অদৃশ্য আলোড়ন
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ১২
________
গুলশানের অভিজাত এক প্রাইভেট ক্লাব 'দ্য রয়্যাল অরিয়ন'-এর সুসজ্জিত লবি তখন মৃদু জ্যাজ মিউজিক আর দামি ফরাসি পারফিউমের গন্ধে ভারী। ক্লাবটির চারপাশটা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় মোড়ানো।
সাধারণ কোনো সদস্যের তো দূরে থাক, দেশের তাবৎ বড় বড় মন্ত্রী, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ আর শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিদের ব্যক্তিগত কার্ড ছাড়া এখানে প্রবেশ করার কোনো জো নেই।
ঠিক রাত সাড়ে দশটার দিকে ক্লাবের সামনে এসে থামল একটি কালো রঙের মার্সিডিজ গাড়ি।
গাড়ির দরজা খুলে একে একে বেরিয়ে এলেন ফারহান শাহরিয়ার এবং তার সাথে আসা কনফিডেন্সিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট 'তুবা আমীন'—অর্থাৎ ইনশিরাহ চৌধুরী।
ইনশিরাহের পরনে আজ একটি প্রিমিয়াম ডার্ক এমেরাল্ড গ্রিন রঙের ডিজাইনার গাউন, যার সাথে মানানসই ম্যাচিং করা একটি গাঢ় সবুজ ও সোনালী এমব্রয়ডারির হিজাব তার মাথা ও কাঁধকে অত্যন্ত আভিজাত্যের সাথে জড়িয়ে রেখেছে।
তার কানে ঝুলছে ছোট হিরের দুল, আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। বাহ্যিকভাবে তাকে দেখতে লাগছিল কোনো রাজপরিবারের উচ্চপদস্থ মার্জিত নারী, কিন্তু তার ভেতরের প্রতিটা স্নায়ু এখন চরম টানটান উত্তেজনায় কাঁপছে।
ফারহানের পরনে নিখুঁত কাটছাঁটের চারকোল ব্ল্যাক টু-পিস স্যুট। তার চওড়া কাঁধ আর বরফশীতল চাহনি পুরো ক্লাবের প্রবেশপথের বাতাসকে যেন এক নিমেষে ভারী করে তুলল। সিকিউরিটি গেটে পৌঁছানোর সাথে সাথেই গার্ডরা অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাদের পথ ছেড়ে দিল।
"ভয় করছে, ইনশিরাহ?"
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ফারহান খুব নিচু ও মায়াবী গলায় ইনশিরাহের ঠিক কানের কাছে মুখটা নিয়ে এসে ফিসফিস করে প্রশ্ন করল।
ফারহানের সেই চেনা সুবাস ও তার মুখের গরম নিঃশ্বাস ইনশিরাহের ঘাড়ের চামচায় এসে লাগতেই ইনশিরাহের বুকটা এক পলকের জন্য কেঁপে উঠল।
ইনশিরাহ নিজেকে চরম শক্তিতে সামলে নিয়ে এক চিলতে আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে ফারহানের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে বলল, "যিনি তিন বছর ধরে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে নিজের বাবার জন্য লড়ছেন, তার আবার ভয় কিসের, স্যার? আপনি আপনার কাজ করুন, আমি আমারটা দেখছি।"
ফারহানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুগ্ধতার হাসি ফুটে উঠল। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ইনশিরাহের হাতটা নিজের কনুইয়ের সাথে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে জড়িয়ে ধরল। কর্পোরেট জুটির ছদ্মবেশে তারা দুজনে সোজা এগিয়ে গেলেন ক্লাবের দোতলার ইমপেরিয়াল প্রাইভেট কনফারেন্স রুমের দিকে।
দরজার বাইরে দুজন সশস্ত্র বডিগার্ড দাঁড়িয়ে ছিল। ফারহানকে দেখেই তারা স্যালুট দিয়ে রাস্তা ছেড়ে দিল।
"ব্যারিস্টার জহির ভেতরে কি অলরেডি মিটিং শুরু করেছেন?" ফারহান ঠান্ডা গলায় সিকিউরিটি গার্ডকে জিজ্ঞেস করল।
"ইয়েস স্যার, ভেতরে অনারেবল মিনিস্টার ও জহির স্যারসহ পাঁচজন বসে আছেন," গার্ডটি মাথা নিচু করে উত্তর দিল।
ফারহান এক ধাক্কায় ভারী সাউন্ডপ্রুফ মেহগনি কাঠের দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। ইনশিরাহ তার পেছনে পেছনে অত্যন্ত সাবধানে ভেতরে পা রাখল।
বিশাল কনফারেন্স রুমের মাঝখানে একটা দামি গ্লাস টেবিল। টেবিলের ঠিক মাথায় বসে আছেন শাহরিয়ার গ্রুপের অন্যতম প্রধান বোর্ড মেম্বার এবং দেশের অন্যতম প্রভাবশালী আইনজীবী—
ব্যারিস্টার জহির আহমেদ। তার বয়স ষাটের কোঠায় হলেও চেহারায় এক ধরনের ধূর্ত ও চতুর পরিপাটি ভাব রয়েছে। তার আশেপাশে বসে আছেন দেশের দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী।
ফারহানকে হুট করে এভাবে ভেতরে ঢুকে পড়তে দেখে ব্যারিস্টার জহিরের মুখের সেই কৃত্রিম হাসির আভা এক পলকে মিলিয়ে গেল। তার চোখের তারায় খেলে গেল চরম উৎকণ্ঠার এক সূক্ষ্ম আভা।
"ফারহান... তুমি?!"
ব্যারিস্টার জহির দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে চেয়ার থেকে কিছুটা দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললেন, "আরে এসো এসো! আমরা তো ভাবছিলাম তুমি আজ রাতের প্রাইভেট মিটিংয়ে আসবে না। ব্যবসায়িক কিছু কনফিডেন্সিয়াল বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করছিলাম।"
ফারহান কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে টেবিলের সামনে গিয়ে বসল এবং ইনশিরাহ অত্যন্ত পেশাদার ভঙ্গিতে তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে গেল। ফারহানের চেহারার কঠোরতা দেখে রুমের বাকি মন্ত্রীরাও কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন।
"ব্যারিস্টার জহির, ব্যবসায়িক কনফিডেনশিয়ালিটি বলতে কি আপনারা অফ-শোর শেল কোম্পানিতে জনগণের ও কোম্পানির হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করার ব্লু-প্রিন্ট বোঝান?" ফারহানের কণ্ঠস্বর এতটাই ঠান্ডা ও ধারালো শোনাল যে পুরো রুমের তাপমাত্রা যেন এক নিমেষে হিমাঙ্কে নেমে গেল।
ব্যারিস্টার জহিরের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি টেবিলের ওপর হাত রেখে কিছুটা উগ্র কণ্ঠে বলে উঠলেন, "ফারহান! তুমি কি হুশ হারিয়েছ? বয়সে বড় একজন মানুষের সাথে কথা বলার কোন ম্যানার্স এটা? কিসের টাকা পাচার আর কিসের ব্লু-প্রিন্ট?"
"ম্যানার্স আমি আপনার কাছ থেকে শিখব না, জহির সাহেব," ফারহান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপর নিজের হাত দুটো রাখল। "তিন বছর আগে লতিফ শাহরিয়ারের মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে আপনি আর আমার কাকা মিলে যে জালিয়াতি করেছিলেন, এবং সেই সমস্ত অপকর্মের পুরো দায় সুচতুরভাবে মৃত নাবিল চৌধুরীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছিলেন—তার সমস্ত অডিও ও ভিডিও প্রুফ এখন আমার হাতের মুঠোয়।"
ব্যারিস্টার জহির আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি টেবিল চাপড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলেন, "প্রমাণ? কীসের প্রমাণ তোমার কাছে? তুমি একটা কমবয়সি ছেলে কোম্পানির সিইও হয়ে আকাশে উড়ছ! তোমার বাবার বন্ধু হিসেবে বলছি, বেশি বাড়াবাড়ি করো না!"
ঠিক সেই মুহূর্তেই—ইনশিরাহ আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে তার ট্যাবের সাথে কানেক্ট করা সেন্ট্রাল প্রজেক্টরের রিমোটটা টিপে দিল।
মুহূর্তের মধ্যে রুমের বিশাল পর্দার ওপর ভেসে উঠল ব্যারিস্টার জহিরের গত সপ্তাহের একটা গোপন অডিও ও ভিডিও কনফারেন্সের রেকর্ড!
যেখানে পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে ব্যারিস্টার জহির কোনো এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার সাথে কথা বলছেন কীভাবে শাহরিয়ার গ্রুপের পরবর্তী টেন্ডার জালিয়াতি করে সেই টাকা বিদেশে পাচার করা হবে।
শুধু তাই নয়, তিন বছর আগের সেই ফিন্যান্সিয়াল স্ক্যামের ফাইলটাও স্ক্রিনের নিচে ফ্ল্যাশ করতে শুরু করল!
রুমের ভেতর বসা মন্ত্রীরা আতঙ্কে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন। এই স্ক্যান্ডাল যদি বাইরে ফাঁস হয়ে যায়, তবে দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক ভয়ংকর ভূমিকম্প ঘটে যাবে।
"বন্ধ করো ওটা! বন্ধ করো বলছি!" ব্যারিস্টার জহির উন্মত্তের মতো প্রজেক্টরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন।
কিন্তু তার আগেই ফারহানের ইশারায় বাইরে থেকে ক্লাবের সিকিউরিটি টিম ও সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের দুই অফিসার সোজা রুমের ভেতর প্রবেশ করল।
তারা এক মুহূর্তের মধ্যে ব্যারিস্টার জহিরের হাত দুটো ধরে পিছমোড় করে ফেলল।
"ব্যারিস্টার জহির আহমেদ," ফারহান বরফশীতল ও নির্মম গলায় উচ্চারণ করল, "কোম্পানির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার অপরাধে এবং একজন নির্দোষ মানুষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগে আপনাকে অফিশিয়ালি অ্যারেস্ট করা হলো।"
ব্যারিস্টার জহির ছটফট করতে করতে রাগে ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে চিৎকার করে উঠলেন, "তোমরা আমাকে আটকাতে পারবে না! এই শাহরিয়ার গ্রুপ একদিন তছনছ হয়ে যাবে...!"
পুলিশ তাকে টেনেহিঁচড়ে রুম থেকে বের করে নিয়ে গেল। রুমের বাকি মন্ত্রীরা কোনো কথা বলার সাহস পেলেন না—তারা দ্রুত নিজেদের ফাইলপত্র গুছিয়ে মাথা নিচু করে কনফারেন্স রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
মুহূর্তের মধ্যে বিশাল রুমটায় শুধু রইলেন ফারহান আর ইনশিরাহ।
বাইরের নিয়ন আলোর রোমাঞ্চ তখন কাঁচের জানালা দিয়ে ভেতরে এসে পড়ছে। ইনশিরাহ এতক্ষণ ধরে নিজের সমস্ত শক্তি আর শ্বাস আটকে রেখেছিল। ব্যারিস্টার জহিরের এই পতনের মধ্য দিয়ে আজ তার বাবার ওপর থেকে সেই অভিশপ্ত কলঙ্কের প্রথম ও সবচেয়ে বড় পাথরটি সরে গেল।
ইনশিরাহের চোখ দুটো বেয়ে এক ফোঁটা জলের ধারা গড়িয়ে পড়ল—সেটা কান্নার নয়, সেটা ছিল দীর্ঘ তিন বছরের এক অসম্ভব মুক্তির অশ্রু।
ফারহান ধীর পায়ে ইনশিরাহের সামনে এসে দাঁড়াল। সে নিজের পকেট থেকে পরিষ্কার একটা সাদা রুমাল বের করে অত্যন্ত আলতো হাতে ইনশিরাহের চোখের কোণ থেকে সেই জলটুকু মুছে দিল।
ইনশিরাহ চমকে ফারহানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো কর্পোরেট অহংকার বা শীতলতা ছিল না—সেখানে ছিল কেবল এক অন্তহীন মায়া ও গভীর প্রশান্তি।
"বলেছিলাম তো, ইনশিরাহ..." ফারহানের কণ্ঠস্বর এত নিচু ও মায়াবী শোনাল যে ইনশিরাহের মনে হলো চারপাশের পৃথিবীটা যেন থেমে গেছে।
"তোমার বাবার সম্মান ফিরিয়ে আনার এই লড়াইয়ে আমি তোমার ছায়া হয়ে শেষ পর্যন্ত পাশে থাকব।"
ইনশিরাহ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ফারহানের বুকের খুব কাছাকাছি এসে নিজের মাথাটা তার শক্ত কাঁধে এলিয়ে দিল।
বাইরে তখন গুলশানের নিঝুম রাস্তায় মাঝরাতের শীতল বাতাস বইতে শুরু করেছে, আর দুই ভিন্ন দুনিয়ার মানুষ আজ এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবনের সবচেয়ে গভীর সত্যটির মুখোমুখি হলো!
চলবে.......