মেঘাবির
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ৭
______
টেকনাফের সেই বিভীষিকাময় রাতের আতঙ্ক কাটিয়ে ওঠার পর প্রায় দুই সপ্তাহ কেটে গেছে। আবিরের ফ্ল্যাট এখন আগের চেয়েও বেশি সুরক্ষিত।
বাইরের কোনো মানুষের প্রবেশ তো দূরের কথা, ফ্ল্যাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা একদম কড়া করে দেওয়া হয়েছে। আবির তার ব্যবসার সমস্ত মিটিং এখন বাসা থেকেই পরিচালনা করছে, যাতে মেঘকে এক মুহূর্তের জন্যও একা থাকতে না হয়।
মেঘের সামান্যতম কাশির শব্দেও আবিরের চোখ কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে সরে সোজা মেঘের ওপর গিয়ে পড়ে।
কিন্তু এত পজেসিভ প্রটেকশন আর ভালোবাসার পরেও মেঘের ভেতর একটা পরিবর্তন আসতে শুরু করল।
গোডাউনের সেই অন্ধকার কুঠুরিতে কাটানো দিনগুলোর কথা মেঘের অবচেতন মন থেকে কিছুতেই মুছছিল না। সে বারবার একা একা ভাবত, তার নিজের কারণে আবিরের মতো মানুষটাকে আজ এই চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
আবির তো বরাবরই নিজের জীবনে একটা শৃঙ্খলিত ও নিরাপদ গণ্ডির মধ্যে থাকতে ভালোবাসত, কিন্তু মেঘ আসার পর থেকেই যেন তার জীবনে একের পর এক ঝড় নেমে আসছে।
এই অপরাধবোধ আস্তে আস্তে মেঘের মনে একটা অদ্ভুত দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করল।
সেদিন বিকেলে মেঘ বারান্দার এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে বাইরের ছায়া দেখছিল। আবির ল্যাপটপ বন্ধ করে ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে এসে পেছন থেকে নিঃশব্দে তার কাঁধে হাত রাখল।
কিন্তু ছোঁয়া লাগতেই মেঘ কেমন যেন চমকে উঠল এবং একটু আড়ালে সরে গিয়ে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
আবিরের শান্ত ও তীক্ষ্ণ চোখ দুটো এক সেকেন্ডের জন্য কুঁচকে গেল। সে মেঘের এই অস্বাভাবিক দূরত্ব নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করল। মানুষটা মুখে সহজে কিছু প্রকাশ করে না, কিন্তু তার ভেতরের হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত নিখুঁত।
আবির গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল, "কয়েক দিন ধরে লক্ষ্য করছি, তুই আমার কাছ থেকে কেমন যেন দূরে দূরে থাকছিস, মেঘ। সমস্যা কোথায়? আমার কোনো কথা বা আচরণে কষ্ট পেয়েছিস?"
মেঘ মাথা নিচু করে রইল, তার গলার ভেতর আটকে গেল কথাগুলো। সে ফিসফিস করে বলল, "না... তেমন কিছু না, আবির ভাই। শুধু মনে হয়, আমার কারণে আপনার জীবনটা কেমন যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। আমি না থাকলে হয়তো আপনার জীবনে কোনো বিপদই আসত না।"
কথাটা শোনার সাথে সাথেই আবিরের চেহারার সমস্ত কোমলতা এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। তার চোখের সেই শান্ত দৃষ্টি মুহূর্তে এক ভয়ংকর ও তীব্র অধিকারবোধে রূপ নিল। সে এক পা এগিয়ে এসে মেঘের হাত দুটো নিজের বড় হাতের মুঠোয় এমন শক্ত করে চেপে ধরল যে মেঘ সামান্য ব্যথা পেল।
আবির তার চিবুকটা উঁচুতে তুলে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে ভারী গলায় বলে উঠল:
➤"এই ফালতু চিন্তা তোর মাথা থেকে কবে দূর হবে, মেঘ? আমার জীবনটা কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেটা আমি ঠিক করি, কোনো পরিস্থিতি বা বিপদ নয়। তুই আমার জীবনের অংশ হয়েছিস মানে এই নয় যে তুই আমার বোঝা। আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার বোকামি করার চেষ্টা করবি না কখনো। আমার এই রূক্ষ্ম দুনিয়ায় তুই ছাড়া আমার শান্তি নেই।"
আবিরের সেই জোরালো কথা আর চোখে থাকা অন্ধ ভালোবাসার তীব্রতা মেঘের ভেতরের সমস্ত জমিয়ে রাখা মেঘগুলোকে এক নিমিষে উড়িয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটার কাছে থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টা করা মানে নিজের নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেওয়া।
মেঘ আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে সোজা গিয়ে নিজের মুখটা গুঁজে দিল আবিরের শক্ত বুকের ভেতরে। আবিরও তার দুই বাহুর পত্যন্ত শক্ত বেড়াজালে তাকে এমনভাবে আটকে ফেলল, যেন পৃথিবীর কোনো শক্তি আর তাদের মাঝে অদৃশ্য দেওয়াল তুলতে না পারে।
কিন্তু তাদের এই নিখাদ মিলনের ঠিক বাইরে, শহরের অন্যপ্রান্তে বসে কেউ যেন ডালপালা মেলছিল অন্য এক গভীর ষড়যন্ত্রের জাল।
শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে, ধানমণ্ডির এক অভিজাত অ্যাপার্টমেন্টের ড্রয়িংরুমটা তখন মৃদু আলোয় অন্ধকারাচ্ছন্ন। দামি সোফায় পা তুলে বসে থাকা মানুষটার নাম হামিমুর চৌধুরী। দেখতে বেশভুষায় মার্জিত ও অভিজাত হলেও তার চোখের চাউনিতে সবসময়ই এক কুটিল ও লোভী দৃষ্টি লুকিয়ে থাকে।
হামিমুর একসময় আবিরের ব্যবসায়িক কোম্পানির অন্যতম শীর্ষ অংশীদার ছিল, কিন্তু কোম্পানির ভেতরের একটা বড় আর্থিক দুর্নীতি ধরা পড়ার পর আবির নিজের হাতে তাকে অত্যন্ত কঠোরভাবে বের করে দিয়েছিল। সেই অপমানের গ্লানি এবং ক্ষোভ তার বুকের ভেতর আগুন হয়ে জ্বলছিল।
সে জানতো, আবিরকে সরাসরি ঘায়েল করা অসম্ভব; কারণ মানুষটার ফৌজি শৃঙ্খলার মতো জীবন এবং অটুট ইমেজে ফাটল ধরানো যায় না। তাই সে অনেকদিন ধরে আবিরের দুর্বলতার সুযোগ খুঁজছিল।
টেকনাফের সেই বখাটেদের দিয়ে মেঘকে অপহরণ করানোর মূল মাস্টারমাইন্ড ছিল এই হামিমুর নিজে। সে চেয়েছিল মেঘকে জিম্মি করে আবিরকে মানসিকভাবে ভেঙে দিতে এবং তার সেই তথাকথিত অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিতে।
কিন্তু আবিরের সেই উন্মাদ ও অপ্রতিরোধ্য রূপ দেখে তার প্রথম পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। তবে হামিমুর এত সহজে হার মানার পাত্র ছিল না। সে বুঝতে পেরেছিল, সরাসরি শারীরিক আঘাত বা অপহরণের চেয়েও বেশি মারাত্মক হতে পারে যদি সে আবির ও মেঘের বিশ্বাসের ভিতটাই নড়ে দেয়।
পরের দিন সকালে হামিমুরের এক বিশ্বস্ত এপ্রোচ মেঘের মোবাইলে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে কিছু ছবি ও ফাইল ফরোয়ার্ড করে দেয়। মেঘ তখন রান্নাঘরে কফি তৈরি করছিল।
মোবাইলের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠতেই তার নজর গেল সেই মেসেজটার ওপর। কৌতূহলবশত সে ফাইলগুলো ওপেন করল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ছবিগুলো দেখে মেঘের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল।
ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে, আবির বিগত কদিন ধরে শহরের এক নামকরা ক্যাফেতে এক রহস্যময় তরুণীর সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে বসে বিভিন্ন কাগজপত্রে স্বাক্ষর করছে।
শুধু তাই নয়, আরেকটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে আবির হাসিমুখে ওই মেয়েটির হাতে একটা গিফটের প্যাকেট তুলে দিচ্ছে। ছবিগুলোর নিচে একটা টাইপ করা নোটে লেখা ছিল:
➤"যাকে আপনি আপনার জীবনের একমাত্র রক্ষাকবচ ভেবে বসে আছেন, মেঘ ম্যাডাম, সে কি আসলেই আপনার প্রতি সৎ? নাকি টেকনাফের ওই নারকীয় ঘটনার আড়ালে অন্য কোনো বড় গেম চলছে? একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন, আপনার এই তথাকথিত পজেসিভ মানুষটির আসল রূপ কী!"
মেঘের হাত থেকে কফি কাপটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হলো। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। টেকনাফের সেই বিভীষিকাময় ট্রমা তখনও তার মন থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি, ঠিক তার ওপর এই নতুন মানসিক ধাক্কা তার ভেতরের সমস্ত বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিল।
সে কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি যে আবির তার আড়ালে অন্য কারোর সাথে এত সহজ হতে পারে। তার মনে অজান্তেই সেই পুরোনো অপরাধবোধ ও সন্দেহ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল—তবে কি আবিরের কাছে সে কেবল একটা দায়িত্ব ছাড়া আর কিছু নয়? তবে কি গত কটা দিনের এই অতিরিক্ত যত্ন ও পাহারা কেবল লোকদেখানো অনুকম্পা?
বিকেল বেলা আবির যখন অফিসিয়াল কিছু পেপার্স চেক করতে ড্রয়িংরুমে বসল, তখন সে লক্ষ্য করল মেঘ সারাদিন কেমন যেন পাথর হয়ে বসে আছে।
তার চোখের কোণে জমে থাকা জল আর ফ্যাকাশে মুখখানা আবিরের তীক্ষ্ণ নজর এড়াল না। আবির নিজের ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে রেখে গম্ভীর পায়ে মেঘের সামনে এসে দাঁড়াল। সে হাঁটু গেড়ে মেঘের ঠিক মুখোমুখি বসল এবং নিজের শক্ত হাত দিয়ে মেঘের ঠান্ডা আঙুলগুলো ধরতে গেল।
কিন্তু মেঘ চকিতে নিজের হাতটা পেছিয়ে নিল। তার চোখে তখন এক অজানা অভিমান আর আস্থার সংকট স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
আবিরের ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল। তার সেই শান্ত অথচ পাথরখোদাই করা গলায় এক গভীর গম্ভীর স্বর বেজে উঠল, "সারাদিন ধরে তোর এই অদ্ভুত নীরবতা কীসের লক্ষণ, মেঘ? এমনভাবে আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আছিস কেন, যেন আমি তোর কোনো বড় অপরাধ করে ফেলেছি?"
মেঘ আর নিজের ভেতরের কান্না ও জমে থাকা ক্ষোভ আটকে রাখতে পারল না। সে কাঁপাকাঁপা গলায় ফোনটা আবিরের চোখের সামনে ধরে অভিশপ্ত সেই ছবিগুলো দেখিয়ে বলল, "এই ছবিগুলোর উত্তর কি দেবেন, আবির ভাই? কে এই মেয়েটা? আর কেন আপনার এই গোপন যোগাযোগের কথা আমাকে কোনোদিন বলেননি? আমি কি আপনাদের এই হিসাবি দুনিয়ায় কেবল একজন অবহেলার পাত্রী?"
আবিরের চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য ওই ছবিগুলোর ওপর পড়ল। স্ক্রিনে দেখা যাওয়া ছবিগুলো এবং তার পেছনে লুকিয়ে থাকা কুচক্রী হামিমুরের চক্রান্ত বুঝতে আবিরের এক সেকেন্ডও লাগল না।
কিন্তু মেঘের চোখে জমে থাকা সেই অবিশ্বাস ও সন্দেহের দৃষ্টি আবিরের বুকটাকে এমন এক চরম যন্ত্রণায় কুঁকড়ে দিল, যা টেকনাফের কোনো আঘাতের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল।
আবির উঠে দাঁড়াল। তার দীর্ঘ দেহাবয়বটা তখন রাগ আর অপমানে শক্ত হয়ে গেছে। সে কোনো উচ্চবাচ্য করল না, কেবল তার চোয়ালের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল। সে এক হাত বাড়িয়ে মেঘের চিবুকটা খুব শক্ত করে নিজের দিকে উঁচুতে তুলে ধরল, যাতে মেঘ তার জ্বলন্ত চোখের গভীরে তাকাতে বাধ্য হয়।
অত্যন্ত গম্ভীর, ভারী এবং হিমশীতল গলায় আবির ফিসফিস করে বলে উঠল:
➤"তোর এই ছোট্ট মনে আমার প্রতি এতটুকু সন্দেহ কি সত্যিই জায়গা পেল, মেঘ? অন্যের দেখানো একটা মিথ্যে প্রোপাগান্ডা দেখে তুই তোর নিজের চোখ বন্ধ করে ফেললি? আমার জীবনে তুই ছাড়া কার জায়গা আছে বা থাকতে পারে, সেই হিসাব নেওয়ার অধিকার কেবল তোরই আছে, অন্য কারোর নয়। কিন্তু মনে রাখিস, আমার বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে তোর নিজের এই বিশ্বাসের ভিতটাকে শক্ত করা উচিত ছিল। আজ তুই যে ভুলটা করলি, তার জবাব আমি নেব—তবে তার আগে এই ষড়যন্ত্রের পেছনের আসল কুকুরটাকে আমি খুঁজে বের করব।"
আবিরের সেই বজ্রকঠিন কথাগুলো শোনার পর মেঘের বুকটা কেঁপে উঠল। সে বুঝতে পারল, সে একটা বিরাট ভুল করে ফেলেছে। কিন্তু ততক্ষণে আবির ফ্ল্যাটের দরজা সশব্দে বন্ধ করে বেরিয়ে গেছে।
শহরের অন্ধকার রাস্তায় তখন মেঘের জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড় বইতে শুরু করেছে, আর আবির বেরিয়ে পড়েছে সেই অদৃশ্য শত্রুটার টিকি ছুঁতে।
চলবে...