ফন্ট সাইজ:
থিম:
অদৃশ্য আলোড়ন

পর্ব 9

লেখক: Jannatul Naima

অদৃশ্য আলোড়ন

পর্ব ৯

লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা

_____

ধানমন্ডির সেই ছোট্ট বাসায় রাতের খাবার খাওয়ার সময় ইনশিরাহ আর আরিফ কাউকেই কোনো কথা বলতে দেখা গেল না।

ডাইনিং টেবিলের মৃদু আলোয় আরিফের চোখমুখে এখনো স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। সে বারবার ইনশিরাহকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল যেন সে আগামীকালই চাকরিটা ছেড়ে দেয়।

কিন্তু ইনশিরাহের মন তখন অন্য এক দুনিয়ায় পড়ে রয়েছে—যেখানে চব্বিশ তলার কাঁচঘেরা কেবিন, ফারহানের বরফশীতল চাহনি আর একটু আগে ফোনে বলে যাওয়া সেই কথাগুলো বারবার রিং বাজিয়ে চলেছে:

"আজ সন্ধ্যায় রশীদ শাহরিয়ারের গোপন ভিলাতে একটা জরুরি প্রাইভেট মিটিং আছে... তুমি কি আমার সাথে সেই নরকে নামতে রাজি আছো,তুবা?"

ইনশিরাহ জানে,এই আমন্ত্রণের অর্থ হলো সরাসরি আগুনের ভেতর লাফ দেওয়া। কিন্তু সে পিছু হটবে না। তার বাবার ওপর চলা অন্যায়ের শেষ সুতোটি টেনে ছিঁড়ে ফেলার সময় এসে গেছে।

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে ঢাকার আকাশ মেঘে ঢাকা পড়ে গেল। গাবতলী ছাপিয়ে উত্তরা বা গুলশানের অভিজাত এলাকা পেরিয়ে একটু নির্জন এক জায়গায় অবস্থিত রশীদ শাহরিয়ারের সেই গোপন ব্যক্তিগত ভিলা।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কোনো সাধারণ বিলাসবহুল বাগানবাড়ি,কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে শাহরিয়ার গ্রুপের দুর্নীতি, ব্ল্যাক মানি আর ক্ষমতার কালো রাজত্ব।

ফারহানের কালো রঙের মার্সিডিজ গাড়িটি যখন ভিলার বিশাল লোহার গেটের সামনে এসে থামল,তখন গাড়ির ভেতরের পরিবেশ ছিল বরফের মতো ঠান্ডা। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা ফারহান এক হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখে অন্য হাতে তার ঘড়িটার দিকে তাকাল।

ইনশিরাহ প্যাসেঞ্জার সিটে বসে নিজের অফ-হোয়াইট থ্রি-পিসের ওপর একটা গাঢ় খয়েরি রঙের ওভারকোট জড়িয়ে নিয়েছিল। তার মাথায় হিজাবটি খুব নিখুঁতভাবে জড়ানো।

গাড়ির মৃদু নীল আলোয় ফারহানের মুখাবয়ব আরও বেশি স্পষ্ট ও ধারালো দেখাচ্ছিল।

"গাড়ি থেকে নামার আগে একটা কথা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি,তুবা,"ফারহান স্টিয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে সিটে একটু পেছনের দিকে হেলান দিয়ে বসল।

তার কণ্ঠস্বরে কোনো আদেশ ছিল না,ছিল এক অদ্ভুত প্রচ্ছন্ন উদ্বেগ।

"ভিলার ভেতরটা যতটা না কর্পোরেট মিটিং রুম, তার চেয়ে অনেক বেশি একটা ক্রাইম সিন। রশীদ আঙ্কেল একা নন,সেখানে তার কিছু ব্যক্তিগত এবং বিপজ্জনক বডিগার্ড থাকবে। তুমি এক মুহূর্তের জন্যও আমার পাশ ছাড়বে না।"

ইনশিরাহ ফারহানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো ভয়ের লেশমাত্র নেই—বরং সেখানে জ্বলছে এক শান্ত ও ভয়ংকর আত্মবিশ্বাস।

"আমার সুরক্ষার কথা আপনাকে ভাবতে হবে না, স্যার," ইনশিরাহ শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল। "আমি এখানে কোনো বেড়াতে আসিনি। আপনি আপনার নিজের দিকটা সামলান।"

ফারহানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে কঠিন হাসি ফুটে উঠল। সে গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে ছোট একটা সিক্রেট কমিউনিকেটর ইয়ারপিস বের করে ইনশিরাহের কানের সাথে সেট করে দিল।

ইনশিরাহের কানের লতি সামান্য ছুঁয়ে যাওয়ার সময় ফারহানের আঙুলের উষ্ণতা ইনশিরাহকে যেন এক মুহূর্তের জন্য শিহরিত করে তুলল।

"কমিউনিকেশন অন রেখো," ফারহান ফিসফিস করে বলল। "ভিতরে নেটওয়ার্ক ব্লক থাকতে পারে, কিন্তু এই ডিভাইস আলাদা ফ্রিকোয়েন্সিতে কাজ করবে।"

দুজন একসাথে গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন।

ভিলার মেইন গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই এক তীব্র অস্বস্তিকর নীরবতা তাদের গ্রাস করল।

বিশাল লন পেরিয়ে মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে যখন তারা প্রধান দরজার সামনে পৌঁছলেন,তখন ভেতর থেকে ভেসে এল গম্ভীর কিছু মানুষের কণ্ঠস্বর ও কাঁচের গ্লাসের মৃদু টুংটাং শব্দ।

ফারহান এক ধাক্কায় ভারী কাঠের দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল।

ভিলার ভেতরে প্রবেশ করতেই ইনশিরাহের চোখ কপালে উঠে গেল। বিশাল ড্রয়িংরুমে মাঝখানে একটা দামি গ্লাস টেবিল,আর তার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছেন রশীদ শাহরিয়ারসহ আরও চারজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। যাদের সাথে দেশের বড় বড় রাজনৈতিক ও অপরাধজগতের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।

রশীদ শাহরিয়ার ফারহানকে হঠাৎ এভাবে ভেতরে ঢুকে পড়তে দেখে এতটাই চমকে গেলেন যে তার হাতের হুইস্কির গ্লাসটি টেবিলের ওপর সশব্দে বেসামাল হয়ে পড়ে গেল।

"ফারহান?! তুই... তুই এখানে কী করছিস?!"

রশীদ শাহরিয়ার রাগে ও আতঙ্কে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন।

ফারহান অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে নিজের ওভারকোটের বোতাম দুটো খুলতে খুলতে এগিয়ে গেল। তার পা ফেলার শব্দে পুরো রুমের তাপমাত্রা যেন আরও কমে গেল।

"কাকা, সারপ্রাইজড হলেন কেন?" ফারহানের ঠোঁটে এক নিষ্ঠুর হাসি ঝুলছিল।

সে সোজা গিয়ে রশীদ শাহরিয়ারের সামনে দাঁড়াল।

"আপনি ভেবেছিলেন ধানমন্ডিতে একটা ভুয়া চিঠির হুমকি দিয়ে আমার পিএ-কে ভয় দেখাবেন,আর আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকব?

শাহরিয়ার গ্রুপের ডিরেক্টর হয়ে কোম্পানির তিল তিল করে জমানো টাকা এভাবে অফ-শোর অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নিজের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য বানাচ্ছেন... আর আমি জানতে পারব না?"

রশীদ শাহরিয়ারের মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বের হচ্ছিল না। তিনি তার পেছনের দাঁড়িয়ে থাকা বডিগার্ডদের ইশারা করতে চাইলেন,কিন্তু তার আগেই ফারহানের সাথে থাকা সিকিউরিটি টিম বাইরে থেকে ভিলার পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে গেল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।

রশীদ শাহরিয়ারের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তি হঠাৎ নিজের কোটের ভেতর থেকে একটা ছোট রিভলভার বের করে সরাসরি ফারহানের বুক বরাবর তাক করল!

"সাবধান, ফারহান সাহেব!"

মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিস্থিতি পাল্টে গেল।

ইনশিরাহ দেখল বন্দুকটা সোজা ফারহানের দিকে তাক করা হয়েছে।

তিন বছর আগে তার বাবার ক্ষেত্রেও ঠিক এভাবেই একটা বন্দুকের নলের সামনে সব সত্য চিরকালের মতো ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল।

আজ ইতিহাস আবার পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে!

কোনো কিছু না ভেবে,নিজের প্রাণের কথা একবারের জন্যও মাথায় না এনে ইনশিরাহ বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে গিয়ে সোজা ফারহানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল!

"ইনশিরাহ—!" ফারহানের গলা চিরে এক তীব্র আর্তনাদ বেরিয়ে এলো।

ঠিক তখনই বন্দুকের ট্রিগার টিপে দেওয়ার শব্দ হলো। একটা কান ফাটানো শব্দে পুরো ভিলা কেঁপে উঠল!

ইনশিরাহের পিঠের পেছনে ঝাপটে ধরে ফারহান মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু গুলিটা কি ইনশিরাহের গায়ে লাগল,নাকি অন্য কোথাও?

গোটা রুমে তখন ধোঁয়া আর চরম বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে।

ফারহান তার বাহুডোরে ইনশিরাহকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁপতে থাকা গলায় ফিসফিস করে উঠল, "তুমি... তুমি কেন সামনে এলে,তুবা? কে তুমি আসলে... ইনশিরাহ?"

ইনশিরাহের চোখ দুটো তখন ফারহানের চোখের সাথে মিশে গেছে।

বাইরে তখন প্রবল বেগে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, আর ভিলার ভেতরের এই অবরুদ্ধ বাতাসে দুই পরিবারের পুরোনো রক্তের গন্ধ আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে।

ইনশিরাহের নামটা ফারহানের মুখ থেকে উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে পুরো রুমের কোলাহল যেন এক নিমেষে ডালপালা গুটিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বাইরের মুষলধারে বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিচ্ছু শোনা যাচ্ছিল না।

ইনশিরাহের বুকটা তখন হাড়কাঁপানো আতঙ্কে আর তীব্র এক মানসিক ঝড়ে থরথর করে কাঁপছে।

লোকটা কি তবে সত্যি জেনে গেছে? সে কি তবে এতদিন ধরে তিল তিল করে সাজানো ইনশিরাহের সব ছদ্মবেশ আর মুখোশ এক পলকে চিনে ফেলেছে?

ইনশিরাহ নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে কামড়ে ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। সে ফারহানের বাহুডোর থেকে সামান্য সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই ফারহান তার কোটের হাতা আরও শক্ত করে খামচে ধরে নিজের বুকে টেনে নিল।

ফারহানের চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে—সেখানে ক্ষোভ নয়,ছিল এক অন্তহীন প্রশ্ন আর অব্যক্ত আশঙ্কার সুতীব্র আকুতি।

"কথা বলো,তুবা...তোমার আসল নাম ইনশিরাহ চৌধুরী?" ফারহানের কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল,যা এর আগে কোনোদিন কেউ দেখেনি।"

যে তিন বছর আগের সেই জালিয়াতির দাগ মুছে দিতে আমার কেবিনে এসে ঢুকেছিল...

তুমি কি সেই নাবিল চৌধুরীর মেয়ে?"

ঠিক সেই মুহূর্তে রশীদ শাহরিয়ারের সেই বন্দুকধারী লোকটা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই ফারহান এক ঝটকায় নিজেকে সামলে নিয়ে নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল বের করে সরাসরি তার কাঁধে গুলি চালাল।

লোকটা যন্ত্রণায় চিৎকার করে গ্লাস টেবিলের ওপর লুটিয়ে পড়ল। রশীদ শাহরিয়ার ভয়ে ঘরের এক কোণে কুঁকড়ে গেলেন।

কিন্তু ফারহানের কাছে শত্রুর এই পতন এখন আর কোনো গুরুত্ব বহন করছে না। সে সম্পূর্ণ মনোযোগ ইনশিরাহের দিকে ফিরিয়ে এনে তার কাঁপতে থাকা মুখটা নিজের হাতের তালুতে তুলে নিল।

"তুমি জানো... তুমি কতটা বোকামি করেছ?"

ফারহানের গলার স্বর এবার শান্ত হলেও তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর হাহাকার।

"তুমি ভেবেছিলে একা একা এই অন্ধকূপে নেমে এসে সব উদ্ধার করবে? রশীদ আঙ্কেলের এই লোকগুলো কতটা নিষ্ঠুর,সে ধারণা তোমার নেই!"

ইনশিরাহের চোখের কোণে জমে থাকা জল আর বাঁধ মানল না। সে আর নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে রাখতে পারল না। তার ভেতরের সমস্ত জমাট বাঁধা কষ্ট এক লহমায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

"হ্যাঁ! আমি ইনশিরাহ চৌধুরী!" ইনশিরাহ সরাসরি ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে চিৎকার করে উঠল।

তার গলায় ছিল তিন বছরের পুঞ্জীভূত ঘৃণা আর কান্নার বিস্ফোরণ। "আমার বাবার লাশটা পর্যন্ত সম্মানের সাথে ঘরে ফিরতে দেননি... আমি সেই অভাগা নাবিল চৌধুরীর মেয়ে!

যে মানুষটা নিজের জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও এই কোম্পানির সততা রক্ষা করেছিল,আপনারা তাকে চোর বানিয়ে মেরে ফেলেছেন! আমি কি চুপ করে বসে থাকতাম,ফারহান শাহরিয়ার?"

ইনশিরাহের এই স্বীকারোক্তি শোনার পর ফারহানের চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। সে যেন এক মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল। যে মেয়েটিকে সে নিজের ছায়ার মতো আগলে রাখতে চেয়েছিল,সে আসলে তার সবচেয়ে বড় শত্রুর কাতারেই দাঁড়িয়ে রয়েছে—

কিন্তু সেই শত্রুতা তো ইনশিরাহের নয়,তা ছিল শাহরিয়ার পরিবারেরই পাপের ফসল।

বাইরের প্রবল বৃষ্টির জলের সাথে ভিলার ভেতরের থমথমে বাতাস মিশে এক অদ্ভুত রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করল।

ফারহান কোনো কথা না বলে ইনশিরাহের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল,আর ইনশিরাহের হৃদস্পন্দন তখন দুই দুনিয়ার মাঝে ঝুলে রয়েছে।

কি হতে চলেছে পরবর্তীতে......!!!

চলবে....

(প্রিয় পাঠক/পাঠিকারা আসসালামু আলাইকুম!

গল্পটা কেমন লাগছে তোমাদের তা আমাকে কমেন্ট করে জানাও,কোনো ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখো!)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 9 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন