শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
১৩তম পর্ব: মুখোশের আড়ালে
রাত প্রায় বারোটা।
নিহারিকা হাতে পুরোনো ছবিটা নিয়ে বসে আছেন। ছবিতে মাহমুদ, রাশেদ, ইমরান এবং সাদমানের বাবা—কামাল আহমেদ।
এত বছর ধরে তিনি ছবিটা লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এখন আর চুপ থাকার সুযোগ নেই।
তিনি সামিরাকে ফোন করলেন।
— সামিরা, সাদমানের বাবার নামটা মনে আছে?
— হ্যাঁ। কামাল আহমেদ।
— সেই মানুষটাই আমাদের সবকিছুর পেছনে ছিল।
সামিরা অবিশ্বাসের সুরে বললেন,
— তুমি নিশ্চিত?
— ছবিটা আমার কাছে আছে। আর একটা পুরোনো চিঠিও পেয়েছি। কাল তোকে সব দেখাব।
— কিন্তু নীরাকে এখনই কিছু বলবি না। মেয়েটা এমনিতেই অনেক চিন্তায় আছে।
নিহারিকা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— জানি। কিন্তু এবার সত্যিটা প্রকাশ করতেই হবে।
পরদিন সকাল।
নীরা অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। এমন সময় মা এসে বললেন,
— মা, একটা কথা বলব?
— বলো।
— সাদমানের পরিবার থেকে আবার ফোন করেছে। তারা নাকি আগের প্রস্তাবের ব্যাপারে কথা বলতে চায়।
নীরা বিরক্ত হয়ে বলল,
— মা, আমি তো আগেই না করেছি।
— আমি জানি। কিন্তু এবার তারা তোর বাবার সঙ্গেও কথা বলতে চায়।
— কী নিয়ে?
— সেটা বলেনি।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— মা, আমি এখন বিয়ে নিয়ে ভাবতে চাই না। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।
মা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
— আমরা তোকে কোনো বিষয়ে জোর করব না।
নীরা মায়ের হাত ধরে হাসল।
— এটাই আমার সবচেয়ে বড় ভরসা।
অফিসে পৌঁছাতেই মেহের নীরাকে ডাকল।
— নীরা, তোর জন্য একটা খবর আছে!
— কী খবর?
— আজ আমাদের কোম্পানির নতুন একটা প্রজেক্টের ঘোষণা হবে। শুনেছি, তোর প্রস্তাবিত আইডিয়াটাও বিবেচনায় আছে।
নীরা খুশি হয়ে বলল,
— সত্যি?
— হ্যাঁ! তবে তুই এখনো জানিস না, স্যার তোর কাজ নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট।
ঠিক তখনই আরিয়ান কেবিন থেকে বেরিয়ে এল।
— মিস নীরা, একটু আসবেন?
নীরা কেবিনে ঢুকল।
আরিয়ান একটি ফাইল এগিয়ে দিল।
— আপনার প্রজেক্টের প্রস্তাবটি বোর্ডের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা ভালো।
নীরার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— সত্যি স্যার? অনেক ধন্যবাদ!
— ধন্যবাদ আমাকে নয়, নিজের পরিশ্রমকে দিন।
নীরা হেসে বলল,
— আপনি কি কখনো কাউকে প্রশংসা করতে পারেন না?
আরিয়ান মৃদু হাসল।
— পারি। তবে সবসময় প্রকাশ করি না।
— বুঝলাম। আপনার প্রশংসাও মনে হয় কোম্পানির বাজেটের মতো সীমিত!
আরিয়ান এবার হেসে ফেলল।
— আপনার কথার জবাব দেওয়া সত্যিই কঠিন।
নীরা কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। আরিয়ান কিছুক্ষণ তার হাসিমাখা মুখের কথা ভাবল।
দুপুরে তৃষা অফিসে এল।
সে সরাসরি আরিয়ানের কেবিনে ঢুকল।
— আরিয়ান, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
— বলো।
— তুমি কি জানো, নীরা আর সাদমানের পরিবারের মধ্যে আবার যোগাযোগ হচ্ছে?
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— তুমি এসব কোথায় শুনলে?
— সাদমানের বাবা আমার বাবার পরিচিত। তাঁদের সঙ্গে আমাদের পরিবারেরও যোগাযোগ আছে।
আরিয়ান এবার একটু গম্ভীর হলো।
— তাতে আমার কী করার আছে?
তৃষা বিরক্ত হয়ে বলল,
— তুমি কি সত্যিই বুঝতে পারছ না? এই মেয়েটাকে ঘিরে তোমাদের দুই পরিবারের মধ্যে কত ঝামেলা হচ্ছে?
— নীরাকে নিয়ে অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য করবে না, তৃষা।
— তুমি কি ওর পক্ষ নিচ্ছ?
— আমি অন্যায় কথার পক্ষ নিই না। আর নীরা আমার একজন কর্মী। তার সম্মান রক্ষা করা আমার দায়িত্ব।
তৃষা আর কিছু না বলে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু তার মনে সন্দেহ আরও বেড়ে গেল।
বিকেল পাঁচটা।
নিহারিকার বাসায় সামিরা এসে পৌঁছালেন।
নিহারিকা টেবিলের ওপর ছবিটা রাখলেন।
— দেখ।
সামিরা ছবিটা হাতে নিয়ে বললেন,
— এটা তো সেই সময়ের ছবি!
— হ্যাঁ। আর পেছনের লেখাটা পড়।
ছবির পেছনে লেখা ছিল—
“ব্যবসার নতুন অংশীদারদের সঙ্গে—মাহমুদ, রাশেদ, ইমরান ও কামাল।”
সামিরা চিন্তিত হয়ে বললেন,
— তাহলে কামাল আহমেদও সেই ব্যবসার অংশীদার ছিলেন?
— শুধু অংশীদার নয়। কোম্পানির আর্থিক হিসাবের দায়িত্বও তাঁর হাতে ছিল।
— তাহলে নথিগুলো পরিবর্তন করার সুযোগ তাঁরই ছিল!
নিহারিকা মাথা নাড়লেন।
— ঠিক তাই। কিন্তু আমাদের কাছে এখনও চূড়ান্ত প্রমাণ নেই।
সামিরা বললেন,
— ইমরান কি কিছু জানে?
— জানে। কিন্তু সে সবকিছু প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছে।
— কেন?
নিহারিকা নিচু গলায় বললেন,
— কারণ কামাল আহমেদের হাতে এখনও এমন কিছু তথ্য আছে, যা প্রকাশ হলে অনেক মানুষের ক্ষতি হতে পারে।
সন্ধ্যায় আরিয়ান বাড়ি ফিরে বাবার সঙ্গে দেখা করল।
— বাবা, কামাল আহমেদ সম্পর্কে কিছু বলবেন?
মাহমুদ রহমানের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
— কেন জানতে চাইছিস?
— কারণ তিনি সাদমানের বাবা। আর নিহারিকা ফুফুর কাছে তাঁর সঙ্গে আপনার, রাশেদ আঙ্কেল ও ইমরানের একটি ছবি আছে।
মাহমুদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— কামাল একসময় আমাদের ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল। কিন্তু তার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার সন্দেহ হয়েছিল।
— আপনি কি জানতেন সে হিসাবের নথি পরিবর্তন করতে পারে?
— সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু প্রমাণ পাইনি।
আরিয়ান বলল,
— তাহলে এবার প্রমাণ খুঁজতে হবে।
মাহমুদ মাথা নেড়ে বললেন,
— সাবধানে এগোতে হবে। কামাল খুব সহজ মানুষ নয়।
রাত আটটা।
নীরা বাসায় বসে ছিল। হঠাৎ তার ফোনে একটি কল এল।
সাদমান।
নীরা কিছুক্ষণ ভেবে কল রিসিভ করল।
— হ্যালো।
— আসসালামু আলাইকুম, নীরা। কেমন আছ?
— ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভালো আছি। বলুন।
— অনেক দিন কথা হয় না। তোমার বাবার সঙ্গে আমার বাবা দেখা করতে চান।
— কী বিষয়ে?
— পুরোনো কিছু ব্যবসায়িক বিষয় নিয়ে। আর একটা কথা ছিল, তোমার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে চাই।
নীরা স্পষ্ট গলায় বলল,
— সাদমান সাহেব, আমি আগেও বলেছি, এখন বিয়ে বা সম্পর্ক নিয়ে ভাবছি না। আশা করি আপনি বিষয়টা বুঝবেন।
সাদমান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— বুঝেছি। তোমাকে কোনো চাপ দিতে চাই না। তবে একটা কথা জানিয়ে রাখি, আমার বাবা তোমার পরিবারের পুরোনো পরিচিত।
নীরা অবাক হলো।
— কীভাবে?
— সেটা বাবা নিজেই বলবেন।
কল শেষ হয়ে গেল।
নীরা এবার বুঝতে পারল, সাদমানের পরিবারকে ঘিরে যে রহস্য তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে তার নিজের পরিবারেরও সম্পর্ক রয়েছে।
রাত এগারোটা।
কামাল আহমেদ নিজের স্টাডি রুমে বসে ছিলেন। সামনে পুরোনো একটি ফাইল।
ফোন বেজে উঠল।
— হ্যালো, স্যার।
— কী খবর?
— মাহমুদ সাহেব পুরোনো বিষয়গুলো নিয়ে খোঁজখবর শুরু করেছেন। আর নিহারিকাও সামিরার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
কামাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
— ইমরান কি তাদের সঙ্গে দেখা করেছে?
— জি।
কামাল ফাইলটা বন্ধ করলেন।
— তাহলে এত বছর পরও সে থামেনি।
— এখন কী করবেন?
কামাল ঠান্ডা গলায় বললেন,
— আগে জানতে হবে, নীল ফাইলের বাকি পাতাগুলো কোথায় আছে।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে সাদমানের কণ্ঠ শোনা গেল।
— বাবা, ভেতরে আসব?
কামাল দ্রুত ফাইলটা ড্রয়ারে রেখে দিলেন।
— আয়।
সাদমান ঘরে ঢুকে বলল,
— বাবা, নীরার পরিবারের সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক?
কামাল ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— কিছু পুরোনো হিসাব আছে, বাবা। সেগুলো মিটিয়ে নিতে হবে।
সাদমান আবার প্রশ্ন করল,
— আর নীরা?
কামালের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— নীরাকে নিয়ে এখন কোনো সিদ্ধান্ত নেবি না।
— কেন?
কামাল জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
— কারণ মেয়েটি যতটা সাধারণ মনে হয়, তার জীবন ততটা সাধারণ নয়।
সাদমান বাবার কথার অর্থ বুঝতে পারল না।
কিন্তু কামাল জানতেন, অতীতের যে দরজাটি এত বছর বন্ধ ছিল, সেটি খুলে গেলে তাঁর নিজের পরিবারও আর আগের মতো থাকবে না।
চলবে…