ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 20

লেখক: Mafiya Queen

শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

লেখক: Mafiya Queen 👑

২০তম পর্ব: মুখোশ খুলে যাওয়ার রাত

সামিরার ঘরে তখন অদ্ভুত নীরবতা।

একদিকে কামাল আহমেদ, অন্যদিকে সামিরা। দুজনের মাঝখানে টেবিলের ওপর পড়ে আছে আঠারো বছর আগের একটি ছবি।

কামাল ধীরে বললেন,

“সামিরা, তুমি জানো না, সেই সময় আমি কী পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম।”

সামিরা দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

“নিজের ভুল ঢাকতে অন্য একজনের জীবন নষ্ট করার অধিকার তোমার ছিল না।”

কামাল বিরক্ত হয়ে বললেন,

“তুমি পুরো ঘটনা জানো না।”

“তাহলে বলো। আজ আর কিছু লুকিয়ো না।”

কামাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,

“আমি কোম্পানির কিছু টাকা অন্য একটি ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিলাম। কিন্তু সেই ব্যবসায় লোকসান হয়। বিষয়টি প্রকাশ পেলে আমার সম্মান শেষ হয়ে যেত। তাই হিসাবের কাগজে পরিবর্তন করেছিলাম।”

সামিরা বিস্মিত হয়ে তাকালেন।

“আর সেই দায় রাশেদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলে?”

কামাল মাথা নিচু করলেন।

“আমি ভেবেছিলাম, বিষয়টা সাময়িকভাবে সামলে নিতে পারব। কিন্তু পরিস্থিতি আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।”

সামিরা বললেন,

“তোমার একটি ভুলের কারণে কতগুলো মানুষ বছরের পর বছর কষ্ট পেয়েছে, সেটা কখনো ভেবেছ?”

কামাল কোনো উত্তর দিলেন না।

ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে সাদমানের কণ্ঠ শোনা গেল।

“বাবা!”

কামাল ঘুরে তাকালেন।

সাদমান ঘরে ঢুকেই বলল,

“আমি সব শুনেছি।”

সাদমান বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

“আপনি কি সত্যিই রাশেদ আঙ্কেলকে ফাঁসিয়েছিলেন?”

কামাল ক্লান্ত গলায় বললেন,

“সাদমান, সবকিছু এত সহজ নয়।”

“তাহলে আমাকে বুঝিয়ে বলুন। আমি আপনার ছেলে, কিন্তু অন্যায়ের পক্ষ নিতে পারব না।”

কামাল এবার ছেলের দিকে তাকালেন।

“আমি ভুল করেছি। কিন্তু তোমার মাকে, তোমাকে, এই পরিবারকে বাঁচানোর জন্য অনেক কিছু করতে হয়েছে।”

সাদমানের চোখে হতাশা।

“পরিবারকে বাঁচানোর জন্য অন্য একটা পরিবারকে ধ্বংস করা কি ঠিক?”

কামাল মাথা নিচু করলেন।

“আমি জানি না, কীভাবে সবকিছু ঠিক করব।”

সাদমান বলল,

“প্রথমে সত্যটা স্বীকার করুন। তারপর যাদের ক্ষতি করেছেন, তাদের কাছে ক্ষমা চান।”

কামাল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?”

সাদমান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“আপনি আমার বাবা। কিন্তু আপনার ভুলকে সঠিক বলতে পারব না।”

পরদিন সকালে মাহমুদ রহমানের বাড়িতে সবাই একত্র হলো।

রাশেদ, নীরা, আরিয়ান, নিহারিকা, ইমরান, সামিরা এবং সাদমান—সবাই উপস্থিত।

কামাল আহমেদও এলেন।

তাঁকে দেখে রাশেদ কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।

কামাল সবার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,

“আজ আমি এমন কিছু বলতে এসেছি, যা অনেক আগেই বলা উচিত ছিল।”

তিনি রাশেদের দিকে তাকালেন।

“রাশেদ, আঠারো বছর আগে কোম্পানির হিসাবের যে গরমিল হয়েছিল, তার জন্য তুমি দায়ী ছিলে না। আমি নিজের ভুল ঢাকতে তোমার স্বাক্ষর ব্যবহার করেছিলাম।”

ঘরের সবাই স্তব্ধ।

রাশেদের চোখে জমে থাকা কষ্ট যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

তিনি ধীরে বললেন,

“তুমি জানো, এই একটা মিথ্যার কারণে আমার পরিবার কত অপমান সহ্য করেছে?”

কামাল মাথা নিচু করলেন।

“জানি। আমি ক্ষমা চাইছি।”

রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“ক্ষমা চাওয়া সহজ, কামাল। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।”

কামাল চুপ করে রইলেন।

আরিয়ান এবার বললেন,

“শুধু মুখে স্বীকার করলেই হবে না। পুরোনো নথিগুলো যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে আইনগত প্রক্রিয়ায় সব সত্য প্রকাশ করতে হবে।”

কামাল মাথা নাড়লেন।

“আমি রাজি।”

ইমরান বললেন,

“তাহলে আমার কাছে থাকা কাগজগুলোও আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেব। যাতে আর কোনো সন্দেহ না থাকে।”

সবাই যখন পুরোনো হিসাবের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিল, তখন নিহারিকা চুপচাপ সামিরার পাশে বসেছিলেন।

তিনি ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,

“সামিরা, তুমি কি সত্যিই জানতেই না, কাগজগুলো কে নিয়ে গিয়েছিল?”

সামিরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

“আমি সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু নিশ্চিত ছিলাম না।”

“এখন কী মনে হচ্ছে?”

সামিরা কামালের দিকে তাকালেন।

“কামাল নিজের ভুল স্বীকার করেছে। কিন্তু কাগজগুলো হারানোর পেছনে শুধু ও ছিল কি না, সেটা এখনো পরিষ্কার নয়।”

ইমরান কথাটা শুনে বললেন,

“আমি একটা বিষয় বলতে চাই।”

সবাই তাঁর দিকে তাকাল।

“সেদিন দুর্ঘটনার আগে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজ নিরাপদ জায়গায় রেখেছিলাম। কামাল জানত না, কাগজটির একটি অনুলিপি আমার কাছে ছিল।”

আরিয়ান অবাক হয়ে বললেন,

“তাহলে সেটি কোথায়?”

ইমরান বললেন,

“আমার কাছে নেই। আমি বহু বছর আগে একজনের হাতে দিয়েছিলাম।”

নীরা জিজ্ঞেস করল,

“কার হাতে?”

ইমরান ধীরে উত্তর দিলেন,

“রাশেদের হাতে।”

সবাই এবার রাশেদের দিকে তাকাল।

রাশেদ অবাক হয়ে বললেন,

“আমার হাতে?”

ইমরান মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। দুর্ঘটনার আগের দিন আমি তোমাকে একটি খাম দিয়েছিলাম। তুমি বলেছিলে নিরাপদে রাখবে।”

রাশেদ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন,

“মনে পড়েছে! আমার পুরোনো আলমারিতে একটা খাম ছিল। কিন্তু অনেক বছর আগে বাড়ি বদলানোর সময় সেটি আর খুঁজে পাইনি।”

নীরা উত্তেজিত হয়ে বলল,

“বাবা, খামটা কি এখনো কোথাও থাকতে পারে?”

রাশেদ বললেন,

“আমি নিশ্চিত নই। তবে পুরোনো বাড়িতে আরেকটি বাক্স আছে, যেটা আমরা এখনো খুলি না।”

সেদিন বিকেলে নীরা আরিয়ানকে নিয়ে বাবার পুরোনো বাড়িতে গেল।

বাড়ির একটি ঘরে ধুলোমাখা কাঠের বাক্স রাখা ছিল।

রাশেদ বাক্সটি খুললেন।

ভেতরে পুরোনো ছবি, কিছু চিঠি এবং কয়েকটি ফাইল।

অনেক খোঁজার পর নীরা একটি বাদামি খাম পেল।

খামের ওপর লেখা—

“ইমরানের দেওয়া কাগজ—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

রাশেদ অবাক হয়ে বললেন,

“এত বছর ধরে এটা এখানেই ছিল!”

নীরা সাবধানে খামটি খুলল।

ভেতরে ছিল একটি হিসাবের নথি এবং একটি হাতে লেখা চিঠি।

চিঠিতে লেখা—

“যদি কখনো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব না হয়, তাহলে এই কাগজগুলো মাহমুদের হাতে দেবে। এখানে প্রকৃত হিসাবের বিবরণ রয়েছে। তবে শুধু কামাল নয়, আরও একজনের ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।”

নীরা চিঠির শেষ লাইনটি পড়ে থমকে গেল।

“আরও একজন?”

আরিয়ান কাগজটি হাতে নিয়ে দেখলেন।

সেখানে একটি নামের প্রথম অক্ষর লেখা ছিল—

“তৃ…”

আর কিছু বোঝা যাচ্ছে না।

ঠিক তখনই নীরার ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল—

তৃষা।

নীরা ফোন ধরতেই তৃষা বলল,

“নীরা, তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে। আমি জানি, তুমি হয়তো আমাকে বিশ্বাস করবে না। কিন্তু তোমাদের পরিবারের পুরোনো ঘটনার সঙ্গে আমার পরিবারেরও একটা সম্পর্ক আছে।”

নীরা অবাক হয়ে বলল,

“কী সম্পর্ক?”

তৃষা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

“আমার বাবার কাছে এমন একটি ছবি আছে, যেটা দেখলে তুমি বুঝতে পারবে কেন আমি এতদিন আরিয়ানের কাছ থেকে দূরে ছিলাম না।”

নীরা আরিয়ানকে একবার দেখল।

তৃষা আবার বলল,

“আগামীকাল আমার সঙ্গে দেখা করো। আমি তোমাকে সব বলব।”

ফোন কেটে গেল।

নীরা ধীরে আরিয়ানের দিকে তাকাল।

আরিয়ান গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

“মনে হচ্ছে, গল্পের আরেকটি অধ্যায় এখনো বাকি।”

নীরা হাতে থাকা চিঠিটির দিকে তাকাল।

কামালের ভুল স্বীকারের পরও রহস্য শেষ হয়নি।

বরং নতুন করে সামনে এসেছে তৃষার পরিবারের নাম।

তাহলে কি তৃষার বাবাও আঠারো বছর আগের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন?

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 20 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন