শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
২১তম পর্ব: তৃষার অজানা অতীত
পরদিন সকাল।
নীরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করছিল। মাথায় শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—তৃষার বাবার সঙ্গে আঠারো বছর আগের ঘটনার সম্পর্ক কী?
আরিয়ান আগেই বলেছিলেন, তৃষার সঙ্গে দেখা করতে হলে তিনি পাশে থাকবেন।
কিন্তু নীরা নিজেই এবার সত্যটা জানতে চায়।
সকাল সাড়ে দশটায় তৃষার ফোন এল।
“নীরা, তুমি কি বের হয়েছ?”
“হ্যাঁ। কোথায় দেখা করবে?”
“ধানমন্ডির একটা ক্যাফেতে। আমি অপেক্ষা করছি।”
ক্যাফেতে পৌঁছে নীরা দেখল, তৃষা জানালার পাশে বসে আছে। আজ তার চেহারায় আগের মতো আত্মবিশ্বাসী ভাব নেই। বরং বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে।
নীরা সামনে গিয়ে বসল।
“তুমি কী বলতে চেয়েছিলে?”
তৃষা ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল।
“এই ছবিটা দেখো।”
নীরা ছবিটি হাতে নিল।
ছবিতে চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন—কামাল আহমেদ, মাহমুদ রহমান, রাশেদ রহমান এবং তৃষার বাবা, মিজানুর রহমান।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
“তোমার বাবা এখানে কেন?”
তৃষা ধীরে বলল,
“আমার বাবা তখন রহমান গ্রুপের আইন ও চুক্তি বিভাগের সঙ্গে কাজ করতেন। ব্যবসার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাগজ তাঁর কাছ দিয়েই যেত।”
নীরা ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
“তাহলে তিনি কি কামাল আহমেদের সঙ্গে কাজ করতেন?”
“হ্যাঁ। তবে বাবা সবসময় বলতেন, তিনি শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন।”
নীরা প্রশ্ন করল,
“তুমি কি জানো, রাশেদ রহমানকে কেন দোষী করা হয়েছিল?”
তৃষা মাথা নিচু করল।
“সম্পূর্ণ ঘটনা জানি না। কিন্তু ছোটবেলায় বাবাকে কয়েকবার বলতে শুনেছি, একটা গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির কাগজ হারিয়ে যাওয়ায় অনেক সমস্যা হয়েছিল।”
“তুমি এতদিন আমাকে এসব বলোনি কেন?”
তৃষা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“কারণ আমি নিজেও জানতাম না, তোমার পরিবারের সঙ্গে আমার বাবার সম্পর্ক আছে। আর সত্যি বলতে, আরিয়ানকে নিয়ে আমার নিজেরও কিছু ভুল ধারণা ছিল। তোমাকে দেখে আমি অকারণে সন্দেহ করতাম।”
নীরা শান্ত গলায় বলল,
“আমি তোমার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে আসিনি, তৃষা। আমার শুধু পরিবারের সত্যটা জানা দরকার।”
তৃষা মাথা নাড়ল।
“আমি বুঝেছি। আর এবার আমি তোমাকে সাহায্য করতে চাই।”
অন্যদিকে, আরিয়ান অফিসে বসে একটি পুরোনো চুক্তির কপি পরীক্ষা করছিলেন।
রাফি এসে বলল,
“স্যার, মিজানুর রহমানের বিষয়ে কিছু তথ্য পেয়েছি।”
“কী তথ্য?”
“তিনি এখনো ঢাকাতেই থাকেন। তবে কয়েক বছর আগে অবসর নিয়েছেন।”
আরিয়ান বললেন,
“তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করো। তবে আগে তাঁকে জানিয়ে দেখা করার সময় নিতে হবে।”
রাফি চলে যাওয়ার পর আরিয়ান আবার কাগজটির দিকে তাকালেন।
চুক্তির নিচে কামাল আহমেদের স্বাক্ষর ছিল। তার পাশে মিজানুর রহমানের নামও রয়েছে।
তাহলে মিজানুর কি শুধু সাক্ষী ছিলেন, নাকি তাঁর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ?
বিকেলে নীরা বাড়ি ফিরে বাবাকে সব জানাল।
রাশেদ ছবিটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
“মিজানুর রহমানকে আমি চিনতাম। ভদ্রলোক একসময় আমাদের ব্যবসার চুক্তিপত্র দেখাশোনা করতেন।”
নীরা জিজ্ঞেস করল,
“বাবা, তিনি কি তোমার বিরুদ্ধে কোনো কাগজ তৈরি করেছিলেন?”
রাশেদ মাথা নাড়লেন।
“আমি নিশ্চিত নই। তবে সেই সময় কিছু কাগজ আমার সামনে না এনেই চূড়ান্ত করা হয়েছিল। পরে সেগুলোতেই আমার স্বাক্ষর দেখানো হয়।”
নীরা বলল,
“তাহলে তৃষার বাবার সঙ্গে কথা বলা দরকার।”
রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“হ্যাঁ মা। এবার কারও কথা না শুনে সব প্রমাণ দেখতে হবে।”
সন্ধ্যায় তৃষা নিজের বাড়িতে ফিরে বাবার ঘরে গেল।
মিজানুর রহমান একটি পুরোনো বই পড়ছিলেন।
“বাবা, তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে।”
মিজানুর বই বন্ধ করলেন।
“কী হয়েছে?”
তৃষা ছবিটি টেবিলে রাখল।
“তুমি কি রাশেদ রহমানকে চিনতে?”
মিজানুর ছবিটির দিকে তাকাতেই তাঁর মুখের ভাব বদলে গেল।
“এই ছবি তুমি কোথায় পেলে?”
“আমার কাছে ছিল। বাবা, তুমি কি আঠারো বছর আগের সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলে?”
মিজানুর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
“আমি সেই সময় চুক্তি বিভাগের দায়িত্বে ছিলাম। কামাল আহমেদ কয়েকটি কাগজ আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, কাগজগুলোর মধ্যে কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে।”
তৃষা অবাক হয়ে বলল,
“তাহলে তুমি প্রতিবাদ করোনি কেন?”
মিজানুর নিচু গলায় বললেন,
“করেছিলাম। কিন্তু আমার কাছে যথেষ্ট প্রমাণ ছিল না। তারপর একদিন অফিসে গিয়ে দেখি, গুরুত্বপূর্ণ একটি নথি আর নেই।”
“নথিটা কে নিয়েছিল?”
মিজানুর উত্তর দিলেন না।
তৃষা বাবার হাত ধরে বলল,
“বাবা, এখন আর চুপ থেকো না। একজন নির্দোষ মানুষ এত বছর অপমান সহ্য করেছেন।”
মিজানুর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আমি চুপ ছিলাম, কারণ সেই নথির সঙ্গে আমার নিজের একটি ভুলও জড়িয়ে ছিল।”
তৃষা বিস্মিত হয়ে গেল।
“তোমার ভুল?”
“আমি যাচাই না করেই একটি কাগজে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেছিলাম। পরে বুঝেছিলাম, সেটি ভুল তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল।”
তৃষা কিছুক্ষণ বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
“তাহলে তুমি কি নীরার বাবাকে সাহায্য করবে?”
মিজানুর ধীরে মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ। এবার আমি সত্যটা বলব।”
রাত প্রায় নয়টা।
আরিয়ান নীরাকে ফোন করলেন।
“নীরা, মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে।”
নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
“তিনি কি কিছু জানেন?”
“তিনি দেখা করতে রাজি হয়েছেন। বলেছেন, তাঁর কাছে পুরোনো একটি নথির অনুলিপি থাকতে পারে।”
নীরার চোখে আশার আলো ফুটে উঠল।
“তাহলে কি এবার বাবার নির্দোষিতা প্রমাণ হবে?”
আরিয়ান বললেন,
“সম্ভাবনা আছে। তবে কাগজগুলো যাচাই না করে কিছু বলা যাবে না।”
নীরা মৃদু স্বরে বলল,
“আমি চাই, বাবা যেন একদিন নিশ্চিন্তে বলতে পারেন যে তিনি কোনো অন্যায় করেননি।”
আরিয়ান কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
“সেই দিনটা আসুক—আমিও সেটাই চাই।”
সেদিন রাতেই মিজানুর রহমান নিজের আলমারি খুললেন।
পুরোনো কাগজের স্তূপের ভেতর থেকে একটি বাদামি ফাইল বের করলেন।
ফাইলের প্রথম পাতায় লেখা—
“রহমান গ্রুপ—চূড়ান্ত চুক্তিপত্র।”
তিনি ধীরে শেষ পাতাটি উল্টালেন।
সেখানে একটি হাতে লেখা নোট পাওয়া গেল—
“মূল চুক্তি পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন কামাল আহমেদ। বিষয়টি জানতেন আরও একজন। তবে তাঁর নাম প্রকাশ করা হলে দুই পরিবারের সম্পর্ক চিরতরে ভেঙে যাবে।”
মিজানুর কাগজটি হাতে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
ঠিক তখনই তাঁর ফোনে একটি মেসেজ এল।
অপরিচিত নম্বর থেকে লেখা—
“মিজানুর সাহেব, পুরোনো ফাইলটি কাউকে দেবেন না। কারণ এবার আপনার নিজের নামও সামনে চলে আসবে।”
মিজানুরের হাত কেঁপে উঠল।
তিনি জানালার বাইরে তাকালেন।
দূরে রাস্তার পাশে একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
গাড়ির ভেতরে কে বসে আছে, তা অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না।
কিন্তু মিজানুর বুঝতে পারলেন, কেউ তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখছে।
তিনি ফাইলটি আবার আলমারিতে রাখলেন।
তারপর নিজের মনেই বললেন,
“এবার আর ভয় পাব না। যত কিছুই হোক, সত্যটা প্রকাশ করতেই হবে।”
চলবে…