ফন্ট সাইজ:
থিম:
অদৃশ্য আলোড়ন

পর্ব 5

লেখক: Jannatul Naima

"অদৃশ্য আলোড়ন"

পর্ব ৫: দুই পরিবারের অতীত ও অদৃশ্য সুতা

লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা

__

গাজীপুর প্রজেক্ট থেকে ফিরে আসার পর চব্বিশ তলার বিশাল অফিসিয়াল নির্জনতা যেন আরও দমবন্ধ করা হয়ে উঠল।

ইনশিরাহের ব্যাগের ভেতরের এনক্রিপ্ট করা সেই হুমকিবার্তাটি কেবল একটি সাংকেতিক মেসেজ ছিল না, তা ছিল এক স্পষ্ট যুদ্ধঘোষণা।

কিন্তু সবকিছুর মাঝে ইনশিরাহকে ভাবাচ্ছিল রশীদ শাহরিয়ারের সেই চতুর চাহনি এবং তিন বছর আগের জালিয়াতি ফাইলের অদৃশ্য সুতাগুলো।

পরদিন সকালে শাহরিয়ার গ্রুপের হেডকোয়ার্টারে ছিল এক জরুরি ইন্টারনাল অডিট সেশন। ইনশিরাহ ফারহানের এক্সিকিউটিভ কেবিনের পাশেই রাখা প্রাইভেট ফাইলে চোখ বুলাচ্ছিল। ফারহান তখনও কেবিনে এসে পৌঁছায়নি।

সুযোগ বুঝে ইনশিরাহ ওর সিক্রেট পার্সোনাল ট্যাবে শাহরিয়ার পরিবারের অতীত কাঠামো ও চৌধুরী পরিবারের পুরোনো কানেকশন ট্র্যাকিং ফাইলটি ওপেন করল।

তিন বছর আগের সেই অভিশপ্ত ঘটনার পেছনের মূল নকশা বুঝতে হলে এই দুই পরিবারের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

চৌধুরী পরিবার এবং শাহরিয়ার পরিবারের সম্পর্কটা কিন্তু দুই বা তিন বছরের নয়—এর ইতিহাস অন্তত দুই দশকের পুরোনো।

ইনশিরাহের বাবা, মরহুম নাবিল চৌধুরী ছিলেন এক অত্যন্ত সৎ, নীতিবান এবং বিরল মেধার অধিকারী ফিন্যান্সিয়াল এক্সপার্ট। সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে নিজের যোগ্যতা ও দূরদর্শিতার শক্তিতে তিনি একসময় শাহরিয়ার গ্রুপের একদম শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছান।

কেবল একজন চিফ একাউন্টেন্ট বা ফিন্যান্সিয়াল হেড হিসেবে নয়, শাহরিয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা—ফারহানের প্রয়াত বাবা লতিফ শাহরিয়ারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ডান হাত ছিলেন নাবিল চৌধুরী।

নাবিল চৌধুরীর পরিবার বলতে ছিল উনার স্ত্রী জোহরা বেগম এবং দুটি সন্তান—বড় মেয়ে ইনশিরাহ চৌধুরী এবং ছোট ছেলে আরিফ চৌধুরী। সম্পূর্ণ সৎ উপার্জনে গড়ে ওঠা একটি সুখী, শান্ত পরিবার। নাবিল চৌধুরী সবসময় মেয়ে ইনশিরাহকে বলতেন—*"কর্পোরেট দুনিয়ায় টাকা আর ক্ষমতার চেয়ে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো নিজের চরিত্র আর সততা, মা।"*

কিন্তু সেই সততাই একদিন তাদের শান্ত জীবনে কাল হয়ে নেমে এলো।

তিন বছর আগে, শাহরিয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা লতিফ শাহরিয়ারের আকস্মিক মৃত্যুর পর পুরো শাহরিয়ার সাম্রাজ্যের ভার এসে পড়ে মাত্র পঁচিশ বছর বয়সী তরুণ ফারহান শাহরিয়ারের কাঁধে।

ঠিক সেই সংকটময় সময়েই কোটি কোটি টাকার এক বিশাল ফিন্যান্সিয়াল স্ক্যাম বা অর্থপাচারের ঘটনা ঘটে শাহরিয়ার গ্রুপে। চক্রান্তকারীরা সব ভুয়া নথিপত্র, ভুয়া সিগনেচার আর অফ-শোর অ্যাকাউন্টের দায় অত্যন্ত সুচতুরভাবে চাপিয়ে দেয় সৎ নাবিল চৌধুরীর ওপর।

পুলিশ কাস্টডিতে নেওয়ার ঠিক আগের রাতে রহস্যজনকভাবে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান নাবিল চৌধুরী।

বাবার এই আকস্মিক ও কলঙ্কজনক মৃত্যুর পর চৌধুরী পরিবার এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ে। সমাজ, সংবাদমাধ্যম আর আইনি ঝামেলার মুখে এক প্রকার নিঃস্ব হয়ে পড়ে তারা।

নাবিল চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী, মেয়ে ইনশিরাহ আর ছোট ছেলে আরিফের জীবন চরম কষ্টের মধ্যে দিয়ে কাটতে থাকে। ছোট ছেলে আরিফ তখন সবে কলেজে উঠেছে, আর অনার্সে পড়া ইনশিরাহের কাঁধে এসে পড়ে পুরো সংসারের দায়িত্ব।

কিন্তু বাবার ওপর লাগা 'চোর' ও 'বিশ্বাসঘাতক'-এর এই মিথ্যা কলঙ্ক কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি ইনশিরাহ ও আরিফ। ইনশিরাহ নিজেকে তিল তিল করে গড়ে তোলে, নতুন পরিচয়—'তুবা আমীন' গ্রহণ করে এবং শাহরিয়ার গ্রুপে অনুপ্রবেশ করে একমাত্র উদ্দেশ্যে: বাবার নাম কলঙ্কমুক্ত করা এবং মূল ষড়যন্ত্রীকে টেনে হিঁচড়ে প্রকাশ্যে আনা।

অন্যদিকে, শাহরিয়ার পরিবার ছিল বাংলাদেশের কর্পোরেট জগতের অন্যতম প্রভাবশালী ও শীর্ষ শিল্পপতি পরিবার। কিন্তু বাইরের চোখধাঁধানো আভিজাত্যের অন্তরালে এই রাজকীয় পরিবারটির ভেতরে জমে ছিল বিষাক্ত এক ইতিহাস।

ফারহানের মা, সাবিহা শাহরিয়ার মারা যান ফারহানের শৈশবেই এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়। মাতৃহীন ফারহান বড় হয়েছে এক চরম কঠোর ও যান্ত্রিক পরিবেশে।

মায়ের অকালমৃত্যু ফারহানকে ভেতর থেকে নিঃসঙ্গ ও বরফশীতল করে তোলে, আর সেই কারণেই সে কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে পারে না। পরিবারে ফারহানের সবচেয়ে প্রিয় দুটি মানুষ হলো তার ছোট ভাই রিশাদ শাহরিয়ার আর ছোট বোন শেহজাদী শাহরিয়ার (শেহনাজ)।

রিশাদ কর্পোরেট জগতের টানাপোড়েন থেকে দূরে থেকে শিল্প ও ছবি তোলা ভালোবাসে, আর শেহনাজ বিদেশে লেখাপড়া শেষ করে সদ্য ফিরে আসা এক অভিমানী মেয়ে। ফারহান নিজের এই দুটি ভাই-বোনকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে এবং আগলে রাখে।

কিন্তু শাহরিয়ার পরিবারের মূল বিষাক্ত কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ফারহানের আপন কাকা—রশীদ শাহরিয়ার।

রশীদ শাহরিয়ার সবসময় চেয়েছেন শাহরিয়ার গ্রুপের সিইও চেয়ারটি যেন তার দখলে আসে। লতিফ শাহরিয়ারের জীবদ্দশায় তিনি সফল হতে পারেননি, আর লতিফ শাহরিয়ারের মৃত্যুর পর ভেবেছিলেন তরুণ ফারহানকে পুতুল বানিয়ে পেছন থেকে রাজত্ব করবেন।

কিন্তু ফারহান সিইও হওয়ার পর অত্যন্ত কঠোর হাতে কাকার সব অপকর্মের পথ বন্ধ করে দেয় এবং কোম্পানির সিংহভাগ শেয়ার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

এই ক্ষমতার লড়াইয়ের মাঝেই রশীদ শাহরিয়ার এক বিশাল অভ্যন্তরীণ চক্রান্ত গড়ে তোলেন।

তিন বছর আগে অফ-শোর অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা সরাতে গিয়ে তিনি লতিফ শাহরিয়ারের বিশ্বস্ত নাবিল চৌধুরীকে বলির পাঠা বানিয়েছিলেন, যাতে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যায়—একদিকে নিজের অপরাধ ঢাকা পড়ে, অন্যদিকে লতিফ শাহরিয়ারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ফিন্যান্সিয়াল স্তম্ভ ভেঙে পড়ে ফারহানকে দুর্বল করে দেওয়া যায়!

কিন্তু প্রশ্ন একটাই—ফারহান কি সত্যি সেসময়ে রশীদ শাহরিয়ারের এই চক্রান্ত বুঝতে পারেনি?

নাকি ফারহান নিজের কাকা আর শাহরিয়ার পরিবারের সম্মান বাঁচাতে নাবিল চৌধুরীর বলিদানে নীরব সমর্থন দিয়েছিল?

ইনশিরাহ ট্যাবের স্ক্রিনে দুই পরিবারের সম্পর্কের তথ্যগুলো দেখতে দেখতে গভীরভাবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

ঠিক সেই মুহূর্তে কেবিনের দরজায় পায়ের শব্দ হলো। ফারহান শাহরিয়ার প্রবেশ করল।

আজ তার পরনে ডার্ক নেভি ব্লু স্যুট, চেহারায় রাজকীয় আভিজাত্য কিন্তু চোখের তারায় জমে আছে এক গভীর চিন্তার ছায়া। সে সোজা নিজের ডেস্কে গিয়ে বসল।

"মিস তুবা," ফারহানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

ইনশিরাহ দ্রুত ট্যাব লক করে ফাইল হাতে ফারহানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। "ইয়েস, স্যার?"

ফারহান ল্যাপটপ অন না করে দুই হাত টেবিলে রেখে সোজা ইনশিরাহের চোখের দিকে তাকাল।

"আজ বিকেলে আমাদের বোর্ডে একটা প্রাইভেট মিটিং আছে। মিটিংয়ে রশীদ শাহরিয়ার এবং কোম্পানির পুরোনো কয়েকজন বোর্ড মেম্বার থাকবেন। আই নিড ইউ টু বি দেয়ার উইথ অল ফিন্যান্সিয়াল ব্যাকআপ ফাইলস।"

ইনশিরাহ এক মুহূর্ত থমকে গেল। "রশীদ শাহরিয়ার স্যারও থাকবেন?"

ফারহান ইনশিরাহের সূক্ষ্ম চমকে যাওয়াটা লক্ষ্য করল। সে শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বলল, "হ্যাঁ। কেন?

গতকাল গাজীপুর সাইটে উনাকে দেখার পর থেকেই আপনার মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি দেখছি, তুবা। আপনি কি রশীদ শাহরিয়ারকে আগে থেকেই চেনেন?"

প্রশ্নটা ছুড়ে দেওয়ার সময় ফারহানের চোখ দুটো ইনশিরাহের মুখের প্রতিটি পেশির সঞ্চালন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল।

ইনশিরাহ নিজের বুকের ভেতরের তোলপাড় চেপে রাখল। ফারহানের সামনে সামান্যতম ভুলের অর্থই হবে নিজের সর্বনাশের পথ খুলে দেওয়া। সে একদম নির্দ্বিধায়, শান্ত কণ্ঠে বলল, "না স্যার, আমি উনাকে আগে কখনো দেখিনি। তবে কাল সাইটে উনার কাজের ধরন আর প্রশ্ন করার পদ্ধতি দেখে মনে হয়েছে... উনি কোম্পানির বর্তমান ম্যানেজমেন্ট বা আপনার ওপর খুব একটা সন্তুষ্ট নন।"

ইনশিরাহের এই সরাসরি ও সাহসী মন্তব্য শুনে ফারহানের চোখে এক পলকের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল। সাধারণ কোনো অ্যাসিস্ট্যান্ট সিইওর কাকা বা বোর্ড ডিরেক্টরকে নিয়ে এমন খোলামেলা মন্তব্য করার সাহস পায় না।

ফারহান চেয়ারে পেছনের দিকে হেলান দিল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে রহস্যময় ও কঠিন হাসি।

"আপনি খুব দ্রুত মানুষ চিনতে পারেন, মিস তুবা," ফারহান ঠান্ডা গলায় বলল। "হ্যাঁ, রশীদ শাহরিয়ার এই কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে আছেন ঠিকই, কিন্তু উনার উদ্দেশ্য সবসময় কোম্পানির স্বার্থে কাজ করা নয়।

তিন বছর আগে যখন আমার বাবা মারা যান এবং নাবিল চৌধুরীর জালিয়াতির ঘটনাটা ঘটে... তখনো উনি চেষ্টা করেছিলেন কোম্পানিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে।"

নাবিল চৌধুরীর নামটা ফারহানের মুখে শোনামাত্র ইনশিরাহের হাতের আঙুলগুলো ফাইলে শক্ত হয়ে বসে গেল।

"তাহলে আপনি কেন উনাকে বোর্ডে রেখে দিয়েছেন, স্যার?" ইনশিরাহ নিজের কৌতূহল আর ভেতরের তীব্র ক্ষোভ সামলাতে না পেরে প্রশ্নটা করেই ফেলল।

ফারহান কয়েক সেকেন্ড এক দৃষ্টিতে ইনশিরাহের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠ বরফের মতো ঠাণ্ডা শোনাল, "শত্রুকে দূর থেকে দেখার চেয়ে কাছে রাখা অনেক বেশি নিরাপদ, তুবা। এতে তার প্রতিটি চালের খবর আগে থেকে পাওয়া যায়।

তাছাড়া... তিন বছর আগের সেই ফিন্যান্সিয়াল স্ক্যামের ফাইল কিন্তু আমি এখনও পুরোপুরি বন্ধ করিনি। কিছু হিসাব মেলা এখনও বাকি আছে।"

ফারহানের মুখে এই কথাটি শুনে ইনশিরাহের বুকের রক্ত যেন এক মুহূর্তে থমকে গেল! ফারহান কি তবে জানে যে নাবিল চৌধুরী নির্দোষ ছিলেন? সে কি তবে রশীদ শাহরিয়ারের ওপর নজর রাখার জন্যই এই পুরো খেলাটা খেলছে?

ফারহান টেবিল থেকে একটি এনক্রিপ্টেড ফোল্ডার তুলে ইনশিরাহের দিকে বাড়িয়ে দিল।

"এই ফাইলটা বিকেলের মিটিংয়ের আগে অত্যন্ত সাবধানে স্টাডি করে নেবেন। এই ফাইলে রশীদ শাহরিয়ারের গত ৩ বছরের কিছু বিতর্কিত প্রজেক্টের ইন্টারনাল রিপোর্ট আছে," ফারহান গম্ভীর গলায় বলল।

"মনে রাখবেন তুবা, শাহরিয়ার পরিবারের ভেতরে রক্ত আর রাজনীতির খেলা বহু পুরোনো। এখানে কাকে বিশ্বাস করবেন আর কাকে করবেন না—তা ভুল করলে মাশুলটা কিন্তু প্রাণ দিয়ে দিতে হতে পারে।"

ইনশিরাহ ফাইলটি হাতে নেওয়ার সময় ফারহানের গরম হাতের স্পর্শ আবার অনুভব করল। ফারহানের চোখের দিকে তাকাতেই ইনশিরাহ সেখানে দেখতে পেল এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব—যাতে রয়েছে চরম কঠোরতা, আবার একই সাথে ইনশিরাহের প্রতি এক অদৃশ্য, সুপ্ত সুরক্ষার টান!

দুই পরিবারের বিষাক্ত অতীতের চক্রান্ত আর বর্তমানের অগোচর অনুরাগের মাঝে দাঁড়িয়ে ইনশিরাহ বুঝতে পারল, এই দাবার খেলায় এখন শুধু প্রতিশোধের অস্ত্র নয়, ফারহান শাহরিয়ারের মন ও রহস্যের গভীর তলদেশে প্রবেশ করাই হবে তার সবচেয়ে বড় চাল!

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 5 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন