গল্পের নাম: তুই থাকলেই গল্প জমে!
পর্ব: ৫
শিরোনাম: তুই থাকলেই গল্প জমে! (সমাপ্ত)
মায়া নতুন শহরে চলে যাওয়ার পর বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে।
শুরুতে মায়া আর নীলার প্রতিদিন কথা হতো। সকালে ঘুম থেকে উঠেই মেসেজ, রাতে ঘুমানোর আগে ভিডিও কল—সবকিছুই আগের মতো চলছিল।
কিন্তু ধীরে ধীরে দুজনের ব্যস্ততা বাড়তে লাগল।
মায়ার নতুন স্কুল, নতুন বন্ধু, নতুন পরিবেশ। অন্যদিকে নীলারও পড়াশোনা আর পরিবারের নানা কাজ নিয়ে সময় কাটছিল।
তবুও তারা চেষ্টা করত একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে।
একদিন সকালে নীলা মায়াকে মেসেজ দিল।
নীলা: এই পাগলি, বেঁচে আছিস?
মায়া: না, ভূত হয়ে তোকে মেসেজ দিচ্ছি!
নীলা: বাহ! ভূতেরও এখন ইন্টারনেট আছে!
মায়া: অবশ্যই। তোর মতো বন্ধুকে বিরক্ত করতে হলে ইন্টারনেট লাগবেই।
নীলা: আচ্ছা, আজকাল আমাকে সময় দিস না কেন?
মায়া: তুইও তো আগের মতো ফোন করিস না।
নীলা: আমি করলে তুই বলিস পড়ছি, পরে কথা বলব।
মায়া: আর তুই করলে বলিস ঘুমাচ্ছিস!
নীলা: তার মানে দুজনেই ব্যস্ত হয়ে গেছি?
মায়া: হয়তো।
নীলা: কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, ব্যস্ত হলেও বন্ধুত্বটা যেন হারিয়ে না যায়।
মায়া: কখনো না।
এভাবেই আবার তাদের কথাবার্তা চলতে লাগল।
কিন্তু একদিন নীলার জন্মদিন এল।
মায়া আগের দিন থেকেই একটা পরিকল্পনা করছিল। সে নীলাকে কিছুই জানায়নি।
জন্মদিনের সকালে নীলা ঘুম থেকে উঠে দেখল, মায়ার কোনো মেসেজ নেই।
নীলা ভাবল, হয়তো মায়া ভুলে গেছে।
সে নিজেই মেসেজ দিল।
নীলা: এই মিস, আজকের দিনটা মনে আছে?
কোনো উত্তর এল না।
এক ঘণ্টা পার হলো। তারপরও কোনো মেসেজ নেই।
নীলার মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল।
সে ভাবল, এতদিনের বন্ধুত্বে এই প্রথম মায়া তার জন্মদিন ভুলে গেল!
দুপুরে নীলা ফোন হাতে নিয়ে বসে ছিল। হঠাৎ অচেনা একটা নম্বর থেকে কল এল।
নীলা: হ্যালো?
ওপাশ থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ শোনা গেল।
মায়া: হ্যাপি বার্থডে, আমার পাগলি!
নীলা অবাক হয়ে গেল।
নীলা: মায়া! তুই?
মায়া: হ্যাঁ রে। কী ভেবেছিলি, ভুলে গেছি?
নীলা: আমি তো ভেবেছিলাম তুই ভুলে গেছিস।
মায়া: তোকে ভুলে যাওয়া এত সহজ নাকি?
নীলা: তুই কোথায়?
মায়া: সেটা এখন বলব না। নিচে আয়।
নীলা: নিচে মানে?
মায়া: বাসার নিচে। তাড়াতাড়ি!
নীলা দৌড়ে নিচে নেমে এল।
আর তারপর যা দেখল, তা বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে মায়া!
নীলা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর দৌড়ে গিয়ে মায়াকে জড়িয়ে ধরল।
নীলা: তুই সত্যিই এসেছিস?
মায়া: না, আবার স্বপ্ন দেখছিস!
নীলা: পাগলি! আমাকে না জানিয়ে চলে এলি কেন?
মায়া: তোকে চমকে দেব বলে।
নীলা: তুই জানিস, আমি কতটা মিস করেছি তোকে?
মায়া: আমিও রে।
নীলা: আর কোনোদিন চলে যাবি না তো?
মায়া একটু হেসে বলল,
মায়া: এই যে, আবার শুরু করলি! আমি কি কোথাও হারিয়ে যাচ্ছি নাকি?
নীলা: জানি না। শুধু তোকে কাছে পেয়ে ভালো লাগছে।
মায়া: আচ্ছা, এখন কান্নাকাটি বন্ধ কর। তোর জন্মদিনে এসেছি, একটু হাসবি না?
নীলা: আগে বল, আমার জন্য কী এনেছিস?
মায়া: বাহ! এতদিন পর দেখা, আর তোর প্রথম প্রশ্ন উপহার নিয়ে?
নীলা: অবশ্যই! বন্ধুত্বের পাশাপাশি উপহারও গুরুত্বপূর্ণ!
মায়া ব্যাগ থেকে একটা সুন্দর বাক্স বের করল।
নীলা খুলে দেখল, ভেতরে দুটো একই রকম ব্রেসলেট। একটিতে লেখা ‘মায়া’, আর অন্যটিতে ‘নীলা’।
নীলার চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল।
নীলা: আমাদের আগের ব্রেসলেটের মতো!
মায়া: হ্যাঁ। মনে আছে, যাওয়ার দিন তুই আমাকে একটা ব্রেসলেট দিয়েছিলি?
নীলা: মনে থাকবে না কেন?
মায়া: তাই ভাবলাম, আবার নতুন করে দুজনের জন্য একই রকম কিছু রাখি।
নীলা: আমি এটা কখনো খুলব না।
মায়া: আমিও না।
এরপর দুজন একসঙ্গে পার্কে গেল। সেই পুরোনো বেঞ্চটাতে বসে অনেক গল্প করল।
নীলা: জানিস, তুই চলে যাওয়ার পর এই জায়গাটায় একা একা কতবার বসেছি?
মায়া: আমিও তোকে অনেক মিস করেছি।
নীলা: মাঝে মাঝে মনে হতো, আমাদের বন্ধুত্বটা হয়তো আগের মতো থাকবে না।
মায়া: আমারও এমন মনে হতো। কিন্তু এখন বুঝেছি, প্রতিদিন দেখা করলেই শুধু বন্ধুত্ব হয় না।
নীলা: তাহলে বন্ধুত্ব কী?
মায়া: বন্ধুত্ব হলো এমন একটা সম্পর্ক, যেখানে অনেক দিন কথা না হলেও দেখা হলে মনে হয়, কিছুই বদলায়নি।
নীলা: একদম ঠিক!
মায়া: আর একটা কথা বলি?
নীলা: বল।
মায়া: তুই আমার জীবনের এমন একটা মানুষ, যার সঙ্গে ঝগড়া করতেও ভালো লাগে, আবার মানাতেও ভালো লাগে।
নীলা: আর তুই এমন একটা মেয়ে, যে আমাকে বিরক্ত না করলে আমার দিনটাই অসম্পূর্ণ লাগে!
মায়া: হাহাহা! এই কথাটা কিন্তু রেকর্ড করে রাখব!
নীলা: রাখ। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে!
কিছুক্ষণ পর নীলা বলল,
নীলা: মায়া, আমাদের বন্ধুত্বের একটা নাম রাখা উচিত।
মায়া: কী নাম?
নীলা: তুই থাকলেই গল্প জমে!
মায়া একটু হেসে বলল,
মায়া: নামটা তো দারুণ!
নীলা: কারণ তুই থাকলে আমার প্রতিটা দিন গল্প হয়ে যায়।
মায়া: আর তুই থাকলে সেই গল্পে হাসি থাকে, দুষ্টুমি থাকে, অভিমান থাকে।
নীলা: আর থাকে একে অপরকে হারিয়ে না ফেলার প্রতিশ্রুতি।
দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল। চারপাশে সন্ধ্যার আলো ছড়িয়ে পড়ছিল।
নীলা হঠাৎ বলল,
নীলা: আচ্ছা, একটা কথা বলি?
মায়া: আবার কী?
নীলা: তুই কি জানিস, আমি তোকে কতটা ভালোবাসি?
মায়া: জানি। তবে তোর ভালোবাসার সঙ্গে বিরক্তিটাও ফ্রি আসে!
নীলা: অসভ্য!
মায়া: তুইও!
তারপর দুজন আবার হেসে উঠল।
তাদের জীবনে হয়তো অনেক পরিবর্তন আসবে। হয়তো আবার দূরে যেতে হবে, হয়তো অনেক দিন দেখা হবে না। কিন্তু তারা বুঝে গিয়েছিল, সত্যিকারের বন্ধুত্ব শুধু পাশাপাশি থাকার নাম নয়।
সত্যিকারের বন্ধুত্ব হলো দূরে থেকেও একে অপরের জন্য জায়গা রেখে দেওয়া।
কিছু সম্পর্ক রক্তের হয় না, তবুও তারা পরিবারের মতো আপন হয়ে যায়।
মায়া আর নীলার বন্ধুত্বও ছিল ঠিক তেমনই।
তাদের গল্পে ছিল ঝগড়া, অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব আর অনেক হাসি।
কিন্তু সবকিছুর শেষে তারা একে অপরকে খুঁজে পেয়েছিল।
কারণ তাদের দুজনেরই বিশ্বাস ছিল—
বন্ধুত্ব মানে প্রতিদিন কথা বলা নয়।
বন্ধুত্ব মানে একে অপরকে বুঝতে শেখা।
বন্ধুত্ব মানে দূরে থেকেও মনে রাখা।
আর বন্ধুত্ব মানে এমন একজন মানুষ, যার কাছে ফিরে গেলে মনে হয়, নিজের জায়গাতেই ফিরে এসেছি।
মায়া আর নীলার গল্প হয়তো এখানেই শেষ।
কিন্তু তাদের বন্ধুত্বের গল্প কখনো শেষ হবে না।
কারণ...
তুই থাকলেই গল্প জমে!
সমাপ্ত। ❤️