ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 40

লেখক: Mafiya Queen

শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

লেখক: Mafiya Queen 👑

৪০তম পর্ব: রওশন আরার গোপন পরিচয়

মাহমুদের হাতে ধরা ছবিটির দিকে সবাই তাকিয়ে আছে।

ছবির এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটির মুখে লাল দাগ দেওয়া। পেছনে লেখা—রওশন আরা, ট্রাস্টের শেষ সাক্ষী।

নীরা ধীরে প্রশ্ন করল,

—তিনি কি সত্যিই মারা গেছেন?

মাহমুদ ছবিটি টেবিলে রেখে বললেন,

—আমাদের পরিবারে সবাই জানত, তিনি অনেক বছর আগে মারা গেছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর কোনো কাগজ আমি কখনো দেখিনি।

আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে তাঁর মৃত্যুর খবর পরিবারে কে দিয়েছিল?

মাহমুদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিলেন,

—আমার বাবা।

নাসির এবার কথা বললেন।

—তাহলে বিষয়টি আরও ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ সালেহ রহমানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটির সঙ্গেও রওশন আরার নাম জড়িয়ে আছে।

নীরা বলল,

—আমরা কি তাঁর কোনো আত্মীয়ের খোঁজ পেতে পারি?

মাহমুদ মাথা নাড়লেন।

—তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। তবে তাঁর এক ভাইয়ের পরিবার এখনো পুরোনো বাড়িতে থাকতে পারে।

১. ট্রাস্টের পুরোনো নথি

পরদিন সকালে আরিয়ান ও নীরা পুরোনো পারিবারিক নথি খুঁজতে শুরু করল।

রাফি তাদের জানাল, আদালতের পুরোনো রেকর্ডে আজহার রহমানের নামে একটি পারিবারিক ট্রাস্টের উল্লেখ পাওয়া গেছে।

আরিয়ান বলল,

—ট্রাস্টের কাগজগুলো সংগ্রহের ব্যবস্থা করো। তবে সবকিছু নিয়ম মেনে করতে হবে।

রাফি মাথা নাড়ল।

কিছুক্ষণ পর সে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাল।

—স্যার, ট্রাস্টের নিবন্ধনের সময় পাঁচজন সাক্ষীর নাম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনলাইনে শুধু চারজনের নাম পাওয়া যাচ্ছে।

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—পঞ্চম নামটি কি বাদ দেওয়া হয়েছে?

রাফি উত্তর দিল,

—সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। মূল নথি না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যাবে না।

ইমরান বলল,

—পুরোনো নথির একটি কপি আমার কাছে আছে। সেটি মিলিয়ে দেখতে পারি।

সে ফাইল খুলে কাগজগুলো পরীক্ষা করতে লাগল।

হঠাৎ একটি পাতায় থেমে গেল।

—এখানে দেখুন! পঞ্চম সাক্ষীর জায়গায় শুধু একটি আদ্যক্ষর আছে—‘R.A.R.’

মাহমুদ ছবিটি হাতে তুলে বললেন,

—রওশন আরা রহমান।

২. পুরোনো বাড়ির ঠিকানা

নাসিরের কাছ থেকে পাওয়া একটি পুরোনো ঠিকানা নিয়ে সবাই রওশন আরার ভাইয়ের বাড়িতে গেল।

বাড়িটি শহরের বাইরে। সেখানে বসবাস করেন রওশন আরার ভাইয়ের ছেলে, ফারুক রহমান।

ফারুক তাঁদের পরিচয় শুনে কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন।

তারপর বললেন,

—আপনারা কি আমার ফুফুর খোঁজে এসেছেন?

মাহমুদ বললেন,

—হ্যাঁ। তিনি কোথায় আছেন, আপনি কি জানেন?

ফারুক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—ফুফু বহু বছর আগে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তবে তিনি মারা গেছেন, এমন কোনো খবর আমি পাইনি।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—তাঁর সঙ্গে শেষ কবে আপনার কথা হয়েছিল?

—প্রায় বারো বছর আগে। তিনি আমাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন।

আরিয়ান বলল,

—চিঠিটি কি এখনো আপনার কাছে আছে?

ফারুক মাথা নাড়লেন।

—আছে। কিন্তু চিঠিতে এমন কিছু কথা আছে, যা আমি কখনো কাউকে বলিনি।

৩. রওশন আরার চিঠি

ফারুক একটি পুরোনো আলমারি খুলে খাম বের করলেন।

খামের ওপর লেখা—

“ফারুকের জন্য — রওশন আরা।”

তিনি চিঠিটি মাহমুদের হাতে দিলেন।

মাহমুদ পড়তে শুরু করলেন।

“ফারুক,

আমি জানি, আমার অনুপস্থিতি নিয়ে তোমাদের মনে অনেক প্রশ্ন আছে।

আমি কাউকে ছেড়ে যেতে চাইনি। কিন্তু পরিবারের কিছু সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমি একমত হতে পারিনি।

আজহার আমাকে একটি দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেই দায়িত্ব ছিল পারিবারিক ট্রাস্টের নথি এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ সংরক্ষণ করা।

কিন্তু একসময় বুঝলাম, আমার কাছে রাখা নথির একটি অংশ অন্য কারও হাতে চলে গেছে।

আমি কাউকে অভিযুক্ত করিনি। কারণ আমার কাছে তখনো যথেষ্ট প্রমাণ ছিল না।

যদি কখনো রহমান পরিবারের কেউ আমার খোঁজে আসে, তাকে বলবে—পুরোনো বাড়ির উত্তর দিকের ঘরটি খুঁজতে।”

চিঠি পড়ে নীরা বলল,

—তাহলে তিনি হয়তো এখনো কিছু নথি সংরক্ষণ করে রেখেছেন।

ফারুক জানালেন,

—পুরোনো বাড়িটি এখন আর আমাদের পরিবারের কাছে নেই। তবে উত্তর দিকের ঘরটি এখনো তালাবদ্ধ।

৪. উত্তর দিকের ঘর

ফারুকের অনুমতি নিয়ে সবাই পুরোনো বাড়িতে গেল।

বাড়িটি বহু বছর ধরে ব্যবহার করা হয় না। দেয়ালে ধুলো, জানালায় মাকড়সার জাল।

উত্তর দিকের ঘরের দরজায় পুরোনো তালা ঝুলছে।

ফারুক একটি চাবি বের করে দরজা খুললেন।

ঘরের ভেতরে একটি কাঠের টেবিল, কয়েকটি বই এবং ছোট একটি আলমারি।

নীরা আলমারির ওপর রাখা একটি ফাইল দেখতে পেল।

ফাইলের গায়ে লেখা—

“পারিবারিক ট্রাস্ট — গোপন নথি।”

ইমরান ফাইলটি খুলে বলল,

—এখানে ট্রাস্টের সম্পত্তির তালিকা, দায়িত্ব বণ্টন এবং কয়েকটি পুরোনো বৈঠকের কার্যবিবরণী আছে।

আরিয়ান একটি কাগজ তুলে নিল।

সেখানে লেখা—

“ট্রাস্টের কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগে পাঁচজন সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন।”

মাহমুদ বললেন,

—তাহলে একজনের একক সিদ্ধান্তে ট্রাস্টের কোনো সম্পত্তি বা নথি পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না।

নীরা বলল,

—কিন্তু পাঁচজনের মধ্যে কেউ যদি অন্যদের স্বাক্ষর ব্যবহার করে থাকে?

ইমরান উত্তর দিল,

—তাহলে সেটি প্রমাণ করতে হবে। শুধু সন্দেহ দিয়ে হবে না।

৫. পঞ্চম সদস্যের নাম

ফাইলের শেষ পাতায় পাঁচজন সদস্যের নাম পাওয়া গেল।

১. আজহার রহমান
২. মাহমুদ রহমানের বাবা
৩. সালেহ রহমান
৪. রওশন আরা রহমান
৫. জহির উদ্দিন

মাহমুদ অবাক হয়ে বললেন,

—জহির ট্রাস্টের সদস্য ছিল?

ফারুক বললেন,

—আমার ফুফু বলতেন, জহির শুধু কাগজপত্র দেখাশোনা করত না। সে ট্রাস্টের নথি সংরক্ষণের দায়িত্বও পেয়েছিল।

নীরা বলল,

—তাহলে জহিরের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাগজ থাকার কথা।

আরিয়ান বলল,

—এখন বুঝতে পারছি, কেন এতগুলো ঘটনার মধ্যে বারবার জহিরের নাম আসছে।

নাসির ধীরে বললেন,

—কিন্তু জহিরই সবকিছুর মূল পরিকল্পনাকারী, এমন সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া যাবে না। হয়তো সে অন্য কারও নির্দেশ পালন করেছিল।

৬. একটি অপ্রত্যাশিত স্বীকারোক্তি

ফাইলের ভেতর থেকে একটি ছোট ডায়েরি পাওয়া গেল।

ডায়েরিটি রওশন আরার।

নীরা প্রথম পাতাটি খুলে পড়তে শুরু করল।

“আজহার ভাই আমাকে বলেছিলেন, পরিবারের সম্মান রক্ষা করার জন্য কখনো কখনো সত্য গোপন করতে হয়। কিন্তু আমি মনে করি, মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে কোনো পরিবারের সম্মান রক্ষা করা যায় না।”

পরের পাতায় লেখা—

“নীরার জন্মের আগের দিন একটি বৈঠক হয়েছিল। সেখানে হাসপাতালের কোনো কাগজ নিয়ে আলোচনা হয়নি। আলোচনা হয়েছিল পুরোনো ট্রাস্টের নথি নিয়ে।

কিন্তু পরদিন হাসপাতাল থেকে একটি কাগজ আমার কাছে পাঠানো হয়। আমি সেটিতে স্বাক্ষর করিনি।”

নীরা থমকে গেল।

—আমার জন্মের আগের দিন বৈঠক হয়েছিল, আর পরদিন হাসপাতালের কাগজ তাঁর কাছে পাঠানো হয়েছিল!

মাহমুদ বললেন,

—তাহলে কেউ হয়তো ট্রাস্টের পুরোনো নথির সঙ্গে হাসপাতালের কাগজ জুড়ে দিতে চেয়েছিল।

ইমরান বলল,

—কিন্তু কেন? সেটাই জানতে হবে।

ডায়েরির পরের পাতায় একটি নাম লেখা ছিল—

“ডা. নাসরিন।”

৭. রওশন আরার বার্তা

সবাই যখন ডায়েরি পড়ছিল, তখন ফারুক একটি ছোট কাগজ বের করলেন।

—আরেকটি কথা আছে। ফুফু এই কাগজটিও আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন।

কাগজে একটি ফোন নম্বর এবং একটি বাক্য লেখা—

“যদি কখনো আমার খোঁজ করতে হয়, তাহলে এই নম্বরে যোগাযোগ করবে। তবে মনে রেখো, আমি নিজের ইচ্ছাতেই দূরে আছি।”

আরিয়ান নম্বরটি দেখে বলল,

—এটি কি এখনো চালু আছে?

ফারুক বললেন,

—আমি কখনো চেষ্টা করিনি।

মাহমুদ নম্বরটিতে ফোন করলেন।

প্রথমবার কোনো উত্তর এল না।

দ্বিতীয়বারও ফোন বেজে কেটে গেল।

তৃতীয়বার ফোন ধরলেন একজন নারী।

ওপাশ থেকে শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল—

—কে বলছেন?

মাহমুদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—আমি মাহমুদ রহমান। আপনি কি রওশন আরা রহমান?

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর নারীটি বললেন,

—এত বছর পর তোমরা আমার খোঁজ করলে কেন?

মাহমুদ আবেগভরা কণ্ঠে বললেন,

—আমরা সত্য জানতে চাই, চাচি।

নারীটি ধীরে উত্তর দিলেন,

—সত্য জানতে চাইলে আগে একটি কথা মনে রেখো। আজহার যে কাগজে স্বাক্ষর করেছিলেন, সেটি তাঁর শেষ সিদ্ধান্ত ছিল না।

নীরা দ্রুত ফোনের কাছে এগিয়ে এল।

—আপনি কি জানেন, সেই কাগজে কী লেখা ছিল?

নারীটি বললেন,

—জানি। কিন্তু ফোনে বলব না।

তারপর তিনি একটি ঠিকানা দিলেন।

—আগামী শুক্রবার এসো। আমি তোমাদের সব বলব। তবে একজনকে সঙ্গে আনবে না।

আরিয়ান প্রশ্ন করল,

—কাকে?

নারীটি কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন,

—জহির উদ্দিনকে। কারণ সে জানে, আমি কী দেখেছিলাম।

ফোনটি কেটে গেল।

নীরা ধীরে আরিয়ানের দিকে তাকাল।

জহিরকে এত দিন খোঁজা হচ্ছিল।

কিন্তু এবার রওশন আরা নিজেই জানিয়ে দিলেন—জহির তাঁর দেখা সত্যের সাক্ষী।

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

জহির কি এত বছর ধরে রওশন আরার কাছ থেকেও কিছু লুকিয়ে রেখেছে?

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 40 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন