গল্পের নাম: তুই থাকলেই গল্প জমে!
পর্ব: ৪
শিরোনাম: দূরত্বের ওপারে বন্ধুত্ব
সেদিনের পর থেকে মায়া আর নীলার বন্ধুত্ব আবার আগের মতো হয়ে উঠেছিল। বরং আগের চেয়েও বেশি গভীর হয়েছিল তাদের সম্পর্ক।
প্রতিদিন স্কুলে একসঙ্গে যাওয়া, টিফিন ভাগ করে খাওয়া, ক্লাসে দুষ্টুমি করা—সবকিছু আবার আগের মতো চলছিল।
কিন্তু জীবনের গল্পে সবকিছু কি আর সবসময় নিজের ইচ্ছেমতো চলে?
একদিন বিকেলে মায়া বাড়ি ফিরে দেখল, তার মা-বাবা খুব চিন্তিত মুখে বসে আছেন।
মায়া: কী হয়েছে মা? তোমাদের মুখ এমন কেন?
মা: মা, তোর বাবার চাকরির কারণে আমাদের অন্য শহরে চলে যেতে হবে।
মায়া প্রথমে কথাটা বুঝতে পারল না।
মায়া: অন্য শহরে মানে?
বাবা: হ্যাঁ মা। আগামী মাসেই আমাদের চলে যেতে হবে।
মায়া: তাহলে আমার স্কুল? আমার বন্ধুরা?
বাবা: নতুন জায়গায় নতুন স্কুলে ভর্তি করে দেব।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—নীলা!
সে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। ফোন হাতে নিয়ে নীলার নামটা খুলল। অনেকক্ষণ ভাবল কীভাবে কথাটা বলবে।
অবশেষে মেসেজ দিল।
মায়া: নীলা, একটা কথা বলব?
নীলা: বল পাগলি।
মায়া: আমাদের পরিবার অন্য শহরে চলে যাচ্ছে।
নীলা: কী! কখন?
মায়া: আগামী মাসে।
নীলা: মজা করছিস?
মায়া: না রে। সত্যি বলছি।
নীলা: তাহলে আমাদের কী হবে?
মায়া: জানি না।
নীলা: তুই আমাকে ছেড়ে চলে যাবি?
মায়া: আমি কি নিজের ইচ্ছায় যাচ্ছি নাকি?
নীলা: তবুও তোর সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হবে না। একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া হবে না। টিফিন ভাগ করে খাওয়া হবে না।
মায়া: আমিও তোকে ছাড়া থাকতে চাই না।
নীলা: তাহলে তোর বাবাকে বল, তোরা যাবি না!
মায়া: সবকিছু কি আমার হাতে আছে?
নীলা আর কোনো উত্তর দিল না।
সেদিন রাতে দুজনেই অনেকক্ষণ ফোনে কথা বলল। কেউই ফোন রাখতে চাইছিল না।
নীলা: মায়া, একটা কথা দিবি?
মায়া: কী কথা?
নীলা: দূরে চলে গেলেও আমাকে ভুলে যাবি না।
মায়া: পাগলি! তোকে ভুলে যাওয়া কি এত সহজ?
নীলা: নতুন বন্ধু পেলে আবার আমাকে ভুলে যাবি না তো?
মায়া: আরে বোকা, নতুন বন্ধু হতে পারে, কিন্তু তুই তো আমার পুরোনো পাগলি!
নীলা: হুম। এই কথাটা মনে রাখিস।
পরের কয়েকটা দিন তাদের খুব ব্যস্ততায় কাটল। মায়া পরিবারের সঙ্গে নতুন জায়গায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল। আর নীলা প্রতিদিন স্কুলে এসে মায়ার সঙ্গে যতটা সম্ভব সময় কাটানোর চেষ্টা করত।
একদিন নীলা মায়াকে বলল,
নীলা: চল, আজ স্কুল ছুটির পর একটু ঘুরে আসি।
মায়া: কোথায় যাবি?
নীলা: আমাদের সেই প্রিয় জায়গায়।
মায়া: পার্কে?
নীলা: হ্যাঁ। যেখানে বসে আমরা প্রথম বন্ধুত্বের কথা বলেছিলাম।
দুজন বিকেলে পার্কে গেল।
সেই পরিচিত বেঞ্চটাতে পাশাপাশি বসে রইল। চারপাশে অনেক মানুষ, অনেক হাসি, অনেক গল্প। কিন্তু তাদের দুজনের মনটা ছিল অন্য কোথাও।
নীলা: জানিস, এই জায়গাটা আমাকে সবসময় আমাদের কথা মনে করিয়ে দেবে।
মায়া: আমারও।
নীলা: তুই চলে গেলে আমি কার সঙ্গে এত ফাজলামি করব?
মায়া: নতুন কাউকে খুঁজে নিস।
নীলা: না, তোর মতো বিরক্তিকর মানুষ আর পাওয়া যাবে না!
মায়া: এই! আমাকে বিরক্তিকর বললি?
নীলা: হ্যাঁ, বলেছি। তুই বিরক্তিকর, জেদি, অভিমানী, আর অনেক বেশি কথা বলিস।
মায়া: আর তুই?
নীলা: আমি তো একদম ভালো মেয়ে!
মায়া: হাহাহা! নিজের প্রশংসা নিজেই করিস!
দুজনেই হেসে উঠল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর নীলার চোখে পানি চলে এল।
মায়া: কী হলো? কাঁদছিস কেন?
নীলা: কিছু না। চোখে ধুলো পড়েছে।
মায়া: পার্কে বসে চোখে ধুলো পড়েছে, তাই না?
নীলা: চুপ কর!
মায়া নীলার হাত ধরে বলল,
মায়া: শোন, দূরত্ব মানেই বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। আমরা ফোনে কথা বলব, ভিডিও কলে গল্প করব। তুই চাইলে প্রতিদিন আমাকে বিরক্ত করতে পারবি।
নীলা: সত্যি?
মায়া: একদম সত্যি।
নীলা: তাহলে আমিও একটা কথা দিচ্ছি। তুই যেখানেই থাকিস, কোনো সমস্যা হলে সবার আগে আমাকে বলবি।
মায়া: কথা দিলাম।
এরপর দিনগুলো দ্রুত কেটে গেল।
অবশেষে মায়ার চলে যাওয়ার দিন এসে গেল।
সকালে নীলা মায়াদের বাসায় পৌঁছে গেল। মায়া তখন শেষ মুহূর্তের জিনিসপত্র গুছাচ্ছিল।
নীলা: এই মায়া!
মায়া ঘুরে তাকাল।
মায়া: তুই এসেছিস?
নীলা: না, আমি তো আকাশ থেকে পড়েছি!
মায়া: এই সময়েও ফাজলামি বন্ধ হবে না?
নীলা: তোর সামনে থাকলে কীভাবে বন্ধ হবে?
দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
নীলা ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট উপহার বের করল।
নীলা: এটা তোর জন্য।
মায়া: কী এটা?
নীলা: খুলে দেখ।
মায়া উপহারটা খুলে দেখল, ভেতরে একটা ছোট্ট বন্ধুত্বের ব্রেসলেট।
নীলা: এটা সবসময় কাছে রাখবি। যখনই আমার কথা মনে পড়বে, এটা দেখবি।
মায়া ব্রেসলেটটা হাতে পরে নিল।
মায়া: তুইও এটা রাখ।
নীলা: আমার জন্যও এনেছিস?
মায়া: হ্যাঁ। আমাদের দুজনের একই রকম।
নীলা ব্রেসলেটটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই মায়ার বাবা ডাকলেন,
বাবা: মা, আমাদের এখন বের হতে হবে।
মায়া নীলার দিকে তাকাল।
নীলা: যা। সাবধানে যাস।
মায়া: তুই কাঁদবি না কিন্তু।
নীলা: আমি কাঁদছি নাকি? আমার চোখে ধুলো পড়েছে!
মায়া হেসে বলল,
মায়া: পাগলি একটা!
গাড়ি চলতে শুরু করল। নীলা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিল। মায়াও জানালা দিয়ে হাত নাড়তে লাগল।
গাড়িটা ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল।
সেদিন নীলা বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে গিয়ে বসে রইল। চারপাশে সবকিছু আগের মতোই ছিল, শুধু মায়া ছিল না।
অন্যদিকে নতুন শহরে পৌঁছে মায়াও জানালার পাশে বসে রইল।
রাতে নীলা মেসেজ দিল।
নীলা: পৌঁছেছিস?
মায়া: হ্যাঁ।
নীলা: নতুন জায়গা কেমন?
মায়া: ভালো। কিন্তু তুই নেই।
নীলা: আমিও তোকে মিস করছি।
মায়া: কাল ভিডিও কলে কথা বলবি?
নীলা: অবশ্যই। তবে আমাকে ভুলে গেলে কিন্তু খবর আছে!
মায়া: তোকে ভুলতে হলে আগে আমার স্মৃতিগুলো ভুলতে হবে। আর সেটা কোনোদিন সম্ভব না।
নীলা: ভালোবাসি রে পাগলি, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড!
মায়া: আমিও ভালোবাসি তোকে।
এভাবেই শুরু হলো তাদের দূরত্বের নতুন অধ্যায়।
তারা বুঝতে পারল, প্রতিদিন দেখা না হলেও বন্ধুত্ব বেঁচে থাকতে পারে। তবে সামনে তাদের জন্য আরও একটি পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল।
কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যস্ততা বাড়ে, নতুন মানুষ আসে, নতুন জীবন শুরু হয়।
তাহলে কি তারা দেওয়া কথাগুলো রাখতে পারবে?
নাকি দূরত্ব একদিন তাদের মাঝেও নীরবতা তৈরি করবে?
চলবে...
পর্ব ৫: তুই থাকলেই গল্প জমে! (সমাপ্ত)