ফন্ট সাইজ:
থিম:
মন প্রাঙ্গনের বৃষ্টি

পর্ব 61

লেখক: কংকা চৌধুরী

#মন_প্রাঙ্গনের_বৃষ্টি
#লেখনীতে_কংকা_চৌধুরী
(৫৫) অন্তিম পর্ব

( কার্টেসী ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ।)

রজনীর আঁধার পেরিয়ে তখন দিবসের দশম প্রহর। সূর্য তার স্বর্ণাভ কিরণ ছড়িয়ে দিয়েছে নীলাকাশের বুকজুড়ে। সকালের কোমলতা পেরিয়ে চারপাশে নেমে এসেছে দিনের ব্যস্ততা। বিমানবন্দরের বিশাল কাচঘেরা প্রাঙ্গণে রোদের মিহি রেখা এসে পড়েছে, আর সেই আলোয় মানুষের আনাগোনা যেন এক চলমান চিত্রপট। সময় চলছে আপন গতিতে। ক্যালেন্ডার থেকে চারটে মাস খসে পড়লো। চার বছর পর দেশে ফিরছে আদ্রিয়ান, নূর ও তাদের একমাত্র সন্তান আশনূহা। আদ্রিয়ানের কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে এদিক ওদিক উঁকি মারছে ছোট্ট আশনূহা । আদ্রিয়ান এক হাতে বুকে আগলে রেখেছে মেয়েকে, আরেকহাতে ব্যাগ ধরে রেখেছে। এই মেয়ে বড্ড বাবাপাগল, বাবা ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আসতেই আরহাম ও আয়ান দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো আদ্রিয়ান ও নূরকে। নূর গুলিয়ে ফেলেছে কে আরহাম ও কে আয়ান। দুজনেই জমজ সন্তান হওয়ায় তাদের চেহারা দেখতে হুবুহু এক। আদ্রিয়ান নূরের বিভ্রান্তি হয়তো বুঝতে পেরেছে, সে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,

" আরহাম তোমাকে জড়িয়ে ধরেছে। "

" দুজনের চেহারাই তো এক, আপনি কি করে চিনলেন? "

" সে তুমি বুঝবে না, সিক্রেট।"

নূর নাকের পাটা ফুলিয়ে আরহামের দিকে তাকালো, অত:পর আরহামকে কোলে তুলে নিয়ে সারা মুখমণ্ডল জুড়ে চুমু খেলো। কত বড়ো হয়ে গিয়েছে দুজনেই। গত চার বছর যাবত আয়ান ও আরহামের সকল খরচ আদ্রিয়ান বহর করেছে। তাদের চাওয়া পাওয়া সবই আদ্রিয়ানের কাছে। আয়ান আদ্রিয়ানের শার্টে টান দিয়ে বললো,

" আ্যাই কুমড়ো পটাশ, আমার গাড়ি এনেছো? "

" এই টমেটো, তুই আমায় কুমড়ো পটাশ ডাকলি কেন, এবার তো গাড়ি দিবো না। "

" গাড়ি না দিলে তোমার মেয়েকে আমাদের কাসে লেকে দিব। "

" আমার মেয়েকে আমার কাছ থেকে রেখে দিবি, তবে রে। "

আয়ান খিলখিল করে হাসতে লাগলো, সে আদ্রিয়ানের হাতের মুঠোয় নিজের হাত রেখে সামনের দিকে চলতে শুরু করলো। আদ্রিয়ান কালো শার্ট পরে আসবে বলে আয়ান ও কালো গেঞ্জি পরে এসেছে। কিছুদূরেই ইলহাম দাঁড়িয়ে আছে। কত বছর পর আদ্রিয়ানকে দেখছে সে। ছেলেটা কত বদলে গিয়েছে, নিজ হাতে মানুষ করেছে সে, একটু তো কষ্ট হবেই। আদ্রিয়ান তার কাছে আসতেই ইলহাম তাকে জড়িয়ে ধরলো। আদ্রিয়ান ও তাকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরেছে। আদ্রিয়ানের কোল থেকে আশনূহাকে কোলে নিতেই সে ডেবডেব করে তাকিয়ে আছে ইলহামের দিকে।অত:পর হাত পা নেড়ে বলে উঠলো,

" বা-ব্বা বা বা । "

ইলহাম আশনূহাকে বুকে আগলে ধরে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,

" মেয়েতো একদম তোর মতো হয়েছে। নাক, চোখ সব দেখছি তোর মতো, শুধু গায়ের রঙটা পেয়েছে নূরের মতো। "

আশনূহা ইলহামের কোলে চুপটি করে শুয়ে আছে। মেয়েটা বড্ড মিশুক, পরিচিত অপরিচিত সবার সাথেই বেশ ভাব তার। হঠাৎ এয়ারপোর্টের সামনে একটা বাইক এসে থামলো। আদ্রিয়ানের চিনতে দেরি হলো না কে এসেছে, রুশান বাইক থেকে নেমেই ছুটে এলো আদ্রিয়ানের কাছে। সবসময় ছোট ভাইয়ের মতোই দেখে এসেছে আদ্রিয়ান তাকে। আদ্রিয়ান তার কাঁধে চাপড় মেরে বললো,

" কেমন আছিস তুই? দিনকাল কেমন যাচ্ছে?"

" ভালোই যাচ্ছে আদ্রিয়ান ভাই। তুমি ভালো আছো তো? "

" হ্যাঁ। বাড়ি চল, আগের দিনগুলো ভীষণ ভাবে মনে পড়ছে। কতবছর একসাথে আড্ডা দেওয়া হয় না। "

আশনূহা ইলহামের কোল থেকে নেমে আসার জন্য ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে উঠছে বারবার। ইলহাম তাকে বুকের সাথে আগলে ধরে দোলাচ্ছে কিন্তু তাতেও সে থামছে না। আদ্রিয়ান তাকে ইলহামের কোল থেকে নিয়ে বললো,

" চেনে না তো তাই এমন করছে। চিনে ফেললে তখন দেখবে কোল থেকে নামানোই যাচ্ছে না। "

" নে তোর মেয়েকে। বাপ ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না দেখছি। "

সবাই গাড়িতে উঠে বসলো। আয়ান আদ্রিয়ানের পাশ ছাড়া বসবে না, যদিও ইলহাম তাকে কয়েকবার চোখ রাঙিয়েছে তাও সে নিজের কথায় অনড়। সে তার ভাইয়ার পাশেই বসবে। নূরের মা-বাবা ও এসেছে শাহ বাড়িতে। চা বছরে বদলে গিয়েছে অনেক কিছু। সুরাইয়া শাহ গত বছর মারা গিয়েছেন, শাহনাব ও ইরার একটি ছেলে আছে এক বছরের।সময়ের সাথে সাথে মানিয়ে নিয়েছে তারা। সময় চলছে নিজ গতিতে। চৌধুরী বাড়ির সকলেই এই বাড়িতে এসেছে আদ্রিয়ানকে দেখতে। গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে প্রবেশ করতেই আশনূহাকে ছোঁ মেরে নিয়ে নিলো শাহনাব। আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার দিকে তাকিয়ে বললো,

" সারাজীবন শুধু আমার জিনিসেই নজর দিয়ে গেলি লাফাঙ্গা কোথাকার। "

" সারাজীবন বখাটেপনা করে এখন আমাকে লাফাঙ্গা ডাকছিস কোন মুখে। "

" ঠাডা পড়ুক তোর মুখে। "

" তোর গালে পড়ুক।"

তাদের ঝগড়া দেখে ইশিতা খিলখিল করে হাসছে সাথে বাকিরাও। এতো বছর চলে গেলো মাঝে তাও এদের সম্পর্কের উন্নতি ঘটলো না। শাহনাব আশনূহাকে কোলে নিয়ে তার নরম তুলতুলে গালে চুমু খেয়ে বললো,

" আম্মাজান তো পুরোই একটা পুতুলের মতো হয়েছে। পুতুলটাকে আমাদের সাথে রেখে দিবো? থাকবে তুমি আম্মা?"

আশনূহা তার উন্মুক্ত মাড়ি দেখিয়ে হাসতে লাগলো শব্দ করে। শাহনাব ও হাসলো তার দেখাদেখি। নূর তার মা মোরশেদা বেগমকে জড়িয়ে ধরলো, তিনি কখনো কল্পনাও করেননি তার মেয়ের কপালে এতো সুখ রয়েছে। আদ্রিয়ান দুটো ট্রলির একটা খুলেছে, সেখান থেকে সবার জন্য আনা জামাকাপড় তাদের দিয়ে দিলো। পায়রা রান্না করছে, কোমড়ে শাড়ি গুজে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে তার। আয়ান, আরহাম ও শাহনাবের ছেলে সায়ান বল নিয়ে খেলছে। তাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে পায়রা। ছেলেগুলোকে বললেও শুনে না, তাদের খেলাই হচ্ছে এমন। কতক্ষণ ভালো আবার কতক্ষণ একজন আরেকজনকে মেরে আলুর ভর্তা বানাবে। নূর রান্নাঘরে আসতেই পায়রা তাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। সংসারের চাপে নিজের যত্নই নেওয়া হয় না তার। বোন এসেছে সেই কবেই কিন্তু রান্নার চাপে আর বসার ঘরে গিয়ে বোনকে জড়িয়ে ধরতে পারেনি সে। বাচ্চাদের চেঁচামেচিতে অতিষ্ঠ পায়রা, সে ধমক দিতেই তারা আয়ানের ঘরে চলে গেলো। নূর তার হাতে হাতে সাহায্য করছে, আদ্রিয়ান পুরো বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখছে। সবকিছু বদলে গিয়েছে আগের থেকে। আগের মতো ভাঙা রাস্তাঘাট ও নেই। পায়রা সকলের জন্য চা-নাশতা তৈরি করে নিয়ে গেলো। আশনূহাকে নিয়ে একপ্রকার কাড়াকাড়ি চলছে, একমাত্র আদ্রিয়ান বাদে বাকি সবারই ছেলে হয়েছে তাই আশনূহাকে সবাই আদরের উপর রেখেছে। আয়ান নূরের পাশে বসে তার দিকে তাকিয়ে বললো,

" ভাবি তুমি এতো সুন্দল, আমি বড়ো হয়ে তোমাকে বিয়ে করব। "

আদ্রিয়ান পাশ থেকে তার কথা শুনছে, সে আয়ানের কান মলে দিয়ে বললো,

" এই টমেটো তুই আমার বউয়ের থেকে দূরে থাকবি।"

" আমি কেন দূরে থাকবো, তুমি দূরে থাকো। "

" আমি বিয়ে করেছি তোর ভাবিকে, আমার বউ আমি কেন দূরে থাকবো। তুই দূরে থাক। "

আয়ান হঠাৎ নূরের কোলে উঠে ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে বলে উঠলো,

" তুমি ব্রোকে বিয়ে করে ফেললে ভাবি। আমাকেও কলো। "

নূর আয়ানের কথা শুনে হাসতে হাসতে কুপোকাপাত প্রায়, সে তার গাল টেনে তাতে চুমু খেয়ে বললো,

" করবো তো। "

আয়ান নূরের কথা শুনে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছে এক ঝলক দাঁতের প্রদর্শন করিয়ে হেসে বললো,

" এখন আমার বউ। "

আদ্রিয়ান আয়ানের কান্ড দেখে কপালে চাপড়ে বললো,

" কি শয়তান! "

পায়রা টেবিলে পানির জগ রেখে বললো,

" বলেছিলাম না তো তোমার মতোই ভন্ড হবে। কথা মিলে গেলো তো?"

আদ্রিয়ানের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। আয়ান মুখে হাত দিয়ে হাসি আটকে রাখার ভান ধরছে। আশনূহার কান্নার আওয়াজ শুনে আদ্রিয়ান ইশতেহার চৌধুরীর কোল থেকে তাকে নিতে গেলে সে অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠে,

" বা, বা,বা, ব্বা। "

" এই তো আমি সোনা। আব্বা এখানে। "

ইশতেহার চৌধুরী আশনূহার কর্মকান্ড দেখে স্মিত হেসে বললেন,

" বড্ড বায়না করে দেখছি তোমার মেয়ে। "

আদ্রিয়ান মেয়ের নাকে নিজের নাক স্পর্শ করিয়ে কপালে আদরের স্পর্শ দিয়ে বললো,

" আমার বায়নাওয়ালী আম্মা যে তাই এতো বায়না করে। তাই না আম্মা?"

" আশনূহার প্রথম শব্দ কি ছিলো? "

ইরার প্রশ্নে নূর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

" এই যে এতোক্ষণ ধরে যা বললো। "

" বাচ্চারা নাকি মা ডাক শিখে প্রথমে, তোমার বেলায় দেখি উল্টো আপু।"

" আর বলো না, বাপের সাথে প্রচুর ভাব তার। "

কিছু সময় পরেই তারা চলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করতে লাগলো। যদিও পায়রা অনেকবার করে বলেছে কিন্তু তারা শুনেননি। সায়ানের হাতে আদ্রিয়ানের দেওয়া গাড়ি। আয়ান ও আরহামের জন্য আনার সময় তার জন্যেও এনেছিলো। অবশ্য শাহনাব ও আশনূহার জন্য জামা-কাপড় কিনে এনেছে, যেহেতু প্রথমবার দেখতে এসেছে। ইশতেহার চৌধুরী সোনার চেইন উপহার দিলেন আশনূহাকে। যেহেতু তার আকিকাতে কিছু দেওয়া হয়নি। দুপুরের মধ্যভাগে এসে সূর্য যেন তার সমস্ত তেজ ঢেলে দিয়েছে ধরিত্রীর বুকে। নীল আকাশের বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে মেঘের আনাগোনা ক্ষীণ, চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র সোনালি রৌদ্র। নূর মেয়েকে খাইয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে খেলার জন্য। পায়রা আয়ান ও আরহামের পেছনে ছুটছে তখন থেকে খাবার নিয়ে। আদ্রিয়ান অন্য ট্রলি খুলে এক এক করে সব জিনিস বের করছে, যেগুলো শুধুমাত্র আয়ান ও আরহামের জন্য আনা। নূরের মা বাবা খেয়ে কবেই বেরিয়ে গিয়েছেন। দুই ছেলেকে খাওয়াতে নাজেহাল অবস্থা পায়রার। খাওয়া শেষ হতেই আয়ান আদ্রিয়ানের সামনে এসে বললো,

" এইগুলো কার জন্য? "

" বাড়ির পাশে একটা জ্বীন থাকে তার জন্য। "

" জ্বীন কি খেলতে পারে নাকি। "

" জ্বীন খেলতে পারে নাকি জানি না কিন্তু তোমার ভুড়ি বেড়ে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পারছি। "

" বেদ্দপ কুমড়ো পটাশ! "

আদ্রিয়ান হো হো করে হাসতে লাগলো, এই ছেলেকে রাগিয়ে বেশ মজা পায় সে। ট্রলি থেকে দুটো শার্ট বের করে আয়ান ও আরহামের হাতে দিলো সে। আরহাম কালো রঙের শার্ট পরে আদ্রিয়ানের সামনে এসে দাঁড়ালো, অত:পর বললো,

" ভাইয়া আমাকে পঁচা লাগছে?"

আদ্রিয়ান আরহামের গাল টেনে তাতে আদরের পরশ দিয়ে বললো,

" নায়ক লাগছে, সবার থেকে তোমাকেই বেশি হ্যান্ডসাম লাগছে। "

আরহাম খুশিতে গদগদ হয়ে চুলে স্টাইল করে হাত বুলালো।আরহামকে দেখে আয়ান ও আদ্রিয়ানের সামনে এসে বললো,

" ব্রো আমাকে কি দেখতে পঁচা লাগছে?"

আদ্রিয়ান তার কথায় ঝটপট উত্তর দিলো,

" হ্যাঁ অনেক। "

আদ্রিয়ানের জবাবে আয়ানের মুখ পানসে হয়ে গেলো। সে আদ্রিয়ানের চুল টেনে ধরে বললো,

" আমি তোমার হাঁটুর সমান তাও আমার পেছনে আঠার মতো লেগে থাকো কেন কুমড়ো পটাশ? "

আদ্রিয়ান আয়ানকে কোলে নিয়ে উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখে বললো,

" চুল ছাড় টমেটো! "

" আম্মু!"

পায়রা ও নূর দুজনেই ছুটে আসলো, তাদের এই কান্ড দেখে পায়রা হাসতে হাসতে বললো,

" ছোটবেলায় এক মুহুর্ত না দেখলে কাঁদতে কাঁদতে বেহুশ হয়ে যেতো আর এখন কিভাবে ঝগড়া করছে দেখ। "

" আম্মু ভাইয়া বলেছে আমাকে পঁচা লাগছে, আর আরহামকে নায়ক লাগছে। "

পায়রা ছেলের শার্টের কলার ঠিক করে বললো,

" কে বলেছে পঁচা লাগছে। তোমাকেও নায়কের মতো লাগছে। "

আয়ান হঠাৎ আদ্রিয়ানের সামনে এসে বললো,

" ব্রো তোমাকে আজকে অনেক বেশি.... "

বাকিটুকু বললো না সে। আদ্রিয়ান নিজেই নিজের প্রশংসা করতে করতে বললো,

" আমি জানি আমাকে দেখতে হ্যান্ডসাম লাগছে। "

" তোমাকে দেখতে অনেক বেশি বেগুনের মতো লাগছে। "

আয়ান খিলখিল করে হেসে নূরের পেছনে লুকিয়ে পড়লো। আদ্রিয়ান হতবাক হয়ে গেলো আয়ানের কথায়। তার সাথে বেগুনের কি সম্পর্ক। কোনভাবে কি আয়ান তাকে কালো বলছে। সে আয়ানের দিকে তেড়ে এসে বললো,

" তবে রে টমেটো, তোকে আজকে জ্বীনের কাছে পাচার করে দিবো। "

আয়ান আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে মুখ ভেঙচি দিয়ে লুকিয়ে রইলো। ইলহাম আশনূহার সাথে খেলছে, কথা বলছে। আয়ান ও আরহামের সাথে তার খুব একটা ভালো বন্ডিং নেই তবে আশনূহাকে এতো বাবাপাগল হতে দেখে ইলহামের মন হাহাকার করে উঠলো। দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ আদ্রিয়ান ও রুশান আরিয়ানের কবর দেখতে গেলো। চার বছর পর ছেলের কাছে এসেছে সে। ফুলগাছ দেখেই বোঝা যাচ্ছে রুশান খুব ভালোভাবে যত্ন নিয়েছে এই কবরের। গত চার বছরে আদ্রিয়ানের যখনি ছেলের কথা মনে পড়তো সে কল করে দেখে নিতো। রুশান ও দিন নেই রাত নেই যখনই বলতো তখনই চলে যেতো আদ্রিয়ানকে দেখাতে। আদ্রিয়ান ছেলের কবরে হাত বুলিয়ে চুমু খেয়ে বললো,

" কত বছর পর তোমায় স্পর্শ করলাম আমার কলিজা। তোমার বোন এসেছে, জানো। তোমাকে ভাইয়া বলে ডাকার জন্য এসেছে। তাকে নিয়ে আবার আসবো কেমন? এই চার বছরে বাবা তোমাকে খুব মিস করেছি সোনা। তোমার জায়গা কেউ নিতে পারবে না৷ অভিমান হয়েছে আমার ছেলের?"

বেশ কিছুসময় ছেলের কবরের সামনেই অতিবাহিত করলো আদ্রিয়ান। নড়লো না সেখান থেকে। অত:পর চলে গেলো পুরোনো সব বন্ধুদের সাথে দেখা করতে। তার দলের ছেলেরা সবাই ক্লাবে অপেক্ষা করছে তার জন্য। অনেকবছর পর দেখায় আদ্রিয়ানকে ছাড়তেই চাচ্ছে না তারা। দিন গড়িয়ে বিকেলের শেষ প্রহর। পশ্চিম দিগন্তে সূর্য তখন ধীরে ধীরে তার তেজ গুটিয়ে নিচ্ছে, আকাশজুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে রক্তিম আর সোনালি আভা। এখানে আসার পর থেকে আশনূহা একটিবারের জন্যেও ঘুমায়নি। বাবার বুক ছাড়া কখনো ঘুমায়নি সে। যেদিন আদ্রিয়ান থাকতো সেইদিন নূরকে অনেক কষ্ট করে ঘুম পাড়াতে হয় এই মেয়েকে। বড্ড জেদী সে। ঘুম চলে এসেছে চোখের পাতায় কিন্তু সে কেঁদেই চলেছে, আদ্রিয়ানের খবর নেই, ফোন ও ধরছে না সে। ইলহাম ও অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু ঘুম পাড়াতে পারেনি। নূর ইলহামের কোল থেকে নিয়ে বললো,

" কান্না থামবে না এই মেয়ের। ঘুম এসেছে তাই এমন করছে। "

" তাহলে ঘুম পাড়িয়ে দাও। কিভাবে কাঁদছে দেখো, গলা ভেঙে যাবে তো।"

" আদ্রিয়ান না আসা অব্দি ঘুমাবে না। বাবার বুকে ঘুমাতে ঘুমাতে অভ্যাস তো তাই। "

বাবার ভালোবাসা কি ইলহাম বোধহয় বুঝলো। ছেলে দুটো সারাক্ষণ মায়ের আশেপাশে ঘুরে অথচ আশনূহার আদ্রিয়ানের প্রতি ভালোবাসা দেখে একটা মেয়ের শখ জাগতে লাগলো ইলহামের। সে তো ছেলেছিলো এমন বাবা হতে। মেয়েটার কান্না কিছুতেই থামছে না। আদ্রিয়ান কিছুসময় পর বাড়ি ফিরলো। রুশানের ছেলেকে দেওয়ার জন্য কিছু খেলনা এনেছিলো সেগুলো নিতে ভুলে গিয়েছে তাই সেগুলোই নিতে এসেছে। আশনূহার কান্নার আওয়াজ কানে আসতেই সে ছুটে এসে দেখলো মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে ফর্সা নাক লাল করে ফেলেছে। সে দ্রুত মেয়েকে কোলে নিয়ে বললো,

" কি হয়েছে, কাঁদছে কেন আমার মেয়ে?"

" ঘুম এসেছে তাই কাঁদছে। "

আদ্রিয়ান মেয়ের কপাকে চুমু খেয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললো,

" আম্মার রাগ হয়েছে বুঝি? আব্বু একটু বাইরে গিয়েছিলাম তাতেই আমার আম্মার এতো কান্নাকাটি? এইটুকু পুতুলটাকে কোথায় রাখবো আমি? বুকেই আগলে রাখি বরং। "

" বা "

" এইতো আব্বু আছি তো। কোথায় যাবো আমার আম্মাকে ফেলে? "

আদ্রিয়ান সোফায় শুয়ে মেয়েকে বুকে আগলে ধরতেই সে ঘুমে তলিয়ে গেলো কয়েক মুহুর্তের মাঝেই। ইলহামের বুক ফেটে যাচ্ছে তা দেখে। ইশ! তার যদি একটা মেয়ে থাকতো তবে সেও হয়তো এভাবেই আব্বা আব্বা করে বাড়ি মাথায় করে রাখত। ইলহাম আর দাড়ালো না, সে তার ঘরে গিয়ে জায়গা জমির কাগজপত্র নিয়ে বসলো। এই সময় আয়ান ও আরহাম সেই ঘরে এসে খেলতে লাগলো। ইলহাম কাজে মন বসাতে পারছে না তাদের জন্য। আয়ান ইলহামের সামনে এসে তার হাত ধরে টানাটানি করতে করতে বললো,

" আব্বু আসো না, আমাদের সাথে খেলো। "

" ওদিকে যাও, আমি কাজ করছি। "

আয়ান তাও ছাড়লো না। সে নাছোড়বান্দার ন্যায় ইলহামের হাত ধরে টানাটানি করতে লাগলো। অত:পর ইলহাম তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দিতে লাগলো। ইলহাম বুঝতে পারেনি তার ধাক্কা অত জোরে লাগবে। আয়ান মেঝেতে উপুড় হয়ে পরে দাঁতের সাতগে ঠোঁট লেগে কেটে গিয়েছে। সে চিৎকার করে কেঁদে উঠে মায়ের কাছে গেলো, পায়রা রান্নাঘরে সবার জন্য পরোটা বানাচ্ছে। হঠাৎ আয়ানের কান্না শুনে সে আয়ানের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো তার ঠোঁট থেকে র'ক্ত পড়ছে। পায়রা আয়ানকে তারাতাড়ি কুলি করিয়ে জিগ্যেস করলো,

" কি হয়েছে আয়ান? কিভাবে হলো এসব?"

"আম্মু জানো আব্বু আজকে আমাকে মেরেছে।ইয়া জোরে ধাক্কা মেরেছে। আয়ানের কষ্ট হয় আব্বু বকা দিলে। আব্বু আর আমাদের ভালোবাসে না। এই আব্বু পঁচা। ভুত আব্বুকে পালটে দিয়েছে। ভুতকে বলো না আগের আব্বুকে ফিরিয়ে দিতে।"

আয়ান ও আরহাম দুজনেই একসাথে বলে উঠলো। তারা ভেবেছে বাড়ির পেছনের ভুত তাদের বাবাকে বদলে দিয়েছে নাহয় আগে তো ঠিকই খেলতো। পায়রা রেগে ইলহামের কাছে এসে বললো,

" কি শুরু করেছেন আপনি?"

ইলহাম কাজ করছিলো। পায়রার কথা শুনে সে বিরক্তিকর কন্ঠে বললো,

" কি করেছি?"

" ছেলেটাকে এতো জোরে ধাক্কা দিলেন কেন? "

" আমি তো শুধু সরিয়ে দিয়েছি। ধাক্কা কোথায় দিলাম। "

" ছেলেটার ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ছে। কিভাবে মেরেছেন দেখুন। "

ইলহাম তার কথায় আহম্মক বনে গেলো। সে আয়ানের কাছে আসতেই দেখতে পেলো সত্যিই ঠোঁট ফুলে গিয়েছে। সে আমতাআমতা করে বললো,

" আমি বুঝতে পারিনি এভাবে লেগে যাবে। তোমার ছেলে এতো দুষ্টুমি করে, বললেও শুনে না। "

" ছেলে তো আমার একা। আমি জন্ম দিয়েছি। বাপ তো নেই। "

" আচ্ছা ঠিক আছে আমি ভুল করেছি। রাগ করো না। আমি চিন্তায় ছিলাম তাই বুঝতে পারিনি। "

ইলহাম আয়ানকে কোলে নিয়ে আদর করে বললো,

" সরি আব্বা। আমি বুঝতে পারিনি।"

আয়ান শুধু বাবার কাঁধে মাথা রেখে বসে রইলো। ইলহাম আরহামকেও আরেক হাতে কোলে নিয়ে আদর করে দিলো। না জেনে ছেলেটাকে কত কষ্ট দিয়ে দিলো। আদ্রিয়ানের আনা সকল খেলনা এক এক করে দেখাচ্ছে ইলহামকে আয়ান। ইলহাম বুঝলো তার ছেলে তার চেয়ে বেশী আদ্রিয়ানকেই ভালোবাসে। আদ্রিয়ান যেভাবে দূর থেকেও তাদের আগলে রেখেছে ইলহাম হয়তো কাছে থেকেও তা পারেনি। ইলহাম দুই ছেলের মাথায় চউমু খেয়ে তাদের জড়িয়ে ধরলো। আদ্রিয়ানের নামে থাকা জমিগুলোতে চাষ শুরু করেছে ইলহাম। কোনটাতে বেগুন, কোনিটাতে ধান। আশনূহা বাবার হাত নিয়ে খেলছে। নূর ভাবলো শাড়ি বদলে থ্রি-পিস পরবে কিন্তু আদ্রিয়ান হঠাৎ বলে উঠলো,

" শাড়ি বদলাতে হবে না। চলো ক্ষেত থেকে ঘুরে আসি। "

" চলুন তাহলে। "

মেয়েকে বাবার সাথে মিল রেখে সাদা রঙের একটা ফ্রক পড়িয়ে দিলো নূর। অত:পর বেরিয়ে গেলো তিনজনেই। আদ্রিয়ান আশনূহাকে কোলে নিয়ে হাটছে। ধানক্ষেতে ফসল ভালোই হয়েছে। আদ্রিয়ান মেয়েকে দেখাতে লাগলো সব। আশনূহাকে কোল থেকে উপরের দিকে ছুড়ে আবার কোলে আগলে নিলো। নূর তার সামনে দিয়েই হাঁটছে। সূর্যের অস্তিত্ব খানিকটা দেখা যাচ্ছে। নূরের খোলা চুল মৃদু হাওয়ায় উড়ছে। আদ্রিয়ান তার পাশে এসে নূরের হাত নিজের হাতের মুঠোয় বন্দী করে বললো,

" ধন্যবাদ তোমায় নূর। আমার এতো সুন্দর একটা জীবন দেওয়ার জন্য। আমায় আগলে রাখার জন্য, আমার পাশে থাকার জন্য। ধন্যবাদ তোমায় আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ডাক শোনানোর জন্য। আমায় আব্বা ডাকার মতো একটা মিষ্টি চড়ুই কে এনে দেওয়ার জন্য। শেষ নিঃশ্বাস অব্দি আমি তোমার সাথে থাকতে চাই নূর। তুমি ছাড়া আমি সত্যিই অচল, এক মুহুর্তের জন্যেও তোমায় ছাড়া থাকার মতো কোন পরিস্থিতি না আসুক আমার জীবনে। ভালোবাসি তোমায় আমার প্রিয়তমা। "

সমাপ্ত।

( অবশেষে শেষ হলো তাদের পথচলা। ধন্যবাদ আপনাদের এই পাঁচ মাস আমার পাশে থাকার জন্য ও তাদের এতো ভালোবাসা দেওয়ার জন্য। আদ্রিয়ান ও নূরের লন্ডনের সংসার জীবন ও তাদের মেয়েকে নিয়ে আসছে ইবুক। তাদের ভালোবাসা, একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও দিনগুলো নিয়ে থাকে এই ইবুক। ছোটখাটো একটা বইয়ের সমানই হবে তবে স্টুডেন্ট বাজেটে রাখবো যাতে সবাই কিনতে পারে কারন আমার বেশিরভাগ পাঠক স্টুডেন্ট। ভালো থাকবেন সবাই। ভুলে যাবেন না যেন আমাকে। নতুন গল্পটাও পড়বেন আশা করি ভালো লাগবে আপনাদের। ভালো থাকবেন সবাই। এত্তো এত্তো ভালোবাসি আপনাদের। একটু দেরি হয়ে গেলো।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 61 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন