অদৃশ্য আলোড়ন
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ১১
_____
পরদিন সকালের প্রথম রোদের আলো যখন ধানমন্ডির পুরোনো রাস্তাগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছিল,তখন ইনশিরাহের ছোট্ট ঘরের টেবিলটার ওপর ল্যাপটপটা খোলা অবস্থায় জ্বলজ্বল করছিল।
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে রশীদ শাহরিয়ারের ব্যক্তিগত সার্ভার থেকে উদ্ধার করা সেই গোপন পেনড্রাইভের ফাইলগুলো। একে একে ফোল্ডারগুলো ওপেন করতেই বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
তিন বছর আগে শাহরিয়ার গ্রুপের সেন্ট্রাল অ্যাকাউন্টস থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ অফ-শোর শেল কোম্পানিতে পাচার করা হয়েছিল, তার সাথে শুধু রশীদ শাহরিয়ার নন—যুক্ত রয়েছে আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী শিল্পপতি ও শীর্ষস্থানীয় বোর্ড মেম্বারের নাম।
ইনশিরাহ তার ডেস্কে বসে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ফাইলগুলো চেক করছিল। তার চোখের নিচে ক্লান্তির হালকা ছোপ, কারণ গত সারা রাত সে এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেনি।
ফারহানের দেওয়া সেই পেনড্রাইভটা যেন তার হাতের এক জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো। এই ফাইলগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে তার বাবা নাবিল চৌধুরীর নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার সেই চাবিকাঠি।
ঠিক তখনই ঘরের দরজায় আলতো করে টোকা পড়ল।
"আপু...?" আরিফের গলা ভেসে এলো। দরজা সামান্য ফাঁক করে সে ভেতরে উঁকি দিল। তার হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। "তুই সারারাত ঘুমাসনি, তাই না? দেখ তোর চোখের অবস্থা কী হয়েছে।"
ইনশিরাহ ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকাল। সে হাসার একটা ক্ষীণ চেষ্টা করে বলল, "ঘুমিয়ে কী হবে রে, আরিফ? সত্যটা এখন আমার হাতের মুঠোয়। আব্বুর ওপর থেকে ওই মিথ্যা কলঙ্ক মুছে ফেলার সময় আর বেশি দূরে নেই।"
আরিফ এসে চা-এর কাপটা টেবিলের ওপর রাখল এবং ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে থাকা ফিন্যান্সিয়াল গ্রাফগুলোর দিকে এক পলক তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আপু... শাহরিয়ার গ্রুপের মতো এত বড় একটা দানবের বিরুদ্ধে লড়াই করা কি সত্যিই এত সহজ? রশীদ শাহরিয়ার তো জেলে গেছে ঠিকই, কিন্তু তোর কী মনে হয় কোম্পানির ভেতরের বাকি শক্তিগুলো কি এত সহজে বসে থাকবে? কাল রাতের পর থেকে আমার কেন যেন খুব ভয় করছে।"
"ভয় পাবি না, আরিফ," ইনশিরাহ ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত দৃঢ় ও শান্ত গলায় বলল। "আগে আমি একা ছিলাম, তাই প্রতিটা পদক্ষেপে আমার ভেতর একটা অনিশ্চয়তা কাজ করত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে।"
আরিফ একটু অবাক হয়ে বোনের দিকে তাকাল। "বদলে গেছে মানে? তুই কি ফারহান শাহরিয়ারের কথা বলছিস? আপু, ওই লোকটা যতই তোকে সাহায্য করুক না কেন, সে তো শেষ পর্যন্ত একটা শাহরিয়ার! ওদের রক্তে ক্ষমতা আর কর্পোরেট লোভ মিশে আছে। তুই কি অন্ধের মতো তাকে বিশ্বাস করছিস?"
আরিফের এই যৌক্তিক প্রশ্নটি ইনশিরাহের মনে এক মুহূর্তের জন্য দোলা দিয়ে গেল। আরিফ ভুল বলেনি। যে পরিবারটা তাদের তিলে তিলে ধ্বংস করেছে, সেই পরিবারেরই একজন শীর্ষ কর্তাকে কীভাবে সে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করবে?
কিন্তু গত রাতের সেই বৃষ্টিভেজা বারান্দায় ফারহানের বলা কথাগুলো—"আমি তোমাকে এই লড়াইয়ে একা ছাড়তে পারতাম না"—ইনশিরাহের মনের গভীরে একটা গভীর রেখাপাত করে গেছে।
সে অনুভব করতে পেরেছে, ফারহান কেবল নিজের কোম্পানি বা ক্ষমতা বাঁচানোর জন্য লড়ছে না; সেও তার নিজের পরিবারের অন্দরে জমে থাকা সমস্ত পচনের বিরুদ্ধে একাকী এক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
"আমি কাউকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করছি না, আরিফ," ইনশিরাহ নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে দিয়ে সাবধানে পেনড্রাইভটা পকেটে রেখে দিল। "আমি শুধু বিশ্বাস করছি আমার বাবার সততাকে। আর সেই সত্য বের করে আনতে যার সাহায্য দরকার, আমি সেটাই নেব।"
এদিকে সকাল দশটা নাগাদ শাহরিয়ার গ্রুপ হেডকোয়ার্টারের চব্বিশ তলায় এক অদ্ভুত থমথমে ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
রশীদ শাহরিয়ারের গ্রেপ্তারের খবর এবং গতকালের সেই গোপন ভিলার অভিযানের পর কোম্পানির শেয়ার বাজারে কিছুটা তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাধারণ কর্মচারীদের মাঝে ফিসফিসানি আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে যে, শাহরিয়ার গ্রুপের অন্দরে বড় কোনো ইন্টারনাল পাওয়ার স্ট্রাগল চলছে।
ইনশিরাহ যখন নিজের প্রিমিয়াম ডার্ক গ্রে প্যান্ট স্যুট আর মানানসই হিজাব পরে চব্বিশ তলার ফ্লোরে এসে পৌঁছাল, তখন অফিসের পরিবেশটা তার কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও জটিল মনে হলো।
সে সোজা নিজের ডেস্কে গিয়ে ব্যাগটা রেখে ফাইলপত্র গুছাতে শুরু করল।
ঠিক তখনই ফারহানের ব্যক্তিগত এক্সিকিউটিভ কেবিনের দরজা খুলে গেল।
ফারহান নিজের সিল্কের টাইটা সামান্য ঢিলা করতে করতে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। তার চেহারায় বরাবরের মতোই একটা দুর্ভেধ্য গম্ভীর ভাব বজায় রয়েছে,তবে তার চোখের চাউনিতে একটা নতুন ক্লান্তি ও তীক্ষ্ণ সতর্কতা স্পষ্ট। সে এক পলক ইনশিরাহের ডেস্কের দিকে তাকাল।
"মিস তুবা," ফারহান ভারী গলায় ডাকল। "আমার কেবিনে আসুন।"
ইনশিরাহ মুহূর্তের মধ্যে নিজের ফোল্ডারটি হাতে তুলে নিয়ে কেবিনের ভেতর প্রবেশ করল। কেবিনের ভারী সাউন্ডপ্রুফ দরজাটা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই ভেতরের বাতাস যেন আরও ভারি হয়ে উঠল।
ফারহান তার বিশাল লেদার চেয়ারে না বসে কাঁচের জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তখন রোদ ঝলমলে ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাজপথ।
"রশীদ আঙ্কেলের কাস্টডি ইন্টারোগেশন আজ সকাল থেকে শুরু হয়েছে," ফারহান মুখ না ফিরিয়েই গম্ভীর গলায় বলল। "তিনি সহজে মুখ খুলবেন না। তার আইনজীবীরা পুরো বিষয়টাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য হাই কোর্ট পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছে। তারা এটাকে কোম্পানির একটা অভ্যন্তরীণ ভুল বোঝাবুঝি বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।"
ইনশিরাহ সামান্য এগিয়ে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়াল। "কিন্তু আমাদের হাতে তো রশীদ সাহেবের পার্সোনাল সার্ভারের অফ-শোর ট্রেইলের ডিজিটাল এভিডেন্স রয়েছে, স্যার! সেই পেনড্রাইভের ফাইলগুলো কি যথেষ্ট নয়?"
ফারহান তখন ধীরে ধীরে ঘুরে ইনশিরাহের দিকে তাকাল। তার গভীর বাদামী চোখ দুটো ইনশিরাহের চোখের সাথে মিলে গেল।
"ডিজিটাল এভিডেন্স আদালতে পেশ করার আগে সেগুলোকে ফরেনসিক ভেরিফিকেশন করাতে হয়, ইনশিরাহ," ফারহান তার নাম ধরে ডেকে উঠল—যা এই কর্পোরেট কেবিনের গোপনীয়তাকে ভেঙে এক ব্যক্তিগত সমীকরণে নিয়ে এল।
"আর সবথেকে বড় কথা হলো, রশীদ আঙ্কেলের পেছনের মূল যে মাস্টারমাইন্ড—যিনি এই পুরো জালিয়াতির ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করেছিলেন—তার নাগাল এখনও আমরা পাইনি।"
ইনশিরাহের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। "মানে? রশীদ শাহরিয়ারের ওপরেও কেউ আছে?"
"হ্যাঁ," ফারহান ধীর পায়ে ইনশিরাহের আরও কাছে এগিয়ে এলো। তার সুগন্ধি আর ঠান্ডা ব্যক্তিত্ব কেবিনের ভেতরের উষ্ণতাকে যেন এক অদ্ভুত আবেশে জড়িয়ে ফেলল।
"লতিফ শাহরিয়ার—অর্থাৎ আমার বাবা মারা যাওয়ার ঠিক এক মাস আগে কোম্পানির একটা মাল্টি-ন্যাশনালি প্রজেক্টের নামে প্রায় পাঁচশ কোটি টাকার ফান্ড ডাইভার্ট হয়েছিল। সেই ফাইলে রশীদ আঙ্কেলের পাশাপাশি এমন একজনের ডিজিটাল সিগনেচার রয়েছে, যিনি বর্তমানে শাহরিয়ার গ্রুপের অন্যতম প্রধান বোর্ড মেম্বার এবং আমার বাবার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে পরিচিত—ব্যারিস্টার জহির আহমেদ।"
নামটা শোনার সাথে সাথে ইনশিরাহের চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। ব্যারিস্টার জহির আহমেদ! এই নামটা মিডিয়া ও কর্পোরেট মহলে অত্যন্ত পরিচিত।
যিনি সবসময় খুব সৎ, নীতিবান এবং শাহরিয়ার পরিবারের পরম শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে নিজেকে জাহির করে এসেছেন!
"ব্যারিস্টার জহির আহমেদ...?" ইনশিরাহ অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠল। "যিনি সবসময় আপনার বাবার পাশে দাঁড়িয়ে কোম্পানির আইনি দিকগুলো সামলান?"
"হ্যাঁ," ফারহানের গলায় এক তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠল। "সবচেয়ে বড় সাপগুলো সবসময় সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষের ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকে।
ব্যারিস্টার জহির গত বিশ বছর ধরে আমাদের পরিবারের ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। অথচ আমার বাবার মৃত্যুর ঠিক আগের রাতে তিনিই এই জালিয়াতির জাল বুনেছিলেন—যাতে সমস্ত দোষ গিয়ে পড়ে একজন নিরীহ মানুষের ওপর..."
ফারহান থেমে গেল।
সে সরাসরি ইনশিরাহের চোখের দিকে তাকিয়ে তার নামটা উচ্চারণ করল—"...তোমার বাবা নাবিল চৌধুরীর ওপর।"
ইনশিরাহের বুক চিরে একটা কান্নার দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে নিজেকে চরম শক্তিতে ধরে রাখল।
তিন বছর ধরে যে মানুষটাকে ওরা পরিবারের সবাই দেবতার মতো বিশ্বাস করত—যিনি তাদের বিপদের দিনে সান্ত্বনার বাণী শুনিয়েছিলেন—সেই মানুষটাই তবে আসল খুনি! সেই মানুষটাই পর্দার আড়াল থেকে সব সুতো নেড়েছিল!
"তাহলে আমরা এখন কী করব, ফারহান?"
ইনশিরাহের গলার স্বর কাঁপতে শুরু করল। তার চোখের ভেতর জমে ওঠা আগুন এখন এক ভয়ংকর প্রতিশোধের রূপ নিয়েছে। "আমরা কি এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকব?"
ফারহান তার পকেট থেকে একটা ছোট মেমোরি কার্ড বা বিশেষ সিকিউরিটি পাস বের করে ইনশিরাহের হাতের তালুতে রেখে দিল। সেই ছোট্ট ডিভাইসটার স্পর্শে ইনশিরাহের পুরো শরীর যেন কেঁপে উঠল।
"আগামীকাল রাতে গুলশানের একটি প্রাইভেট ক্লাবে ব্যারিস্টার জহিরের একটি ক্লোজড-ডোর ইমপেরিয়াল মিটিং আছে," ফারহান খুব নিচু ও দৃঢ় গলায় ফিসফিস করে বলল। "সেখানে দেশের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও কিছু করাপ্ট বিজনেসম্যান উপস্থিত থাকবে। সেই মিটিংয়ের রিয়েল-টাইম অডিও ও ভিডিও রেকর্ড যদি আমরা সংগ্রহ করতে পারি, তবে ব্যারিস্টার জহিরের সাম্রাজ্য এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।"
ইনশিরাহ সেই ডিভাইসটি নিজের মুঠোর ভেতর শক্ত করে চেপে ধরল। তার হৃদস্পন্দন তখন চরম গতিতে ছুটছে। এই কাজটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা সে খুব ভালো করেই জানে। যদি একবার তারা ধরা পড়ে যায়, তবে শুধু চাকরি নয়—তাদের জীবন পর্যন্ত বিপন্ন হতে পারে।
কিন্তু ইনশিরাহের মনে এখন আর কোনো ভয় নেই। সে ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে কঠিন ও নির্ভীক হাসি ফুটিয়ে তুলল।
"নরক হোক কিংবা মৃত্যু... আমি কাল রাতে সেই ক্লাবে যাচ্ছি, ফারহান," ইনশিরাহ দ্বিমত না করে সরাসরি নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল।
"আমার বাবার অসমাপ্ত বিচার শেষ করার জন্য আমাকে যদি আগুনেও নামতে হয়,আমি পিছু হটব না।"
ফারহান এক দৃষ্টিতে ইনশিরাহের সেই অদম্য জেদ ও সাহসিকতার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখের গভীরে ইনশিরাহের প্রতি এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসার ছায়া নেমে এল, যা সে কোনোদিন কারো সামনে প্রকাশ করেনি।
"তুমি একা যাচ্ছ না, ইনশিরাহ," ফারহান তার হাত বাড়িয়ে ইনশিরাহের কাঁধের ওপর নিজের হাত রাখল। তার স্পর্শে একটা অদম্য সুরক্ষার আশ্বাস ছড়িয়ে পড়ল। "আগুন যদি জ্বলে, তবে সেই আগুনে আমরা দুজনেই একসাথে পুড়ব।"
বাইরে তখন দুপুরের রোদ আরও চড়া হয়েছে। কিন্তু চব্বিশ তলার এই কাঁচঘেরা কেবিনের ভেতরে দুই ভিন্ন মানুষের রক্তের ঋণ শোধ করার সেই যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি এক নতুন ও ভয়ংকর মোড় নিয়ে নিল।
চলবে......