মেঘাবির
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ৬
______
আবিরের হাতের পানির বোতল আর স্ন্যাক্সের প্যাকেটগুলো তখন ব্যস্ত রাস্তার ধূলোবালিতে ছিটকে পড়ে গেছে। কিন্তু সেদিকে তাকানোর ফুরসত তার ছিল না। ক্যাফের সামনে থেকে গাড়ির দিকে ছুটে আসার ঠিক আগ মুহূর্তেই দ্বিতীয় কালো রঙের মাইক্রোবাসটা তীব্র বেগে এসে তাদের গাড়িকে ঘিরে ফেলল।
মুহূর্তের মধ্যে আগের মাইক্রোবাস থেকে নেমে আসা দুজন বখাটে জোর করে মেঘের গাড়ির দরজা খুলে ফেলল।
মেঘ চিৎকার করে আবিরের নাম ধরে ডাকতেই তাদের একজন মুখ চেপে ধরে জোরপূর্বক তাকে টেনে হিঁচড়ে ওই ভারী মাইক্রোবাসের ভেতরে তুলে নিল।
আবির বিদ্যুৎগতিতে ছুটে এসে মাইক্রোবাসটার দরজায় ঝাপিয়ে পড়ল এবং ভেতর থেকে একজনকে টেনে নামিয়ে প্রচন্দ ক্ষিপ্রতায় মারধর শুরু করল। কিন্তু ততক্ষণে ড্রাইভার সিটে বসা লোকটা এক্সিলারেটর দাবিয়ে গাড়িটা সোজা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
আবির মাটিতে লুটিয়ে পড়া লোকটাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রাণপণে গাড়িটার পেছনে ছুটল। সে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিলচিৎকার করে মেঘকে বাঁচানোর জন্য আক্রোশে ফেটে পড়ল, কিন্তু চোখের পলকে গাড়িটা মেরিন ড্রাইভ রোডের বাঁক নিয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেল।
সেই মুহূর্ত থেকে শুরু হলো আবিরের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর, উন্মাদ তিনটে দিন।
পুলিশের ওপর ভরসা না করে আবির নিজের সমস্ত নেটওয়ার্ক, আন্ডারওয়ার্ল্ডের পরিচিত যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত লোকবল কাজে লাগিয়ে কক্সবাজার ও তার আশেপাশের সমস্ত পাহাড়ি ও গোপন আড্ডাগুলোতে তল্লাশি শুরু করল।
মানুষটা গত তিন দিন ধরে একটানা নাওয়া-খাওয়া ভুলে গেছে। তার চোখ দুটো লাল, পরিপাটি চুলগুলো উসকোখুসকো, আর গায়ে জড়ানো সেই জ্যাকেটটা ধুলোবালি ও ঘামে মলিন।
সে নিজেই একেকটা সন্দেহজনক আড্ডায় গিয়ে বখাটেদের ওপর চড়াও হচ্ছিল, তছনছ করে দিচ্ছিল তাদের গোপন ডাঁহা।
শহরের সেই ঠান্ডা মাথার, শৃঙ্খলিত ব্যবসায়ী আবির সেদিন আক্ষরিক অর্থেই একটা উন্মাদ বাঘের রূপ ধারণ করেছিল—যার একমাত্র লক্ষ্য তার ছিনিয়ে নেওয়া স্ত্রীকে যেকোনো মূল্যে উদ্ধার করা।
এদিকে শহরের অদূরে একটা পুরোনো, পরিত্যক্ত ফিশারি গোডাউনের অন্ধকার কুঠুরিতে মেঘকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আটকে রাখা হয়েছিল।
গোডাউনের বাতাসটা স্যাঁতসেঁতে এবং চারপাশটা মাছের আঁশ ও পচা গন্ধে ভারী। মেঘের চোখ দুটো দিয়ে অবিরাম জল গড়িয়ে পড়ছে।
গত তিন দিন ধরে ওই বখাটেদের নোংরা চাহনি আর হুমকি শুনতে শুনতে সে মানসিক ও শারীরিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। প্রতিটা সেকেন্ড তার কাছে একটা শতাব্দীর মতো কাটছে।
সে শুধু ফিসফিস করে কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে, আর মনে মনে আবিরের নাম জপছে—"আবির ভাই, আপনি কোথায়? আমাকে বাঁচান!" সে বিশ্বাস করে, পৃথিবীর সমস্ত শক্তি এক হয়ে গেলেও আবির তাকে ঠিক খুঁজে বের করবে।
অবশেষে তৃতীয় দিনের গভীর রাতে আবিরের বিশ্বস্ত এক সূত্রে খবর এল—টেকনাফের এক নির্জন পাহাড়ি গোডাউনে মেঘকে আটকে রাখা হয়েছে।
খবর পাওয়া মাত্রই আবির আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। সে নিজেই নিজের গাড়িতে চেপে অন্ধকারের বুক চিরে সেই গোডাউনের দিকে ঝড়ের বেগে ছুটে চলল। তার বুকটা তখন উত্তাল সমুদ্রের চেয়েও বেশি তোলপাড় করছে।
তৃতীয় রাতের সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে টেকনাফের পাহাড়ি পাদদেশের পরিত্যক্ত ফিশারি গোডাউনটা একটা ভুতুড়ে বাড়ির মতো দাঁড়িয়ে ছিল। সমুদ্রের গর্জন আর দূরের ঝিঁঝি পোকার ডাক ছাপিয়ে গোডাউনের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে বখাটেদের বিকট হাসির আওয়াজ ভেসে আসছিল।
আবিরের গাড়িটা যখন গোডাউনের ঠিক বিশ গজ দূরে হেডলাইট নিভিয়ে সাইলেন্ট করে ব্রেক কষল, তখন ঘড়ির কাঁটা রাত দুটো ছুঁই ছুঁই।
গাড়ির দরজা ঠেলে যখন আবির বাইরে বেরিয়ে এল, তখন তার চেহারায় কোনো মানুষের ছায়া মাত্র ছিল না—সে ছিল সাক্ষাৎ এক ধ্বংসদূত।
গত তিন দিনের একটানা নাওয়া-খাওয়া ছাড়া উন্মাদ ছোটাছুটি তার পুরো শরীরে এক অদ্ভুত নিষ্ঠুর শক্তি যুগিয়েছিল। চোখে তার রক্তের দাগ, পরনের শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো, আর দুই হাতের মুঠো এমনভাবে শক্ত করা ছিল যে যেকোনো মুহূর্তে হাড়গোড় গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
গোডাউনের মূল লোহার দরজাটা ভেতর থেকে অর্গলবদ্ধ ছিল। আবির বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে তার সর্বশক্তি দিয়ে দরজায় একটা হিংস্র লাথি বসল।
বিকট শব্দে লোহার পুরোনো অর্গলটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এবং দরজাটা সশব্দে খুলে ভেতরে আছড়ে পড়ল।
হঠাৎ এমন অতর্কিত হামলায় গোডাউনের ভেতরে থাকা সেই বখাটেদের আড্ডাটা কেঁপে উঠল। নোংরা টেবিলে বসে মদ খাচ্ছিল যে তিনজন লোক, তারা চমকে দাঁড়িয়ে গেল।
তাদের মধ্যে মূল পান্ডা, যার মুখে একটা কুৎসিত কাটা দাগ ছিল, সে হাতে একটা ধারালো চাকু নিয়ে রাগে গর্জাতে গর্জাতে সামনে এগিয়ে এসে চিৎকার করে উঠল, "কে রে হারজাদা! এত বড় সাহস তোর, আমার আড্ডায় সোজা ঢুকে পড়লি?"
কিন্তু সে কথা শেষ করার সুযোগ পেল না। আবির একটা ঝড়ের বেগে তার ওপর গিয়ে পড়ল। কোনো কথা নয়, কোনো তর্জন-গর্জন নয়—সোজা একটা পাথরসম কিল গিয়ে বসল ওই পান্ডার নাকের ওপর।
হাড় ভেঙে যাওয়ার মচমচে আওয়াজে গোডাউনটা কেঁপে উঠল, আর লোকটা ছিটকে গিয়ে পেছনের লোহার ড্রামে সজোরে ধাক্কা খেল।
বাকি দুজন লোক যখন বুঝল যে এই উন্মাদ মানুষটা আর কেউ নয়, বরং সেই মেয়েটার স্বামী—যাকে তারা তুলে এনেছিল—তখন তাদের প্যান্টে প্রস্রাব হওয়ার উপক্রম হলো।
একজন পকেট থেকে রিভলভার বের করার চেষ্টা করতেই আবির তার হাতটা বাজপাখির মতো চেপে ধরে এমন এক মোচড় দিল যে রিভলভারটা হাত থেকে ছিটকে দূরে পড়ে গেল।
এরপর আবিরের সেই নির্মম প্রহারের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা কারোরই রইল না। এক মিনিটের মধ্যে গোডাউনের মেঝেতে তিনটে পিশাচ গোঙাতে গোঙাতে লুটিয়ে পড়ল।
সবাইকে নিস্তেজ করে ফেলে আবির ছুটে গেল গোডাউনের অন্ধকারের দিকে, যেখানে একটা ভাঙা কাঠের পিলারের সাথে মেঘকে শক্ত করে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল!
গোডাউনের ওই স্যাঁতসেঁতে কোণায় মেঘের অবস্থা তখন শোচনীয়। গত তিন দিন ধরে একটা ফোঁটা পানি বা খাবার তার পেটে যায়নি।
চোখের জলের নোনতা দাগে তার গাল দুটো শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে, আর ঠোঁটগুলো ভয়ে ও ক্লান্তিতে ফ্যাকাশে।
চোখের সামনে আবিরকে দেখতে পেয়ে মেঘের আচ্ছন্ন চেতনা যেন হঠাৎ ফিরে এল। সে দুর্বল গলায় ফুঁপিয়ে উঠল, "আবির ভাই... আপনি... আপনি সত্যিই এসেছেন?"
আবির এক দৌড়ে গিয়ে নিজের হাত দিয়ে সেই শক্ত দড়িগুলো ছিঁড়ে ফেলল। দড়ি খোলার সাথে সাথেই মেঘ আর নিজেকে সামলাতে পারল না—সে সোজা গিয়ে হুড়মুড় করে আছড়ে পড়ল আবিরের প্রশস্ত বুকের ওপর।
তার সর্বশরীর তখন কাঁপছে। সে দুই হাত দিয়ে আবিরের শার্টের কলার খামচে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল, যেন গত তিন দিনের সমস্ত জমে থাকা ভয়, যন্ত্রণা আর আর্তনাদ একসঙ্গে উপচে পড়ছে।
আবির তার দুই শক্তিশালী বাহু দিয়ে মেঘকে নিজের সত্তার ভেতরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। মানুষের ওই বিশাল দেহের মাঝে মেঘ তখন একটা ছোট্ট পাখির মতো আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে।
আবিরের বুকটাও তখন অদ্ভুত এক কাঁপুনিতে কাঁপছে। সে জীবনে এই প্রথমবার নিজের ভেতরের সমস্ত শক্ত বাঁধ ভেঙে মেঘের মাথার চুলে মুখ গুজে গভীর কান্নায় ভেঙে পড়তে চাইল, কিন্তু পরমুহূর্তেই তার চোখ দুটো আবার এক ভয়ংকর পাথুরে রূপ ধারণ করল।
সে মেঘকে খুব সাবধানে নিজের কোলে তুলে নিল, কারণ দীর্ঘ তিন দিন হাত-পা বাঁধা থাকায় মেঘের হাঁটার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট ছিল না। গোডাউনের বাইরে এসে নিজের গাড়ির পেছনের সিটে মেঘকে শুইয়ে দিয়ে আবির একটা জলের বোতল বের করে নিজ হাতে তার মুখে পানি ঢেলে দিল।
মেঘ অল্প একটু পানি খেয়ে আবিরের হাতের তালুটা নিজের গালে চেপে ধরে কাঁপাকাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল, "আমাকে আর কখনও একা ছাড়বেন না তো, আবির ভাই?"
আবির গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে মেঘের দিকে একবার তাকাল। তার চোখের সেই চাউনিতে কোনো সান্ত্বনার বুলির চেয়ে অনেক বেশি ছিল এক অবিচল ও চিরন্তন সত্যের ঘোষণা।
গোডাউনের ওই অন্ধকার নরক থেকে মেঘকে কোলে করে বের করে এনে আবির যখন গাড়িটা রাতের ফাঁকা হাইওয়ের দিকে ছোটাল, তখন বাইরের অন্ধকার কেটে গিয়ে পূর্ব আকাশে ধীরে ধীরে একটা নতুন ভোরের আলোর রেখা ফুটতে শুরু করেছিল।
চলবে...