শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
১৬তম পর্ব: হারিয়ে যাওয়া সাক্ষী
ইমরান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
গাড়ির ভেতরে বসে থাকা মানুষটি আর কেউ নন, মাহমুদ রহমান।
কিন্তু তাঁকে দেখে ইমরান এতটা অবাক হলেন কেন?
নিহারিকা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,
“ইমরান, কী হয়েছে? তুমি এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?”
ইমরান ধীরে বললেন,
“মাহমুদ এখানে কেন এসেছে, সেটা বুঝতে পারছি না। কিছুক্ষণ আগেই তো ওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।”
নিহারিকা জানালার কাছে এসে দাঁড়ালেন।
“হয়তো কোনো জরুরি কাজে এসেছে।”
“হতে পারে। কিন্তু নীল ফাইলের শেষ পাতাটা দেখার পর আমার মনে হচ্ছে, ওকে সবকিছু জানানো উচিত হবে না।”
ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
ইমরান দরজা খুললেন।
সামনে মাহমুদ।
“ভেতরে আসতে পারি?”
ইমরান একটু সরে দাঁড়ালেন।
“আসুন।”
মাহমুদ ঘরে ঢুকে প্রথমেই নীল ফাইলটির দিকে তাকালেন।
“তোমরা কি কিছু খুঁজে পেয়েছ?”
ইমরান সরাসরি প্রশ্ন করলেন,
“আপনি কি জানতেন, ওই ফাইলের শেষ পাতায় একজন সাক্ষীর নাম ছিল?”
মাহমুদ চুপ করে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর বললেন,
“জানতাম। কিন্তু নামটা আমি নিজেও অনেক বছর ধরে দেখিনি।”
নিহারিকা অবাক হয়ে বললেন,
“তাহলে আপনি জানেন সাক্ষী কে?”
মাহমুদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“নামটা বলার আগে তোমাদের একটা ঘটনা জানতে হবে।”
আঠারো বছর আগের কথা।
রহমান গ্রুপের ব্যবসা তখন বেশ ভালো চলছিল। মাহমুদ, রাশেদ, ইমরান এবং কামাল—চারজন মিলে ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন।
কিন্তু একসময় হিসাবের কাগজে বড় ধরনের গরমিল দেখা দেয়।
রাশেদ বুঝতে পারেন, কোম্পানির কিছু টাকা অনুমতি ছাড়া অন্য জায়গায় পাঠানো হয়েছে। তিনি বিষয়টি মাহমুদকে জানান।
ইমরানও হিসাব পরীক্ষা করে একই ধরনের অসংগতি খুঁজে পান।
কামাল তখন বলেছিলেন,
“এটা সাময়িক ভুল। আমি সব ঠিক করে দেব।”
কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যায়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিতে রাশেদের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। অভিযোগ ওঠে, তিনিই টাকা সরানোর অনুমতি দিয়েছিলেন।
রাশেদ বারবার নিজের নির্দোষতার কথা বললেও কেউ তাঁর কথা বিশ্বাস করেনি।
শুধু একজন মানুষ জানতেন, নথিগুলোর পেছনে অন্য গল্প আছে।
সেই মানুষটিই ছিলেন শেষ পাতার সাক্ষী।
বর্তমানে ফিরে এসে মাহমুদ বললেন,
“সেই সাক্ষী ছিলেন আমাদের অফিসের পুরোনো হিসাবরক্ষক, আবদুল করিম।”
ইমরান অবাক হয়ে গেলেন।
“করিম সাহেব? উনি তো অনেক আগেই চাকরি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন!”
“হ্যাঁ। ঘটনার কিছুদিন পরই তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। আমি ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো সবকিছু ভুলে গেছেন।”
নিহারিকা বললেন,
“তাহলে তাঁকে খুঁজে বের করতে হবে।”
মাহমুদ মাথা নাড়লেন।
“আমি অনেক বছর আগে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তাঁর কোনো ঠিকানা পাইনি।”
ইমরান নীল ফাইলটি বন্ধ করে বললেন,
“এবার তাঁকে খুঁজতেই হবে। কারণ তাঁর সাক্ষ্য ছাড়া সবকিছু প্রমাণ করা কঠিন হবে।”
পরদিন সকাল।
সাদমান নিজের ঘরে বসে ছিল। আগের রাতের ঘটনা তার মাথা থেকে কিছুতেই সরছিল না।
সে বাবার কাছে আবারও সত্য জানতে চেয়েছিল, কিন্তু কামাল কোনো উত্তর দেননি।
হঠাৎ তার ফোনে একটি মেসেজ এল।
অপরিচিত নম্বর থেকে লেখা—
“আপনার বাবার পুরোনো ব্যবসার হিসাব নিয়ে জানতে চাইলে আবদুল করিমের খোঁজ করুন।”
সাদমান মেসেজটি কয়েকবার পড়ল।
আবদুল করিম!
নামটি তার কাছে নতুন।
সে সঙ্গে সঙ্গে নীরাকে ফোন করল।
“নীরা, একটা খবর পেয়েছি।”
“কী খবর?”
“আবদুল করিম নামে একজন পুরোনো হিসাবরক্ষকের কথা জানতে পেরেছি। মনে হচ্ছে, তিনি তোমার বাবার মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হতে পারেন।”
নীরা অবাক হয়ে বলল,
“এই নামটা আমিও প্রথম শুনছি। তুমি কীভাবে জানলে?”
“একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে।”
নীরা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
“তাহলে আমাদের আরিয়ান সাহেবকে জানানো উচিত।”
অন্যদিকে, আরিয়ান তখন অফিসে বসে একটি পুরোনো নথি পরীক্ষা করছিলেন।
নীরা ও সাদমানের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাফিকে ডাকলেন।
“রাফি, আবদুল করিম নামে আমাদের পুরোনো কোনো কর্মচারীর তথ্য পাওয়া যায় কি না খুঁজে দেখো।”
রাফি বলল,
“জি, স্যার। চেষ্টা করছি।”
আরিয়ান আরও বললেন,
“তবে সবকিছু আইনসম্মতভাবে করবে। কারও ব্যক্তিগত তথ্য অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করবে না।”
রাফি মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ানের ফোন বেজে উঠল।
ফোনের ওপাশে নীরা।
“স্যার, একটা কথা বলব?”
“বলুন।”
“আপনার কি মনে হয়, এত বছর পর সত্যিই সবকিছু প্রমাণ করা সম্ভব?”
আরিয়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
“সব সত্যের প্রমাণ একসঙ্গে পাওয়া যায় না, নীরা। তবে চেষ্টা করলে অনেক পুরোনো প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া সম্ভব।”
নীরা নরম কণ্ঠে বলল,
“আমি শুধু চাই, আমার বাবাকে আর কেউ ভুল না বুঝুক।”
“আমি বুঝতে পারছি। আর এবার কাউকে অনুমান করে দোষী করা হবে না।”
সেদিন বিকেলে কামাল আহমেদ নিজের পড়ার ঘরে বসে ছিলেন।
সাদমানের ফোনে আসা মেসেজের কথা তিনি জানতেন না। তবে তিনি বুঝতে পারছিলেন, পুরোনো বিষয়গুলো আবার সামনে আসছে।
হঠাৎ তাঁর ফোনে একটি কল এল।
“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে একজন বলল,
“স্যার, আবদুল করিমের নাম আবার সামনে এসেছে।”
কামাল চুপ করে গেলেন।
“কে খোঁজ করছে?”
“এখনো নিশ্চিত নই। তবে মাহমুদ সাহেব, ইমরান এবং আরিয়ান সাহেব পুরোনো নথি নিয়ে কাজ করছেন।”
কামাল চোখ বন্ধ করলেন।
“করিমকে খুঁজে বের করার আগেই আমাকে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
“কিন্তু স্যার, তাঁর বর্তমান ঠিকানা—”
“যেভাবেই হোক, খবর বের করো।”
ফোন কেটে দিয়ে কামাল টেবিলের ড্রয়ার খুললেন।
সেখানে একটি পুরোনো খাম রাখা ছিল।
খামের ওপর লেখা—
“আবদুল করিমের ব্যক্তিগত চিঠি।”
কামাল খামটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ফিসফিস করে বললেন,
“এত বছর পরও তুমি আমাকে শান্তিতে থাকতে দিলে না, করিম!”
রাত।
নীরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে বাবার পুরোনো ডায়েরি।
হঠাৎ তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
“হ্যালো?”
একজন বৃদ্ধ মানুষের কণ্ঠ শোনা গেল।
“তুমি কি নীরা রহমান?”
“জি। আপনি কে বলছেন?”
“আমার নাম আবদুল করিম। তোমার বাবার সঙ্গে আমার একসময় কাজ করার সুযোগ হয়েছিল।”
নীরার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
“আপনি কি সেই পুরোনো ঘটনার কিছু জানেন?”
বৃদ্ধ মানুষটি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
“আমি শুধু ঘটনা জানি না, মা। আমি নিজের চোখে সেই কাগজে স্বাক্ষর হতে দেখেছিলাম।”
নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
“কার স্বাক্ষর?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
“কামাল আহমেদের।”
নীরা যেন কথা হারিয়ে ফেলল।
ঠিক তখনই বৃদ্ধ মানুষটি আরও একটি কথা বললেন—
“তবে একটা বিষয় তোমাকে জানানো দরকার। ওই কাগজে শুধু কামালের স্বাক্ষর ছিল না। তার পাশে আরেকজনের স্বাক্ষরও ছিল।”
“কে তিনি?”
বৃদ্ধের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“সেই নামটা শুনলে তুমি হয়তো বিশ্বাস করতে পারবে না।”
নীরা উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল,
“দয়া করে বলুন!”
কিন্তু বৃদ্ধ মানুষটি শুধু বললেন—
“আগামীকাল দেখা হলে সব বলব। আর একটা কথা, কাউকে এখনই এই ফোনের কথা জানিয়ো না।”
কল কেটে গেল।
নীরা ফোনটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর সে বাবার ঘরের দিকে তাকাল।
সাক্ষীর পাশে দ্বিতীয় স্বাক্ষরটি কার ছিল?
আর সেই নাম শুনলে নীরা কেন বিশ্বাস করতে পারবে না?
চলবে…