শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৮ম পর্ব: ফিরে আসা মানুষটি
রাত প্রায় বারোটা।
রাশেদ রহমান তখনো বসার ঘরে বসে আছেন। তাঁর হাতে ফোন। কিছুক্ষণ আগেই যে মানুষটি ফোন করেছিল, তার কণ্ঠ এখনো কানে বাজছে।
ইমরান!
যে মানুষটিকে এত বছর ধরে মৃত কিংবা নিখোঁজ বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, সে কীভাবে আবার ফিরে এল?
নীরা বাবার পাশে এসে বসল।
— বাবা, তুমি কি আমাকে কিছু বলবে না?
রাশেদ মেয়ের দিকে তাকালেন।
— সব কথা জানার পর তুই হয়তো আমাকে অন্য চোখে দেখবি।
— সত্য জানলে কাউকে অন্য চোখে দেখতে হয় না, বাবা। বরং সত্য লুকিয়ে রাখলে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।
রাশেদ মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
— তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস, মা।
— তাহলে এবার আমাকে সত্যিটা বলো।
রাশেদ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
— ইমরান শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক ছিল না। সে ছিল আমার খুব কাছের বন্ধু। মাহমুদ আর আমি যখন একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করি, তখন ইমরান আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়।
— তাহলে সে তোমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল?
— আমি জানি না। কিন্তু দুর্ঘটনার আগে সে আমাকে একটা কথা বলেছিল। বলেছিল, আমাদের প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এমন একজন আছে, যে আমাদের দুজনকেই ধ্বংস করতে চায়।
নীরা অবাক হয়ে গেল।
— সেই মানুষটা কে?
— সেটা আমি আজও জানতে পারিনি।
পরদিন সকাল।
আরিয়ান অফিসে যাওয়ার আগে বাবার সঙ্গে দেখা করল।
— বাবা, গত রাতে যে ছবিটা পেয়েছি, সেটার ব্যাপারে জানতে চাই।
মাহমুদ ছবিটা হাতে নিলেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
— এটা সেই সময়ের ছবি, যখন আমাদের দুই পরিবারের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল।
— ছবির ছোট মেয়েটি কে?
মাহমুদ ছবির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— নীরা।
আরিয়ান অবাক হলো।
— নীরা? কিন্তু ও তো তখন খুব ছোট ছিল!
— হ্যাঁ। ছবিটা তোর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তোলা হয়েছিল।
আরিয়ান এবার আরও একটি প্রশ্ন করল।
— তাহলে নীরার হাতে থাকা ব্রেসলেটটা?
— সেটা সামিরা কিনেছিল। নীরার জন্মের সময় ওকে উপহার দিয়েছিল।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
— বাবা, তুমি কি জানো নীরার জন্মের আগের রাতে কী হয়েছিল?
মাহমুদ চোখ নামিয়ে বললেন,
— জানি। কিন্তু সেই রাতের সব ঘটনা আমি নিজেও দেখিনি।
— তাহলে কে জানে?
মাহমুদ ধীরে উত্তর দিলেন,
— ইমরান।
অফিসে নীরা নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছিল। কিন্তু মনোযোগ বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল।
মেহের এসে পাশে দাঁড়াল।
— কী হয়েছে? আজ তোমাকে একদম চুপচাপ লাগছে।
— কিছু পারিবারিক ব্যাপার চলছে।
— চাইলে আমাকে বলতে পারো।
নীরা সব কথা না বললেও ইমরানের ফিরে আসার বিষয়টা জানাল।
মেহের অবাক হয়ে বলল,
— এত বছর পর একজন মানুষ ফিরে এসেছে! ব্যাপারটা তো সিনেমার মতো।
নীরা মৃদু হাসল।
— আমার জীবনটা এখন সিনেমার চেয়েও বেশি রহস্যময় লাগছে।
ঠিক তখনই রাফি এসে বলল,
— মিস নীরা, স্যার আপনাকে ডাকছেন।
নীরা উঠে আরিয়ানের কেবিনে গেল।
— আমাকে ডেকেছেন, স্যার?
— হ্যাঁ। বসুন।
আরিয়ান কিছুক্ষণ নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনার বাবা কি গত রাতে কারও ফোন পেয়েছিলেন?
নীরা অবাক হলো।
— আপনি কীভাবে জানলেন?
— কারণ আমার বাবাও গত রাতে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন পেয়েছেন।
— তাহলে কি একই মানুষ?
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
— সম্ভবত। মানুষটির নাম ইমরান।
নীরা বলল,
— আমার বাবাও নামটা বলেছেন।
আরিয়ান এবার একটু সামনে ঝুঁকে বলল,
— নীরা, আমাদের দুই পরিবারের অতীতের সঙ্গে আপনার জন্মের আগের কোনো ঘটনার যোগসূত্র আছে বলে মনে হচ্ছে।
নীরা শান্তভাবে বলল,
— আমিও সেটাই বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি চাই না, অতীতের জন্য বর্তমান নষ্ট হোক।
— আমিও চাই না।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর আরিয়ান বলল,
— আপনার কোনো সাহায্য লাগলে আমাকে জানাবেন।
নীরা উঠে দাঁড়াল।
— ধন্যবাদ, স্যার। তবে আমি চাই সত্যটা নিজের পরিবারের কাছ থেকেই জানতে।
আরিয়ান মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
অন্যদিকে, তৃষা নিজের বাড়িতে বসে একটি পুরোনো ফাইল দেখছিল।
ফাইলের ভেতরে কিছু কাগজ, কয়েকটি ছবি এবং একটি সংবাদপত্রের কাটিং।
সংবাদপত্রের শিরোনাম—
“ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক নিখোঁজ, তদন্তে নতুন মোড়।”
তৃষা খবরটি পড়ে নিজের মনে বলল,
— ইমরান ফিরে এসেছে! তাহলে এতদিন পর সবকিছু আবার শুরু হবে?
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি মেসেজ এল।
“তুমি যা জানো, তার অর্ধেকও সত্য নয়। নীরাকে নিয়ে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিও না।”
তৃষা মেসেজটি পড়ে রেগে গেল।
— কে আমাকে এসব পাঠাচ্ছে?
সে নম্বরে কল করল। কিন্তু ফোন বন্ধ।
তৃষা এবার বুঝতে পারল, এই রহস্যে শুধু নীরা আর আরিয়ানের পরিবার নয়, আরও কেউ জড়িয়ে আছে।
সন্ধ্যা।
নীরা বাসায় ফিরে দেখে সামিরা খালা এসেছেন। তাঁকে দেখে নীরা অবাক হলো।
— খালা! তুমি এখানে?
সামিরা নীরার হাত ধরে বললেন,
— তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
রাশেদও ঘরে এসে বসলেন।
সামিরা ধীরে বললেন,
— ইমরান আমাকে আজ ফোন করেছিল।
রাশেদ চমকে উঠলেন।
— তোমাকেও?
— হ্যাঁ। সে বলেছে, কাল আমাদের সঙ্গে দেখা করতে চায়।
নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
— সে কি বলেছে, কেন এত বছর লুকিয়ে ছিল?
সামিরা মাথা নাড়লেন।
— না। শুধু বলেছে, নীরার জন্মের আগের রাতের সত্য সে জানে।
নীরা এবার বাবার দিকে তাকাল।
— বাবা, আমার জন্মের আগের রাতে এমন কী হয়েছিল?
রাশেদ উত্তর দেওয়ার আগেই সামিরা বললেন,
— সেদিন রাতে তোর মা হাসপাতালে ছিলেন। আর ঠিক সেই সময় মাহমুদ ভাইয়ের গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়।
নীরা অবাক হয়ে গেল।
— আমার জন্ম আর সেই দুর্ঘটনা একই রাতে হয়েছিল?
সামিরা মাথা নেড়ে বললেন,
— হ্যাঁ। আর সেই রাতেই এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যার কারণে দুই পরিবার আলাদা হয়ে যায়।
রাশেদ এবার দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
— কাল ইমরানের সঙ্গে দেখা হলে সব পরিষ্কার হবে।
রাত ১০টা।
আরিয়ান নিজের ঘরে বসে ছিল। হঠাৎ ফোনে একটি কল এল।
অচেনা নম্বর।
— হ্যালো?
ওপাশ থেকে পরিচিত অথচ বহু বছর শোনা হয়নি এমন একটি কণ্ঠ ভেসে এল।
— আরিয়ান, আমি ইমরান বলছি।
আরিয়ান উঠে দাঁড়াল।
— আপনি কোথায়? এত বছর কোথায় ছিলেন?
ইমরান বললেন,
— সব প্রশ্নের উত্তর কাল পাবে। তবে তার আগে একটা কথা বলি।
— কী কথা?
— নীরাকে সাবধানে রেখো। মেয়েটা কিছুই জানে না। অথচ এত বছরের পুরোনো রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সে নিজেই।
আরিয়ানের কণ্ঠ কঠিন হয়ে গেল।
— নীরার কী হয়েছে? ওর কোনো বিপদ আছে?
ইমরান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— বিপদটা নীরার নয়, আরিয়ান। বিপদ তাদের জন্য, যারা এত বছর ধরে সত্য লুকিয়ে রেখেছে।
কল কেটে গেল।
আরিয়ান ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর জানালার বাইরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“এবার সত্যটা জানতেই হবে।”
কিন্তু সে জানত না, পরদিন ইমরানের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তার নিজের জীবন সম্পর্কেও এমন একটি সত্য প্রকাশ পাবে, যা সে কখনো কল্পনাও করেনি।
চলবে…