ফন্ট সাইজ:
থিম:
মেঘাবির

পর্ব 4

লেখক: Jannatul Naima

মেঘাবির

লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা

পর্ব ৪

________

বাইরের নিয়ন আলোর ঝলকানি তখন স্তিমিত হয়ে এসেছে। ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা ছুঁই ছুঁই। শহরের এই ফ্ল্যাটটার ভেতরে এখন এক গাঢ় নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। দিনের বেলার সেই ব্যস্ততা, রান্নাঘরের কোলাহল কিংবা আবিরের অফিসের তাড়া—সবকিছু যেন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে।

কেবল শোবার ঘরের ছোট নাইট ল্যাম্পটার নরম হলুদ আলো খাটের একপাশে টিমটিম করে জ্বলছে। মেঘ অনেকক্ষণ ধরে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে, কিন্তু চোখের পাতা এক ফোঁটাও এক করতে পারছে না।

মাথার মধ্যে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ঘুরপাক খাচ্ছে। গত কয়েকদিনের নতুন পরিবেশ, চেনা মানুষদের থেকে দূরে থাকার একটা অদৃশ্য শূন্যতা আর মনে জমে থাকা এক বুক মনখারাপ আজ তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

খাটের অন্যপাশে আবির গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মানুষটা সারাদিন এত ধকল সামলে আসার পরেও ঘুমের মধ্যে কি এক অদ্ভুত শান্ত ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। তার চওড়া বুকটা প্রতি নিশ্বাসে ওঠানামা করছে।

আবিরের চেহারায় দিনের সেই কঠোর ভাবটা এখন নেই, বরং একটা ক্লান্ত অথচ দৃঢ় প্রশান্তি লেপ্টে আছে। মেঘ বালিশ থেকে মাথা একটু তুলে একদৃষ্টিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে রইল।

মানুষটাকে বাইরে থেকে যতটা পাথরের মতো কঠিন বা রূক্ষ্ম মনে হয়, ভেতরে তার এই শান্ত রূপটা দেখলে মেঘের বুকটা কেমন যেন মায়ায় ভরে ওঠে। কিন্তু এই মায়ার মাঝেই হঠাৎ তার বুকের ভেতর পিত্রালয়ের কথা মনে পড়ে একটা তীব্র কষ্ট মোচড় দিয়ে উঠল।

বিয়ের পর থেকে মা-বাবাকে ঠিকমতো দেখা হয়নি, মায়ের সেই চেনা হাতের স্পর্শ আর বাবার স্নেহের ডাক যেন কান্ন হয়ে ভেতর থেকে উঠে আসছে। মেঘ আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে বালিশে হারিয়ে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই তার পিঠের পেছনে একটা চেনা ভারী উপস্থিতি অনুভূত হলো। কোনো শব্দ না করে, খুব নিঃশব্দ পায়ে আবির কখন ঘুম ভেঙে উঠে বসেছে, মেঘ টেরই পায়নি।

আবিরের পরনে একটা ঢিলেঢালা নাইট টি-শার্ট আর ট্রাউজার, চুলগুলো কিছুটা অগোছালো। মানুষটার গায়ের সেই চেনা সুবাস আর পুরুষের উষ্ণ শরীরী উপস্থিতি বাতাসের সাথে মিশে মুহূর্তের মধ্যে চারপাশটা আচ্ছন্ন করে ফেলল।

আবির কোনো কথা বলল না। সে এক মুহূর্তের জন্যেও অপেক্ষা না করে তার দুই শক্তিশালী বাহু দিয়ে পেছন থেকে মেঘকে নিজের পুরো শরীরের সাথে জড়িয়ে ধরল।

আবিরের প্রশস্ত বুকটা মেঘের পিঠের সাথে এমনভাবে মিশে গেল যে মাঝখানে বাতাসেরও যাতায়াতের কোনো জায়গা রইল না। তার শক্ত অথচ মায়াবী আলিঙ্গনে মেঘের শরীরটা একবার কেঁপে উঠল।

আবির তার মুখটা মেঘের কানের কাছে নিয়ে এসে নিচু অথচ অত্যন্ত গভীর ও গম্ভীর গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল, "রাত বারোটা পার হয়ে গেছে, অথচ তোর বিছানায় থাকার কথা থাকলেও তুই এভাবে লুকিয়ে কাঁদছিস কেন, স্পেরো? আমার অগোচরে তোর মনের ভেতর কোন মেঘ জমেছে, যেটা আমাকে বলিসনি?"

আবিরের এই হঠাৎ স্পর্শ আর তার সেই চেনা গম্ভীর গলায় মেঘের বুকটা আরও বেশি কেঁপে উঠল। সে মাথা নিচু করে নিজের কান্নার আওয়াজ থামানোর চেষ্টা করল, কিন্তু আবিরের তীক্ষ্ণ নজর এড়ানো অসম্ভব।

আবির এক হাত দিয়ে মেঘের চিবুকটা ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনল, যাতে সে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাতে বাধ্য হয়। মেঘের ভেজা চোখ দুটো দেখতে পেলেই আবিরের চোখের সেই শান্ত ভাবটা নিমেষে উবে গিয়ে এক তীব্র উদ্বেগের রূপ নেয়।

আবির একটু ধমকের সুরে, কিন্তু ভেতরে এক গভীর টান রেখে বলল, "চোখে জল কেন তোর? পিত্রালয়ের কথা মনে পড়ে মন খারাপ হয়েছে তো? সেটা আমাকে বললেই তো পারতি! নিজের ভেতরের কষ্ট একা একা গিলে খাওয়ার অভ্যাস তোর কবে যাবে?"

মেঘ আর নিজের জমে থাকা অভিমান ও কান্নাগুলোকে আটকে রাখতে পারল না। সে একটু কেঁপে ওঠা গলায়, কিছুটা আভিমানিক সুরে বলে উঠল, "আপনাকে বললে কি করবেন? আপনি তো বলবেন ওসব দুর্বলতা। কিন্তু আমার মা-বাবাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে, আবির ভাই। ওদের ছেড়ে আসার পর থেকে মনটা কেমন যেন ফাঁকা লাগে।"

আবির তার দুই হাত দিয়ে মেঘের মুখটা আরও একটু শক্ত করে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। পুরুষ মানুষের এই অটল, পাহাড়সম দৃঢ়তার সামনে মেঘের সমস্ত ক্ষোভ ও বিষণ্নতা যেন বরফের মতো গলে জল হয়ে গেল।

এবার একদম সোজাসাপ্টা ও গম্ভীর গলায় বলে উঠল:

"নিজের মা-বাবার জন্য মন খারাপ হওয়া কোনো দুর্বলতা নয়, মেঘ। আর তাদের দেখতে চাওয়ার জন্য তোর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আগামী শুক্রবার সকালেই তোর পিত্রালয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা আমি করছি। তোকে তোর বাপের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসার দায়িত্ব আমার। আর শুধু তাই নয়, সেখান থেকে ফেরার পথে তোর মন ভালো করার জন্য পাহাড়ি কোনো সুন্দর জায়গায় কয়েকদিনের জন্য ঘুরতেও আমরা যাব। বাইরে লোকদেখানো রোমান্স করার ফুরসত আমার নেই, কিন্তু তোর মুখের ওই ম্লান হাসি ফিরিয়ে আনার জন্য আমার এইটুকু করা কর্তব্য। মন খারাপ করিস না,আমার স্প্যারো !"

আবিরের এই কথাগুলোর মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, কোনো লোকদেখানো মিষ্টি ভণিতা ছিল না—ছিল এক নিখাদ, অটুট ও নিঃশর্ত সমর্পণ। মেঘ আর নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারল না। সে দুই হাত দিয়ে আবিরের প্রশস্ত কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের মুখটা সজোড়ে গুঁজে দিল তার বুকে।

আবিরও তার দুই বাহুর শক্তি আরও বাড়িয়ে দিয়ে মেঘকে নিজের সত্তার ভেতরে লুকিয়ে ফেলল।

পর দিন সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকেই মেঘের মনটা অদ্ভুত এক আনন্দে হালকা হয়ে গেল।

আবির যেমন কথা দিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই শুক্রবার সকালে গাড়ি নিয়ে মেঘকে তার পিত্রালয়ে পৌঁছে দিল। মা-বাবাকে কাছে পেয়ে মেঘের চোখ যেমন আনন্দাশ্রুতে ভিজে উঠল, তেমনই আবিরের গম্ভীর উপস্থিতি সেই ঘরটাকে এক অন্য রকম নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলল।

মেঘের মা যখন পরম যত্নে জামাইকে আহার করালেন এবং বাবা যখন মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন, তখন আবিরের শক্ত চোয়ালেও এক প্রশান্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল।

পিত্রালয়ে কাটানো সেই সুন্দর মুহূর্তগুলো শেষ করে আবির ও মেঘ যখন পাহাড়ি কোনো এক নিরিবিলি ও সবুজ উপত্যকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল, তখন চারপাশের প্রকৃতি যেন তাদের স্বাগত জানাতে দুই হাত বাড়িয়ে দিল।

গাড়ির কাঁচ নামিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই মেঘের মুখে এসে লাগল ঠান্ডা পাহাড়ি হাওয়া। দূরে কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ের সারি, ঝরনার কুলকুল শব্দ আর পাইন বনের সোঁদা গন্ধ—সব মিলিয়ে চারপাশের পরিবেশটা রূপকথার মতো সুন্দর হয়ে উঠল।

তারা যখন পাহাড়ি খাদের ধারে একটা ছিমছাম রিসোর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে বয়ে চলা নদীটা দেখছিল, তখন আবির পেছন থেকে মেঘের কাঁধে একটা ভারী পশমি শাল জড়িয়ে দিল।

মেঘ চমকে ফিরে তাকাতেই আবির তার চিবুকটা খুব আলতো করে ছুঁয়ে গম্ভীর ও মায়াবী গলায় বলল, "পাহাড়ের এই ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগলে তোকে সামলানোর দায়িত্ব কার, ভুলে গেছিস নাকি?"

মেঘ চোখের কোণে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে আবিরের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সে মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলল, "আপনার এই ধমকের আড়ালে যে কী পরিমাণ ভালোবাসা লুকিয়ে আছে, তা আর কেউ না জানলেও আমি ঠিক জানি।"

আবির আর কোনো কথা বলল না। সে কেবল তার শক্ত বাহু দিয়ে মেঘকে নিজের আরও একটু কাছে টেনে নিল। পাহাড়ের সবুজ উপত্যকা আর মাথার ওপর নীল আকাশ সাক্ষী রইল তাদের এই শান্ত, গভীর ও চিরন্তন ভালোবাসার।

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 4 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন