অদৃশ্য আলোড়ন"
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব : ৬ ভাঙা সংসার ও মায়ের কান্না
সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত আটটা নাগাদ চব্বিশ তলার মানসিক চাপ আর ফারহানের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে ইনশিরাহ যখন ধানমন্ডির এক শান্ত, সাধারণ গলির পুরোনো ভাড়া বাসায় ফিরল, তখন তার পুরো শরীর ও মন মারাত্মক ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিল।
বাসার দরজায় দাঁড়িয়ে গভীরভাবে কয়েকটা শ্বাস নিল ইনশিরাহ। অফিসের সেই দামী, সুসজ্জিত কর্পোরেট সুট আর 'তুবা আমীন'-এর কঠোর ছদ্মবেশটা সে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় যেন একপাশে সরিয়ে রেখে এসেছে।
এই দরজার ওপাশে সে কোনো তুবা নয়—সে শুধুই ইনশিরাহ, তার বাবার আদরের বড় মেয়ে।
দরজায় আলতো করে নক করতেই ভেতর থেকে কবাট খোলার শব্দ হলো।
দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে ওর ছোট ভাই—আরিফ চৌধুরী। বিশ বছর বয়সী ছিপছিপে গড়নের তরুণ আরিফ, যার চোখের তারায় বাবার সেই একই শান্ত ও গভীর দৃষ্টি ফুটে ওঠে। সে পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে অনার্সে পড়ছে, পাশাপাশি পার্টটাইম কিছু টিউশনি করে সংসারে সাহায্য করার চেষ্টা করে।
"আপু! তুই এসে পড়েছিস?" আরিফ দরজার পাশ থেকে সরে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলল। তবে পরক্ষণেই ইনশিরাহের চেহারার ফ্যাকাশে ভাব দেখে ওর হাসিটা মিলিয়ে গেল। "তুই এত রাত করলি কেন আপু? আর তোর মুখটা এরকম শুকিয়ে গেছে কেন?"
"কাজের একটু চাপ ছিল রে, আরিফ," ইনশিরাহ আলতো করে ছোট ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ভেতরে ঢুকল। "আম্মু কই?"
"আম্মু ভেতরে, সেই কখন থেকে তোর জন্য ভাত বেড়ে অপেক্ষা করছে," আরিফ নিচু গলায় বলল।
তারপর দরজার লকটা শক্ত করে আটকে দিয়ে ইনশিরাহের কাছে এসে দাঁড়াল।
"আপু... শাহরিয়ার গ্রুপের ভেতরের পরিবেশ কেমন? তুই সত্যি ওখানে সেফ তো? তুই ওখানে ঢোকার পর থেকে আমার কিন্তু প্রতিটা মুহূর্তে ভয় করে।"
ইনশিরাহ এক মুহূর্ত থামল। ভাইটির চোখে ফুটে ওঠা শঙ্কা ও উদ্বেগ ও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিল। সে আরিফের কাঁধে হাত রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "ভয় পাবি না আরিফ। তোর আপু কোনো ভুল কাজ করতে ওখানে যায়নি।
আমরা আমাদের অধিকার আর বাবার সম্মান ফেরত আনতে গেছি।"
পর্দা ঠেলে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন ওদের মা—জোহরা বেগম।
তিন বছর আগের সেই ঝড়ের ধাক্কা আর স্বামীর অকালমৃত্যুর শোক এই নারীটির শরীর ও মনকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। একসময়ের সুহাসিনী, পরিপাটি জোহরা বেগমের চুলে এখন অকালেই পাক ধরেছে, চোখের নিচে কালচে ছোপ। স্বামীর নামে জালিয়াতির মিথ্যা অপবাদ ওঠার পর থেকে তিনি এক প্রকার লোকচক্ষুর আড়ালে নিজেকে বন্দি করে ফেলেছেন।
"ইনশিরাহ... এসেছিস মা?" জোহরা বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত গলায় বললেন। "হাত-মুখ ধুয়ে আয়। খাবার টেবিলে দিচ্ছি।"
ইনশিরাহ তার হ্যান্ডব্যাগটি নিজের ছোট ঘরের পড়ার টেবিলে রেখে শাড়ি ও হিজাব বদলে একটা সাধারণ সুতির থ্রি-পিস পরে এলো। হাত-মুখ ধুয়ে যখন সে ডাইনিং টেবিলের প্লাস্টিকের চেয়ারটায় বসল, তখন সামনে সাজানো খুব সাধারণ ডাল, আলুভর্তা আর ছোট মাছের ঝোল।
শাহরিয়ার গ্রুপের বিশাল ফাইভ-স্টার ক্যাটারিং আর দামি কাঁচের পাত্রের আভিজাত্যের চেয়ে এই সাধারণ খাবারগুলো ইনশিরাহের কাছে হাজার গুণ বেশি শান্তির।
খাওয়ার মাঝেই জোহরা বেগম হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে থমকে গেলেন। উনার হাত থেকে ভাতের লোকমাটা যেন আর মুখে উঠছিল না।
"কী হয়েছে, আম্মু? খাচ্ছ না কেন?" আরিফ মায়ের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল।
জোহরা বেগম চোখের কোণে জমে ওঠা জলটুকু আঁচল দিয়ে মুছে নিলেন। "আজ তোর আব্বুর তিন নম্বর মৃত্যুবার্ষিকী আসার আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি, আরিফ...।
দিনগুলোর কথা মনে পড়লেই বুকটা যেন ফেটে যায়। উনি সারাজীবন এক টাকার অসততাও করেননি। অথচ মরণের পরও উনার কপালে জালিয়াতির দাগ লেগে রইল!"
আম্মুর এই করুণ কণ্ঠস্বর শুনে ইনশিরাহের হাতের চামচটা থালায় পড়ে গেল। বুকের ভেতর এক তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ আছড়ে পড়ল।
"আম্মু, দয়া করে আবার কেঁদো না," ইনশিরাহ মায়ের কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের হাতের তালুতে তুলে নিল। "আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম না? আব্বুর নাম আমরা সাফ করবই।"
"কিন্তু কীভাবে মা?" জোহরা বেগম ব্যাকুল চোখে ইনশিরাহের দিকে তাকালেন। "ওই শাহরিয়ার গ্রুপ দেশের সবচেয়ে বড় শক্তিশালী দানব! লতিফ শাহরিয়ার মারা যাওয়ার পর তার ছেলে ফারহান শাহরিয়ার নাকি আরও বেশি নির্দয়, কঠোর মানুষ! পেপারে-টিভিতে দেখি তাকে।
ওই লোকটার সামনে দাঁড়ালে নাকি তাবৎ বড় বড় বিজনেসম্যানরা থরথর করে কাঁপে! তুই সামান্য একটা মেয়ে হয়ে কীভাবে ওই পাষাণ লোকটার সাথে লড়বি?"
'ফারহান শাহরিয়ার' নামটা শোনামাত্র ইনশিরাহের মনের ভেতরে এক অনাস্বাদিত তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল আজ দুপুরে গাড়িতে ফারহানের সুরক্ষামূলক সেই বাড়িয়ে দেওয়া হাত, কপালে আলতো স্পর্শ আর তার গভীর বাদামী চোখ দুটো।
"আম্মু, তুমি ফারহান শাহরিয়ারকে যতটা কঠোর ভাবছ... পরিস্থিতি হয়তো তার চেয়েও বেশি জটিল," ইনশিরাহ ধীর কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলে ফেলল।
আরিফ সঙ্গে সঙ্গে ইনশিরাহের দিকে এক সোজা ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিল। "মানে কী আপু? তুই কি ওই লোকটার সাফাই গাইছিস? ওই লোকটাই তো আব্বুকে কাস্টডিতে পাঠানোর সব ব্যবস্থা করেছিল! লতিফ শাহরিয়ারের মৃত্যুর পর সেই তো আব্বুর ওপর সব দায় চাপিয়ে প্রেস কনফারেন্স করেছিল!"
"আমি কারো সাফাই গাইছি না, আরিফ," ইনশিরাহ নিজেকে সামলে নিয়ে শক্ত গলায় বলল। "আমি শুধু বলছি, আব্বুকে ফাঁসানোর পেছনে শাহরিয়ার পরিবারের ভেতরেরই কোনো বিষাক্ত হাত জড়িত ছিল।
ফারহানের আপন কাকা—রশীদ শাহরিয়ার। আমি আজ প্রজেক্ট সাইটে ওই লোকটাকে নিজ চোখে দেখেছি। ওই লোকটার চেহারায় অপরাধীর স্পষ্ট ছাপ।"
"রশীদ শাহরিয়ার?!" জোহরা বেগম চমকে উঠলেন। "সেই লোকটা? যে তোর আব্বুর জ্যান্ত থাকতে কতদিন এই বাসায় এসে তোর আব্বুর হাতের রান্না খেয়ে গেছে? যে তোর আব্বুকে বড় ভাইয়ের মতো সম্মান করার ভান করত?"
"হ্যাঁ আম্মু," ইনশিরাহ এক চিলতে কঠিন ও হিমশীতল হাসি ফুটাল। "কর্পোরেট জগতে মিষ্টি মুখের আড়ালেই আসল সাপগুলো লুকিয়ে থাকে।
রশীদ শাহরিয়ারই সেই সাপ, যে শাহরিয়ার গ্রুপকে গিলে খেতে চেয়েছিল আর আব্বুকে বলির পাঠা বানিয়েছিল। আর আমি কাল রাতে অফিসে উনার এনক্রিপ্টেড ফিন্যান্সিয়াল ফাইলের ছবি পেয়েছি।"
আরিফ এবার বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ইনশিরাহের পাশে এসে নিচু হয়ে বসল। "আপু! তুই কি সত্যি ওই ফাইলের কপি বের করতে পেরেছিস?
কিন্তু ফারহান শাহরিয়ার যদি কোনোভাবে জানতে পারে তুই কাল রাতে ওর ড্রয়ারে হাত দিয়েছিস... তাহলে ও তোকে এক সেকেন্ডেও রেহাই দেবে না!"
"ও জেনেও গেছে যে আমি ফাইলের দিকে নজর দিয়েছি, আরিফ," ইনশিরাহ শান্ত গলায় উত্তর দিল।
"কী বলছিস তুই?!" জোহরা বেগম ভয়ে হাত চেপে ধরলেন। "তবে তো তুই আর ওখানকার কাজে যাবি না, ইনশিরাহ! তোকে আমি কোনো বিপদে ফেলতে পারব না! আমার স্বামী গেছে, আমি আমার সন্তানদের হারাতে পারব না!"
"ভয় পেও না আম্মু," ইনশিরাহ পরম মমতায় মায়ের মুখটা তুলে ধরল। "ফারহান আমাকে সন্দেহ করলেও কাল আমাকে পুলিশে দেয়নি। বরং ও আমাকে বলেছে সতর্ক থাকতে!
ফারহান নিজেও মনে হয় ভেতর ভেতর জানে যে তিন বছর আগের অডিট রিপোর্টে মারাত্মক কোনো জালিয়াতি লুকানো আছে। সেও সত্যটা খুঁজছে... তবে নিজের স্টাইলে।"
আরিফ চোখ সংকীর্ণ করে বোনকে দেখতে লাগল। "আপু... তুই কি ফারহান শাহরিয়ারকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিস? ও কিন্তু অত্যন্ত চতুর লোক। তোকে ব্যবহার করে ও নিজের কাকাকে সরাতে পারে, আর কাজ শেষে তোকেও ছুড়ে ফেলে দিতে পারে!"
আরিফের এই খাঁটি যুক্তিতে ইনশিরাহ মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গেল। আরিফ ভুল বলেনি। শাহরিয়ার গ্রুপের সিইও ফারহান শাহরিয়ার কারো বন্ধু হতে পারে না। তার চালের গভীরে কী লুকিয়ে আছে, তা বোঝা প্রায় অসম্ভব।
"আমি কাউকেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করছি না, আরিফ," ইনশিরাহের গলায় এক ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা ফিরে এলো। "আমার চোখ শুধু আব্বুর নির্দোষ প্রমাণপত্রের দিকে। ফারহান শাহরিয়ার আমার ঢাল হোক কিংবা শত্রু... আমি এই লড়াই শেষ পর্যন্ত লড়ব।"
রাতে নিজের ছোট ঘরে বিছানায় শুয়ে জানালার ওপাশের আঁধার ঘেঁষা শহরের দিকে তাকিয়ে রইল ইনশিরাহ।
পাশের ঘরে আম্মু আর আরিফ ঘুমিয়ে পড়েছে।
কিন্তু ইনশিরাহের চোখে কোনো ঘুম নেই। সে ড্রয়ার থেকে বের করল বাবার সেই পুরোনো ডায়রিটা, যেখানে শেষ পাতায় লেখা ছিল—*"আমার মেয়ে ইনশিরাহ আমাদের পরিবারের নাম উজ্জ্বল করবে।"*
ইনশিরাহ ডায়েরিটা বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। তখনই হঠাৎ তার মনে ভেসে উঠল ফারহানের সেই পারফিউমের গন্ধ, তার ব্যাকুল দৃষ্টি আর শেষবার গাড়িতে বলে যাওয়া কথাগুলো—*"এখানে প্রতিটা পদক্ষেপে ছায়া শিকার করে।"*
ইনশিরাহ নিজের চোখ দুটো বন্ধ করল। একদিকে মায়ের কান্না আর বাবার অসমাপ্ত সম্মান রক্ষার দায়, অন্যদিকে ফারহান শাহরিয়ারের সেই অদৃশ্য আকর্ষণ আর মনস্তাত্ত্বিক ছায়াবৃত্ত। লড়াইটা এখন আর শুধু ফাইলের নয়... লড়াইটা এখন হৃদয়ের আর আবেগেরও!
চলবে..