ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 46

লেখক: Mafiya Queen

শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

লেখক: Mafiya Queen 👑

৪৬তম পর্ব: হারিয়ে যাওয়া সাক্ষী

পুরোনো বাড়ির উত্তর দিকের ঘরে সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

নীরার হাতে জয়নাল আবেদিনের ছবিটি। আরিয়ানের হাতে সেই চিঠি, যেটি এত বছরের পুরোনো রহস্যের নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।

মাহমুদ ছবিটির দিকে তাকিয়ে বললেন,

—ছোটবেলায় দাদুর সঙ্গে এই মানুষটিকে দু-একবার দেখেছিলাম। কিন্তু কখনো নাম জিজ্ঞেস করিনি।

নীরা প্রশ্ন করল,

—তাহলে তাঁর সম্পর্কে আপনার কিছুই মনে নেই?

—একটা কথা মনে আছে। দাদু তাঁকে খুব সম্মান করতেন। অন্যদের সঙ্গে যেভাবে কথা বলতেন, তাঁর সঙ্গে সেভাবে বলতেন না।

ইমরান বলল,

—তাহলে জয়নাল সাধারণ কোনো কর্মচারী ছিলেন না।

রাশেদ চিঠিটি হাতে নিয়ে বললেন,

—তাঁকে খুঁজে বের করতে হবে। কারণ হিসাবের ভুল কে করেছিল, সেটা আমরা জানি। কিন্তু সেই ভুলকে বৈধ হিসেবে দেখিয়েছিল কে, সেটা এখনো অজানা।

১. পুরোনো ঠিকানার খোঁজ

পরদিন সকালে রাফি অফিসে এসে জানাল,

—স্যার, জয়নাল আবেদিন নামে একজনের পুরোনো চাকরির রেকর্ড পেয়েছি। তিনি একসময় রহমান অ্যান্ড কোম্পানির নথি যাচাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

—বর্তমানে কোথায় থাকেন?

—পুরোনো ঠিকানাটি পাওয়া গেছে। তবে সেখানে এখন তাঁর পরিবারের একজন সদস্য থাকেন।

নীরা বলল,

—আমরা আজই যাব।

রাফি আরও একটি কাগজ এগিয়ে দিল।

—স্যার, একটা বিষয় আছে। জয়নাল সাহেব প্রায় পনেরো বছর আগে চাকরি ছেড়ে দেন। চাকরি ছাড়ার কারণ হিসেবে লেখা আছে—ব্যক্তিগত অসুস্থতা।

ইমরান কাগজটি দেখে বলল,

—পনেরো বছর আগে? অথচ আমাদের প্রয়োজনীয় ঘটনাগুলোর বেশির ভাগই তার আগের।

মাহমুদ বললেন,

—হতে পারে তিনি সবকিছু জানতেন। আবার এমনও হতে পারে, তাঁকে কিছু জানানোই হয়নি।

নীরা দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

—সেটা তাঁর মুখ থেকেই শুনব।

২. জয়নাল আবেদিনের বাড়ি

বিকেলে তাঁরা একটি পুরোনো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন।

দরজা খুললেন মধ্যবয়সী এক নারী।

—কাকে খুঁজছেন?

মাহমুদ নিজের পরিচয় দিলেন।

নারীটি একটু অবাক হয়ে বললেন,

—আপনারা কি জয়নাল সাহেবের বিষয়ে এসেছেন?

নীরা বলল,

—জি। উনি কি এখানে থাকেন?

নারীটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—তিনি আমার বাবা। তবে এখন খুব বেশি মানুষের সঙ্গে দেখা করেন না।

আরিয়ান শান্তভাবে বলল,

—আমরা তাঁকে কোনো সমস্যায় ফেলতে আসিনি। পুরোনো কিছু কাগজের বিষয়ে তাঁর সাহায্য প্রয়োজন।

নারীটি তাঁদের ভেতরে নিয়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর ঘরের ভেতর থেকে একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন।

মাহমুদ তাঁকে দেখেই ছবির কথা মনে করতে পারলেন।

—আপনি কি জয়নাল আবেদিন?

বৃদ্ধ ধীরে বললেন,

—হ্যাঁ। কিন্তু আপনারা এত বছর পর আমার কাছে কেন এসেছেন?

নীরা ছবিটি তাঁর সামনে রাখল।

—এই ছবিটা আমরা আজিজুর রহমানের পুরোনো বাড়ি থেকে পেয়েছি।

ছবিটি দেখেই জয়নালের মুখের ভাব বদলে গেল।

তিনি দীর্ঘক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

—আজিজুর সাহেব... তিনি কি আর বেঁচে নেই?

মাহমুদ নিচু স্বরে বললেন,

—না। অনেক বছর আগেই মারা গেছেন।

জয়নাল চোখ নামিয়ে ফেললেন।

—তাহলে সময় শেষ হয়ে গেছে।

৩. যে হিসাব কখনো মেলেনি

জয়নাল তাঁদের বসতে বললেন।

নীরা সরাসরি প্রশ্ন করল,

—কামাল আহমেদের আর্থিক অনিয়ম সম্পর্কে আপনি কী জানতেন?

জয়নাল বললেন,

—আমি হিসাবের কাগজ যাচাই করতাম। একসময় কয়েকটি হিসাবের মধ্যে অসংগতি দেখতে পাই। কিন্তু সেগুলো সংশোধনের জন্য যে অনুমোদন প্রয়োজন ছিল, তা কাগজে ঠিকঠাক দেখানো হয়েছিল।

ইমরান জিজ্ঞেস করল,

—কে অনুমোদন দিয়েছিল?

—কাগজে কয়েকজনের স্বাক্ষর ছিল। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম, সব স্বাক্ষর আসল নয়।

রাশেদ বললেন,

—তাহলে আপনি বিষয়টি আজিজুর সাহেবকে জানাননি কেন?

জয়নাল উত্তর দিলেন,

—জানিয়েছিলাম। তিনি আমাকে মূল নথিগুলো আলাদা করে রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরই সেই নথির একটি অংশ আমার কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

নীরা বিস্মিত হয়ে বলল,

—কে নিয়েছিল?

জয়নাল মাথা নাড়লেন।

—আমি নিশ্চিত ছিলাম না। শুধু জানতাম, যিনি নথি সরিয়েছিলেন, তিনি অফিসের ভেতরেরই কেউ।

আরিয়ান বলল,

—আপনার কাছে কি কোনো কপি আছে?

জয়নাল ধীরে উঠে পাশের আলমারি খুললেন।

সেখান থেকে একটি পুরোনো খাতা বের করলেন।

—এটা আমার ব্যক্তিগত হিসাবের খাতা। মূল নথি নয়, তবে কোন তারিখে কোন কাগজ যাচাই করেছি, তার বিবরণ আছে।

ইমরান খাতাটি খুলে কয়েকটি পাতা দেখতে লাগল।

হঠাৎ একটি পাতায় এসে সে থেমে গেল।

সেখানে লেখা—

“১৭ জুন — মূল হিসাবের কপি পরিবর্তিত। অনুমোদন যাচাই অসম্পূর্ণ। পুনরায় যাচাইয়ের নির্দেশ।”

তার নিচে একটি সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষর।

“J.A.”

৪. দ্বিতীয় স্বাক্ষর

ইমরান বলল,

—এই স্বাক্ষর আপনার?

জয়নাল মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ। আমি নিজের জন্য লিখেছিলাম।

নীরা পাতাটি ভালো করে দেখল।

—কিন্তু এখানে আরেকটি নাম থাকার কথা ছিল না?

জয়নাল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—ছিল। আমি যার কাছে বিষয়টি জানিয়েছিলাম, তার নামও লিখেছিলাম। পরে খাতার ওই অংশ কেটে ফেলা হয়েছে।

মাহমুদ বললেন,

—আপনি কি জানেন কে কেটেছে?

—না। তবে কাটার আগের লেখার চাপ এখনো পাতার পেছনে থাকতে পারে।

ইমরান পাতাটি উল্টে আলোতে ধরল।

কিছু অস্পষ্ট অক্ষর দেখা গেল।

সে ধীরে ধীরে পড়ার চেষ্টা করল।

“...রহমান।”

নীরা বলল,

—শুধু পদবি দিয়ে কাউকে সন্দেহ করা যাবে না। আমাদের পুরো নাম দরকার।

জয়নাল মাথা নাড়লেন।

—ঠিক বলেছ। প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী করা উচিত নয়।

৫. হাসপাতালের কাগজের সঙ্গে সম্পর্ক

আরিয়ান এবার অন্য প্রশ্ন করল।

—নীরার জন্মের রাতের হাসপাতালের কাগজ সম্পর্কে আপনি কিছু জানতেন?

জয়নাল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—হ্যাঁ। আজিজুর সাহেব আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোনো হাসপাতালের সংযুক্ত কপি কি অফিসের নথির সঙ্গে রাখা হয়েছে?

নীরা আগ্রহ নিয়ে বলল,

—আপনি কী উত্তর দিয়েছিলেন?

—আমি বলেছিলাম, এমন একটি কাগজ আমার সামনে এসেছিল। কিন্তু সেটি ট্রাস্টের নথি হিসেবে গ্রহণ করার কোনো বৈধ নির্দেশ ছিল না।

মাহমুদ বললেন,

—তাহলে আপনি জানতেন, কাগজটি সন্দেহজনক।

—জানতাম। তবে আমি হাসপাতালের মূল রেজিস্টার দেখিনি। পরে শুনেছিলাম, মূল রেজিস্টারে কোনো পরিবর্তন হয়নি।

নীরা শান্তভাবে বলল,

—আমরা সেটি আগেই নিশ্চিত হয়েছি। ডা. নাসরিনও একই কথা বলেছেন।

জয়নাল বললেন,

—তাহলে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার। কেউ সংযুক্ত কপিটিকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, কিন্তু মূল রেকর্ড পরিবর্তন করতে পারেনি।

রাশেদ প্রশ্ন করলেন,

—কিন্তু কেন?

জয়নাল উত্তর দিলেন না।

কিছুক্ষণ পর বললেন,

—সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমার কাছে নেই। তবে আজিজুর সাহেব একবার বলেছিলেন, ব্যবসার নথি আর হাসপাতালের কাগজ—দুটোর পেছনে একই কয়েকজন মানুষের যোগাযোগ ছিল। কিন্তু উদ্দেশ্য এক ছিল কি না, তা তিনি নিশ্চিত হতে পারেননি।

৬. খাতার ভেতরের চিঠি

বাড়ি থেকে ফেরার আগে জয়নাল তাঁদের আরেকটি ছোট কাগজ দিলেন।

—এটা খাতার ভেতরে অনেক দিন ধরে রাখা ছিল। আজিজুর সাহেব আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে মাহমুদকে দেব।

মাহমুদ চিঠিটি খুললেন।

“মাহমুদ,

যদি কখনো জয়নালের কাছে যাও, তার কথা মন দিয়ে শুনবে।

তোমার চারপাশে এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের তুমি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করেছ। কিন্তু বিশ্বাস আর প্রমাণ এক নয়।

কাউকে শুধু সম্পর্কের কারণে নির্দোষ ভাববে না, আবার সন্দেহের কারণে অপরাধীও বানাবে না।

সত্যকে খুঁজবে, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে বিচার করবে না।

—বাবা”

চিঠিটি পড়ে মাহমুদ দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকলেন।

নীরা তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল,

—দাদু হয়তো জানতেন, একদিন এই প্রশ্নগুলো আবার সামনে আসবে।

মাহমুদ বললেন,

—হ্যাঁ। আর তিনি চাইতেন, আমরা যেন রাগ দিয়ে নয়, প্রমাণ দিয়ে সত্য খুঁজি।

৭. শেষ পাতার নাম

বাড়ি ফেরার পথে ইমরান খাতাটি আবার পরীক্ষা করছিল।

হঠাৎ সে বলল,

—এক মিনিট! এখানে আরও কিছু লেখা আছে।

সবাই তার দিকে তাকাল।

ইমরান খাতার শেষ পাতাটি খুলে দেখাল।

সেখানে ছোট করে লেখা—

“মূল নথি যাচাইয়ের পর দ্বিতীয় কপি পাঠানো হয়েছে—সালেহ রহমানের কাছে।”

নীরা বলল,

—সালেহ চাচার কাছে?

—হ্যাঁ। কিন্তু তার নিচে আরেকটি লাইন আছে।

ইমরান পাতাটি কাছে টেনে পড়ল।

“সালেহের নির্দেশে নথিটি ফেরত নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গ্রহণের স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি।”

আরিয়ান বলল,

—তার মানে নথিটি সালেহ রহমানের কাছে পৌঁছেছিল কি না, সেটাও নিশ্চিত নয়।

রাশেদ বললেন,

—সালেহ বেঁচে থাকলে হয়তো তিনি জানেন।

মাহমুদ ধীরে বললেন,

—তাহলে আমাদের তাঁকে খুঁজতেই হবে।

নীরা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

এত দিনের অনুসন্ধানে তারা জানতে পেরেছে, কামাল একা ছিল না। জয়নাল কিছু নথির অসংগতি দেখেছিলেন। আজিজুর রহমানও বিষয়টি জানতেন। কিন্তু আসল নথির শেষ গন্তব্য এখনো অজানা।

ঠিক তখন রাফির ফোন এল।

আরিয়ান ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে রাফি বলল,

—স্যার, সালেহ রহমানের নামে একটা পুরোনো জমির রেকর্ড পাওয়া গেছে। তবে সেখানে একটি নতুন তথ্য আছে।

—কী তথ্য?

রাফি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,

—রেকর্ড অনুযায়ী, গত মাসেও ওই জমির খাজনা জমা হয়েছে। অর্থাৎ কেউ একজন এখনো সেই সম্পত্তির দেখাশোনা করছেন।

নীরা অবাক হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকাল।

সালেহ রহমান যদি সত্যিই মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর সম্পত্তির দেখাশোনা করছে কে?

আর যদি তিনি বেঁচে থাকেন—

তাহলে এত বছর ধরে কোথায় ছিলেন?

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 46 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন