শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
১৭তম পর্ব: দ্বিতীয় স্বাক্ষর
সারারাত নীরার চোখে ঘুম এল না।
আবদুল করিমের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।
“ওই কাগজে শুধু কামালের স্বাক্ষর ছিল না। তার পাশে আরেকজনের স্বাক্ষরও ছিল।”
কে সেই মানুষ?
মাহমুদ রহমান? নাকি অন্য কেউ?
নীরা বাবার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল, রাশেদ রহমান এখনো জেগে আছেন। হাতে পুরোনো একটি ছবি নিয়ে বসে আছেন তিনি।
নীরা ধীরে ঘরে ঢুকল।
“বাবা, ঘুমাওনি?”
রাশেদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
“তুমিও তো ঘুমাওনি। কী হয়েছে মা?”
নীরা বাবার পাশে বসে বলল,
“বাবা, আবদুল করিম নামে একজনের কথা শুনেছ?”
ছবিটি রাশেদের হাত থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“আবদুল করিম?”
“হ্যাঁ। তিনি নাকি তোমাদের অফিসে কাজ করতেন।”
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
“করিম সাহেব অনেক সৎ মানুষ ছিলেন। সেই ঘটনার পর তিনি চাকরি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তারপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।”
নীরা এবার সরাসরি বলল,
“তিনি আমাকে ফোন করেছিলেন। বলেছেন, পুরোনো একটি কাগজে কামাল আহমেদের পাশাপাশি আরেকজনের স্বাক্ষর ছিল।”
রাশেদের মুখের ভাব বদলে গেল।
“তিনি কি নাম বলেছেন?”
“না। আগামীকাল দেখা করতে বলেছেন।”
রাশেদ মেয়ের হাত ধরে বললেন,
“মা, কাল দেখা করতে গেলে একা যেও না। আর কোনো কাগজে না বুঝে স্বাক্ষর করবে না।”
নীরা বাবার হাত চেপে ধরল।
“চিন্তা কোরো না বাবা। এবার সত্যটা জানতেই হবে।”
পরদিন সকাল।
আরিয়ানকে সবকিছু জানাল নীরা।
আরিয়ান বললেন,
“আমি তোমার সঙ্গে যাব। তবে আগে করিম সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখা করার জায়গাটা নিশ্চিত করি।”
নীরা মাথা নাড়ল।
“সাদমানকেও জানানো উচিত। ওর কাছ থেকেও অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে।”
আরিয়ান কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
“ঠিক আছে। তবে মনে রেখো, আমরা কাউকে আগেভাগে দোষী ভাবব না।”
দুপুরে তারা একটি ছোট্ট রেস্টুরেন্টে পৌঁছাল।
একটি জানালার পাশে বসে ছিলেন আবদুল করিম। বয়সের ভারে চেহারায় ক্লান্তি থাকলেও চোখে স্পষ্ট দৃঢ়তা।
নীরা সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“আপনি কি আবদুল করিম সাহেব?”
বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।
“তুমিই নীরা?”
“জি।”
করিম সাহেব বসতে ইশারা করলেন।
“তোমার বাবার কথা অনেক শুনেছি। মানুষটা অন্যায়ভাবে অনেক কষ্ট পেয়েছে।”
নীরা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
“আপনি কি জানেন, আসলে কী হয়েছিল?”
করিম সাহেব ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো কাগজ বের করলেন।
“এটা সেই নথির ফটোকপি। আসল কাগজ আমার কাছে নেই। তবে এই কপিতে দুজনের স্বাক্ষর পরিষ্কার দেখা যায়।”
আরিয়ান কাগজটি হাতে নিয়ে পরীক্ষা করলেন।
প্রথম স্বাক্ষর—কামাল আহমেদ।
দ্বিতীয় স্বাক্ষরটি দেখে তিনি থমকে গেলেন।
“এটা তো…”
নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
“কাকে চিনতে পেরেছেন?”
আরিয়ান কিছুক্ষণ কাগজটির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“মাহমুদ রহমান।”
নীরা যেন বিশ্বাস করতে পারল না।
“কী বলছেন আপনি? আরেকজনের স্বাক্ষর আমার বাবার অভিযোগের কাগজে কেন থাকবে?”
করিম সাহেব শান্ত গলায় বললেন,
“মা, শুধু স্বাক্ষর দেখেই পুরো ঘটনা বোঝা যাবে না। সেদিন মাহমুদ সাহেবকে বলা হয়েছিল, এটা সাধারণ হিসাবের অনুমোদনপত্র। তিনি পুরো কাগজ না পড়েই স্বাক্ষর করেছিলেন বলে আমার মনে আছে।”
আরিয়ান অবাক হয়ে বললেন,
“আপনি কি নিশ্চিত?”
“আমি তখন হিসাব বিভাগে ছিলাম। সবকিছু নিজের চোখে দেখেছি। কিন্তু পরে যখন বুঝতে পারলাম কাগজের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
নীরা ধীরে বলল,
“তাহলে বাবা আর মাহমুদ সাহেব দুজনেই কি প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন?”
করিম সাহেব উত্তর দিলেন,
“আমার ধারণা, তাই। তবে কামাল আহমেদ কেন এমন করেছিলেন, তার পুরো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।”
এদিকে কামাল আহমেদের বাড়িতে সাদমান বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেল।
“বাবা, আবদুল করিমের সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে?”
কামাল চমকে উঠলেন।
“কেন?”
“কারণ তিনি পুরোনো হিসাবের ব্যাপারে কথা বলছেন।”
কামাল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
“তুমি আবার এসবের মধ্যে জড়িয়েছ?”
“আমি শুধু সত্যটা জানতে চাই।”
কামাল রাগ সামলে বললেন,
“সাদমান, তুমি বুঝতে পারছ না। পুরোনো ঘটনা নিয়ে বেশি নাড়াচাড়া করলে অনেক মানুষের সম্মান নষ্ট হবে।”
সাদমান দৃঢ় গলায় বলল,
“যদি কেউ অন্যায় করে থাকে, তাহলে তার সম্মান রক্ষা করার দায়িত্ব আমার নয়।”
কামাল ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“তুমি কি আমাকে অপরাধী ভাবছ?”
সাদমান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“আমি এখনো কিছু জানি না। কিন্তু আপনার উত্তরগুলো আমাকে সন্দেহ করতে বাধ্য করছে।”
কামাল আর কোনো কথা বললেন না।
সন্ধ্যায় মাহমুদ রহমানের বাড়িতে সবাই একত্র হলো।
নিহারিকা, ইমরান, রাশেদ, নীরা, আরিয়ান এবং সাদমান—সবাই উপস্থিত।
আরিয়ান টেবিলে কাগজটি রাখলেন।
“এই নথিতে কামাল আহমেদের পাশাপাশি বাবার স্বাক্ষরও আছে।”
মাহমুদ কাগজটি হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
“এই কাগজে আমি স্বাক্ষর করেছিলাম?”
ইমরান বললেন,
“জি। তবে করিম সাহেবের বক্তব্য অনুযায়ী, আপনাকে বলা হয়েছিল এটি সাধারণ হিসাবের অনুমোদনপত্র।”
মাহমুদ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।
“তাহলে কামাল আমাকে ব্যবহার করেছিল!”
রাশেদ শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“আমাদের দুজনের বিশ্বাসকেই সে ব্যবহার করেছে। কিন্তু এখন আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না। আমাদের প্রমাণ দরকার।”
সাদমান এতক্ষণ চুপ করে ছিল।
হঠাৎ সে বলল,
“আমি বাবার কাছ থেকে আরও কিছু জানতে পেরেছি। তাঁর কাছে আবদুল করিমের একটি পুরোনো চিঠি আছে।”
সবাই তার দিকে তাকাল।
“চিঠি?”
সাদমান মাথা নাড়ল।
“জি। আমি নিজে দেখেছি। কিন্তু পুরোটা পড়তে পারিনি।”
ইমরান উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
“ওই চিঠিতে কী লেখা আছে, সেটা জানা খুব জরুরি।”
রাত গভীর হলো।
সবাই চলে যাওয়ার পর নীরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আরিয়ান তার পাশে এসে দাঁড়ালেন।
“আজকের ঘটনাগুলো তোমাকে খুব ভাবিয়ে তুলেছে, তাই না?”
নীরা মৃদু হাসল।
“এতদিন ভেবেছিলাম, শুধু আমার বাবাকে ভুল বোঝা হয়েছিল। এখন বুঝতে পারছি, আরও অনেক মানুষের জীবন এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।”
আরিয়ান বললেন,
“সত্য সামনে এলে হয়তো অনেক সম্পর্ক বদলে যাবে।”
নীরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সম্পর্ক সত্যের ওপর দাঁড়ালে ভাঙার ভয় থাকে না। মিথ্যার ওপর দাঁড়ালেই একদিন সবকিছু ভেঙে পড়ে।”
আরিয়ান কিছু বললেন না। শুধু নীরার কথাগুলো মন দিয়ে শুনলেন।
ঠিক তখনই সাদমানের ফোনে একটি ছবি এল।
ছবিটি কামাল আহমেদের পড়ার ঘরের সেই পুরোনো চিঠির।
ছবির নিচে লেখা—
“যে মানুষটিকে তোমরা এতদিন বিশ্বাস করেছ, সে-ই এই ঘটনার শেষ সাক্ষী।”
সাদমান ছবিটি বড় করে দেখল।
চিঠির একেবারে নিচে একটি নাম লেখা—
“নিহারিকা রহমান।”
সাদমান হতবাক হয়ে গেল।
নিহারিকা ফুফু কি তবে সব জানতেন?
আর এতদিন তিনি কেন চুপ ছিলেন?
চলবে…