ফন্ট সাইজ:
থিম:
মেঘাবির

পর্ব 2

লেখক: Jannatul Naima

মেঘাবির

লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা

পর্ব ২

_____

বাইরে তখন ঝুমঝুম করে বৃষ্টি পড়ছে। শরৎকালের মেঘলা আকাশ যেন হঠাৎ করেই দুপুরের দিকে তার রূপ বদলে গভীর বর্ষার চাদরে মুড়ে নিয়েছে।

চারতলার এই ছোট ফ্ল্যাটটার বসার ঘরের বিশাল কাঁচের জানালার ঠিক বাইরে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো একটানা আছড়ে পড়ছে ফিনফিনে ছাঁটের মতো।

পুরো শহরটা যেন একটা ক্লান্তির আবরণে ঢাকা পড়ে গেছে। রিকশার টুংটাং শব্দ, দূরের কোনো রাস্তায় গাড়িগুলোর জল কেটে যাওয়ার সাঁই সাঁই আওয়াজ, আর অনেক দূর থেকে ভেসে আসা কোনো এক মসজিদের মিনার থেকে আসা আজানের গম্ভীর ধ্বনি—

সব মিলিয়ে চারপাশের পরিবেশটায় এক অদ্ভুত, মায়াবী স্থবিরতা নেমে এসেছে। এই বৃষ্টির দুপুরগুলোতে মানুষের মন কেমন যেন আনচান করে ওঠে, একটু পুরোনো স্মৃতির রোমন্থন করতে ইচ্ছে করে, কিংবা প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে জানালার ধারে বসে অলস সময় কাটাতে মন চায়।

কিন্তু মেঘের জীবন এখন অতীত ছাপিয়ে বর্তমানের এক সম্পূর্ণ নতুন উপন্যাসে এসে ঠেকেছে, যেখানে প্রতিটি পাতার লেখা কেবল একজন মানুষের নামেই উৎসর্গ করা—সাজ্জাদুল খান আবির।

রান্নাঘরের ছোট্ট কাউন্টারে দাঁড়িয়ে মেঘ দুই কাপ গরম চা বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। চুলগুলো আজ খুব যত্ন করে কোনো ক্লিপ দিয়ে আটকে রাখা হয়নি, বরং কিছুটা অগোছালোভাবেই কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে।

গায়ে একটা হালকা নীল রঙের সুতির সালোয়ার-কামিজ, যার ওড়নাটা একপাশে খুব সাধারণভাবেই গোঁজা। রান্নাঘরের ছোট জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে বৃষ্টির ঠান্ডা বাতাস এসে তার গালের চুলে আলতো ছুঁয়ে যাচ্ছে।

রান্নার হালকা আদা-চা আর লবঙ্গর সুবাস আর বাইরের বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ মিলে ঘরের বাতাসটাকে বড্ড নিবিড় আর শান্ত করে তুলেছে। নতুন এই সংসারের প্রতিটি কোণায় মেঘের হাতের স্পর্শ লেগে আছে।

রান্নাঘরের তাক গোছানো থেকে শুরু করে শোবার ঘরের বিছানার চাদর বদলানো—সবকিছু সে নিজে হাতে করে।

একটা স্বাধীন, ছিমছাম সংসার পাতার স্বপ্ন সে বহুদিন দেখেছে, আর আজ সেই স্বপ্ন তার চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই চার দেয়ালের ভেতরে বাইরের কোনো কোলাহল নেই, কোনো জটিলতা নেই; কেবল রয়েছে এক গভীর দায়িত্ববোধ আর অদ্ভুত এক নিরিবিলি শান্তি।

বসার ঘরের ঠিক এক কোণায় ছোট্ট কাঠের টেবিলটার ওপর একটা ল্যাপটপ খোলা। আবির সেখানে গম্ভীর মুখে বসে অফিসের জরুরি কিছু ফাইলের কাজ দেখছিল।

বাইরে যতই রোমান্টিক আবহাওয়া থাকুক না কেন, আবিরের চেহারায় বা তার কাজের গতিতে তার বিন্দুমাত্র কোনো প্রভাব নেই। মানুষটা যেন এক টুকরো পাথর—অটল, গম্ভীর এবং অত্যন্ত শৃঙ্খলিত।

তার পরনে একটা ধূসর রঙের ক্যাজুয়াল টি-শার্ট, বাহুর পেশিগুলো সামান্য উন্মুক্ত, চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো।

কাজের প্রতি তার এই নিখাদ মনোযোগ আর একাগ্রতা মেঘ দূর থেকে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখছিল। মানুষটার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো লোকদেখানো ভাব নেই।

সে যা করে, পুরো সততা নিয়ে করে। তার এই সোজাসাপ্টা ও কঠোর ব্যক্তিত্বের পেছনে যে কী পরিমাণ কোমলতা আর গভীর মায়া লুকিয়ে আছে, তা কেবল মেঘই অনুভব করতে পারে।

মেঘ চায়ের কাপ দুটো ছোট ট্রেতে সাজাল। সাথে এক প্লেট বিস্কুট আর নিজে হাতে ভাজা গরম স্ন্যাক্স রাখল। ট্রে হাতে নিয়ে সে ধীরে ধীরে বসার ঘরের দিকে এগিয়ে এল। তার পায়ের নুপুরের মৃদু ঝংকার বা কাপের চামচের টুংটাং শব্দ আবিরের কাজে বা মনোযোগে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটাল না, যতক্ষণ না মেঘ তার ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

আবির নিজের কাজের ভেতরে এতটাই মগ্ন থাকে যে চারপাশের পৃথিবী যেন তার কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে।

টেবিলে চায়ের কাপটা খুব সাবধানে নামিয়ে রেখে মেঘ একটু নিচু গলায় ডাকল, "চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। একটু কাজ থামিয়ে খেয়ে নিন প্লিজ।"

আবির ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে এক পলক মেঘের দিকে তাকাল। তার সেই সোজা চাউনিতে কোনো পরিবর্তনের লেশমাত্র নেই। চোখের সেই তীব্র দৃষ্টি যেন যেকোনো মানুষকে এক মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিতে পারে। সে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা সামান্য নামিয়ে রেখে টেবিলে রাখা চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিল।

এক চুমুক দিয়ে গম্ভীর গলায়, কোনো রাখঢাক না রেখে সরাসরি প্রশ্ন করল, কিন্তু তার চোখের গভীরে তখন এক অদ্ভুত স্নেহের পাহারাদারী জ্বলজ্বল করছে।

সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মেঘের একদম কাছাকাছি এগিয়ে এল। আবিরের উচ্চতা মেঘের তুলনায় বেশ খানিকটা বেশি, তাই কথা বলার সময় তাকে একটু নিচু হয়ে মেঘের চোখের দিকে তাকাতে হয়।

পুরুষ মানুষের এই দীর্ঘ দেহাবয়ব আর পাহাড়সম ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়ালে মেঘের বুকের ভেতরটা এক অজানা শিহরণে কেঁপে ওঠে।

আবির তার শক্ত হাতের আঙুল দিয়ে মেঘের কপাল থেকে সেই অবাধ্য ও ভেজা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিল।

ছোঁয়াটা যতটা না কঠোর, তার চেয়ে অনেক বেশি অধিকারবোধে ভরা। তারপর গম্ভীর ও নিচু গলায় সে সরাসরি বলে উঠল:

"সারাদিন এই স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় চুলগুলো এভাবে ভিজিয়ে রেখে কী প্রমাণ করতে চাস তুই? নিজের যত্ন নেওয়ার আক্কেলটুকুও কি তোর নেই, নাকি আমাকে জোর করে শিখিয়ে দিতে হবে?"

আবিরের এই কথার ধমকটা কঠোর হলেও তার চোখের কোণের সেই উষ্ণ চাউনি মেঘের সমস্ত রাগ এক নিমিষে ধুয়ে মুছে দিল। মানুষটার ভালোবাসা প্রকাশের ধরনটা বড্ড অদ্ভুত—সে ভালোবাসে ধমক দিয়ে, আগলে রাখে কঠিন শাসনে।

মেঘ একটু লজ্জা মিশিয়ে মাথা নিচু করে মৃদু গলায় বলল, "আপনার এই কড়া শাসন আর কোনোদিন গেল না! সবসময় কেবল ধমক দিতে জানেন, একটু নরম করে কথা বলতে কি খুব কষ্ট হয়? বাইরে এত সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে, একটু তো রোমান্টিক হতে পারেন!"

আবির একটুও হাসল না, কিন্তু তার মুখের সেই কাঠিন্য ভেদ করে এক ধরনের তীব্র মালিকানার ভাব ফুটে উঠল। সে এক হাত বাড়িয়ে মেঘের চিবুকটা খুব আলতো করে কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে উঁচুতে তুলে ধরল।

তার হাতের ছোঁয়াটা এতই উষ্ণ ছিল যে মেঘের সমস্ত দ্বিধা নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ঘরের ভেতরের এই নিস্তব্ধতায়, বাইরে বৃষ্টির একটানা ঝুমঝুম শব্দের মাঝে আবির কোনো রাখঢাক না রেখে একেবারে সোজাসাপ্টা সুরে বলে উঠল:

➤"ভালোবাসার খাতা খুলে পদ্য লেখার সাধ্য বা অভ্যাস আমার নেই, মেঘ। কিন্তু এই ঝুম বৃষ্টির দিনে জানালার কাঁচের ওপারে যখন পুরো শহর ধুয়ে যায়, তখন কেবল তোর ওই ভেজা চুল আর মায়াবী মুখটাই আমার সমস্ত দুনিয়া হয়ে ধরা দেয়। আমার এই রূক্ষ্ম, গোমড়ামুখো স্বভাবের আড়ালে তোর জন্য যে কত নিখাদ আলো জমে আছে, তা বাইরের কেউ কোনোদিন জানবে না। বাইরের কোনো রূপকথা বা কাব্যিক প্রতিশ্রুতির আমার প্রয়োজন নেই, কারণ আমার এই ছোট্ট সংসারের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত কেবল তুই আছিস। আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে, আমার স্পেরো।"

আবিরের এই গভীর ও একরোখা কথার পর মেঘের বুকটা অদ্ভুত এক ভালোলাগায় ফেটে পড়তে চাইল। মানুষটার এই রূক্ষ্ম আবরণের নিচে যে কী পরিমাণ নিখাদ মায়া আর ভালোবাসা লুকিয়ে আছে, তা আর কাউকেই বোঝাতে হয় না।

আবিরের প্রশস্ত বুকের ওম থেকে মুখ তুলে মেঘ সামান্য পিছিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন ভালোবাসার জল চিকচিক করছে, কিন্তু মুখে ফুটে উঠেছে এক অসম্ভব নির্ভরতার প্রশান্ত হাসি।

সে পরম শ্রদ্ধায় এবং সমর্পিত কণ্ঠে আবিরের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে নিজের মনের কথাগুলো ব্যক্ত করল:

➤"আপনার এই কাঠিন্য আর ধমকের আড়ালে যে মানুষটা লুকিয়ে আছে, তাকে চেনার পর বাইরের কোনো মিষ্টি কথার আর কোনো মূল্য থাকে না আমার কাছে, আবির ভাই। মানুষ হয়তো সুন্দর পদ্য লিখে মন ভোলায়, কিন্তু আমার এই ছোট্ট জীবনে আপনার ওই এক ফোঁটা অধিকারবোধ আর নিঃশব্দ আগলে রাখাটাই সবচেয়ে বড় কাব্য। এই বৃষ্টির জলের মতো আপনার ভালোবাসাও আজ আমাদের পুরো অস্তিত্ব ধুয়ে মুছে একাকার করে দিয়েছে। শুধু এই জন্ম কেন, প্রতি জন্মে কেবল আপনার ছায়াতেই বেঁচে থাকতে চায় এই মেঘ। আমৃত্যু আপনারই থাকব আমি।"

মেঘের এই কথাগুলোর মধ্যে কোনো চতুরতা বা অতিরিক্ত সাজানো ভঙ্গি ছিল না—ছিল এক পূর্ণাঙ্গ সমর্পণ আর ভক্তি মিশ্রিত ভালোবাসা। আবির আর একটি কথাও বলল না। সে কেবল তার শক্ত আঙুলগুলো দিয়ে মেঘের চিবুকটা আরেকবার ছুঁয়ে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে তাকে আবারও নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল।

বাইরে তখন বৃষ্টির ছাঁট আরও তীব্র হয়েছে, কিন্তু সেই চার দেয়ালের উষ্ণতায় তাদের দুজনের পৃথিবীটা হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ স্বাধীন, ভালোবাসাময় ও পবিত্রময়।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন