শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
১২তম পর্ব: বিশ্বাসঘাতক কে?
সকাল থেকেই মাহমুদ রহমানের মনে অস্থিরতা কাজ করছে।
আজ বহু বছর পর তিনি রাশেদ রহমানের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। যে মানুষটির সঙ্গে একসময় নিজের ভাইয়ের মতো সম্পর্ক ছিল, আজ সেই মানুষটির সঙ্গে কথা বলতেও তাঁর বুক ভারী হয়ে আসছে।
আরিয়ান বাবার পাশে এসে দাঁড়াল।
— বাবা, তৈরি?
— হ্যাঁ। চল।
— একটা কথা বলব?
— বল।
— আজ যেন কোনো কথা লুকাবেন না। এত বছর ধরে আমরা সবাই ভুল ধারণা নিয়ে বেঁচে আছি।
মাহমুদ ছেলের দিকে তাকালেন।
— আজ আর কিছু লুকাব না।
দুপুর বারোটা।
রাশেদ রহমানের বাড়ির বসার ঘরে সবাই উপস্থিত।
রাশেদ, মাহমুদ, আরিয়ান, নীরা এবং সামিরা।
নিহারিকাও আসার কথা ছিল, কিন্তু এখনো তাঁর কোনো খবর নেই।
মাহমুদ রাশেদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
— রাশেদ, কেমন আছ?
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। এত বছর পর আমার কথা মনে পড়ল?
মাহমুদ মাথা নিচু করলেন।
— আমি জানি, আমার ক্ষমা চাওয়ার কোনো অধিকার নেই। তবুও আজ বলতে চাই, আমাকে ক্ষমা করে দিও।
রাশেদ তিক্ত হেসে বললেন,
— ক্ষমা চাওয়া সহজ, মাহমুদ। কিন্তু যে অপমান আমি আর আমার পরিবার সহ্য করেছি, সেটা কি এত সহজে ভুলে যাওয়া যায়?
— জানি। সেদিন আমি তোমার কথা বিশ্বাস করিনি। অন্যের কথায় তোমাকে দোষী ভেবেছিলাম।
— শুধু দোষী ভাবোনি। সবাইকে জানিয়েছিলে, আমি তোমাদের কোম্পানির টাকা আত্মসাৎ করেছি।
মাহমুদ চোখ বন্ধ করলেন।
— আমি ভুল করেছিলাম।
নীরা বাবার পাশে বসে সব শুনছিল। সে বুঝতে পারছিল, এই দুই মানুষের মধ্যে কত বছরের জমে থাকা কষ্ট।
আরিয়ান নীরার দিকে তাকিয়ে আবার বাবার দিকে মনোযোগ দিল।
মাহমুদ বললেন,
— আমি এখন জানি, সেই হিসাবের কাগজগুলো তুমি সরাওনি। সেগুলো পরিবর্তন করা হয়েছিল।
রাশেদ অবাক হয়ে বললেন,
— তুমি কীভাবে জানলে?
— ইমরান আমাকে কিছু প্রমাণ দিয়েছে।
— তাহলে আসল অপরাধী কে?
মাহমুদ উত্তর দেওয়ার আগেই সামিরা বললেন,
— সেই প্রশ্নের উত্তরই তো এত বছর ধরে আমরা খুঁজছি।
ঠিক তখনই দরজার কলিংবেল বেজে উঠল।
নীরা দরজা খুলতেই দেখতে পেল নিহারিকা দাঁড়িয়ে আছেন।
— ফুফু! আপনি এসেছেন?
নিহারিকা ঘরে ঢুকে সবার দিকে তাকালেন।
— দেরি হয়ে গেল। কিছু জরুরি কাজ ছিল।
মাহমুদ উঠে দাঁড়ালেন।
— নিহারিকা, তুই এসেছিস?
নিহারিকা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— এত বছর পর তোমাদের সবাইকে একসঙ্গে দেখে ভালো লাগছে।
মাহমুদ ধীরে বললেন,
— এবার সব সত্য বলার সময় এসেছে।
নিহারিকা সোফায় বসলেন।
— তাহলে শোনো। সেই রাতে ইমরান আমাকে জানিয়েছিল, কোম্পানির হিসাবের কিছু নথি ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে। সে জানত, এর পেছনে একজন প্রভাবশালী মানুষ জড়িত।
রাশেদ প্রশ্ন করলেন,
— কে সেই মানুষ?
নিহারিকা মাথা নিচু করলেন।
— নামটা বলার আগে একটা প্রমাণ দেখাতে চাই।
তিনি ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো চিঠি বের করলেন।
চিঠির ওপর লেখা ছিল—
“ব্যক্তিগত — মাহমুদ রহমানের জন্য।”
মাহমুদ চিঠিটা হাতে নিলেন।
চিঠির ভেতরে লেখা—
“আপনার প্রতিষ্ঠানের সব হিসাব আমার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রাশেদ রহমানকে দোষী প্রমাণ করতে বেশি সময় লাগবে না। ইমরান যদি মুখ খোলে, তাহলে তাকেও সরিয়ে দেওয়া হবে।”
মাহমুদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— এই চিঠি তুই কোথায় পেলি?
নিহারিকা বললেন,
— ইমরান আমাকে দিয়েছিল। দুর্ঘটনার আগের দিন।
আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,
— তাহলে ইমরান সব জানত?
— হ্যাঁ। কিন্তু দুর্ঘটনার পর সে নিখোঁজ হয়ে যায়। আর চিঠিটা আমি এত বছর নিজের কাছে রেখেছিলাম।
রাশেদ কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলেন।
— কিন্তু এখানে তো কারও নাম নেই!
নিহারিকা মাথা নেড়ে বললেন,
— কারণ নামটা আলাদা একটি পাতায় লেখা ছিল।
— সেই পাতাটা কোথায়?
নিহারিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
— আমার কাছে নেই।
নীরা এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার সে বলল,
— ফুফু, আপনি যদি সব জানতেন, তাহলে এত বছর আমাদের কিছু বলেননি কেন?
নিহারিকার চোখ ভিজে উঠল।
— আমি ভয় পেয়েছিলাম, মা। তখন আমার নিজের জীবনেও অনেক সমস্যা চলছিল। ইমরান নিখোঁজ হওয়ার পর আমিও বিপদে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, চুপ থাকলেই সবাই নিরাপদ থাকবে।
নীরা শান্ত গলায় বলল,
— কিন্তু আপনার নীরবতায় আমার বাবা এত বছর কষ্ট পেয়েছেন।
নিহারিকা নীরার হাত ধরলেন।
— আমি জানি। আমার ভুলের জন্য তোর বাবার কাছে ক্ষমা চাইছি।
রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— অতীত বদলানো যাবে না। তবে এবার সত্যটা বের করা দরকার।
অন্যদিকে, তৃষা নিজের ঘরে বসে ফোনে কথা বলছিল।
— তুমি নিশ্চিত, তারা সবাই একসঙ্গে দেখা করেছে?
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
— হ্যাঁ। মাহমুদ, রাশেদ, আরিয়ান, নীরা এবং সামিরা—সবাই সেখানে ছিল।
তৃষা বিরক্ত হয়ে বলল,
— তাহলে তো ব্যাপারটা আরও জটিল হচ্ছে।
— আপনার কী মনে হয়, পুরোনো ফাইলটা তাদের হাতে পৌঁছেছে?
তৃষা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
— ফাইলটা যদি তারা পেয়ে যায়, তাহলে অনেক কিছু প্রকাশ হয়ে যাবে।
— তাহলে এখন কী করব?
তৃষা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আগে জানতে হবে, নিহারিকা আসলে কী কী জানে।
সন্ধ্যায় আরিয়ান নীরাকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিল।
গাড়ি থেকে নামার আগে নীরা বলল,
— আজকের জন্য ধন্যবাদ।
— ধন্যবাদ কেন?
— আপনার বাবা আজ আমার বাবার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। এত বছর পর হলেও এটা অনেক বড় ব্যাপার।
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
— হয়তো এখন থেকে সবকিছু ঠিক হতে শুরু করবে।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— একটা কথা বলব?
— বলুন।
— আপনি সবসময় এত গম্ভীর থাকেন কেন?
আরিয়ান হালকা হেসে ফেলল।
— আবার সেই প্রশ্ন!
— উত্তরটা তো আজও পেলাম না।
— হয়তো কিছু উত্তর সময়ের সঙ্গে পাওয়া যায়।
নীরা হেসে গাড়ি থেকে নেমে গেল।
আরিয়ান গাড়ি চালু করার আগে একবার পেছনে তাকাল। মেয়েটির মুখে আজ অনেকদিন পর স্বস্তির হাসি দেখা যাচ্ছে।
রাত সাড়ে দশটা।
নিহারিকা নিজের ঘরে বসে ছিলেন। হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো।
তিনি দরজা খুলতেই একজন অচেনা লোককে দেখতে পেলেন।
লোকটি একটি ছোট খাম এগিয়ে দিল।
— আপনার জন্য।
— কে পাঠিয়েছে?
— সেটা বলা নিষেধ।
নিহারিকা খামটা খুললেন।
ভেতরে একটি কাগজ।
তাতে লেখা—
“পুরোনো চিঠি দেখিয়েছেন, এবার পুরোনো ছবিটাও দেখাতে হবে। নইলে সত্য কখনো সম্পূর্ণ হবে না।”
নিহারিকার হাত কেঁপে উঠল।
তিনি আলমারির ভেতর থেকে একটি ছোট বাক্স বের করলেন।
বাক্সে রাখা ছবিটা হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
— এত বছর ধরে এই ছবিটাই লুকিয়ে রেখেছি। কিন্তু এবার আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মাহমুদ, রাশেদ, ইমরান এবং আরও একজন মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন।
কিন্তু ছবির পেছনে লেখা নামটি দেখে নিহারিকার চোখ বড় হয়ে গেল।
“সাদমান আহমেদ।”
নীরা যে ছেলেটির বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল, সেই সাদমানের বাবার নামও কি এই রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে?
নিহারিকা দ্রুত সামিরাকে ফোন করলেন।
— সামিরা, আমাদের বড় বিপদ হতে পারে।
— কেন? কী হয়েছে?
— আমি বুঝতে পেরেছি, এত বছরের ঘটনার পেছনে কার হাত ছিল।
— কে?
নিহারিকা কাঁপা গলায় বললেন,
— সাদমানের বাবা!
চলবে…