শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
২৭তম পর্ব: নিখোঁজ মামার ফিরে আসা
ডা. নাসরিনের হাতে ধরা ছবিটি যেন তাঁর অতীতের সব স্মৃতি আবার জাগিয়ে তুলল।
ছবিতে নীরার মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আর কেউ নন—নীরার নিখোঁজ মামা, নাসির উদ্দিন।
নীরা কখনো তাঁর মামাকে দেখেনি। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছে, তার মায়ের একমাত্র ভাই বহু বছর আগে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। এরপর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
কিন্তু আজ সেই মানুষটির ছবি হাসপাতালের পুরোনো নথির সঙ্গে পাওয়া গেল!
নাসরিন আর দেরি না করে নীরাকে ফোন করলেন।
—নীরা, তোমাকে একটা জরুরি কথা বলার আছে।
—কী হয়েছে, আন্টি?
—তোমার মামার বিষয়ে।
নীরা চমকে উঠল।
—আমার মামা? আপনি কীভাবে তাঁকে চেনেন?
—তোমার জন্মের রাতে তিনি হাসপাতালে ছিলেন। আমার কাছে তাঁর একটি ছবি এবং কিছু পুরোনো কাগজ আছে। তোমাকে এগুলো দেখাতে হবে।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—আমি কখন আসব?
—যত তাড়াতাড়ি পারো।
পরদিন সকালে নীরা আরিয়ানকে নিয়ে ডা. নাসরিনের বাসায় গেল।
নাসরিন তাঁদের হাতে ছবিটি তুলে দিলেন।
নীরা ছবির মানুষটির দিকে তাকিয়ে রইল।
—এটাই কি আমার মামা?
—হ্যাঁ। তাঁর নাম নাসির উদ্দিন।
নীরা ছবির পেছনের লেখাটি পড়ল।
“যিনি রেজিস্টার পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি এই ছবিতেই আছেন।”
আরিয়ান বলল,
—তাহলে আপনার ধারণা, নাসির সাহেবই রেজিস্টার পরিবর্তন করেছিলেন?
নাসরিন মাথা নাড়লেন।
—আমি এমনটা বলছি না। ছবিতে তিনি আছেন, কিন্তু নির্দেশটা কে দিয়েছিল, তা আমি নিজের চোখে দেখিনি।
নীরা বলল,
—আমার মামা যদি হাসপাতালেই ছিলেন, তাহলে এত বছর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি কেন?
নাসরিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—সেটা আমি জানি না। তবে তিনি যাওয়ার আগে আমাকে বলেছিলেন, কোনো একদিন নীরা বড় হলে যেন তাকে একটি কথা জানাই।
—কী কথা?
নাসরিন একটি পুরোনো কাগজ বের করলেন।
সেখানে লেখা—
“নীরাকে বলবেন, তার জন্মের রাতের সত্য জানার অধিকার তার আছে। তবে কাউকে দোষী ভাবার আগে সব প্রমাণ যাচাই করবে।”
নীরা কাগজটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
বাড়ি ফিরে নীরা মায়ের কাছে ছবিটি দেখাল।
ছবিটি দেখেই তাঁর মা যেন স্থির হয়ে গেলেন।
—এটা কোথায় পেলে?
নীরা বলল,
—ডা. নাসরিন দিয়েছেন। মা, তুমি কি মামার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলে?
মায়ের চোখে পানি জমল।
—তোর মামা আমার একমাত্র ভাই ছিল। একসময় আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। কিন্তু তোর জন্মের কয়েক মাস আগে থেকে সে অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করে। অনেক কিছু জানতে চাইত, আবার কিছু কথা বলত না।
—কী নিয়ে জানতে চাইত?
—পুরোনো ব্যবসার হিসাব নিয়ে। তোর বাবা আর মাহমুদ সাহেবদের মধ্যে যে বিরোধ হয়েছিল, সেটা নিয়েও তার আগ্রহ ছিল।
নীরা বিস্মিত হয়ে বলল,
—তাহলে মামা ব্যবসার ব্যাপারেও জানতেন?
মা মাথা নেড়ে বললেন,
—হ্যাঁ। কিন্তু কেন জানতেন, সেটা আমি বুঝতে পারিনি।
নীরা মায়ের হাত ধরল।
—তুমি কি তাঁকে খুঁজতে চাও?
মা চোখ মুছে বললেন,
—প্রতিদিন চেয়েছি, মা। কিন্তু কোনো ঠিকানা পাইনি।
অন্যদিকে আরিয়ান অফিসে বসে নাসির উদ্দিনের পুরোনো তথ্য খুঁজছিল।
রাফি কয়েকটি নথি নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করল।
—স্যার, নাসির উদ্দিনের নামে একটি পুরোনো ব্যবসায়িক রেকর্ড পেয়েছি।
আরিয়ান কাগজটি হাতে নিল।
—কোথায়?
—রহমান গ্রুপের পুরোনো অংশীদারদের তালিকায় তাঁর নাম নেই। তবে তিনি একসময় চুক্তিপত্র তৈরির কাজে সহায়তা করতেন বলে একটি নোট পাওয়া গেছে।
আরিয়ান অবাক হলো।
—তাহলে তিনি শুধু নীরার মামা ছিলেন না, পুরোনো ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন?
—সম্ভবত, স্যার।
আরিয়ান বলল,
—এই তথ্যগুলো আইনজীবীর কাছে পাঠাও। আর তাঁর বর্তমান ঠিকানা পাওয়া যায় কি না, সেটাও খোঁজ করো।
সন্ধ্যায় তানভীর রহমানের সঙ্গে ইমরানের দেখা হলো।
ইমরান সরাসরি প্রশ্ন করল,
—নাসির উদ্দিনের ব্যাপারে আপনি আগে কিছু বলেননি কেন?
তানভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—কারণ আমি জানতাম না, সে কোথায় আছে। শুধু জানতাম, হাসপাতালের সেই রাতের ঘটনার পর সে আমাদের সবার কাছ থেকে দূরে চলে যায়।
—সে কি রেজিস্টার পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত ছিল?
—আমি নিশ্চিত নই। তবে নাসির কিছু কাগজ দেখেছিল। সেই কাগজগুলোতে এমন একজনের নাম ছিল, যাকে আমরা সবাই বিশ্বাস করতাম।
ইমরান জিজ্ঞেস করল,
—কে সেই মানুষ?
তানভীর উত্তর দেওয়ার আগেই তাঁর ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
তিনি কল রিসিভ করলেন।
ওপাশ থেকে একটি পুরুষ কণ্ঠ বলল,
—তানভীর সাহেব, পুরোনো বিষয়গুলো আবার সামনে আনছেন কেন?
তানভীর শান্ত গলায় বললেন,
—কারণ সত্যকে আর আটকে রাখা সম্ভব নয়।
কণ্ঠটি বলল,
—আপনি কি নাসিরের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন?
তানভীর চমকে উঠলেন।
—আপনি নাসিরকে চেনেন?
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
—তাহলে আপনি এখনো জানেন না, সে কোথায় আছে?
কলটি কেটে গেল।
ইমরান তানভীরের দিকে তাকাল।
—কী হয়েছে?
তানভীর ফোনটি নামিয়ে বললেন,
—নাসিরের খোঁজ শুধু আমরা করছি না। অন্য কেউও তার খোঁজ করছে।
রাত প্রায় এগারোটা।
নীরা নিজের ঘরে বসে পুরোনো ছবিটি দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, এত বছর ধরে পরিবারের অনেক মানুষ একই সত্যের চারপাশে ঘুরেছে, কিন্তু কেউ পুরোটা বলতে পারেনি।
ঠিক তখনই ফোনে একটি মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
“তুমি তোমার মামাকে খুঁজছ, নীরা?”
নীরা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উত্তর দিল,
—আপনি কে?
কয়েক মুহূর্ত পর আরেকটি মেসেজ এল।
“যাকে তুমি নিখোঁজ ভাবছ, সে তোমার কাছ থেকে খুব বেশি দূরে নেই।”
নীরার বুক ধক করে উঠল।
সে দ্রুত আরিয়ানকে ফোন করল।
—আরিয়ান, আমার কাছে একটা মেসেজ এসেছে।
—কী লেখা?
নীরা মেসেজটি পড়ে শোনাল।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—কোনো উত্তর দেবে না। নম্বরটা সংরক্ষণ করো। আমরা আগে বিষয়টি যাচাই করব।
ঠিক তখনই নীরার ফোনে একটি ছবি এল।
ছবিতে একজন বয়স্ক মানুষ একটি ছোট্ট চায়ের দোকানের সামনে বসে আছেন।
নীরা ছবিটি বড় করে দেখল।
মানুষটির মুখ স্পষ্ট।
সে ছবিটি চিনতে পারল।
কারণ ডা. নাসরিনের দেওয়া পুরোনো ছবির মানুষটির সঙ্গে তাঁর মুখের মিল রয়েছে।
ছবির নিচে লেখা—
“তোমার মামা তোমার সঙ্গে দেখা করতে চান। কিন্তু তিনি একা আসবেন না।”
নীরা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তাহলে কি মামা সত্যিই ফিরে এসেছেন?
আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
—সম্ভবত। কিন্তু আমাদের আগে নিশ্চিত হতে হবে ছবিটি সাম্প্রতিক কি না এবং মানুষটি সত্যিই তোমার মামা কি না।
নীরা আবার ছবিটির দিকে তাকাল।
তার মনে একটাই প্রশ্ন—
এত বছর পর মামা ফিরে আসতে চাইছেন কেন?
আর হাসপাতালের সেই রাতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কই বা কী?
চলবে…