ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 39

লেখক: Mafiya Queen

নওরীনের ফোন পাওয়ার পর থেকেই নীরার মনে একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল।

সালেহ রহমান যদি সত্যিই বেঁচে থাকেন, তাহলে এত বছর তিনি কোথায় ছিলেন? আর নওরীন কীভাবে তাঁর সম্পর্কে জানেন?

অফিসে পৌঁছাতেই রাফি তাঁদের কনফারেন্স রুমে নিয়ে গেল।

নওরীন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের দেখে তিনি এগিয়ে এলেন।

—আপনারা এসেছেন দেখে ভালো লাগল। আমি জানি, আপনাদের অনেক প্রশ্ন আছে।

মাহমুদ সরাসরি বললেন,

—সালেহ রহমান সম্পর্কে আপনি কী জানেন?

নওরীন ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো খাম বের করলেন।

—বাবার মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে এই খামটি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, একদিন রহমান পরিবারের কেউ যদি সত্য জানতে আসে, তখন যেন এটি তাকে দিই।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

—এত দিন অপেক্ষা করলেন কেন?

নওরীন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না, আপনাদের মধ্যে কেউ সত্যিই সত্য জানতে চান, নাকি শুধু পুরোনো হিসাব মেটাতে চান।

নীরা শান্ত গলায় বলল,

—আমরা কাউকে শাস্তি দিতে আসিনি। আমরা জানতে চাই, এত বছর ধরে আমাদের পরিবার কেন ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে ছিল।

নওরীন খামটি নীরার হাতে দিলেন।

—তাহলে এটা আপনারই পড়া উচিত।

১. চিঠির ভেতরের নাম

নীরা খাম খুলে চিঠিটি বের করল।

চিঠির শুরুতে লেখা—

“নওরীন,

সালেহ রহমানের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল তোমার জন্মের কয়েক বছর আগে। তিনি তখন খুব চিন্তিত ছিলেন। বলেছিলেন, তাঁর পরিবারের কিছু মানুষ এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার ফল একদিন নির্দোষ মানুষের ওপর পড়বে।

আমি তাঁকে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে বলেছিলেন, সব কাগজের সত্য একসঙ্গে প্রকাশ করা যাবে না।

তিনি একটি পুরোনো নথি আমার কাছে রাখতে দিয়েছিলেন। সেই নথিতে ব্যবসার হিসাবের পাশাপাশি একটি পারিবারিক বৈঠকের উল্লেখ আছে।

আমি জানি না, সালেহ এখন কোথায়। তবে তিনি একবার বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে তিনি নিজের নাম বদলে সাধারণ মানুষের মতো জীবন কাটাবেন।

তাঁকে খুঁজতে হলে পুরোনো রেলস্টেশনের পাশের বাড়িতে খোঁজ করো।”

নীরা চিঠি নামিয়ে বলল,

—এই ঠিকানাটাই তো আমরা পেয়েছি।

নওরীন মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ। কিন্তু আমার কাছে আরও একটি তথ্য আছে।

২. নওরীনের স্মৃতি

নওরীন জানালেন, ছোটবেলায় তিনি বাবার সঙ্গে একবার একটি পুরোনো বাড়িতে গিয়েছিলেন।

সেখানে একজন বয়স্ক মানুষ তাঁদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাঁর মুখ স্পষ্ট মনে নেই, তবে বাবাকে তিনি বারবার বলেছিলেন—

“আমি আর কারও ক্ষতি চাই না। কিন্তু আমার নীরবতার কারণে যাদের জীবন বদলে গেছে, তাদের কাছে একদিন ক্ষমা চাইতেই হবে।”

নওরীন বললেন,

—আমি তখন ছোট ছিলাম। কথাগুলোর অর্থ বুঝিনি। পরে বাবার ডায়েরিতে সালেহ রহমানের নাম দেখে বিষয়টি মনে পড়ে।

মাহমুদ প্রশ্ন করলেন,

—আপনি কি নিশ্চিত, সেই মানুষটি সালেহ ছিলেন?

—না। আমি নিশ্চিত নই। তবে বাবা তাঁকে সালেহ সাহেব বলে সম্বোধন করেছিলেন।

ইমরান বলল,

—তাহলে আমাদের কাছে একটি সম্ভাব্য সূত্র আছে, কিন্তু পরিচয় নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ নেই।

নীরা মাথা নাড়ল।

—আমরা সেখানে যাব। তবে আগে ঠিকানাটি যাচাই করতে হবে।

৩. রেলস্টেশনের পাশের বাড়ি

পরদিন সকালে নীরা, আরিয়ান, মাহমুদ ও নাসির পুরোনো রেলস্টেশনের পাশের বাড়িতে গেল।

বাড়িটি ছোট। সামনে একটি পুরোনো কাঠের দরজা। দরজার পাশে একটি নামফলক—

“এস. রহমান”

মাহমুদ নামফলক দেখে থেমে গেলেন।

—এটা কি সালেহ চাচার নামের প্রথম অক্ষর?

নাসির বললেন,

—হতে পারে।

আরিয়ান দরজায় কড়া নাড়ল।

কিছুক্ষণ পর একজন মধ্যবয়সী নারী দরজা খুললেন।

—কাকে খুঁজছেন?

মাহমুদ বললেন,

—আমরা সালেহ রহমানের সঙ্গে দেখা করতে চাই।

নারীটি তাঁদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—আপনারা একটু অপেক্ষা করুন।

তিনি ভেতরে চলে গেলেন।

কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে জানালেন,

—তিনি এখন এখানে থাকেন না। তবে আপনাদের জন্য কিছু রেখে গেছেন।

নারীটি একটি ছোট খাম এগিয়ে দিলেন।

৪. শেষ ঠিকানার সূত্র

খামের ভেতরে একটি পুরোনো ভিজিটিং কার্ড ও হাতে লেখা কয়েকটি লাইন ছিল।

“আমি জানি, একদিন তোমরা আমার খোঁজে আসবে।

আমার অনুপস্থিতিকে অপরাধ ভেবো না। আবার আমার নীরবতাকেও নির্দোষতার প্রমাণ ভেবো না।

আমি ভুল করেছি। কিন্তু যে ভুলের দায় আমার নয়, সেটিও আমার নামে চাপানো হয়েছিল।

সত্য জানতে চাইলে প্রথমে আজহার রহমানের শেষ বৈঠকের নথি খুঁজে বের করো।

সেই বৈঠকে উপস্থিত চারজনের মধ্যে একজন এখনো সত্য গোপন করে আছে।

—সালেহ”

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—চারজন কারা ছিলেন?

মাহমুদ বললেন,

—আজহার চাচা, বাবা, কামাল এবং...

তিনি থেমে গেলেন।

নাসির তাঁর দিকে তাকালেন।

—আর চতুর্থ ব্যক্তি কে ছিলেন?

মাহমুদ দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—আমার মনে হচ্ছে, চতুর্থ ব্যক্তি ছিলেন আমাদের পরিবারের এমন একজন, যার নাম আমরা কখনো এই ব্যবসার সঙ্গে জড়াইনি।

৫. পুরোনো বৈঠকের তালিকা

বাড়ির নারীটি তাঁদের আরেকটি কাগজ দিলেন।

—সালেহ সাহেব বলেছিলেন, এই কাগজটি আপনাদের কাজে লাগতে পারে।

কাগজে একটি বৈঠকের তারিখ এবং চারজনের নাম লেখা।

১. আজহার রহমান
২. মাহমুদ রহমান
৩. কামাল আহমেদ
৪. জহির উদ্দিন

মাহমুদ অবাক হয়ে বললেন,

—জহির? কিন্তু জহির তো পরিবারের কেউ ছিল না!

নাসির বললেন,

—পরিবারের সদস্য না হলেও সে পরিবারের অনেক গোপন নথির দায়িত্বে ছিল।

আরিয়ান কাগজটি হাতে নিয়ে বলল,

—তাহলে চতুর্থ ব্যক্তি জহিরই ছিল। কিন্তু সালেহ কেন বললেন, পরিবারের এমন একজন, যার নাম আমরা ব্যবসার সঙ্গে জড়াইনি?

নীরা কাগজটি উল্টে দেখল।

পেছনে ছোট করে আরও একটি লাইন লেখা—

“বৈঠকের তালিকায় নাম চারটি, কিন্তু উপস্থিত ছিলেন পাঁচজন।”

সবাই থমকে গেল।

মাহমুদ বললেন,

—পঞ্চম ব্যক্তি কে?

৬. অদৃশ্য পঞ্চম মানুষ

নীরা কাগজটি ভালো করে পরীক্ষা করছিল।

হঠাৎ তার চোখে পড়ল, নিচের কোণে একটি অস্পষ্ট সিল।

সিলের লেখা প্রায় মুছে গেছে। তবে শেষের দুটি শব্দ পড়া যাচ্ছিল—

“পারিবারিক ট্রাস্ট।”

আরিয়ান বলল,

—আমাদের পরিবারের কি কোনো ট্রাস্ট ছিল?

মাহমুদ মাথা নাড়লেন।

—আজহার চাচা জীবিত থাকাকালে একটি পারিবারিক ট্রাস্ট গঠনের কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেটি কখনো কার্যকর হয়েছিল কি না, আমি জানি না।

ইমরান ফোনে পুরোনো নথির তালিকা খুঁজে দেখল।

কিছুক্ষণ পর সে বলল,

—আমি একটি তথ্য পেয়েছি। আজহার রহমানের মৃত্যুর পর ট্রাস্টের কিছু কাগজ আদালতে জমা হয়েছিল। কিন্তু ট্রাস্টের মূল সদস্যদের তালিকা পাওয়া যাচ্ছে না।

নাসির ধীরে বললেন,

—সেই তালিকায় হয়তো পঞ্চম ব্যক্তির নাম আছে।

নীরা বলল,

—তাহলে আমাদের পরবর্তী কাজ হবে ট্রাস্টের নথি খুঁজে বের করা।

৭. শেষ প্রশ্ন

সেদিন রাতে নীরা নিজের ঘরে বসে চিঠিগুলো আবার পড়ছিল।

তার মা ঘরে এসে পাশে বসলেন।

—এত রাত পর্যন্ত কী দেখছিস?

নীরা মায়ের হাত ধরে বলল,

—মা, তুমি কি আজহার রহমানের পারিবারিক ট্রাস্টের কথা কখনো শুনেছ?

মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—একবার তোর বাবা একটা কথা বলেছিল। আজহার রহমান নাকি পরিবারের সম্পত্তি নিয়ে একটি বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু পরে সেই ব্যবস্থা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল।

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—বাবা তোমাকে আর কিছু বলেছিল?

মা মাথা নাড়লেন।

—না। তবে একটা নাম বলেছিল।

—কার নাম?

মা স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করলেন।

তারপর ধীরে বললেন,

—সালেহ রহমান নয়... সেই ট্রাস্টের দায়িত্বে নাকি ছিলেন একজন নারী।

নীরার হাত থেকে কাগজটি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

—নারী?

মা বললেন,

—হ্যাঁ। নামটা ছিল... রওশন আরা রহমান।

নীরা নামটি কখনো শোনেনি।

কিন্তু মাহমুদের বাড়িতে ফিরে যখন নামটি বলা হলো, মাহমুদ চুপ হয়ে গেলেন।

আরিয়ান বাবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

—বাবা, আপনি এই নাম চেনেন?

মাহমুদ ধীরে মাথা নাড়লেন।

—চিনি। তিনি ছিলেন আমার দাদির ছোট বোন। সবাই তাঁকে মৃত বলেই জানত।

নীরা বিস্ময়ে বলল,

—তাহলে তিনিও কি বেঁচে আছেন?

মাহমুদ উত্তর দিলেন না।

শুধু পুরোনো ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ছবির এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর মুখে লাল দাগ দেওয়া ছিল।

আর ছবির পেছনে লেখা—

“রওশন আরা — ট্রাস্টের শেষ সাক্ষী।”

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 39 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন