অদৃশ্য আলোড়ন
পর্ব ৮
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
___
বোর্ড রুমের উত্তপ্ত ও দমবন্ধ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে ইনশিরাহ যখন নিজের ডেস্কে ফিরে এল, তখন ঘড়িতে সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা বাজে।
চব্বিশ তলার বিশাল অফিস ফ্লোরে একে একে সব কর্মীরা ডেস্ক গুছিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু ইনশিরাহের মনে তখন ঝড়ের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে বোর্ড রুমের শেষ মুহূর্তগুলো।
ফারহান যেভাবে রশীদ শাহরিয়ারকে কোণঠাসা করেছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে ফারহান আর যাই হোক, নিজের কাকার অপরাধের বিষয়ে অন্ধ নয়। সে জানত শেল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে কীভাবে টাকা পাচার হয়েছে।
তাহলে কি তিন বছর আগে ফারহানের অজান্তেই পুরো জালিয়াতিটা ঘটিয়েছিল রশীদ শাহরিয়ার?
নাকি ফারহান তখন খুব কম বয়সে সিইও হওয়ার কারণে কাকার সেই জালের বিরুদ্ধে সরাসরি দাঁড়াতে পারেনি?
ইনশিরাহ তার ট্যাব ও ফাইলগুলো গুছিয়ে ল্যাপটপটা বন্ধ করল। ঠিক তখনই ফারহানের এক্সিকিউটিভ কেবিনের ইন্টারকম ফোনটা বেজে উঠল।
রিং হতেই ইনশিরাহের বুকটা এক পলক কেঁপে উঠল। সে শান্ত হয়ে ইন্টারকম রিসিভারটা তুলে কানে ধরল।
"মিস তুবা, আমার কেবিনে আসুন," ফারহানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
"জি স্যার, আসছি," হিজাবটা একটু ঠিক করে ইনশিরাহ ফাইল হাতে ফারহানের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।
দরজায় হালকা টোকা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল, ফারহান তার বিশাল এক্সিকিউটিভ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কাঁচের জানালার সামনে হাত দুটো পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে।
বাইরে তখন ঢাকার রাতের বেলার নিয়ন আলোর রোমাছ ছড়ানো ব্যস্ত শহরটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কেবিনের মৃদু আলোয় ফারহানের চওড়া কাঁধ আর পরিপাটি স্যুট তাকে আরও বেশি রহস্যময় ও শক্তিশালী দেখাচ্ছে।
"আপনি ডেকেছিলেন, স্যার?" ইনশিরাহ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল।
ফারহান মুখ ফিরিয়ে ইনশিরাহের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই বরফশীতল কঠোরতা এখন কিছুটা কমে এসেছে, যার জায়গায় লুকিয়ে আছে এক গভীর ক্লান্তি।
"বোর্ড মিটিংয়ে রশীদ আঙ্কেল যেভাবে রিয়্যাক্ট করেছেন, তাতে আজ রাতে তিনি চুপ করে বসে থাকবেন না," ফারহান ধীর পায়ে ডেস্কের কাছে এসে বটল থেকে এক গ্লাস জল ঢালতে ঢালতে বলল।
"উনি যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো স্টেপ নিতে পারেন। আর আমি চাই না এই কর্পোরেট পলিটিক্সের মাঝখানে আপনি কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তুবা।"
ইনশিরাহ ফারহানের মুখে এই সুরক্ষার কথা শুনে এক মুহূর্তের জন্য অবাক হলো। যে লোকটা সামান্য আগে বোর্ডরুমে শত্রুদের সাথে নির্মম লড়াই করল, সেই মানুষটাই আজ ওর নিরাপত্তার কথা ভাবছে!
"আমার সুরক্ষার কথা আপনার ভাবতে হবে না, স্যার," ইনশিরাহ কিছুটা শক্ত গলায় উত্তর দিল।
"আমি জানি কীভাবে নিজের যত্ন নিতে হয়। বরং আপনার নিজের পরিবারে এমন শত্রুরা লুকিয়ে আছে যখন, তখন আপনার নিজের সাবধান হওয়া উচিত।"
ফারহান জল খাওয়ার গ্লাসটা হাত থেকে নামিয়ে টেবিলে রাখল। তারপর এক দীর্ঘ পদক্ষেপে ইনশিরাহের একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল।
ফারহানের উচ্চতা ও তার উপস্থিতির তীব্রতা ইনশিরাহকে যেন এক অদৃশ্য প্রাচীরের মতো ঘিরে ফেলল।
"তুমি আমাকে নিয়ে এত ভাবছ কেন, তুবা?" ফারহান সরাসরি ইনশিরাহের চোখের ভেতর তাকিয়ে খুব নিচু ও মায়াবী কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্নটা করল। "আমার কি মনে হয় জানো... তুমি এই শাহরিয়ার গ্রুপের শুধু একজন সাধারণ অ্যাসিস্ট্যান্ট বা পিএ নও? তোমার চোখের পেছনে অন্য কোনো গভীর গল্প লুকিয়ে আছে?"
ফারহানের এই সরাসরি প্রশ্নে ইনশিরাহের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। পলকের জন্য ওর মনে হলো, লোকটা কি তবে সব কিছু জেনে গেছে?
ও কি তবে চিনে ফেলেছে আসল ইনশিরাহ চৌধুরীকে?
ইনশিরাহ নিজের ভেতরের সব ভয় ও কম্পন চরম শক্তিতে আড়ালে ঢেকে দিল। সে কোনোভাবেই এই ফাঁদে পা দিতে পারবে না।
একদম বরফশীতল কণ্ঠে সে ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমার কোনো লুকানো গল্প নেই, স্যার।
আমার অতীত একটাই—আর তা হলো আমার সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবন আর আমার কাজ। আপনি যদি আমার পরিচয় নিয়ে সন্দেহ করেন, তবে আজই আমার পেপার্স চেক করে দেখতে পারেন।"
ফারহান এক দৃষ্টিতে ইনশিরাহের আত্মবিশ্বাসী ও জেদি মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে ইনশিরাহের চোখে কোনো ভয়ের ছায়া দেখতে পেল না, কেবল দেখতে পেল এক অবাধ্য আগুন।
ফারহানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে একটু ঝুঁকে ইনশিরাহের আরও কাছে এসে কানে ফিসফিস করে বলল, "কাগজপত্র তো যেকোনো দিন বদলে ফেলা যায়, তুবা... কিন্তু চোখের আগুন সহজে লুকানো যায় না। যাকগে, আজ আর কাজ করতে হবে না। বাড়ি যাও।"
ফারহান আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে নিজের ওভারকোটটা গায়ে জড়িয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
ইনশিরাহ একা কেবিনের মধ্যে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল। বুক তখনো দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে। ফারহান শাহরিয়ারের এই অতি-তক্ষ্ণ বুদ্ধি যেকোনো মুহূর্তে ওর সব ছদ্মবেশ ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।
অফিস থেকে বের হয়ে ইনশিরাহ যখন ধানমন্ডির বাসায় পৌঁছাল, তখন ঘড়িতে রাত প্রায় সাড়ে নটা।
বাসায় ঢুকতেই মার মুখ দেখে ইনশিরাহ বুঝতে পারল কিছু একটা হয়েছে। আরিফ ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ভীষণ উৎকণ্ঠিত মুখে খবরের কাগজ উল্টাচ্ছে।
"কী হয়েছে, আম্মু? তোমরা এভাবে বসে আছো কেন?" ইনশিরাহ দ্রুত ব্যাগটা রেখে মায়ের কাছে গিয়ে বসল।
জোহরা বেগম মেয়ের হাত দুটো নিজের কাঁপতে থাকা হাতে জড়িয়ে ধরে রুদ্ধশ্বাসে বললেন, "আজ সন্ধ্যায় কে যেন আমাদের বাসার বাইরে এসে একটা খাম ফেলে গেছে, ইনশিরাহ!"
ইনশিরাহের মাথার ভেতরটা যেন দপ করে জ্বলে উঠল। "খাম? কে ফেলে গেছে? ভেতরে কী ছিল?"
আরিফ সোফা থেকে দ্রুত উঠে একটা সাদা রঙের সিলবন্ধ খাম ইনশিরাহের দিকে বাড়িয়ে দিল।
"আমি যখন দরজা খুলতে গেলাম, তখন দেখি কেউ নেই। শুধু গেটের কিনারায় খামটা গোঁজা ছিল। ভেতরে যা আছে, তা দেখলে তোর মাথা ঘুরে যাবে আপু!"
ইনশিরাহ দ্রুত খামটা ছিঁড়ে ভেতরের কাগজটা বের করল।
কাগজের ওপর প্রিন্ট করা বড় বড় অক্ষরে লেখা:
"মিস তুবা ওরফে ইনশিরাহ চৌধুরী... শাহরিয়ার গ্রুপের চব্বিশ তলায় খেলা বন্ধ করো। তিন বছর আগে তোমার বাবা নাবিল চৌধুরী যেভাবে নিজের জীবন দিয়ে ব্যাংকের ঋণ ও জালিয়াতির দাম শোধ করেছিল, ঠিক একইভাবে এবার তোমার মায়ের বা ভাইয়ের যেকোনো একজনের ওপর সেই অভিশাপ নেমে আসতে পারে। যদি নিজের পরিবারকে বাঁচাতে চাও, কাল সকালের মধ্যে চাকরি ছেড়ে চিরতরে দূরে চলে যাও।"
চিঠিটা পড়ার সাথে সাথে ইনশিরাহের সারা শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। ওর হাত থেকে কাগজটা খসে মাটিতে পড়ে গেল।
ওরা শুধু জানে ও কে নয়... ওরা ওর পরিবারকেও টার্গেট করেছে! রশীদ শাহরিয়ার বা তার কোনো লোক খুব সুচতুরভাবে ওদের বাসার ঠিকানা পর্যন্ত বের করে ফেলেছে!
"আম্মু... আরিফ..." ইনশিরাহের গলার স্বর কাঁপতে শুরু করল। চোখের কোণে জমে ওঠা জল সে জোর করে আটকে দিল। "ভয় পেও না। কেউ আমাদের কিচ্ছু করতে পারবে না!"
"কীভাবে ভয় পাবো না আপু?" আরিফ ক্ষোভে ও আতঙ্কে ফেটে পড়ল। "ওরা আমাদের বাসার ঠিকানা পর্যন্ত জেনে গেছে! আজ তো মা একা ছিলেন বাসায়, কাল যদি তোর বা আমার কিছু হয়ে যায়...? তুই কালকেই ওই চাকরি ছাড়বি! আমার কোনো চাকরি বা প্রতিশোধ দরকার নেই!"
"না, আরিফ!" ইনশিরাহ এবার শক্ত কণ্ঠে ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখল। ওর চোখে এখন আর কোনো ভয় নেই, আছে এক ভয়ংকর জেদ ও ধ্বংসের আগুন।
"আমি যদি এখন পিছু হটি, তবে ওরা আমাদের চিরকালের মতো শেষ করে দেবে। ওরা ভেবেছে ভয় দেখিয়ে আমাকে থামিয়ে দেবে... কিন্তু ওরা জানে না, ইনশিরাহ চৌধুরী মৃত্যুর ভয় কবেই পেরিয়ে এসেছে।"
রাত গভীর হলো।
ধানমন্ডির সেই ছোট্ট বাসার এক কোণে বসে ইনশিরাহ তার ল্যাপটপটা ওপেন করল। সে আজ আর কোনো সাধারণ পিএ নয়—সে একজন শিকারী, যে তার বাবার রক্তের বদলা নিতে নিজেই বাঘের গুহায় পা রেখেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ইনশিরাহের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে অপরিচিত একটা নম্বর ভেসে উঠল।
ইনশিরাহ ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ফারহানের গভীর ও শীতল কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "তুবা... আজ রাতে তোমার বাসার বাইরে কিছু কি ঘটেছে? কারণ আমার সিকিউরিটি ইনফর্মাররা জানিয়েছে, রশীদ শাহরিয়ারের এক লোক আজ ধানমন্ডি এলাকায় তোমাদের বাড়ির আশপাশে ঘোরাঘুরি করছিল।"
ফারহানের মুখে এই কথাটা শোনার পর ইনশিরাহের বুকটা এক পলকের জন্য কেঁপে উঠল। লোকটা কি তবে সত্যি ওর ওপর সারাক্ষণ নজর রাখছে? নাকি সে ইতিমধ্যেই সবটা জেনে গেছে?
"আপনি এসব কথা কেন বলছেন, স্যার?" ইনশিরাহ নিজেকে কঠিন রাখার চেষ্টা করে বলল। "আমার বাসার বাইরে কে গেল বা না গেল, তাতে আপনার কী যায় আসে?"
ওপাশ থেকে ফারহানের দীর্ঘ এক শ্বাসের শব্দ শোনা গেল। তারপর ফারহান আরও গম্ভীর ও ধারালো গলায় বলল, "তুবা, আগুন নিয়ে খেলার শখ তোমার থাকতে পারে, কিন্তু সেই আগুনে তোমার নিজের ঘর পুড়ে যাক—সেটা আমি হতে দেবো না। কাল সকালে অফিসে এসো। তোমার নিরাপত্তার একটা পার্মানেন্ট ব্যবস্থা আমাকে করতে হবে।"
লাইনটা কেটে গেল।
ইনশিরাহ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। রাতের এই নীরবতার মাঝে তার মনে প্রবল এক আলোড়ন তৈরি হলো। ফারহান কি তবে তার আসল পরিচয় জেনে গেছে? নাকি সে তার অজান্তেই ইনশিরাহকে বাঁচাতে চাইছে?
পরদিন সকালে শাহরিয়ার গ্রুপ হেডকোয়ার্টারে পা রাখতেই এক অভাবনীয় পরিস্থিতি ইনশিরাহের মুখোমুখি হলো।
অফিসের লবিতে থমথমে পরিবেশ। কর্মচারীদের ফিসফিসানি আর কানাকানি দেখে মনে হচ্ছে বড় কোনো ভূমিকম্প ঘটে গেছে।
ইনশিরাহ দ্রুত লিফটে করে চব্বিশ তলায় উঠে সোজা ফারহানের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। কেবিনের দরজা খোলা ছিল।
ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই সে দেখল, ফারহান নিজের ডেস্কে বসে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় কিছু একটা পড়ছেন। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কোম্পানির চিফ সিকিউরিটি অফিসার।
"স্যার, সিকিউরিটি রিপোর্ট ক্লিয়ার," চিফ সিকিউরিটি অফিসার স্যালুট দিয়ে বললেন। "রশীদ স্যারের পিএ-র মাধ্যমে গতকাল রাতে ধানমন্ডি এলাকায় যে লোকটা পাঠানো হয়েছিল, তাকে আমাদের টিম ট্র্যাক করেছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার আগেই কে যেন লোকটাকে মিটিয়ে দিয়েছে বা সে নিজেই আড়ালে চলে গেছে।"
ইনশিরাহের পা দুটো যেন ডেস্কে এসে জমে গেল। গত রাতে ধানমন্ডির বাসায় সেই হুমকির চিঠি আসার পর রশীদ শাহরিয়ারের লোকটাকে কে সরিয়ে দিল? ফারহান কি তবে রাতেই কোনো অ্যাকশন নিয়েছিল?
ফারহান সিকিউরিটি অফিসারকে হাত নেড়ে চলে যাওয়ার ইশারা দিল। অফিসারটি রুম থেকে বের হওয়ার সময় ইনশিরাহকে দেখে মাথা নিচু করে চলে গেল।
কেবিনের দরজাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ফারহান নিজের লেদার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে মুখে এক অদ্ভুত ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু দৃষ্টি আগের মতোই তীক্ষ্ণ ও ধারালো। সে সোজা ইনশিরাহের দিকে এগিয়ে এসে ডেস্কে ওপর দুই হাত রাখল।
"তুমি কাল রাতে আমার কথা শোনোনি, তুবা," ফারহান সরাসরি অভিযোগের সুরে বলল। "আমি তোমাকে বলেছিলাম সাবধানে থাকতে। অথচ রশীদ শাহরিয়ারের লোক তোমার বাসার দোরগোড়ায় এসে হুমকি দিয়ে গেল!"
ইনশিরাহ নিজেকে সম্পূর্ণ সামলে নিয়ে ইস্পাতকঠিন গলায় বলল, "আপনি কীভাবে জানলেন আমার বাসার কথা, স্যার? আপনি কি আমার ওপর নজর রাখছেন? নাকি আপনি নিজেই রশীদ শাহরিয়ারের সাথে মিলে আমার ওপর এসব করাচ্ছেন?"
ইনশিরাহের এই সরাসরি ও ক্ষুব্ধ অভিযোগে ফারহানের মুখের পেশিগুলো একবারের জন্য শক্ত হয়ে গেল। সে এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে রইল। তারপর খুব মন্থর গতিতে ইনশিরাহের আরও কাছাকাছি এগিয়ে এলো। ফারহানের সুগন্ধি আর তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা ইনশিরাহের কাছাকাছি এসে পৌঁছাল।
"তোমার কি সত্যিই মনে হয়, আমি তোমাকে ভয় দেখাতে পারি, তুবা?"
ফারহানের কণ্ঠস্বর এতটাই নিচু ও মায়াবী ছিল যে ইনশিরাহের বুক কেঁপে উঠল।
"যদি কখনো তোমাকে ধ্বংস করার বা ভয় দেখানোর ইচ্ছে আমার থাকত, তবে এতক্ষণে খেলা অন্য জায়গায় গড়িয়ে যেত। আমি তোমাকে রক্ষা করছি... কারণ এই কর্পোরেট দুনিয়ায় আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে আর বিশ্বাস করতে পারছি না।"
ইনশিরাহ ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সেখানে কোনো মিথ্যা অভিনয়ের ছায়া ছিল না।
ছিল এক গভীর, অসহনীয় আকুলতা যা ফারহানের মতো কঠোর মানুষের মুখে মানায় না।
"বিশ্বাস?" ইনশিরাহ ব্যঙ্গাত্মক একটা হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল। "আপনি কাউকে বিশ্বাস করতে জানেন না, স্যার। আপনি শুধু জানেন দাবার ছক উল্টে দিতে!"
"তাহলে চলো আজ সেই দাবার ছক আমরা একসাথে উল্টে দিই," ফারহান হঠাৎ ইনশিরাহের হাতের কব্জিটা নিজের উষ্ণ ও শক্ত মুঠোর মধ্যে তুলে নিল।
ইনশিরাহের হৃৎস্পন্দন এক মুহূর্তে হাজার গুণ বেড়ে গেল। ফারহান খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, "আজ সন্ধ্যায় রশীদ শাহরিয়ারের গোপন ভিলাতে একটা জরুরি প্রাইভেট মিটিং আছে। কোম্পানির সমস্ত গোপন ব্ল্যাক মানি ও জাল দলিলের আসল কপি সেখানে রাখা আছে। তুমি কি আমার সাথে সেই নরকে নামতে রাজি আছো, তুবা... নাকি এখানে বসেই হেরে যাওয়ার অপেক্ষা করবে?"
ইনশিরাহ নিজের কব্জিটা ফারহানের হাতের মুঠোয় স্পন্দিত হতে দেখল। তিন বছরের জমে থাকা প্রতিশোধের আগুন, বাবার অসমাপ্ত বিচার আর এই অদ্ভুত মানুষটির প্রতি তৈরি হওয়া এক তীব্র অদৃশ্য আকর্ষণ—সবমিলিয়ে ইনশিরাহের মাথা তখন ঘুরছিল।
সে ফারহানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত শক্ত ও দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিল, "নরক হোক কিংবা মৃত্যু... আমি আপনার সাথে আসছি, ফারহান শাহরিয়ার। দেখি কার সত্য জয়ী হয়!"
চলবে.....