ফন্ট সাইজ:
থিম:
মেঘাবির

পর্ব 3

লেখক: Jannatul Naima

মেঘাবির

লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা

পর্ব ৩

_____

গতকালের সেই মুষলধারে বৃষ্টির পর আজ সকালটা যেন এক অন্য রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে। চারতলার এই ছোট ফ্ল্যাটটার পূর্বমুখী জানালার কাঁচ ভেদ করে রোদ এসে সোজা পড়েছ বসার ঘরের মেঝেতে।

রাতের সেই আর্দ্র ও মেঘলা আকাশ কেটে গিয়ে আজ আকাশে এক টুকরো সাদা মেঘের চিহ্নও নেই—চারদিকটা কী এক অদ্ভুত স্বচ্ছতায় ঝলমল করছে।

দূরে কোনো এক গাছের ডালে বসে থাকা চড়ুই পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর নিচ থেকে ভেসে আসা ট্রাফিকের চেনা হর্ন—সব মিলিয়ে একটা নতুন দিনের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে এসেছে। এই ছোট ফ্ল্যাটের ভেতরে সময় যেন নিজের গতিতে বয়, যেখানে বাইরের পৃথিবীর কোনো হুল্লোড় বা জটিলতা পৌঁছাতে পারে না।

রান্নাঘরের ছোট কাউন্টারে দাঁড়িয়ে মেঘ আজ বেশ মন দিয়ে সকালের নাস্তা তৈরি করছে। গ্যাসের চুলায় কেটলিতে পানি বসানো হয়েছে, যার মুখ দিয়ে সরু ফুঁসফুঁস শব্দে বাষ্প বের হচ্ছে। টুংটাং শব্দে প্লেট সাজাতে সাজাতে মেঘের মনে পড়ে গেল গতকালের সেই বৃষ্টির কথা।

আবিরের সেই গম্ভীর অথচ তীব্র কথাগুলো এখনো তার কানের কাছে রিনঝিন করে বাজছে। মানুষটা মুখে যতই কাঠিন্য দেখাক না কেন, তার চোখের গভীরে যে কী পরিমাণ মায়া আর অধিকারবোধ লুকিয়ে আছে, তা আর কাউকেই বলে দিতে হয় না।

মেঘের পরনে আজ একটা হালকা হলুদ রঙের সুতির সালোয়ার-কামিজ, চুলগুলো খুব যত্নের সাথে ফিতে দিয়ে একটা পরিপাটি বিনুনি করে পিঠের ওপর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। রান্নাঘরের ছোট ভেন্টিলেটর দিয়ে আসা সকালের মিষ্টি রোদের ছোঁয়া তার ফর্সা গালের ওপর এক অপূর্ব আভা তৈরি করেছে।

নতুন এই সংসারের প্রতিটি ভোরের সূচনা হয় এক গভীর দায়িত্ববোধ আর অদ্ভুত এক নিরাপত্তার অনুভূতি দিয়ে।

ঠিক তখনই শোবার ঘরের ভারী দরজাটা খোলার একটা পরিচিত শব্দ হলো।

ভারী পায়ে কেউ ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে আসছে। মেঘ ঘাড় ফিরিয়ে এক পলক তাকাল। আবির রুম থেকে বের হয়ে এসেছে। পরনে তার অফিসের সেই চেনা নিখুঁত ইস্ত্রি করা সাদা শার্ট আর কালো ফর্মাল প্যান্ট।

হাতের ঘড়িটা কব্জিতে বাঁধতে বাঁধতে সে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসল। আবিরের চেহারায় সকালের স্নিগ্ধতার চেয়েও বেশি রয়েছে কাজের একটা কঠোর শৃঙ্খলা।

মানুষটার চেহারায় কোনো আলস্য নেই, কোনো অপ্রয়োজনীয় ক্লান্তি নেই। সে সবসময় সময়ের একনিষ্ঠ অনুসারী। তার এই শৃঙ্খলিত জীবনযাত্রাই যেন এই ছোট সংসারটার মূল স্তম্ভ।

আবির বসার পর টেবল থেকে চোখ তুলে সোজা তাকাল রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মেঘের দিকে। তার সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এক পলকে মেপে নিল মেঘের সকালের সমস্ত প্রস্তুতি।

আবিরের কপালে হালকা একটা চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। সে হাত থেকে ঘড়িটা নামিয়ে রেখে একটু গম্ভীর ও ভারী গলায় ডেকে উঠল, "স্পেরো, এদিকে আয় তো একটু।"

মেঘ একটু চমকে গেল। রান্নার কাজ ফেলে সে দ্রুত হাতে হাত মুছে এগিয়ে এল বসার ঘরের দিকে। আবিরের সামনে এসে দাঁড়াতেই সে নরম গলায় প্রশ্ন করল, "কী হয়েছে? এভাবে ডাকছেন কেন?"

আবির চেয়ারে বসে থেকেই একদৃষ্টিতে মেঘের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখের সেই চাউনিতে কোনো বকাঝকা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত গভীর অধিকারবোধ।

সে নিজের বড় একটা হাত বাড়িয়ে মেঘের ডান হাতটা নিজের মুঠোয় তুলে নিল। শক্ত এক মুঠো হাতের ভেতর মেঘের নরম হাতটা যেন হারিয়ে গেল।

আবির গম্ভীর অথচ মায়াবী গলায় বলল, "কাল রাত থেকে খেয়াল করছি, তোর চোখের নিচে সামান্য কালচে ছাপ পড়েছে। তুই কি রাতে ঠিকমতো ঘুমাচ্ছিস না? নাকি এই নতুন সংসারের সমস্ত চাপ একা মাথায় নিয়ে নিজে নিজে ছটফট করিস?"

মেঘ মৃদু হেসে মাথা নিচু করে ফেলল। মানুষের এই গভীর খেয়াল রাখার ক্ষমতাটুকু দেখে তার বুকটা ভরে ওঠে। সে শান্ত গলায় বলল, "সংসারের কাজ তো একটু-আধটু করতেই হবে, আবির ভাই। নতুন একটা জায়গায় সব গুছিয়ে বসাতে গেলে একটু তো সময় লাগবেই। এতে ক্লান্ত হওয়ার কিছু নেই।"

আবির মেঘের কথা শুনে আরও গম্ভীর হলো, কিন্তু হাতের মুঠোটা একটু শক্ত হলো। সে সোজাসাপ্টা সুরে বলে উঠল, "আমি তোকে এই চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি করে খাটানোর জন্য আনিনি, মেঘ। তোর কাজ করার জন্য কাজের লোক বা যা দরকার, সবকিছুর ব্যবস্থা আমি করতে পারি। কিন্তু তোর মুখের একটুখানি ক্লান্তিও আমার সহ্য হয় না। সংসার মানে তো কেবল ইট-পাথরের ঘর গোছানো নয়, সংসার মানে হলো দুজন মানুষের একসাথে শান্তিতে নিঃশ্বাস নেওয়া। আমার এই কথাগুলো কি তোর বুঝতে এত কষ্ট হয়?"

আবিরের এই কথাগুলোর মধ্যে কোনো মিষ্টি রোমান্টিক ফুলঝুরি ছিল না—ছিল একটা মানুষের চরম দায়িত্বশীলতা আর নিখাদ ভালোবাসা। মেঘ আর নিজের আবেগকে আটকে রাখতে পারল না। সে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে আবিরের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে তার মাথার ওপর হাত বুলিয়ে দিতেই আবির এক টানে মেঘকে নিজের একদম কাছে টেনে নিল।

মেঘের মুখটা সোজা গিয়ে মিশে গেল আবিরের সেই শার্টের বুকে।

বাইরে তখন সকালের রোদ আরও চড়া হয়েছে। জানালার কাঁচ ভেদ করে ঘরের ভেতরে এক সোনালী আলো খেলা করছে। আবির এক হাত দিয়ে মেঘের পিঠটা আলতো করে জড়িয়ে ধরে গম্ভীর গলায় বলল,

"বাইরের দুনিয়াটা অনেক স্বার্থপর, মেঘ। মানুষ কেবল সুযোগ খোঁজে কার কোথায় দুর্বলতা আছে তা নিয়ে আঘাত করার। কিন্তু তুই ভুলে যাস না, তোর মাথার ওপর আমার এই হাতটা যতদিন আছে, ততদিন তোর গায়ে একটা আঁচড়ও কেউ লাগাতে পারবে না। আমার এই ছোট্ট দুনিয়ায় তুই কেবল আমার রানি হয়ে থাকবি।"

মেঘ আবিরের বুকের ওম থেকে মুখ তুলে তার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু তখন রোদের আলোয় মুক্তোর মতো চকচক করছে। সে পরম আস্থায় আবিরের কাঁধে হাত রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "বাইরের দুনিয়া আমার দরকার নেই, আবির ভাই। আপনার এই চার দেয়ালের এই ছোট্ট পৃথিবীটাই আমার সব। যতদিন আপনি আমার সাথে আছেন, আমার কোনো ভয় নেই।"

ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার বেল বেজে উঠল। সকালের এই শান্ত সময়ে হঠাৎ দরজার শব্দে দুজনেই একটু নড়েচড়ে বসল। আবির মেঘকে আলতো করে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চেহারার সেই কোমল ভাবটা নিমিষেই আবার একটা শক্ত ও গম্ভীর আবরণে ঢাকা পড়ে গেল।

বাইরের দুনিয়া থেকে আসা যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য সে সবসময় প্রস্তুত থাকে।

আবির ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে মূল দরজাটা খুলে দিল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে কুরিয়ার সার্ভিসের এক ডেলিভারি ম্যান, হাতে একটা ছোট পার্সেল বক্স। আবির গম্ভীর মুখে পার্সেলটা রিসিভ করে সই করে দিল, তারপর দরজা বন্ধ করে ভেতরে ফিরে এল।

টেবিলে বক্সটা রেখে সে কাঁচি দিয়ে পার্সেলটা কাটল। ভেতরে দেখা গেল মেঘের বাবা-মায়ের পাঠানো একটা ছোট উপহার আর সাথে হাতে লেখা একটা ছোট চিঠি।

চিঠিটা দেখেই মেঘের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। এতদিন সে তার পিত্রালয়ের ছায়ায় ছিল, আজ সেখান থেকে আসা একটা ছোট চিঠিও তার কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি। সে দ্রুত হাতে চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল।

চিঠির প্রতিটা লাইনে বাবা-মায়ের বুকভাঙ্গা স্নেহ আর নতুন জীবনের জন্য আশীর্বাদ লুকিয়ে আছে। পড়তে পড়তে মেঘের গলাটা কেমন যেন ধরে এল। সে জন্মভূমি আর নিজের পুরোনো ঘর ছেড়ে এই অচেনা ফ্ল্যাটে এসে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু শেকড়ের টান তো সহজে মোছে না।

আবির দূর থেকে দাঁড়িয়ে মেঘের চোখের এই জল খুব নিপুণভাবে লক্ষ করল। মানুষটা মুখে কখনো সান্ত্বনার বড় বড় বুলি আওড়ায় না, কিন্তু তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সব টের পায়। সে এগিয়ে এসে মেঘের হাত থেকে চিঠিটা আলতো করে নিজের বড় হাতের তালুতে তুলে নিল, তারপর শান্ত গলায় বলল, "পিত্রালয়ের টান মানুষের রক্তে থাকে, মেঘ। সেটাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু তুই যে আজ আমার এই সংসারে এসেছিস, তা কি তোর কাছে কেবলই একটা আপস বলে মনে হয়?"

মেঘ দ্রুত মাথা নেড়ে ফেলে চোখের জল মুছে ফেলল। সে গলার স্বর কিছুটা ঠিক করে বলে উঠল, "না, আবির ভাই! আপস কেন হবে? আপনার এই ছোট্ট সংসারটাই আজ আমার সবচেয়ে বড় পৃথিবী। শুধু হঠাৎ মা-বাবার কথা মনে পড়ে গেলে মনটা একটু কেমন যেন করে।"

আবির আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে খুব শক্ত করে মেঘের কাঁধ দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় ধরল। তার চোখের সেই তীব্র, পাথরখোদাই করা চাউনি মেঘের সমস্ত বিষণ্নতা এক নিমেষে উড়িয়ে দিল। ঘরের ভেতরের এই নিস্তব্ধতায়, সকালের মিষ্টি রোদের আলোয় আবির কোনো রাখঢাক না রেখে একেবারে সোজাসাপ্টা ও চিরন্তন সুরে বলে উঠল:

➤"অতীতের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বর্তমানকে কষ্ট দেওয়ার মানুষ আমি নই, মেঘ। আমি শুধু এটুকুই জানি, তোর ওই এক ফোঁটা চোখের জলের দাম এই পুরো পৃথিবীর সমস্ত ধনসম্পদের চেয়েও অনেক বেশি। তোর মা-বাবা তোকে ভালোবেসে আমার হাতে সঁপে দিয়েছেন, আর সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করার জন্য আমার এই জীবনটাই যথেষ্ট। আজ এখানে দাঁড়িয়ে কোনো মিথ্যা সান্ত্বনা দেব না, কেবল একটা পাথরখোদাই করা সত্যি বলছি—যতদিন আমার এই বুকে স্পন্দন থাকবে, তোর চোখের কোণে আর কেউ কখনো জলের দাগ ফেলতে পারবে না। আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে, আমার স্পেরো।"

আবিরের এই কথাগুলোর মধ্যে যে কী পরিমাণ আত্মবিশ্বাস আর সুরক্ষার আশ্বাস ছিল, তা শুনলে যেকোনো মানুষের বুক ভরে যেত। মেঘ আর নিজের সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে সোজা গিয়ে নিজের পুরো সত্তা দিয়ে জড়িয়ে ধরল আবিরকে।

বাইরের রোদের উষ্ণতা ছাপিয়ে তাদের দুজনের ভেতরের এই ভালোবাসার উত্তাপ গোটা ঘরটাকে এক পরম শান্তিতে ভরিয়ে দিল।

জীবন যতই জটিল হোক, বাইরের পৃথিবী যতই নিষ্ঠুর হোক না কেন—এই চার দেয়ালের ভেতরে আবির আর মেঘের এই ছোট্ট পৃথিবীটা সম্পূর্ণ পবিত্রময়, অটুট এবং চিরন্তন হয়ে রইল।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন