শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৭ম পর্ব: অন্ধকারে লুকানো সত্য
সকালের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে প্রবেশ করেছে। অথচ নীরার চোখে একটুও ঘুম নেই।
গত রাতের অচেনা নম্বর থেকে আসা মেসেজটা বারবার মনে পড়ছে।
“তোমার জন্মের আগের রাতের ঘটনা জানতে চাইলে সামিরা খালাকে জিজ্ঞেস করো।”
সামিরা খালা এমন কী জানেন, যা এত বছর ধরে সবাই লুকিয়ে রেখেছে?
নীরা আর দেরি করল না। ফোন হাতে নিয়ে সামিরাকে কল করল।
— খালা, আজ কখন দেখা করবে?
— দুপুরে। আমি তোকে ঠিকানা পাঠিয়ে দিচ্ছি।
— খালা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— বল মা।
— তুমি কি আমার জন্মের আগের ঘটনা জানো?
সামিরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— জানি। কিন্তু সব কথা ফোনে বলা যাবে না। তুই চলে আয়।
দুপুর বারোটা।
একটি নিরিবিলি রেস্টুরেন্টের কোণে বসে আছেন সামিরা। নীরাকে দেখেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
— আয় মা, বস।
নীরা বসে কোনো ভূমিকা ছাড়াই প্রশ্ন করল,
— খালা, সেদিন রাতে কী হয়েছিল?
সামিরা কিছুক্ষণ নীরার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
— তোর জন্মের কয়েক মাস আগে দুই পরিবারের মধ্যে একটা বড় ব্যবসায়িক চুক্তি হয়েছিল। তোর বাবা আর মাহমুদ ভাই একসঙ্গে কাজ করতেন। তাঁদের সম্পর্ক শুধু ব্যবসার ছিল না, পারিবারিক সম্পর্কও ছিল খুব ভালো।
— তাহলে সম্পর্ক নষ্ট হলো কেন?
— সেই চুক্তির সঙ্গে অনেক মানুষের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে ছিল। কিন্তু একদিন হঠাৎ হিসাবের কিছু কাগজ হারিয়ে যায়। অভিযোগ ওঠে, তোর বাবা নাকি গুরুত্বপূর্ণ নথি সরিয়ে ফেলেছেন।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
— বাবা এমন কাজ করতে পারে না!
— আমিও বিশ্বাস করিনি। কিন্তু তখন পরিস্থিতি এমন হয়ে গিয়েছিল যে কেউ কারও কথা শুনতে রাজি ছিল না।
— তারপর?
সামিরা কিছুক্ষণ থেমে আবার বলতে শুরু করলেন।
— সেই রাতেই একটা দুর্ঘটনা ঘটে। মাহমুদ ভাইয়ের গাড়ি রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার হয়। গাড়িতে আরও একজন ছিল। এরপর থেকে সেই মানুষটির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
— মানুষটি কে ছিল?
সামিরা চোখ নামিয়ে ফেললেন।
— তার নাম ছিল ইমরান।
নীরা নামটা মনে রাখল।
— ইমরান কে ছিলেন?
— তিনি ওই ব্যবসার হিসাবরক্ষক ছিলেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাঁর কাছে ছিল। দুর্ঘটনার আগে তিনি আমাকে বলেছিলেন, কিছু একটা বড় গোপন বিষয় সামনে আসতে যাচ্ছে।
— তিনি কি মারা গিয়েছিলেন?
সামিরা মাথা নাড়লেন।
— কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি। কিন্তু তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নীরা ধীরে বলল,
— তাহলে সবাই বাবাকে দোষ দিল কেন?
— কারণ দুর্ঘটনার আগের দিন ইমরান তোর বাবার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। আর তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পর কিছু কাগজ পাওয়া যায়, যেখানে তোর বাবার স্বাক্ষর ছিল।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
— খালা, তুমি কি বিশ্বাস করো বাবা নির্দোষ?
সামিরা নীরার হাত ধরে বললেন,
— আমি বিশ্বাস করি, তোর বাবা পুরো সত্যটা জানেন না। আর যেটুকু জানেন, সেটুকুও হয়তো কাউকে বলতে পারেননি।
অন্যদিকে, আরিয়ানের বাসায় আজ অস্বাভাবিক ব্যস্ততা।
মাহমুদ রহমান বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন।
বাড়িতে প্রবেশ করতেই আরিয়ান বাবার সামনে দাঁড়াল।
— বাবা, এবার আর কোনো কথা এড়িয়ে যাওয়া চলবে না।
মাহমুদ কোট খুলতে খুলতে বললেন,
— কী জানতে চাস?
— ইমরান কে ছিলেন?
মাহমুদ থমকে গেলেন।
— এই নাম কোথায় শুনেছিস?
— নীরার খালা সামিরার কাছে।
মাহমুদ ধীরে সোফায় বসে পড়লেন।
— ইমরান ছিল আমাদের প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক। খুব বিশ্বস্ত মানুষ ছিল। কিন্তু একটা সময় সে এমন কিছু তথ্য জানতে পারে, যা আমাদের ব্যবসার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল।
— কী তথ্য?
— কোম্পানির কিছু আর্থিক হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি ছিল। আমি বিষয়টা খতিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই দুর্ঘটনা ঘটে।
আরিয়ান বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনি কি জানতেন নীরার বাবাকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছিল?
মাহমুদ চুপ করে গেলেন।
— বাবা, উত্তর দিন।
— আমি নিশ্চিত নই। তবে একটা কথা জানি, রাশেদ কখনো নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের ক্ষতি করবে না।
আরিয়ান অবাক হলো।
— তাহলে এত বছর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি কেন?
মাহমুদ মাথা নিচু করলেন।
— কিছু সিদ্ধান্ত মানুষ পরিস্থিতির চাপে নেয়। পরে বুঝতে পারে, সেই সিদ্ধান্ত কতগুলো জীবন বদলে দিয়েছে।
— আপনি কি নীরার পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইবেন?
মাহমুদ জানালার বাইরে তাকালেন।
— আগে আমাকে ইমরানকে খুঁজে বের করতে হবে।
বিকেল।
নীরা বাড়ি ফিরে দেখে বাবা বসার ঘরে একা বসে আছেন। তাঁর সামনে সেই পুরোনো ছবিটা।
নীরা পাশে গিয়ে বসল।
— বাবা, তোমার সঙ্গে একটু কথা বলব?
— বল মা।
— ইমরান নামে কাউকে চিনতে?
ছবিটা রাশেদের হাত থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
— কে তোকে এই নাম বলেছে?
— সামিরা খালা।
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— ইমরান ছিল একজন ভালো মানুষ। সে আমাদের অনেক সাহায্য করেছিল।
— তাহলে সে কোথায়?
— জানি না।
— বাবা, তুমি কি তার নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলে?
রাশেদ মেয়ের দিকে তাকালেন। চোখে কষ্ট স্পষ্ট।
— তুইও কি আমাকে সন্দেহ করছিস?
নীরা দ্রুত বাবার হাত ধরে বলল,
— না বাবা। আমি শুধু সত্যটা জানতে চাই।
রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, সেদিন রাতে যা ঘটেছিল, তার জন্য আমাকে যে দায়ী করা হয়েছিল, সেটা পুরোপুরি সত্য নয়।
— তাহলে আসল সত্য কী?
রাশেদ উত্তর দেওয়ার আগেই তাঁর ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
তিনি কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটি পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেল।
— রাশেদ সাহেব, এত বছর পরও কি আমাকে মনে আছে?
রাশেদের মুখের রং বদলে গেল।
— তুমি?
— হ্যাঁ। আমি ফিরে এসেছি।
— কিন্তু তুমি তো...
লোকটি হালকা হেসে বলল,
— সবাই ভেবেছিল আমি হারিয়ে গেছি। এবার সেই রাতের সত্য সবাই জানবে।
কল কেটে গেল।
নীরা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
— বাবা, কে ফোন করেছিল?
রাশেদ কাঁপা গলায় শুধু একটি নাম বললেন—
— ইমরান!
সেই একই সময়ে আরিয়ানের ফোনে একটি ছবি এল।
ছবিতে একজন মধ্যবয়সী মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। ছবির নিচে লেখা—
“তোমার বাবার পুরোনো বন্ধু ফিরে এসেছে। এবার সত্য লুকানো কঠিন হবে।”
আরিয়ান ছবিটা বড় করে দেখল।
মানুষটিকে সে আগে কখনো দেখেনি।
কিন্তু ছবির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজনকে দেখে তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
সেখানে ছিল তার বাবা মাহমুদ রহমান।
আর তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট একটি মেয়ে।
মেয়েটির হাতে সেই একই রুপার ব্রেসলেট, যেটি সামিরা নীরাকে দিয়েছিলেন।
আরিয়ানের মনে নতুন প্রশ্ন জাগল—
এই মেয়েটি কি নীরা? আর ইমরানের সঙ্গে তাদের পরিবারের সম্পর্ক আসলে কী?
রহস্যের পর্দা একটু একটু করে সরছে। কিন্তু সত্য প্রকাশের আগে আরও অনেক মুখোশ খুলতে বাকি।
চলবে…