শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৪৫তম পর্ব: বাবার অজানা সিদ্ধান্ত
লাইব্রেরি থেকে ফেরার পুরো পথ মাহমুদ রহমান চুপ ছিলেন।
তাঁর হাতে তখনো সেই পুরোনো রসিদটির ছবি। বারবার সেটির দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি।
রসিদে লেখা নামটি যেন তাঁর অতীতের বন্ধ দরজায় নতুন করে ধাক্কা দিচ্ছিল।
“মাহমুদ রহমান — ট্রাস্টের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি।”
গাড়ির ভেতরে নীরবতা ভেঙে নীরা বলল,
—আপনি কি সত্যিই জানতেন না, দাদু আপনাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন?
মাহমুদ ধীরে মাথা নাড়লেন।
—না, নীরা। আমি কখনো এমন কোনো চিঠি পাইনি।
আরিয়ান বাবার দিকে তাকাল।
—তাহলে এই সিদ্ধান্তের কথা আপনাকে কে জানাল?
—কেউ না। আজ প্রথম জানলাম।
রাশেদ বললেন,
—আজিজুর ভাই এমন সিদ্ধান্ত হঠাৎ নিতেন না। নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো কারণ ছিল।
নীরা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—কারণটা জানতে হবে। কারণ এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে পুরোনো নথিগুলোর সম্পর্ক থাকতে পারে।
১. পুরোনো দপ্তরের ঠিকানা
পরদিন সকালেই আরিয়ান রাফিকে ডেকে পাঠাল।
—রসিদে যে ঠিকানাটা আছে, সেটার বর্তমান অবস্থা জানতে হবে। জায়গাটা কার নামে আছে, সেখানে কোনো পুরোনো কাগজপত্র পাওয়া যায় কি না—সব খোঁজ নাও।
রাফি বলল,
—ঠিক আছে, স্যার।
নীরা পাশে বসে কাগজগুলো সাজাচ্ছিল।
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি কি আজ অফিসে কাজ করবে, নাকি আমাদের সঙ্গে যাবে?
—আমি যাব। এটা শুধু আপনার পরিবারের বিষয় নয়। আমার বাবার নামও এই নথিগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আরিয়ান আর আপত্তি করল না।
কিছুক্ষণ পর রাফি ফিরে এসে জানাল,
—স্যার, জায়গাটা এখনো আছে। পুরোনো ভবনটি ভাঙা হয়নি। তবে সেখানে একজন কেয়ারটেকার থাকেন।
মাহমুদ বললেন,
—চলো। আর দেরি করার দরকার নেই।
২. বন্ধ দরজার ওপারে
পুরোনো ভবনটি শহরের ব্যস্ত রাস্তা থেকে একটু ভেতরে।
দেয়ালের রং উঠে গেছে। জানালার কাঠ পুরোনো হয়ে গেছে। প্রবেশপথের ওপর ছোট একটি ফলকে এখনো লেখা—
“রহমান পারিবারিক দপ্তর।”
দরজায় কড়া নাড়তেই একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন।
—কাকে চান?
মাহমুদ নিজের পরিচয় দিলেন।
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
—আপনি কি মাহমুদ সাহেব?
—জি।
—আপনার বাবা বলেছিলেন, একদিন আপনি আসবেন।
সবাই অবাক হয়ে গেল।
মাহমুদ জিজ্ঞেস করলেন,
—আমার বাবা আপনার কাছে কী বলে গিয়েছিলেন?
বৃদ্ধ বললেন,
—তিনি বলেছিলেন, তাঁর ছেলে যদি কখনো এই বাড়িতে আসে, তাহলে তাকে উত্তর দেবে। তবে আগে একটা প্রশ্ন করতে হবে।
নীরা এগিয়ে এসে বলল,
—কী প্রশ্ন?
বৃদ্ধ মাহমুদের দিকে তাকালেন।
—আপনি কি সত্য জানতে চান, নাকি শুধু নিজের নামের ওপর থেকে অভিযোগ সরাতে চান?
মাহমুদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—আমি সত্য জানতে চাই। সত্য যদি আমার বিরুদ্ধেও যায়, তবু।
বৃদ্ধ দরজাটি খুলে দিলেন।
—তাহলে ভেতরে আসুন।
৩. আজিজুর রহমানের শেষ নির্দেশ
ঘরের ভেতরে একটি কাঠের টেবিল, কয়েকটি পুরোনো চেয়ার এবং দেয়ালে ঝোলানো আজিজুর রহমানের ছবি।
বৃদ্ধের নাম রহিম উদ্দিন।
তিনি একটি আলমারি খুলে ধুলোমাখা ফাইল বের করলেন।
—আজিজুর সাহেব এই ফাইলটি আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, নির্দিষ্ট সময়ের আগে যেন কাউকে না দিই।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—কোন সময়ের কথা বলেছিলেন?
—যেদিন তাঁর পরিবারের কেউ সত্য জানার জন্য নিজের স্বার্থের বাইরে দাঁড়াতে পারবে।
রহিম উদ্দিন ফাইলটি মাহমুদের হাতে দিলেন।
ফাইলের ভেতরে ছিল তিনটি কাগজ।
প্রথমটি ট্রাস্টের দায়িত্ব বণ্টনের তালিকা।
দ্বিতীয়টি একটি বৈঠকের সিদ্ধান্ত।
তৃতীয়টি ছিল আজিজুর রহমানের হাতে লেখা চিঠি।
মাহমুদ চিঠিটি খুললেন।
“মাহমুদ,
তোমাকে ট্রাস্টের দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছি। এই সিদ্ধান্ত তোমার প্রতি অবিশ্বাস থেকে নয়।
আমি জানতে পেরেছি, তোমার অজান্তেই তোমার নাম ব্যবহার করে কিছু নথি তৈরি করা হচ্ছে। তুমি যদি দায়িত্বে থাকো, তাহলে ভবিষ্যতে সেই নথিগুলোর দায় তোমার ওপর চাপানো হতে পারে।
তোমাকে নিরাপদ রাখার জন্যই এই সিদ্ধান্ত।
যেদিন তুমি সব নথি নিজের চোখে দেখবে, সেদিন বুঝতে পারবে কেন আমি তোমাকে কিছু বলিনি।
—আজিজুর রহমান।”
চিঠি পড়া শেষ হলে মাহমুদের চোখ স্থির হয়ে গেল।
তিনি নিচু স্বরে বললেন,
—বাবা আমাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন, কারণ কেউ আমার নাম ব্যবহার করছিল?
নীরা বলল,
—তাহলে দাদু হয়তো আপনাকে দোষী ভাবেননি। বরং বিপদ থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন।
৪. দ্বিতীয় নথির রহস্য
ইমরান দ্বিতীয় কাগজটি হাতে নিল।
সেখানে কয়েকজনের নামের পাশে স্বাক্ষর ছিল।
আজিজুর রহমান, সালেহ রহমান, নাসিমা বেগম এবং জহির উদ্দিন।
কিন্তু একটি জায়গায় নামের অংশ কেটে দেওয়া হয়েছে।
রাশেদ কাগজটি ভালো করে দেখে বললেন,
—এখানে আরেকজনের নাম ছিল।
রহিম উদ্দিন বললেন,
—হ্যাঁ। আজিজুর সাহেব নিজেই নামটি কেটে দিয়েছিলেন।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—কেন?
—তিনি বলেছিলেন, ওই ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করার আগে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে।
আরিয়ান বলল,
—নামটি কি অন্য কোনো কাগজে আছে?
রহিম উদ্দিন কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—একটি চিঠি আছে। তবে সেটি এই ফাইলে নেই।
—কোথায় আছে?
—আজিজুর সাহেবের পুরোনো বাড়িতে।
মাহমুদ অবাক হয়ে বললেন,
—আমাদের গ্রামের বাড়ি?
—জি। তিনি বলেছিলেন, বাড়ির উত্তর দিকের ঘরে কাঠের আলমারির নিচের তাকে চিঠিটি রাখা আছে।
নীরা বলল,
—তাহলে আমাদের সেখানে যেতে হবে।
৫. মাহমুদের অনুশোচনা
সবাই যখন বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, মাহমুদ একা দাঁড়িয়ে আজিজুর রহমানের ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
রাশেদ তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন।
—কী ভাবছেন?
মাহমুদ বললেন,
—বাবা আমাকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন। অথচ এত বছর আমি ভেবেছি, তিনি আমাকে বিশ্বাস করতেন না।
রাশেদ শান্তভাবে বললেন,
—আমাদের সবার জীবনেই এমন কিছু সিদ্ধান্ত থাকে, যার কারণ সময়মতো বোঝা যায় না।
মাহমুদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আর সেই ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে দিয়ে কত বছর চলে গেল।
নীরা কাছে এসে বলল,
—এখনো সময় আছে। অন্তত সত্যটা জানার সুযোগ আছে।
মাহমুদ নীরার দিকে তাকিয়ে মৃদু মাথা নাড়লেন।
—তুমি ঠিক বলেছ।
৬. গ্রামের বাড়ির আলমারি
সেদিন বিকেলেই তাঁরা গ্রামের পুরোনো বাড়িতে পৌঁছালেন।
হাশেম আলী তাঁদের দেখে এগিয়ে এলেন।
—আবার এসেছেন?
নীরা বলল,
—হ্যাঁ। উত্তর দিকের ঘরটা খুলতে হবে।
হাশেম আলী দরজা খুলে দিলেন।
ঘরের ভেতরে পুরোনো কাঠের আসবাবপত্র। এক পাশে সেই কাঠের আলমারি।
আরিয়ান ও ইমরান আলমারির নিচের তাকটি পরীক্ষা করতে লাগল।
কিছু পুরোনো কাপড় সরাতেই একটি ছোট কাঠের বাক্স পাওয়া গেল।
বাক্সে তালা ছিল না।
ভেতরে একটি চিঠি এবং একটি পুরোনো ছবি।
ছবিতে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।
একজন আজিজুর রহমান।
অন্যজন সালেহ রহমান।
তৃতীয় ব্যক্তির মুখ ছবির এক পাশে ছায়ায় ঢাকা।
ছবির পেছনে লেখা—
“যে নামটি সবাই ভুলে গেছে, তার কাছেই শেষ হিসাবের উত্তর।”
নীরা ছবিটি হাতে নিয়ে বলল,
—এই মানুষটি কে?
মাহমুদ ছবিটি দেখলেন। তাঁর মুখের ভাব বদলে গেল।
—আমি এই মুখ চিনি।
আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,
—আপনি চেনেন?
মাহমুদ ধীরে উত্তর দিলেন,
—এই মানুষটি আমাদের পরিবারের কেউ নন। কিন্তু ছোটবেলায় তাঁকে দাদুর সঙ্গে কয়েকবার দেখেছিলাম।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—নাম কী তাঁর?
মাহমুদ ছবির পেছনের লেখাটি আবার পড়লেন।
তারপর বললেন,
—তাঁর নাম ছিল জয়নাল আবেদিন।
ঘরের সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
ইমরান বলল,
—এই নাম তো আমরা আগে কখনো শুনিনি।
মাহমুদ চিঠিটি খুললেন।
প্রথম লাইন পড়েই তিনি থমকে গেলেন।
সেখানে লেখা—
“জয়নাল, তুমি যদি এই চিঠি পাও, তাহলে বুঝবে আমার পরিবারের কেউ অবশেষে সত্যের কাছে পৌঁছেছে।”
নীরা চিঠিটি পড়ার জন্য এগিয়ে এল।
কিন্তু চিঠির পরের অংশে এমন একটি তথ্য ছিল, যা তাদের পুরোনো ধারণাগুলোকে আবার নতুন করে ভাবতে বাধ্য করল।
চিঠির নিচে লেখা—
“কামালের হিসাবের ভুল খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল। কঠিন ছিল সেই মানুষটিকে চেনা, যে ভুল হিসাবগুলোকে বৈধ বলে সবার সামনে উপস্থাপন করেছিল।”
আরিয়ান ধীরে বলল,
—তাহলে কামালের পেছনে থাকা মানুষটি হয়তো হিসাবের দায়িত্বে ছিল না। সে ছিল কাগজগুলোকে বৈধ দেখানোর দায়িত্বে।
নীরা চিঠিটি শক্ত করে ধরে বলল,
—এবার আমাদের জয়নাল আবেদিনকে খুঁজে বের করতে হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
জয়নাল আবেদিন কি এখনো বেঁচে আছেন?
আর তিনি কি জানেন, এত বছর ধরে একটি পরিবারের জীবন বদলে দেওয়া সত্যটি তাঁর কাছেই লুকিয়ে আছে?
চলবে…