মেঘাবির
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ৫
পাহাড়ি উপত্যকার সেই স্নিগ্ধ ও মনোরম পরিবেশে এসে পৌঁছানোর পর এভার রোড রিসোর্টের বিলাসবহুল কটেজটিতে তাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। কেবিন রুমটি থেকে বাইরে তাকালেই চোখে পড়ে সবুজ পাইন বন আর দূরের কুয়াশামাখা পাহাড়ের সারি।
লম্বা জার্নির ধকল কাটিয়ে রিসোর্টে পৌঁছানোর পর মেঘ কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। রুমের চমৎকার বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে সে বেশ কিছুক্ষণ গভীর বিশ্রাম নিল।
আবির নিজেও নিজের ল্যাপটপ বা অফিসের সমস্ত ঝামেলা দূরে সরিয়ে রেখে সেই নিরিবিলি দুপুরটায় মেঘের পাশে বসে তার কপালে হাত বুলিয়ে দিল, যাতে তার যাত্রার ক্লান্তি নিমিষে দূর হয়ে যায়।
বিশ্রাম শেষে সন্ধ্যার একটু আগে রিসোর্টের রেস্টুরেন্টে স্থানীয় পাহাড়ি খাবার আর ধোঁয়া ওঠা গরম কফির সুবাসে তাদের বিকেলটা কাটল। রাতের অন্ধকার যখন পাহাড়ি উপত্যকাকে গিলে ফেলল, তখন ঘড়ির কাঁটা দেখে আবির গম্ভীর গলায় বলল, "চল, রাতের সমুদ্রের আসল রূপ দেখতে যাবি বলেছিলি তো? আজ রাতেই যাওয়া যাক।"
পাহাড়ের কোল থেকে কিছুটা দূরে রাতের সমুদ্র সৈকতের উদ্দেশ্যে তাদের গাড়ি ছুটল। রাতের বেলা সমুদ্রের পাড়ে পৌঁছানোর পর চারপাশের পরিবেশটা ছিল একেবারে অন্যরকম।
গুমোট অন্ধকারের বুক চিরে আছড়ে পড়া ঢেউগুলোর ফেনার সাদা রূপ আর তাদের গর্জন রাতের আকাশটাকে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চে ভরিয়ে দিয়েছিল।
সৈকতের বালুচরে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা হাওয়ায় মেঘের চুলগুলো যখন উড়ছিল, তখন আবির পেছন থেকে এসে তার কাঁধে শক্ত করে হাত রাখল। রাতের সমুদ্রের এই মাতাল করা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে মেঘ যখন আবিরের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল, তখন আবির তার চিবুক ছুঁয়ে গম্ভীর সুরে ফিসফিস করে বলে উঠল:
"রাতের এই সমুদ্রের গর্জন যতই উত্তাল হোক না কেন, তোর এই শান্ত মুখটার চেয়ে সুন্দর কিছু আমার দেখার প্রয়োজন নেই!"
ভ্রমণের এই চার দিনে তারা প্রতিদিন একেকটি ভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা ঠিক করল, যাতে মেঘের মনের সব ক্লান্তি আর বিষণ্নতা চিরতরে মুছে যায়!
➤প্রথম দিন: 'হিমছড়ি পাহাড়ি ঝরনা ও ইকো পার্ক'
সকালের মিষ্টি রোদে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বয়ে চলা ঝরনার জলরাশি দেখতে দেখতে মেঘের মন একেবারে ভালো হয়ে গেল। ঝরনার ঠান্ডা জলে পা ভিজিয়ে ছবি তোলার সময় আবির একপাশে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের মতো তাকে আগলে রাখল।
কেউ যাতে ভিড়ের মধ্যে মেঘের গায়ে সামান্য ধাক্কাও না লাগে, সেদিকে তার তীক্ষ্ণ নজর ছিল। দুপুরের দিকে পাহাড়ি রেস্তোরাঁয় সুস্বাদু দুপুরের খাবার সেরে তারা বিকেলে চারপাশের সবুজ প্রকৃতি ঘুরে দেখল।
➤দ্বিতীয় দিন: 'ইনানী পাথুরে সৈকত'
পরের দিন তারা গেল ইনানী পাথুরে সৈকত দেখতে। সমুদ্রের নীল জলের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় কালো পাথরগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে ঢেউয়ের ছাঁট দেখার অনুভূতিটাই ছিল আলাদা।
পাথরের খাঁজে জমে থাকা জলে পা ডুবিয়ে হাঁটতে গিয়ে মেঘ যখন হঠাৎ পিছলে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো, ঠিক তখন আবিরের এক হাতের বজ্রমুঠো তাকে কোমর জড়িয়ে ধরে নিরাপদ দূরত্বে টেনে তুলল।
আবিরের সেই তীব্র চাউনিতে বকাঝকা থাকলেও চোখের গভীরে ছিল চরম অধিকারবোধ। আবির গম্ভীর গলায় ধমকের সুরে বলল, "পাথরে হাঁটার আক্কেলটুকুও তোর নেই, মেঘ? একটু সাবধানে চললে কি মাথার মুকুট পড়ে যেত?"
মেঘ তখন মুচকি হেসে আবিরের সেই রূক্ষ্ম হাতের তালু নিজের গালের সাথে মিশিয়ে বলেছিল, "আপনার এই ধমক ছাড়া আমার দিন চলে না, আবির।" রাতের বেলা ইনানীর সমুদ্র সৈকতের পাশে খোলা আকাশের নিচে ফায়ার ক্যাম্পের মাঝে তারা এক চমৎকার ডিনার সম্পন্ন করল।
➤তৃতীয় দিন: 'টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ রোড'
তৃতীয় দিনে তারা টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ রোড ধরে এক দুর্দান্ত লং ড্রাইভে বের হলো। একদিকে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ আর অন্যদিকে পাহাড়ের সবুজ দেওয়াল—এই দুইয়ের মাঝখান দিয়ে ছুটে চলা পিচঢালা পথ ধরে তাদের গাড়ি এগিয়ে চলল শেষ বিকেলের সোনালী রোদের আলোয়।
রাস্তার ধারের একটা খোলা পয়েন্টে গাড়ি থামিয়ে তারা সূর্যাস্ত দেখল। সমুদ্রের জলে লালচে সূর্যের ডুবে যাওয়ার সেই দৃশ্য মেঘের মনকে একেবারে শান্ত করে দিয়েছিল।
আবির তার পকেট থেকে কফি কাপ বাড়িয়ে দিয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "সারাদিনের এই ধকলের পরেও তোর হাসিমুখটা দেখলে আমার সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়, স্পেরো।"
চতুর্থ দিন: 'হিমছড়ি পাহাড়ের চূড়া ও সানসেট পয়েন্ট'
ভ্রমণের চতুর্থ ও শেষ ঘোরাঘুরির দিনে তারা হিমছড়ি পাহাড়ের একদম চূড়ায় অবস্থিত সানসেট পয়েন্টে উঠল। চারশ ফুট উঁচুতে দাঁড়িয়ে নিচের অবিরাম সমুদ্রের নীল জলরাশি আর দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ দেখার সেই বিশালতা মেঘের বুকটা ভরে দিল।
আবির শক্ত করে মেঘের হাত ধরে পাহাড়ের চূড়ার সংকীর্ণ পথ পার করিয়ে নিয়ে গেল। সূর্যাস্তের ঠিক আগ মুহূর্তে মেঘ যখন আবিরের কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়িয়েছিল, তখন আবির তার কপালে খুব আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে গম্ভীর গলায় ফিসফিস করে বলেছিল, "তোর জীবনের এই পাহাড়সমান উচ্চতা বা গভীর সমুদ্রের মতো যেকোনো বিপদে আমার এই হাত তোর ছাতা হয়ে থাকবে, মেঘ।"
চার দিনের এই চার ভিন্ন সুন্দর জায়গায় ঘুরে মেঘের মন একেবারে ফুরফুরে হয়ে উঠল। পাহাড়ি আবহাওয়া, সমুদ্রের গর্জন আর আবিরের এই নিরবচ্ছিন্ন ও কঠোর পাহাড়সম পাহারা—সব মিলিয়ে তাদের এই ট্রিপটি জীবনের অন্যতম সেরা একটা স্মৃতি হয়ে রইল।
রাতের বেলা রিসোর্টে ফিরে তারা ফ্রেশ হয়ে খেয়ে দেয়ে ঘুমাতে গেল!
ভ্রমণের সেই মধুর চার দিন এবং পঞ্চম রাতের আনন্দময় সমাপ্তির পর ষষ্ঠ ও শেষ সকালটা রিসোর্টের জানালায় এসে উঁকি দিল। আজ তাদের চিরচেনা সেই ছোট ফ্ল্যাটে ফিরে যাওয়ার কথা।
সকালের মিষ্টি সোনালী রোদ রিসোর্টের কাঠের কেবিনের ভেতরে এসে ছড়িয়ে পড়েছিল। মেঘ বিছানা গুছিয়ে ফেলার পর বারান্দার চেয়ারে বসে দূরের সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আনমনে চা খাচ্ছিল।
পাহাড়ি হাওয়া আর গত কটা দিনের একটানা ভালোবাসার আবহে তার মনটা ছিল এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরা। আবির রুমের ভেতরে ল্যাপটপ বা দরকারি কাগজপত্র সুটকেসে গুছিয়ে রাখছিল। মানুষটার চলাফেরায় একটা নিখাদ শৃঙ্খলা আর গাম্ভীর্য সবসময়ই বজায় থাকে।
নাস্তা সেরে যখন তারা রিসোর্টের চেক-আউট সম্পন্ন করল, তখন ঘড়ির কাঁটা দুপুর এগারোটা ছুঁই ছুঁই। ফেরার পথে শেষবারের মতো সমুদ্র সৈকতের পাশ দিয়ে যাওয়া মেরিন ড্রাইভ রোড ধরে তাদের গাড়ি এগোতে লাগল।
দুই পাশের সবুজ পাহাড় আর ডান পাশের নীল সমুদ্রের জলরাশি মিলে এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করেছিল। মেঘ গাড়ির কাঁচ নামিয়ে বাইরে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখছিল।
আবির এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে গাড়ি ড্রাইভ করছিল, কিন্তু তার তীক্ষ্ণ নজর বরাবরই মেঘের চেহারার প্রতিটা ভাবের দিকে নিবদ্ধ ছিল।
মানুষটার এই নীরব পাহারাদারি মেঘের বুকটাকে এক অনাবিল নিরাপত্তায় ভরিয়ে রাখছিল।
গাড়িটা চলতে চলতে হঠাৎ করে সৈকতের এমন একটা ফাঁকা ও নির্জন পয়েন্টে এসে পৌঁছাল, যেখানে দুপুরের এই সময়ে আশেপাশের লোকজনের দেখা মেলা ভার।
রাস্তার পাশে একটা ছোট ক্যাফেতে কিছু দরকারি খাবার ও পানি নেওয়ার জন্য আবির গাড়িটা একপাশে থামাল। ইঞ্জিন বন্ধ করে সে মেঘের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "গাড়ির ভেতরে বসেই একটু অপেক্ষা কর, আমি ১০ মিনিটের মধ্যে আসছি। বাইরে কড়া রোদ, দরজা লক করা আছে।" মেঘ মুচকি হেসে ঘাড় নাড়ল। আবির ক্যাফের দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই রাস্তার বিপরীত দিক থেকে একটা কালো রঙের ভারী মাইক্রোবাস এসে হুট করে তাদের গাড়ির ঠিক সামনে ব্রেক কষে থামল। মেঘ প্রথমে বিষয়টাতে খুব একটা পাত্তা দেয়নি, ভেবেছিল হয়তো অন্য কোনো ট্যুরিস্টদের গাড়ি।
কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই মাইক্রোবাসের দরজা সশব্দে খুলে গেল এবং ভেতর থেকে তিনজন বখাটে ও রূক্ষ্ম চেহারার লোক নেমে এল। তাদের চোখেমুখে একটা হিংস্র ও লোলুপ দৃষ্টি পরিষ্কার ফুটে উঠছে।
লোকগুলোর মধ্যে একজন সামনের সিটের কাঁচের দিকে তাকিয়ে মেঘকে দেখতে পেল। তার নোংরা ও লোভাতুর চোখ দুটো মেঘের ওপর পড়ার সাথে সাথেই সে তার পাশে দাঁড়ানো লোকটার কাঁধে কনুই দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,
"এই দোস্ত, একটু ভালো করে চেয়ে দেখ! মালটা তো মারাত্মক সুন্দর রে! শহরের কোনো বড়লোকের রানি হবে মনে হয়। একা একা গাড়িতে বসে আছে। আজ যদি একে হাত করতে পারি, তবে ট্রিপ পুরো জমে ক্ষীর হয়ে যাবে!"
আরেকজন বিকট হেসে উঠে নোংরা ভাষায় বলল, "ঠিক বলেছিস! এমন মালাই জিনিস হাতের কাছে একা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। চল, আর দেরি না করে ওকে গাড়ি থেকে তুলে সোজা আমাদের গোপন আড্ডায় নিয়ে যাই। এই ফাঁকা জায়গায় কেউ বাঁচাতে আসবে না!"
কথাগুলো শোনার সাথে সাথেই মেঘের বুকের রক্ত জমে গেল। তার সমস্ত শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। সে গাড়ির ডোর লক করা আছে কি না তা দেখার আগেই সামনের লোকটা গাড়ির হ্যান্ডেলে হ্যাঁচকা টান মারল।
লক করা থাকায় দরজা খুলল না, কিন্তু লোকটা বিকট শব্দে কাচে ধাক্কা দিয়ে মেঘকে উদ্দেশ্য করে কুৎসিত ভাষায় ইশারা করতে লাগল। মেঘ ভয়ে পেছনের সিটের কোণে কুঁকড়ে গেল, তার মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। বুক ফেটে কেবল আবিরের নামটা বেরিয়ে আসতে চাইল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্যাফে থেকে জিনিসপত্র হাতে নিয়ে ফিরে আসার সময় আবিরের চোখ গিয়ে পড়ল গাড়িটার ওপর। মুহূর্তের মধ্যে তার শান্ত চোখ দুটো হিংস্র বাঘের মতো জ্বলে উঠল।তার হাতের সমস্ত জিনিস রাস্তায় ছিটকে পড়ে গেল,আর সে নরপিশাচগুলোর দিকে লক্ষ্য করে দ্রুত ছুটে আসার চেষ্টা করল!
চলবে.....