❤️ শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
✍️ লেখক: Mafiya Queen 👑
প্রথম পর্ব: অচেনা শহরে প্রথম দেখা
কিছু মানুষ জীবনে আসে গল্প হয়ে, আর কিছু মানুষ এসে পুরো জীবনটাই বদলে দেয়। কিন্তু এমন কিছু ভালোবাসা থাকে, যাদের পাওয়া না গেলেও হৃদয় থেকে কখনো মুছে ফেলা যায় না।
ঢাকা শহর।
সকাল আটটা।
শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো তখন মানুষের পদচারণায় মুখর। কেউ অফিসের উদ্দেশ্যে ছুটছে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ জীবিকার তাগিদে বেরিয়ে পড়েছে অজানা ব্যস্ততার পথে।
এই ব্যস্ত শহরেরই একটি ছোট্ট বাসায় থাকে নীরা।
পুরো নাম নীরা রহমান।
বয়স চব্বিশ। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই মেয়েটি একটু অন্য রকম। খুব বেশি কথা বলে না, সহজে কাউকে বিশ্বাস করে না। তবে তার মনটা ভীষণ নরম। অন্যের কষ্ট দেখলে নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে।
নীরার পরিবারে আছে তার মা, বাবা আর ছোট ভাই নিলয়।
বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। মা সংসার সামলান। ছোট ভাই কলেজে পড়ে।
পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তাই নিজের পড়াশোনা শেষ করার পাশাপাশি নীরা একটি চাকরি খুঁজছে।
আজ তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।
একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাবে সে।
সকাল থেকেই ঘরের মধ্যে ব্যস্ততা।
— মা, আমার সাদা শার্টটা কোথায় রেখেছ?
রান্নাঘর থেকে নীরার মা উত্তর দিলেন,
— আলমারির দ্বিতীয় তাকে রেখেছি। কাল রাতে তোকে বলেছিলাম, ভালো করে গুছিয়ে রাখতে।
— পেয়েছি মা!
নীরা শার্টটি হাতে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
সাধারণ সাজ। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, খোলা চুলগুলো সুন্দর করে বেঁধে নিল। চোখে সামান্য কাজল। ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপবাম।
নিজেকে আয়নায় দেখে মুচকি হাসল।
তারপর মায়ের কাছে গিয়ে বলল,
— মা, দোয়া করো। চাকরিটা যেন হয়ে যায়।
মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ। যা তোর জন্য ভালো, আল্লাহ যেন সেটাই করেন।
নীরা মায়ের হাত ধরে বলল,
— আমার জন্য একটু বেশি করে দোয়া করো। আমি চাই তোমাদের আর কষ্ট করতে না হয়।
মা মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বললেন,
— তুই ভালো থাকলেই আমরা ভালো থাকব।
নীরা আর কিছু বলল না। শুধু মাকে জড়িয়ে ধরে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ল।
তার জানা ছিল না, আজকের এই সাধারণ সকালটি তার জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ একটি ঘটনার শুরু হতে যাচ্ছে।
অন্যদিকে...
ঢাকার অভিজাত এলাকায় অবস্থিত বিশাল একটি ভবন।
ভবনটির নাম—
রয়্যাল হোল্ডিংস।
শহরের অন্যতম সফল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা একজনই।
আরিয়ান রহমান।
বয়স আটাশ।
শহরের পরিচিত তরুণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে অন্যতম। তার ব্যক্তিত্বে এমন একটা দৃঢ়তা আছে, যার কারণে মানুষ সহজে তার সামনে কথা বলতে সাহস পায় না।
লম্বা, সুদর্শন, গম্ভীর চেহারা। সব সময় পরিপাটি পোশাক পরে থাকে। কালো রঙের শার্ট তার বেশ পছন্দ।
তবে আরিয়ানের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো তার রাগ এবং কঠোর ব্যবহার।
অফিসে কেউ ভুল করলে দ্বিতীয়বার সুযোগ পাওয়া কঠিন।
সকাল নয়টা।
আরিয়ান নিজের কেবিনে বসে ল্যাপটপে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দেখছিল।
ঠিক তখনই তার ব্যক্তিগত সহকারী রাফি দরজায় নক করল।
— স্যার, ভেতরে আসতে পারি?
— আসো।
রাফি ভেতরে প্রবেশ করল।
— স্যার, আজ দশটায় নতুন মার্কেটিং এক্সিকিউটিভদের ইন্টারভিউ শুরু হবে।
আরিয়ান ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলল,
— আমি জানি।
— স্যার, প্রার্থীদের তালিকাটা আপনার টেবিলে রেখেছি।
— ঠিক আছে। তুমি যাও।
রাফি বেরিয়ে গেল।
আরিয়ান আবার কাজে মনোযোগ দিল।
তার কাছে জীবন মানেই দায়িত্ব, ব্যবসা আর লক্ষ্য অর্জন। ভালোবাসা কিংবা আবেগের জন্য তার সময় নেই।
অন্তত সে নিজেকে সেটাই বোঝায়।
কিন্তু মানুষ সব সময় নিজের ভবিষ্যৎ জানে না।
আরিয়ানও জানত না, খুব শিগগিরই এমন একজন তার জীবনে আসবে, যার সামনে তার সব অহংকার একদিন অসহায় হয়ে পড়বে।
প্রথম মুখোমুখি
সকাল দশটা পঁচিশ মিনিট।
নীরা অবশেষে রয়্যাল হোল্ডিংসের সামনে এসে পৌঁছাল।
বিশাল কাঁচের ভবনটির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
— মাশাআল্লাহ! এত বড় অফিস!
নিজের মনেই কথাটি বলে ভেতরে প্রবেশ করল।
রিসেপশনে গিয়ে বলল,
— আসসালামু আলাইকুম। আমি আজকের ইন্টারভিউ দিতে এসেছি।
রিসেপশনিস্ট হাসিমুখে বললেন,
— আপনার নাম?
— নীরা রহমান।
— ঠিক আছে। আপনি পাঁচতলায় চলে যান। সেখানে অপেক্ষা করবেন।
— ধন্যবাদ।
নীরা লিফটের দিকে এগিয়ে গেল।
লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে একজন পুরুষ দ্রুত এগিয়ে এলেন।
— এক্সকিউজ মি!
নীরা তাড়াতাড়ি দরজাটি আটকে দিল।
লোকটি ভেতরে প্রবেশ করলেন।
— থ্যাংক ইউ।
নীরা হালকা হাসল।
— ইউ আর ওয়েলকাম।
লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর লোকটি নীরার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— আপনি কি ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন?
— জি।
— কোন পদের জন্য?
— মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ।
লোকটি আর কিছু বললেন না।
নীরা ভাবল, হয়তো অফিসের কোনো কর্মচারী।
কিন্তু সে জানত না, তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিই এই প্রতিষ্ঠানের মালিক।
লিফট পাঁচতলায় পৌঁছালে দুজনই বেরিয়ে এল।
নীরা নিজের ফাইল হাতে নিয়ে অপেক্ষার জায়গায় গিয়ে বসল।
অন্যদিকে লোকটি সোজা পরিচালকের কেবিনের দিকে চলে গেল।
নীরা মনে মনে বলল,
— লোকটা বেশ গম্ভীর!
তারপর নিজের ফাইল খুলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে লাগল।
অপ্রত্যাশিত বিপত্তি
কিছুক্ষণ পর অফিসের একজন কর্মচারী এসে বললেন,
— নীরা রহমান কে?
নীরা উঠে দাঁড়াল।
— জি, আমি।
— আপনাকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হচ্ছে। আমার সঙ্গে আসুন।
নীরা নিজের ফাইল হাতে নিয়ে তার পেছনে হাঁটতে লাগল।
কেবিনের দরজার সামনে এসে কর্মচারী বললেন,
— আপনি ভেতরে যান।
নীরা দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল।
— আসসালামু আলাইকুম।
কোনো উত্তর এল না।
নীরা সামনের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল।
সকালে লিফটে দেখা সেই মানুষটি বড় একটি চেয়ারে বসে আছেন।
লোকটি ফাইলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— বসুন।
নীরা ধীরে ধীরে বসে পড়ল।
আরিয়ান এবার চোখ তুলে তাকাল।
— আপনার নাম নীরা রহমান?
— জি।
— আপনার সিভি দেখেছি। অভিজ্ঞতা খুব বেশি নেই।
নীরা শান্তভাবে উত্তর দিল,
— জি স্যার। আমি নতুন। তবে কাজ শেখার আগ্রহ আছে।
— আগ্রহ দিয়ে সব হয় না। দক্ষতাও প্রয়োজন।
— আমি জানি স্যার। কিন্তু দক্ষতা অর্জনের জন্যও তো কাউকে প্রথম সুযোগ দিতে হয়।
আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটি কথাটা বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছে।
— আপনি কি মনে করেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান আপনাকে সুযোগ দিতে বাধ্য?
নীরা একটু অবাক হলো।
— না স্যার। আমি কাউকে বাধ্য করতে আসিনি। নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ চাইতে এসেছি।
আরিয়ান এবার ফাইলটি বন্ধ করল।
— আপনি বেশ আত্মবিশ্বাসী।
— চেষ্টা করি স্যার।
— আচ্ছা, ধরুন আপনাকে এমন একটি কাজ দেওয়া হলো, যেটা আপনি আগে কখনো করেননি। কী করবেন?
— প্রথমে কাজটা বুঝব। তারপর প্রয়োজন হলে শিখব। ভুল হলে সেটা স্বীকার করে ঠিক করার চেষ্টা করব।
— আর যদি ব্যর্থ হন?
নীরা একটু হেসে বলল,
— তাহলে আবার চেষ্টা করব। কারণ ব্যর্থতা মানেই সব শেষ নয়।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
মেয়েটির উত্তরগুলো তার কাছে অদ্ভুত লাগছিল।
অন্য প্রার্থীরা সাধারণত তাকে খুশি করার চেষ্টা করে। কিন্তু এই মেয়েটি কোনো বাড়তি প্রশংসা করছে না।
— ঠিক আছে। আপনি যেতে পারেন। ফলাফল জানিয়ে দেওয়া হবে।
নীরা উঠে দাঁড়াল।
— ধন্যবাদ, স্যার।
দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
— স্যার, একটা কথা বলব?
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— বলুন।
— আপনি সব সময় এত গম্ভীর থাকেন?
কেবিনের পরিবেশ কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আরিয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
এমন প্রশ্ন তাকে কেউ করে না।
নীরা বুঝতে পারল, হয়তো একটু বেশি বলে ফেলেছে।
তাড়াতাড়ি বলল,
— সরি স্যার। কিছু মনে করবেন না।
এই বলে দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
আরিয়ান কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটে উঠল।
— অদ্ভুত মেয়ে!
একটি ফোনকল
ইন্টারভিউ শেষ করে নীরা নিচে নেমে এল।
বাইরে এসে মাকে ফোন করল।
— মা!
— কী হলো? ইন্টারভিউ কেমন দিলি?
— মোটামুটি ভালো। তবে লোকটা খুব গম্ভীর।
— কোন লোক?
— যার সামনে ইন্টারভিউ দিলাম।
— তাহলে নিশ্চয়ই অফিসের বড় কর্মকর্তা। ভয় পেয়েছিলি?
— না মা। তবে একটা কথা জিজ্ঞেস করে ফেলেছি।
— কী জিজ্ঞেস করেছিস?
— উনি সব সময় এত গম্ভীর থাকেন কেন!
ওপাশ থেকে মা হেসে ফেললেন।
— তোর এই স্বভাবটা আর গেল না!
নীরাও হেসে বলল,
— আচ্ছা মা, রাখি। বাসায় ফিরছি।
ফোন রেখে সে রাস্তার পাশে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই আকাশ মেঘে ঢেকে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি শুরু হলো।
নীরা ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করতে গেল।
কিন্তু ছাতা নেই!
মনে পড়ল, সকালে তাড়াহুড়ো করে বাসায় রেখে এসেছে।
— ইশ! আজকেই বৃষ্টি হতে হলো?
সে একটি দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়াল।
বৃষ্টি ক্রমেই বাড়ছিল।
ঠিক তখনই সামনে একটি কালো গাড়ি এসে থামল।
গাড়ির দরজা খুলে একজন লোক বেরিয়ে এলেন।
নীরা তাকিয়ে দেখল, আরিয়ান!
সে অবাক হয়ে গেল।
আরিয়ানও তাকে চিনতে পারল।
— আপনি এখনো এখানে?
নীরা একটু বিব্রত হয়ে বলল,
— জি স্যার। বৃষ্টির জন্য আটকে গেছি।
আরিয়ান আকাশের দিকে তাকাল।
— কোথায় যাবেন?
— বাসায়।
— সেটা তো বুঝলাম। কোথায় আপনার বাসা?
— বাড্ডা।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— গাড়িতে উঠুন। আমি ওই দিকেই যাচ্ছি।
নীরা একটু ইতস্তত করল।
— না স্যার, সমস্যা নেই। আমি বাসে চলে যেতে পারব।
— বৃষ্টি দেখছেন না?
— জি, দেখছি।
— তাহলে?
নীরা চুপ করে রইল।
আরিয়ান আবার বলল,
— ভয় পাওয়ার কিছু নেই। গাড়িতে আমার ড্রাইভারও আছে।
নীরা গাড়ির দিকে তাকাল। সামনের আসনে একজন চালক বসে আছেন।
কিছুক্ষণ ভেবে সে গাড়িতে উঠে বসল।
— ধন্যবাদ, স্যার।
আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
নীরব যাত্রা
গাড়ির ভেতর অদ্ভুত নীরবতা।
নীরা জানালার বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছিল।
অন্যদিকে আরিয়ান ফোনে অফিসের একটি জরুরি মেইল দেখছিল।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
— আপনার পরিবারে কে কে আছেন?
নীরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
— জি?
— বলছিলাম, পরিবারে কে কে আছেন?
— বাবা, মা আর ছোট ভাই।
— বাবা কী করেন?
— আগে চাকরি করতেন। এখন অবসর নিয়েছেন।
— আপনার চাকরিটা খুব প্রয়োজন?
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— জি। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে চাই।
আরিয়ান এবার ফোন থেকে চোখ সরাল।
— আপনার বয়স কত?
— চব্বিশ।
— বিয়ে হয়নি?
নীরা একটু হেসে বলল,
— না স্যার।
— কেন?
নীরা এবার অবাক হয়ে গেল।
— এটা কি ইন্টারভিউয়ের কোনো প্রশ্ন?
আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— না। সাধারণ প্রশ্ন।
— তাহলে সাধারণ উত্তরও আছে। এখনো বিয়ে করার কথা ভাবিনি।
আরিয়ান আর কোনো প্রশ্ন করল না।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি বাড্ডার একটি পরিচিত মোড়ে এসে থামল।
নীরা বলল,
— স্যার, এখানেই নামিয়ে দিন। আমি চলে যেতে পারব।
গাড়ি থামল।
নীরা দরজা খুলে নামার আগে বলল,
— আবারও ধন্যবাদ।
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
নীরা নেমে গেল।
গাড়ি চলে যাওয়ার আগে একবার পেছনে তাকাল।
কালো গাড়িটি ততক্ষণে অনেকটা দূরে চলে গেছে।
নীরা নিজের মনেই বলল,
— মানুষটা এত গম্ভীর কেন, আল্লাহ জানেন!
আরিয়ানের অজানা অনুভূতি
অন্যদিকে গাড়ির ভেতরে আরিয়ান চুপচাপ বসে ছিল।
রাফি আজ অফিসে আসেনি। ড্রাইভারই গাড়ি চালাচ্ছিল।
আরিয়ান ফোন হাতে নিয়ে নীরার সিভিটি আবার খুলল।
নাম: নীরা রহমান।
শিক্ষাগত যোগ্যতা: স্নাতক সম্পন্ন।
অভিজ্ঞতা: নেই।
ঠিকানা: বাড্ডা, ঢাকা।
সে কিছুক্ষণ সিভির দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর নিজের মনেই বলল,
— মেয়েটা বেশ সাহসী।
ড্রাইভার আয়নায় তাকিয়ে বলল,
— স্যার, কিছু বললেন?
— না। তুমি গাড়ি চালাও।
অপেক্ষার দিন
পরের দিন সকাল।
নীরা ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই ফোন হাতে নিল।
কোনো ফোনকল আসেনি।
সে ভেবেছিল, হয়তো আজ ফলাফল জানাবে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো।
তবুও কোনো খবর নেই।
নীরা মায়ের পাশে বসে বলল,
— মা, মনে হয় চাকরিটা হবে না।
মা বললেন,
— এত তাড়াতাড়ি হতাশ হোস না। সবকিছুর জন্য সময় লাগে।
— কিন্তু মা, আমার খুব দরকার ছিল।
— আল্লাহর কাছে চাই। তিনি উত্তম পরিকল্পনাকারী।
নীরা মাথা নাড়ল।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
অপরিচিত নম্বর।
নীরা দ্রুত ফোন ধরল।
— হ্যালো?
ওপাশ থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল।
— আমি রয়্যাল হোল্ডিংস থেকে বলছি। আপনি কি নীরা রহমান?
— জি, বলছি।
— অভিনন্দন। আপনাকে আমাদের প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ পদে নির্বাচিত করা হয়েছে।
নীরা কয়েক মুহূর্ত কথা বলতে পারল না।
তারপর আনন্দিত কণ্ঠে বলল,
— সত্যি?
— জি। আগামী সোমবার থেকে আপনাকে অফিসে যোগ দিতে হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে আসবেন।
— জি, অবশ্যই। অনেক ধন্যবাদ।
ফোন কেটে নীরা আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
— মা! মা! আমার চাকরি হয়েছে!
মা রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন।
— আলহামদুলিল্লাহ! সত্যি?
নীরা মাকে জড়িয়ে ধরল।
তার চোখে আনন্দের পানি।
বাবাও ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
সবাই মিলে আনন্দ করল।
নীরা মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করল।
কিন্তু তার জানা ছিল না, এই চাকরিটিই তাকে এমন একজন মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাবে, যার সঙ্গে তার সম্পর্ক একদিন শুধু পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
নতুন অধ্যায়
সোমবার সকাল।
নীরা সময়ের আগেই অফিসে পৌঁছে গেল।
আজ তার প্রথম কর্মদিবস।
রিসেপশনে গিয়ে নিজের পরিচয় দিল।
একজন কর্মচারী তাকে অফিসের নির্দিষ্ট বিভাগে নিয়ে গেলেন।
সেখানে গিয়ে নীরা পরিচিত হলো তার নতুন সহকর্মীদের সঙ্গে।
একজন মেয়ের নাম মেহের।
বয়স ছাব্বিশ।
মেহের হাসিমুখে বলল,
— তুমি নতুন?
— জি। আজ প্রথম দিন।
— আমি মেহের। তোমার নাম?
— নীরা।
— ওহ! তোমার কথা শুনেছি। তুমি সেদিন ইন্টারভিউ দিয়েছিলে, তাই না?
নীরা অবাক হয়ে বলল,
— তুমি জানলে কীভাবে?
মেহের হেসে বলল,
— আমাদের অফিসে নতুন কর্মী আসার খবর সবাই পেয়ে যায়।
নীরা হেসে ফেলল।
মেহের তাকে নিজের পাশে বসাল।
— একটা কথা বলি?
— বলো।
— আমাদের বসকে একটু এড়িয়ে চলবে।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
— কেন?
— আরিয়ান স্যার! উনি ভীষণ রাগী। কাজের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেন না। সামান্য ভুল হলেও অনেক কথা শোনান।
নীরা মনে মনে বলল,
— সেটা তো আগেই বুঝেছি!
মেহের জিজ্ঞেস করল,
— কী বললে?
— না, কিছু না।
ঠিক তখনই অফিসের সবাই হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল।
নীরা বুঝতে পারল না কী হয়েছে।
মেহের নিচু স্বরে বলল,
— স্যার আসছেন!
নীরা নিজের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণের মধ্যে আরিয়ান অফিসে প্রবেশ করল।
কালো শার্ট, হাতে ঘড়ি, চোখে সেই পরিচিত গম্ভীর দৃষ্টি।
সে সবার দিকে একবার তাকিয়ে নিজের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু কেবিনে প্রবেশের আগে হঠাৎ থেমে গেল।
তার চোখ পড়ল নীরার দিকে।
নীরাও তাকিয়ে ছিল।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল,
— মিস নীরা রহমান?
নীরা দ্রুত উত্তর দিল,
— জি, স্যার।
— আমার কেবিনে আসুন।
মেহের নীরার দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল।
নীরা নিজের ফাইল হাতে নিয়ে কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।
তার মনে একটাই প্রশ্ন—
প্রথম দিনেই আবার কী হলো?
কেবিনের দরজার ওপাশে
নীরা দরজায় নক করল।
— মে আই কাম ইন, স্যার?
— কাম ইন।
ভেতরে ঢুকে সে দাঁড়াল।
আরিয়ান একটি ফাইল তার দিকে এগিয়ে দিল।
— এই প্রজেক্টটি আগামী সপ্তাহের মধ্যে শেষ করতে হবে।
নীরা ফাইল হাতে নিয়ে বলল,
— জি স্যার।
— আপনার কাজ হবে প্রজেক্টের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা এবং একটি রিপোর্ট তৈরি করা।
— ঠিক আছে।
— কোনো সমস্যা হলে আপনার টিম লিডারের সঙ্গে কথা বলবেন।
— জি।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— আর একটা কথা।
নীরা তাকাল।
— জি, স্যার?
— অফিসে কাজের সময় ব্যক্তিগত কথাবার্তা কম বলবেন।
নীরা একটু অবাক হলো।
— আমি কি কিছু করেছি, স্যার?
— এখনো করেননি। তবে আপনার কথা বলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, আপনি বেশ কথা বলতে পছন্দ করেন।
নীরা এবার মৃদু হেসে বলল,
— প্রয়োজন ছাড়া কথা বলি না, স্যার।
আরিয়ান ভ্রু তুলল।
— তাই?
— জি।
— ঠিক আছে। আপনি যেতে পারেন।
নীরা বেরিয়ে যাওয়ার সময় মনে মনে বলল,
— আল্লাহ! কী কঠিন মানুষ!
অন্যদিকে আরিয়ান নিজের কাজে ফিরে গেল।
কিন্তু কয়েক মিনিট পর হঠাৎ তার মনে পড়ল নীরার শেষ কথাটি।
তার ঠোঁটে আবার সেই অল্প পরিচিত হাসি ফুটে উঠল।
একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা
বিকেল চারটা।
অফিসে সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত।
নীরা কম্পিউটারে রিপোর্ট তৈরি করছিল।
হঠাৎ তার ফোনে মায়ের কল এল।
সে ফোন ধরল।
— মা, বলো।
— নীরা, তোর বাবা একটু অসুস্থ বোধ করছেন। তুই কি আজ একটু তাড়াতাড়ি আসতে পারবি?
নীরার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— কী হয়েছে বাবার?
— তেমন কিছু না। তবে শরীরটা ভালো লাগছে না।
— আচ্ছা মা। আমি আসছি।
ফোন রেখে নীরা তাড়াতাড়ি ফাইল গুছিয়ে নিল।
মেহেরকে বলল,
— মেহের, আমার একটু জরুরি কাজ আছে। আমি কি আজ একটু আগে যেতে পারব?
মেহের বলল,
— টিম লিডারকে জানাও। তবে বসের অনুমতি লাগতে পারে।
নীরা আর দেরি করল না।
সে আরিয়ানের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।
দরজায় নক করল।
— আসুন।
নীরা ভেতরে প্রবেশ করে বলল,
— স্যার, আমার বাবার শরীরটা একটু খারাপ। আমি কি আজ একটু আগে যেতে পারি?
আরিয়ান ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে তাকাল।
— আপনার কাজ শেষ হয়েছে?
— জি স্যার, আজকের কাজ শেষ করেছি।
— ঠিক আছে। যেতে পারেন।
নীরা কিছুটা স্বস্তি পেল।
— ধন্যবাদ, স্যার।
সে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে আরিয়ান আবার বলল,
— এক মিনিট।
নীরা ফিরে তাকাল।
— জি?
— আপনার বাবার অবস্থা কি খুব খারাপ?
— জানি না স্যার। মা ফোন করেছিলেন। তাই একটু চিন্তা হচ্ছে।
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
— ঠিক আছে। সাবধানে যাবেন।
নীরা কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর নিজের কাজে মন দিল।
কিন্তু সেদিন প্রথমবার তার মনে হলো, মেয়েটির জীবনের গল্পটা হয়তো তার ধারণার চেয়ে অনেক বড়।
শেষ দৃশ্য
সন্ধ্যা।
নীরা বাসায় পৌঁছে দেখল বাবা বিছানায় শুয়ে আছেন।
সে দ্রুত বাবার পাশে গিয়ে বসল।
— বাবা, কী হয়েছে তোমার?
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— কিছু হয়নি মা। একটু দুর্বল লাগছিল।
নীরা বলল,
— ডাক্তার দেখাতে হবে। এভাবে অবহেলা করলে চলবে না।
বাবা মৃদু হাসলেন।
— তুই নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছিস। নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রাখিস। এত চিন্তা করতে হবে না।
নীরা বাবার হাত ধরে বলল,
— তোমাদের জন্যই তো এত কিছু করতে চাই।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর নীরা নিজের ঘরে বসে নতুন অফিসের কথা ভাবছিল।
আজকের দিনটা বেশ ব্যস্ততায় কেটেছে।
বিশেষ করে আরিয়ান রহমান নামের মানুষটিকে নিয়ে তার মনে অনেক প্রশ্ন।
কেন মানুষটা এত গম্ভীর?
কেন সব সময় এমন কঠিনভাবে কথা বলে?
আবার কখনো কখনো তার কথার মধ্যে অদ্ভুত এক ধরনের যত্নও থাকে।
নীরা নিজের মনেই হেসে ফেলল।
— ধুর! এসব কী ভাবছি আমি? উনি আমার বস। কাজ করতে গিয়েছি, গল্প করতে নয়।
ফোনটা হাতে নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল।
রাত এগারোটা।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে মেসেজ এল।
Unknown Number:
“আগামীকাল সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে পৌঁছাবেন। আপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে।”
নীরা মেসেজটি পড়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর উত্তর দিল,
“জি, স্যার। আমি সময়মতো পৌঁছে যাব।”
কয়েক সেকেন্ড পর আবার মেসেজ এল।
Unknown Number:
“আর নিজের খেয়াল রাখবেন।”
নীরা ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
কথাটি পড়ে তার মনে হলো, এটা কি সত্যিই তার বসের মেসেজ?
সে আর কিছু লিখল না।
অন্যদিকে আরিয়ান নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
নীরার ছোট্ট উত্তরটি পড়ে সে ফোনটি পকেটে রাখল।
আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে।
আরিয়ান নিজের মনেই বলল,
— মেয়েটা সত্যিই অদ্ভুত!
কিন্তু সে জানত না, এই অদ্ভুত মেয়েটিই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে।
আর নীরাও জানত না, তার জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পটির প্রথম অধ্যায় আজই শুরু হয়েছে।
চলবে...
❤️ প্রথম পর্বের সমাপ্তি ❤️
কিছু পরিচয় হঠাৎ হয়, কিছু সম্পর্ক ধীরে ধীরে তৈরি হয়। আর কিছু মানুষ একদিন এমনভাবে হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, যাদের ছাড়া নিজের অস্তিত্বও অসম্পূর্ণ মনে হয়।