ফন্ট সাইজ:
থিম:
অদৃশ্য আলোড়ন

পর্ব 13

লেখক: Jannatul Naima

অদৃশ্য আলোড়ন

লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা

অধ্যায় ১৩

_______

'দ্য রয়্যাল অরিয়ন' ক্লাবের অভিজাত ইমপেরিয়াল কনফারেন্স রুমের সেই রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তার পর যখন ফারহান আর ইনশিরাহ বাইরে এসে মার্সিডিজ গাড়িতে বসল, তখন ঘড়িতে রাত প্রায় আড়াইটা।

ঢাকার রাতের ফাঁকা রাজপথে গাড়ির হেডলাইটের মৃদু আলো কেটে কেটে এগিয়ে চলেছে। গাড়ির ভেতরের নিঃশব্দ পরিবেশে তখনো যেন ব্যারিস্টার জহিরের সেই আর্তচিৎকার আর উত্তেজনার রেশটুকু রয়ে গেছে।

ইনশিরাহ প্যাসেঞ্জার সিটে বসে জানালার কাঁচের ওপর মাথা এলিয়ে দিয়ে বাইরের অন্ধকার শহরের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল গত তিন বছরের সেই অপমান, মায়ের কান্না, আরিফের আতঙ্ক আর আজ ব্যারিস্টার জহিরের হাতে হাতকড়া পরার সেই দৃশ্যটি।

তার বাবার ওপর থেকে সেই মিথ্যা ও কলঙ্কজনক জালিয়াতির দাগ অবশেষে মুছতে শুরু করেছে। এত বড় একটা বিজয়ের পর ইনশিরাহের মন হালকা হওয়ার কথা থাকলেও, তার বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা আর ভারী হাহাকার কাজ করছিল।

ড্রাইভিং সিটে চুপচাপ গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে ফারহান এক পলক ইনশিরাহের দিকে তাকাল। ইনশিরাহের মুখের সেই ক্লান্ত ও বিষণ্ণ ভাব তার চোখ এড়াল না।

"তুমি এখনো কি সেই পুরনো স্মৃতিগুলোর মাঝেই আটকে আছো, ইনশিরাহ?" ফারহানের কণ্ঠস্বর রাতের নিরবতাকে চিরে অত্যন্ত নরম ও মায়াবী শোনাল।

ইনশিরাহ মুখ ফিরিয়ে ফারহানের দিকে তাকাল। গাড়ির ড্যাশবোর্ডের মৃদু নীল আলোয় ফারহানের মুখাবয়বটা আরও বেশি রহস্যময় ও আকর্ষণীয় দেখাচ্ছিল।

"জানি না, ফারহান," ইনশিরাহের গলাটা সামান্য কেঁপে উঠল। সে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "আজ ব্যারিস্টার জহির ধরা পড়েছে, রশীদ শাহরিয়ার জেলেও রয়েছে। আব্বুর ওপর থেকে অনেক বড় একটা কলঙ্ক মুছে যাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। কিন্তু... তবুও কেন জানি মনে হচ্ছে এই লড়াই এখানেই শেষ নয়। এর শেকড় আরও অনেক গভীরে প্রোথিত।"

ফারহান গাড়িটা রাস্তার পাশে একটা শান্ত ও নিরিবিলি জায়গায় এনে স্লো করে থামাল। তারপর সে স্টিয়ারিংয়ের ওপর থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে ইনশিরাহের দিকে ঘুরে বসল। তার গভীর বাদামী চোখ দুটোতে উপচে পড়ছিল এক অদ্ভুত গভীরতা ও টান।

"লড়াইটা কখনোই সহজ ছিল না, ইনশিরাহ," ফারহান অত্যন্ত শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল। "তুমি একা এই কর্পোরেট দানবদের সাথে লড়তে নেমেছিলে।

কিন্তু আজ থেকে এই লড়াইয়ে তুমি আর একা নও। আমি কথা দিয়েছিলাম, তোমার ছায়া হয়ে তোমার পাশে থাকব—আর আমার কথার নড়চড় হয় না।"

ফারহানের সেই কথাগুলো ইনশিরাহের হৃদস্পন্দনকে এক মুহূর্তে বাড়িয়ে দিল। গাড়ির কাঁচের ওপাশে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

বৃষ্টির ফোঁটা যখন গাড়ির উইন্ডশিল্ডে এসে পড়ছে, তখন ভেতরের এই অবরুদ্ধ পরিসরে দুই মানুষের মধ্যকার দূরত্বটুকু যেন নিমেষে গলে জল হয়ে গেল।

ফারহান ধীরে ধীরে তার হাত বাড়িয়ে ইনশিরাহের হাতের ওপর নিজের উষ্ণ হাত রাখল। সেই স্পর্শে ইনশিরাহের পুরো শরীর যেন এক অদ্ভুত বিদ্যুতের মতো শিহরিত হয়ে উঠল।

সে চাইলে হাতটা সরিয়ে নিতে পারত, কিন্তু তার শরীর ও মন যেন অবচেতনভাবেই সেই উষ্ণতাকে আঁকড়ে ধরতে চাইল।

"ফারহান..." ইনশিরাহের গলা থেকে ফিসফিস করে শব্দটা বেরিয়ে এলো।

"বলো, ইনশিরাহ," ফারহান আরও একটু এগিয়ে এলো। তার সুগন্ধি আর পুরুষালী নিঃশ্বাসের উত্তাপ ইনশিরাহের মুখের ওপর এসে লাগল।

"আজ আর কোনো বস বা পিএ-র সম্পর্ক নেই। আজ শুধু তুমি আর আমি—দুইটা ক্লান্ত আত্মা, যারা সত্যের খোঁজে নিজেদের সবকটা আলো নিভিয়ে ফেলেছিল।"

ইনশিরাহ আর একটা কথাও বলতে পারল না। তার চোখের পলকগুলো ভারী হয়ে এল। ফারহান অত্যন্ত আলতো হাতে ইনশিরাহের কপাল থেকে সামান্য খসে পড়া হিজাবের আঁচলটা সরিয়ে দিয়ে তার আঙুলগুলো ইনশিরাহের চুলে বিলিয়ে দিল।

সেই স্পর্শের ভেতরে কোনো লোভ বা তাড়াহুড়ো ছিল না—ছিল এক অন্তহীন মায়া, যা ইনশিরাহের তিন বছরের জমে থাকা সমস্ত অভিমানকে এক পলকে ধুয়ে মুছে দিল।

বাইরের মুষলধারে বৃষ্টির শব্দ আর রাতের এই গাঢ় অন্ধকারের মাঝে ইনশিরাহ নিজের অজান্তেই ফারহানের আরও কাছাকাছি সরে এল। তার সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

সে বুঝতে পারল, যার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে শাহরিয়ার গ্রুপের অন্দরে প্রবেশ করেছিল, আজ অজান্তেই সে এই মানুষটির সঙ্গেই এক অদৃশ্য ও জন্মজন্মান্তরের সুতোয় বাঁধা পড়ে গেছে।

ধানমন্ডির সেই পুরোনো গলির ভাড়া বাসার সামনে যখন ফারহানের গাড়িটি এসে থামল, তখন রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছে।

গাড়ি থামার পর ইনশিরাহ যখন গাড়ি থেকে নামার জন্য হ্যান্ডেল ধরল, তখন ফারহান তার হাতটা আবার আলতো করে টেনে ধরল।

"কাল সকালে অফিসে আসার দরকার নেই, ইনশিরাহ," ফারহান নরম গলায় বলল। "আগে একটু বিশ্রাম নাও। ব্যারিস্টার জহিরের বাকি আইনি প্রক্রিয়া আমি নিজে হ্যান্ডেল করব।"

ইনশিরাহ গাড়ির মৃদু আলোয় ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে তুলল। "ধন্যবাদ, ফারহান... সবকিছুর জন্য।"

"ধন্যবাদ বলতে হয় না," ফারহান মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলল। "কাল সকালে দেখা হচ্ছে।"

গাড়ি থেকে নেমে ইনশিরাহ যখন ধানমন্ডির বাসার গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল, তখন তার বুকটা এক অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরে ছিল।

সে জানে, এই লড়াইয়ের রাস্তা এখনো অনেক লম্বা এবং বিপদসংকুল। কিন্তু তার পাশে এখন এমন একজন মানুষ রয়েছে, যার ছায়া তাকে আগলে রাখার জন্য যথেষ্ট।

এদিকে মার্সিডিজ গাড়ির ভেতরে বসে থাকা ফারহান অনেকক্ষণ ধরে ইনশিরাহের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতর তখন বইছে এক অন্য ঝড়—যে ঝড় কর্পোরেট জগতের নয়, সে ঝড় হৃদয়ের।

পরদিন সকালে ধানমন্ডির সেই ছোট্ট বাসায় যখন রোদের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে এসে পড়ল, তখন ইনশিরাহের ঘুম ভাঙল বেশ দেরিতে।

গত কয়েক দিনের লাগাতার মানসিক চাপ, রাত জাগা আর গুলশানের সেই ক্লাবের উত্তেজনার পর আজকের সকালটা তার কাছে অদ্ভুত এক প্রশান্তির ছোঁয়া নিয়ে এসেছে।

বিছানায় শুয়েই তার মনে পড়ে গেল গত রাতের সেই মার্সিডিজ গাড়ির ভেতরের মুহূর্তগুলো—ফারহানের হাতের সেই উষ্ণ স্পর্শ, চুলে বিলিয়ে দেওয়া আঙুলের মায়া আর তার বলা কথাগুলো। বুকটা কেমন যেন এক অচেনা ভালোলাগায় কেঁপে উঠল।

রান্নাঘর থেকে আম্মু আর আরিফের হালকা কথা বলার শব্দ ভেসে আসছে। ইনশিরাহ বিছানা ছেড়ে ওজু করে নামাজ আদায় করল এবং ডেস্কে এসে বসল।

ল্যাপটপটা ওপেন করতেই তার চোখে পড়ল ফারহানের পাঠানো একটা সংক্ষিপ্ত টেক্সট মেসেজ: "সকালে অফিস আসতে বারণ করেছিলাম, আশা করি ভালোমতো ঘুমাচ্ছো। দুপুরের পর একবার শাহরিয়ার গ্রুপের সেন্ট্রাল কনফারেন্স রুমে যোগাযোগ কোরো, নতুন কিছু আপডেট আছে।"

মেসেজটা পড়ার পর ইনশিরাহের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নাশতা সেরে নিলো।

আম্মু আর আরিফও আজ বেশ স্বস্তিতে রয়েছে, কারণ ব্যারিস্টার জহির ও রশীদ শাহরিয়ারের গ্রেপ্তারের খবর সকালে টিভির সংবাদে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে।

সমাজে নাবিল চৌধুরীর নাম নিয়ে যে কলঙ্কের দাগ এতদিন লেগে ছিল, তা যে ধীরে ধীরে মুছে যেতে শুরু করেছে—সেটা জোহরা বেগমের মলিন মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।

দুপুর নাগাদ ইনশিরাহ যখন শাহরিয়ার গ্রুপের চব্বিশ তলার সেন্ট্রাল ফ্লোরে পা রাখল, তখন আগের সেই থমথমে ও আতঙ্কিত পরিবেশ আর নেই।

কর্মচারীদের মুখে মুখে এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস আর নতুন নেতৃত্বের প্রশংসা। ইনশিরাহ সোজা নিজের ডেস্কে গিয়ে ফাইলপত্র গুছাতে শুরু করল। ঠিক তখনই ইন্টারকমটা বেজে উঠল।

"মিস তুবা, আমার কেবিনে আসুন," ফারহানের গম্ভীর অথচ পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

ইনশিরাহ বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের হিজাবটা সামান্য ঠিক করে ফারহানের এক্সিকিউটিভ কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।

দরজায় হালকা টোকা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই সে দেখল, ফারহান বিশাল কাঁচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরে ঢাকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন।

আজ তার পরনে কোনো কালো স্যুট নেই—সাদা রঙের একটি ফরমাল শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো, যা তাকে আরও বেশি স্বস্তিদায়ক ও আকর্ষণীয় দেখাচ্ছিল।

পায়ের শব্দ পেয়ে ফারহান মুখ ফিরিয়ে তাকাল। তার চোখে মুখে গত রাতের সেই গভীর ক্লান্তি নেই, বরং রয়েছে এক দীপ্ত আত্মবিশ্বাস। সে ধীর পায়ে ইনশিরাহের দিকে এগিয়ে এল।

"তুমি আজ না আসলেও পারতে, ইনশিরাহ," ফারহান অত্যন্ত নরম গলায় বলল।

"ঘরে বসে আর ভালো লাগছিল না, স্যার," ইনশিরাহ একটু মুচকি হেসে জবাব দিল। "তাছাড়া নতুন কী আপডেট আছে সেটা জানার জন্য আমারও তো কৌতূহল হওয়ার কথা।"

ফারহান নিজের ডেস্কে ফিরে গিয়ে একটা ফাইল ইনশিরাহের দিকে বাড়িয়ে দিল। "ব্যারিস্টার জহির কাস্টডিতে মুখ খুলতে শুরু করেছে। সে স্বীকার করেছে যে তিন বছর আগে তোমাদের পুরো পরিবারকে নিঃস্ব করার জন্য সে একটা ভুয়া সিন্ডিকেট তৈরি করেছিল। আগামী পরশু কোর্টে ফাইনাল হেয়ারিং আছে। সেদিনই তোমার বাবার ওপর থেকে সমস্ত আইনি অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেওয়া হবে।"

ফাইলটার ওপর চোখ বুলোতেই ইনশিরাহের চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে এক পলক ফারহানের দিকে তাকাল। তিন বছরের সেই দীর্ঘ অপেক্ষা, লড়াই আর কষ্টের আজ বুঝি সত্যি অবসান ঘটতে চলেছে।

"ধন্যবাদ, ফারহান..." ইনশিরাহের গলাটা কান্নায় কেঁপে উঠল।

ফারহান আর এক মুহূর্তও দূরত্ব বজায় রাখল না। সে এক পদক্ষেপে ইনশিরাহের একদম কাছে এসে তার কাঁধে অত্যন্ত কোমলভাবে হাত রাখল।

কেবিনের ভেতরে তখন দুপুরের মিষ্টি রোদ এসে তাদের দুজনকে ছুঁয়ে গেছে। দুই ভিন্ন জগতের এই মানুষটি আজ সমস্ত বাধা পেরিয়ে এক অদ্ভুত ভালোবাসার বন্ধনে নিজেদের ভবিষ্যৎ লিখে ফেলল।

চলবে........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 13 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন