ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 26

লেখক: Mafiya Queen

শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

লেখক: Mafiya Queen 👑

২৬তম পর্ব: জন্মের রাতের শেষ সাক্ষী

পুরোনো রহমান বাড়ির ঘরে তখন পিনপতন নীরবতা।

তানভীর রহমানের সামনে দাঁড়িয়ে নীরা। তার হাতে সেই পুরোনো চিঠি, যেটা এত বছর ধরে তার জন্য অপেক্ষা করছিল।

নীরা ধীরে প্রশ্ন করল,

—আপনি বললেন, আমার মায়ের একজন পুরোনো বন্ধু আছেন। তিনি আমার জন্মের রাতের শেষ সাক্ষী। কিন্তু তিনি কে?

তানভীর কিছুক্ষণ নীরার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

—তাঁর নাম ডা. নাসরিন আক্তার। তোমার জন্মের সময় তিনি হাসপাতালে দায়িত্বে ছিলেন। তোমার মায়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল।

নীরা অবাক হলো।

—আমার মা কখনো তাঁর কথা বলেননি কেন?

—হয়তো কিছু স্মৃতি মানুষ নিজের ভেতরেই আটকে রাখতে চায়। তবে এবার তাঁর সঙ্গে তোমার দেখা হওয়া প্রয়োজন।

মাহমুদ এগিয়ে এসে বললেন,

—তানভীর, তুমি এত বছর কোথায় ছিলে? আমাদের একবারও জানালে না যে তুমি বেঁচে আছ!

তানভীরের চোখে ক্লান্তি ফুটে উঠল।

—সবকিছু বলব, মাহমুদ। কিন্তু আগে নীরার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া দরকার। এত বছর ধরে ওর পরিবার যে কষ্ট পেয়েছে, তার একটা অংশের দায় আমারও আছে।

পরদিন সকালে নীরা নিজের মাকে বিষয়টি জানাল।

মায়ের মুখে ডা. নাসরিনের নাম শুনে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা গেল।

—তুমি তাঁর নাম কোথায় পেলে?

নীরা মায়ের পাশে বসে বলল,

—তানভীর রহমান বলেছেন, আমার জন্মের রাতে তিনি হাসপাতালে ছিলেন। মা, তুমি কি তাঁকে চেনো?

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—নাসরিন আমার খুব কাছের বান্ধবী ছিল। তোমার জন্মের সময় সে আমার পাশে ছিল। কিন্তু কিছুদিন পর আমাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

—কেন?

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—সেদিন হাসপাতালে একটা ঘটনা ঘটেছিল। সবাই খুব ভয় পেয়েছিল। নাসরিন আমাকে বলেছিল, কিছু কাগজে ভুল তথ্য লেখা হয়েছে। কিন্তু তখন তোমার বাবা আর আমি নতুন সন্তানকে নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে বিষয়টা ভালোভাবে বুঝতে পারিনি।

নীরা মায়ের হাত ধরল।

—তাহলে কি আমার জন্মের কোনো সত্য তোমরা আমার কাছ থেকে লুকিয়েছ?

মা মেয়ের চোখের দিকে তাকালেন।

—একটা কথা মনে রাখিস, মা। তুই আমার সন্তান। তোকে আমি নিজের হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে বড় করেছি। কোনো কাগজের ভুল আমাদের সম্পর্ক বদলে দিতে পারবে না।

নীরা মায়ের কাঁধে মাথা রাখল।

—আমি তোমাদের ভালোবাসা নিয়ে কখনো সন্দেহ করিনি। শুধু জানতে চাই, সেদিন কী হয়েছিল।

মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

—তাহলে নাসরিনের সঙ্গে দেখা কর। হয়তো সে বলতে পারবে।

দুপুরে আরিয়ান নীরাকে নিয়ে ডা. নাসরিনের বাসায় গেল।

ডা. নাসরিন এখন অবসরপ্রাপ্ত। বয়সের ভারে আগের মতো কর্মক্ষম না হলেও স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো।

নীরাকে দেখে তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

—তুমি রাশেদ সাহেবের মেয়ে নীরা?

—জি। আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?

নাসরিন মৃদু হাসলেন।

—তোমাকে তো ছোট্ট অবস্থায় কোলে নিয়েছিলাম। তোমার মা তখন খুব চিন্তিত ছিল। তুমি জন্মানোর পর সে বারবার তোমার খবর জানতে চাইছিল।

নীরা ধীরে বলল,

—আমার জন্মের রাতে কী হয়েছিল, আপনি কি আমাকে বলতে পারবেন?

নাসরিনের হাসি মিলিয়ে গেল।

তিনি দুজনকে বসতে বললেন।

—সেদিন হাসপাতালে অস্বাভাবিক ব্যস্ততা ছিল। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরি হচ্ছিল। তোমার জন্মের পর কিছু তথ্য নথিতে ঠিকভাবে লেখা হয়নি। আমি বিষয়টি বুঝতে পেরে সংশোধনের কথা বলেছিলাম।

আরিয়ান প্রশ্ন করল,

—কেউ কি ইচ্ছা করে তথ্য বদলেছিল?

—আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারব না। তবে পরে হাসপাতালের একটি পুরোনো রেজিস্টারে কাটাকাটির চিহ্ন দেখেছিলাম।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—সেই রেজিস্টার কি এখনো আছে?

নাসরিন মাথা নাড়লেন।

—জানি না। তবে আমার কাছে সেদিনের একটি ব্যক্তিগত নোটবুক আছে। সেখানে কিছু তথ্য লিখে রেখেছিলাম।

তিনি পাশের আলমারি খুলে একটি ছোট নোটবুক বের করলেন।

পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে। তিনি কয়েকটি পাতা উল্টে একটি জায়গায় থামলেন।

সেখানে লেখা ছিল—

“রাত ১১টা ৪০ মিনিট। নীরার জন্মের পর পুরোনো রেজিস্টারের একটি তথ্য সংশোধনের নির্দেশ আসে। নির্দেশদাতার নাম লেখা হয়নি।”

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—নির্দেশটা কে দিয়েছিল?

নাসরিন উত্তর দিলেন,

—সেটা আমি জানতে পারিনি। তবে ওই রাতে হাসপাতালে তানভীর রহমান এসেছিলেন।

আরিয়ান বলল,

—তানভীর সাহেব কেন হাসপাতালে এসেছিলেন?

নাসরিন কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

—তিনি তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। কিন্তু যাওয়ার আগে আমার কাছে একটি খাম রেখে গিয়েছিলেন।

নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,

—সেই খাম কোথায়?

নাসরিন বললেন,

—আমি সেটি অনেক বছর নিজের কাছে রেখেছিলাম। পরে আমার বাসা বদলের সময় একটি পুরোনো বাক্সে রেখে দিই। বাক্সটি এখনো আছে কি না, খুঁজে দেখতে হবে।

সেদিন সন্ধ্যায় নীরা আরিয়ানকে নিয়ে বাসায় ফিরছিল।

গাড়িতে বসে নীরা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

আরিয়ান বলল,

—তুমি ঠিক আছ?

—হ্যাঁ। তবে একটা বিষয় বুঝতে পারছি না।

—কী?

—তানভীর সাহেব এত বছর পর ফিরে এসে আমার জন্মের রাতের কথা কেন সামনে আনছেন? তিনি কি আগে থেকেই সব জানতেন?

আরিয়ান বলল,

—সম্ভবত কিছু জানেন, কিন্তু সবটা নয়। আমাদের ধৈর্য ধরে এগোতে হবে।

নীরা মৃদু স্বরে বলল,

—আমি চাই না, আমার অতীতের কারণে বাবাকে আবার কোনো সমস্যায় পড়তে হোক।

—এবার আমরা সবাই একসঙ্গে আছি। তোমার বাবাকে একা লড়তে হবে না।

নীরা আর কোনো কথা বলল না।

অন্যদিকে, ডা. নাসরিন নিজের ঘরে পুরোনো বাক্স খুঁজছিলেন।

অনেক খোঁজার পর বিছানার নিচে রাখা একটি কাঠের বাক্স বের করলেন। ভেতরে পুরোনো ছবি, কিছু চিঠি এবং হাসপাতালের কাগজপত্র।

একটি ছোট খাম হাতে আসতেই তিনি থমকে গেলেন।

খামের ওপর তানভীরের হাতের লেখা।

“নাসরিন, এই খামটি নীরার জন্য। সময় হলে তাকে দেবে।”

তিনি খামটি খুললেন।

ভেতরে একটি কাগজ এবং একটি ছোট ছবি।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে আছেন তানভীর, নাসরিন এবং নীরার মা।

কিন্তু ছবির পেছনে আরও একজনের ছায়া দেখা যাচ্ছে।

নাসরিন ছবিটি উল্টে দেখলেন।

পেছনে লেখা—

“যিনি রেজিস্টার পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি এই ছবিতেই আছেন।”

নাসরিনের হাত কেঁপে উঠল।

তিনি সঙ্গে সঙ্গে তানভীরকে ফোন করলেন।

—তানভীর সাহেব, আপনার দেওয়া খামটি পেয়েছি।

ওপাশ থেকে তানভীরের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শোনা গেল।

—ছবিটা দেখেছেন?

—হ্যাঁ। কিন্তু একটা কথা বলুন, আপনি কি জানতেন ছবির পেছনে ওই মানুষটি আছেন?

তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—জানতাম। কিন্তু এত বছর ধরে তাঁর নাম প্রকাশ করতে পারিনি।

নাসরিন ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,

—তাহলে এখন কি নীরাকে সব বলা উচিত?

তানভীর বললেন,

—হ্যাঁ। তবে সাবধানে। কারণ ছবির মানুষটি শুধু আমাদের পুরোনো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

তিনি একটু থেমে বললেন,

—তিনি নীরার পরিবারেরও খুব কাছের একজন মানুষ।

কলটি শেষ হয়ে গেল।

নাসরিন আবার ছবিটির দিকে তাকালেন।

ছবির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ এবার স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

তিনি আর কেউ নন—

নীরার নিজের মামা!

কিন্তু নীরার তো কোনো মামা থাকার কথা নয়। তার মায়ের একমাত্র ভাই বহু বছর আগেই নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন!

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 26 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন