ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 44

লেখক: Mafiya Queen

শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

লেখক: Mafiya Queen 👑

৪৪তম পর্ব: অচেনা মানুষের পরিচয়

জহির উদ্দিন দেখা করতে রাজি হয়েছেন।

কিন্তু তাঁর সঙ্গে আরও একজন অচেনা মানুষ আসবেন—এই খবর শোনার পর থেকেই নীরার মনে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কে সেই মানুষ?

কেনই বা এত বছর ধরে তাঁর পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে?

আরিয়ান ফোনটি রেখে বলল,

—জহির আগামীকাল বিকেল পাঁচটায় দেখা করতে বলেছেন। জায়গাটা পুরোনো একটি লাইব্রেরি।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—তিনি কি আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো কথা বলেছেন?

—না। শুধু বলেছেন, আমরা যেন নির্ধারিত সময়ের আগে সেখানে না যাই।

মাহমুদ বললেন,

—আমি যাব। জহিরের সঙ্গে আমারও অনেক প্রশ্নের হিসাব বাকি আছে।

রাশেদও যেতে চাইলেন।

কিন্তু নীরা বলল,

—বাবা, তুমি যাবে। এত বছর ধরে যে সত্য তোমার কাছ থেকে লুকানো ছিল, সেটার উত্তর তোমারও জানা প্রয়োজন।

১. পুরোনো লাইব্রেরি

পরদিন বিকেল।

লাইব্রেরিটি শহরের পুরোনো এলাকায়। একসময় এখানে অনেক মানুষ বই পড়তে আসত। এখন পাঠকের সংখ্যা কমে গেছে।

আরিয়ান, নীরা, মাহমুদ ও রাশেদ নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট আগে পৌঁছালেন।

লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে তাঁরা একটি নিরিবিলি টেবিলে বসলেন।

পাঁচটা বাজার কয়েক মিনিট পর একজন বয়স্ক মানুষ দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন।

মাহমুদ তাঁকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন।

—জহির!

জহির উদ্দিন ধীরে এগিয়ে এলেন।

বয়সের ছাপ তাঁর চেহারায় স্পষ্ট। কিন্তু চোখে এখনো সেই পুরোনো সতর্কতা।

তিনি বসে বললেন,

—অনেক বছর পর আপনাদের সবাইকে একসঙ্গে দেখছি।

রাশেদ সরাসরি প্রশ্ন করলেন,

—এত বছর কোথায় ছিলেন, জহির?

জহির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—যেখানে থাকলে পুরোনো ভুলগুলো থেকে দূরে থাকা যায়।

নীরা বলল,

—দূরে থাকলেই কি ভুলের দায় শেষ হয়ে যায়?

জহির নীরার দিকে তাকালেন।

—না। সে কারণেই আজ এসেছি।

২. অচেনা মানুষটির আগমন

কিছুক্ষণ পর লাইব্রেরির দরজা দিয়ে একজন নারী প্রবেশ করলেন।

তাঁর বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। পরনে সাধারণ শাড়ি, হাতে একটি পুরোনো চামড়ার ব্যাগ।

তিনি জহিরের পাশে এসে দাঁড়ালেন।

জহির পরিচয় করিয়ে দিলেন,

—ইনি নাসিমা বেগম। আজিজুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন।

মাহমুদ বিস্মিত হয়ে বললেন,

—নাসিমা আপা? আপনি এখনো বেঁচে আছেন?

নারীটি মৃদু হাসলেন।

—বেঁচে আছি। তবে এত বছর নিজের পরিচয় প্রকাশ করার সাহস পাইনি।

নীরা বলল,

—আপনি কি সেই ব্যক্তি, যাঁর কাছে ট্রাস্টের নথি রাখা হয়েছিল?

নাসিমা মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ। আজিজুর রহমান আমাকে কিছু নথি সংরক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তবে আমি ট্রাস্টের সদস্য ছিলাম না। শুধু তাঁর বিশ্বাসের একজন মানুষ ছিলাম।

৩. নাসিমার কাছে থাকা নথি

নাসিমা ব্যাগ থেকে একটি ফাইল বের করলেন।

ফাইলের ওপর লেখা—

“আজিজুর রহমান — ব্যক্তিগত সংরক্ষণ।”

তিনি বললেন,

—এই নথিগুলো আমি কাউকে দিইনি। কারণ আজিজুর সাহেব আমাকে বলেছিলেন, প্রমাণ ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করতে নেই।

ইমরান ফাইলটি খুলে দেখতে লাগল।

প্রথম কয়েকটি কাগজ ছিল ট্রাস্টের সম্পত্তির হিসাব। এরপর পাওয়া গেল একটি পুরোনো বৈঠকের কার্যবিবরণী।

সেখানে লেখা—

“পারিবারিক ট্রাস্টের নথি সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব সাময়িকভাবে নাসিমা বেগমের কাছে থাকবে। কোনো নথি পরিবর্তন বা স্থানান্তরের আগে আজিজুর রহমানের লিখিত অনুমতি নিতে হবে।”

আরিয়ান বলল,

—তাহলে নাসিমা আপার কাছে নথি থাকার বিষয়টি বৈধ ছিল।

জহির মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একটি নথি আমার কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। সেটি কীভাবে নাসিমা আপার কাছ থেকে আমার কাছে এল, তা নিয়ে অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।

নাসিমা বললেন,

—আমি কোনো নথি নিজে থেকে কাউকে দিইনি। আজিজুর সাহেবের নির্দেশে একটি খাম জহিরের কাছে পাঠিয়েছিলাম।

নীরা প্রশ্ন করল,

—সেই খামে কী ছিল?

নাসিমা একটি পুরোনো খামের দিকে ইঙ্গিত করলেন।

—এই খামটি।

৪. সালেহ রহমানের নাম

খামের ভেতরে একটি চিঠি পাওয়া গেল।

চিঠিটি আজিজুর রহমানের লেখা।

“সালেহ,

আমি জানি, তুমি অনেক কিছু নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু পরিবারের পুরোনো নথি যেন কখনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়।

তোমার কাছে যে নীল পাথরের আংটি আছে, সেটি শুধু একটি স্মৃতিচিহ্ন নয়। এটি প্রমাণ করে, ট্রাস্টের নথি সংরক্ষণের দায়িত্ব তোমার হাতে দেওয়া হয়েছিল।

তবে মনে রেখো, নথির দায়িত্ব নেওয়া আর সব সিদ্ধান্তের দায় নেওয়া এক বিষয় নয়।

যদি কোনো দিন সত্য প্রকাশ করতে হয়, তাহলে নাসিমার কাছে থাকা কাগজগুলোও সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে।”

মাহমুদ বললেন,

—তাহলে সালেহ চাচা ট্রাস্টের নথির দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু নাসিমা আপার কাছে মূল কাগজের আরেকটি অংশ ছিল।

ইমরান বলল,

—এখন আমাদের কাছে দুটি আলাদা সংগ্রহ আছে। দুটো মিলিয়ে দেখলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে।

নীরা জহিরের দিকে তাকাল।

—আপনি এত দিন এসব জানতেন। তবু কাউকে বলেননি কেন?

জহির মাথা নিচু করলেন।

—কারণ আমি একটি বড় ভুল করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, নথিগুলো গোপন রাখলে পরিবারের সম্মান রক্ষা পাবে। কিন্তু সেই নীরবতার কারণে নির্দোষ মানুষকে সন্দেহ করা হয়েছে।

৫. জহিরের স্বীকারোক্তি

জহির এবার নিজের ব্যাগ থেকে একটি কাগজ বের করলেন।

—এটা আমার ব্যক্তিগত বিবৃতি। আমি যা জানি, সব লিখেছি।

কাগজে লেখা ছিল—

“আজহার রহমানের মৃত্যুর আগে আমাকে কিছু নথি সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে কামাল আহমেদের আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসে।

আমি জানতাম, কিছু হিসাবের কাগজে অসংগতি রয়েছে। কিন্তু কে সেই কাজের পেছনে ছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানতাম না।

একই সময়ে হাসপাতালের একটি সংযুক্ত কপি আমার কাছে আসে। আমাকে বলা হয়েছিল, এটি পুরোনো ট্রাস্টের নথির সঙ্গে সংরক্ষণ করতে হবে।

আমি কাগজটি গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, এর সঙ্গে কোনো বৈধ অনুমোদন সংযুক্ত ছিল না।

আমি কাগজটি ব্যবহার করিনি। তবে যথাসময়ে বিষয়টি প্রকাশও করিনি। এই নীরবতার দায় আমার।”

রাশেদ বললেন,

—তাহলে আপনি জানতেন, হাসপাতালের কাগজটি সন্দেহজনক?

—হ্যাঁ।

—কিন্তু আমাকে কেন জানাননি?

জহির উত্তর দিলেন,

—কারণ তখন আপনার বিরুদ্ধে আর্থিক অভিযোগ চলছিল। আমি ভয় পেয়েছিলাম, হাসপাতালের কাগজের কথা জানালে আপনার সমস্যাও বাড়বে।

নীরা বলল,

—আপনার ভয় আমাদের পরিবারের জন্য আরও বড় সমস্যা তৈরি করেছে।

জহির মাথা নিচু করলেন।

—আমি জানি।

৬. যে নামটি এখনো অজানা

আরিয়ান প্রশ্ন করল,

—আপনাকে হাসপাতালের কাগজটি কে দিয়েছিল?

জহির কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,

—আমি মুখটি দেখেছিলাম। কিন্তু এত বছর পর শুধু স্মৃতির ওপর নির্ভর করে কারও নাম বলতে চাই না।

ইমরান বলল,

—আপনার কাছে কি কোনো প্রমাণ আছে?

জহির মাথা নাড়লেন।

—একটি রসিদ আছে। সেখানে কাগজটি গ্রহণের তারিখ এবং পাঠানো ব্যক্তির পরিচয়ের সংক্ষিপ্ত অংশ লেখা আছে।

তিনি একটি পুরোনো রসিদ বের করলেন।

নীরা কাগজটি হাতে নিয়ে পড়ল।

তারিখটি ছিল নীরার জন্মের পরের দিন।

প্রেরকের নামের জায়গায় লেখা—

“A. R. — পারিবারিক দপ্তর।”

মাহমুদ বললেন,

—A. R. তো আজিজুর রহমানের নামের আদ্যক্ষরও হতে পারে।

রাশেদ বললেন,

—আবার অন্য কারও নামও হতে পারে।

নীরা কাগজটি ভালো করে দেখল।

—এই রসিদে কি কোনো ঠিকানা আছে?

জহির বললেন,

—আছে। তবে ঠিকানাটি এখন আর ব্যবহার করা হয় না।

৭. শেষ সূত্র

নাসিমা এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন।

এবার তিনি বললেন,

—আমি একটা কথা বলতে চাই।

সবাই তাঁর দিকে তাকাল।

—আজিজুর রহমানের মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি আমাকে একটি কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, পরিবারের ভেতরে একজন মানুষ আছেন, যিনি নিজের পরিচয় ব্যবহার না করে অন্যের নামে কাজ করান।

মাহমুদ বিস্মিত হয়ে বললেন,

—তিনি কি সেই ব্যক্তির নাম বলেছিলেন?

নাসিমা মাথা নাড়লেন।

—না। তবে একটি জায়গার কথা বলেছিলেন। পুরোনো পারিবারিক দপ্তরের পাশের বাড়ি।

ইমরান বলল,

—সেই জায়গার ঠিকানা কি এই রসিদে লেখা?

নাসিমা রসিদটি দেখে ধীরে বললেন,

—হ্যাঁ। এই ঠিকানাটিই।

নীরা বলল,

—তাহলে আমাদের সেখানে যেতে হবে।

জহির এবার নীরার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—যাবে। কিন্তু যাওয়ার আগে একটা কথা মনে রেখো। সেখানে যে নথি পাবে, সেটি হয়তো তোমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেবে না। বরং এমন একটি প্রশ্ন সামনে আনবে, যার উত্তর খুঁজতে তোমাদের আবার আজিজুর রহমানের অতীতে ফিরে যেতে হবে।

আরিয়ান বলল,

—কী প্রশ্ন?

জহির ধীরে উত্তর দিলেন,

—আজিজুর রহমান কেন নিজের জীবনের শেষ দিকে এসে পরিবারের একজন সদস্যকে ট্রাস্টের সব দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন?

মাহমুদ বিস্ময়ে বললেন,

—তিনি কাকে সরিয়েছিলেন?

জহির নীরব রইলেন।

শুধু রসিদের নিচের অংশটি নীরার দিকে এগিয়ে দিলেন।

সেখানে একটি নাম লেখা ছিল।

“মাহমুদ রহমান।”

আরিয়ান বাবার দিকে তাকাল।

মাহমুদ যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

নীরা ধীরে বলল,

—তাহলে দাদু কি আপনাকেও ট্রাস্টের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন?

মাহমুদ কোনো উত্তর দিলেন না।

কারণ তিনি নিজেও জানতেন না, তাঁর বাবা জীবনের শেষ দিকে এমন সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিলেন।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 44 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন