শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৫০তম পর্ব: শেষ পাতার গোপন নাম
রওশন আরা রহমানের বার্তাটি পড়ার পর নীরা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
একটি নামের জন্য এত বছরের সম্পর্ক বদলে যেতে পারে—কথাটা সহজে মেনে নিতে পারছিল না সে।
আরিয়ান পাশে বসে বলল,
—কী ভাবছ?
নীরা ফোনটি তার দিকে এগিয়ে দিল।
আরিয়ান বার্তাটি পড়ে বলল,
—কাল আমরা যাব। তবে একটা কথা মনে রেখো, কাগজে কোনো নাম থাকলেই সেই মানুষ অপরাধী হয়ে যায় না।
নীরা মৃদু মাথা নাড়ল।
—আমি শুধু সত্যটা জানতে চাই।
১. রওশন আরার বাড়িতে
পরদিন দুপুরে তাঁরা রওশন আরা রহমানের বাড়িতে পৌঁছালেন।
রওশন তাঁদের বসার ঘরে নিয়ে গেলেন। তাঁর সামনে একটি পুরোনো ফাইল রাখা ছিল।
নীরা বসতেই তিনি বললেন,
—তোমরা যে নথির শেষ পাতাটি খুঁজছ, সেটি আমার কাছে বহু বছর ধরে আছে।
মাহমুদ প্রশ্ন করলেন,
—এত দিন আমাদের দেননি কেন?
রওশন আরা শান্তভাবে বললেন,
—কারণ আজিজুর রহমানের মৃত্যুর পর এই কাগজ নিয়ে অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আমি চাইনি, প্রমাণ যাচাই না করে কেউ কাউকে দোষী ভাবুক।
রাশেদ বললেন,
—এখন তো আমরা সবাই সত্য জানতে চাইছি।
রওশন ফাইলটি খুললেন।
—তাহলে আজ আর কিছু গোপন করব না।
২. শেষ পাতার নাম
রওশন একটি কাগজ বের করে নীরার সামনে রাখলেন।
কাগজের ওপর লেখা—
“ব্যক্তিগত বিবৃতি — আজিজুর রহমান।”
নীরা পড়তে শুরু করল।
“আমার মৃত্যুর পর যদি পুরোনো হিসাবের কোনো নথি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে মনে রাখতে হবে, সব সিদ্ধান্ত আমার অনুমতিতে নেওয়া হয়নি।
কামাল আহমেদ আর্থিক অনিয়ম করেছে। কিন্তু তাকে সহযোগিতা করার জন্য যে নথিগুলো অনুমোদনের পথে পাঠানো হয়েছে, সেগুলোর দায়িত্ব শুধু একজনের নয়।
আমি কয়েকজনের ভূমিকা সম্পর্কে সন্দেহ করেছি। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কারও নাম লিখে যেতে চাই না।
তবে একজনের বিষয়ে আমি নিশ্চিত। তিনি জানতেন, নথিগুলোতে কী পরিবর্তন হচ্ছে। তিনি চাইলে সেগুলো থামাতে পারতেন।
তবু তিনি নীরব ছিলেন।”
নীরা পরের অংশ পড়তে গিয়ে থেমে গেল।
শেষ পাতায় একটি নাম লেখা।
“জহির উদ্দিন।”
ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল।
মাহমুদ বললেন,
—জহির?
রওশন মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। তবে পুরো বিবৃতিটা না পড়ে সিদ্ধান্ত নিয়ো না।
৩. জহিরের ভূমিকা
রওশন আরা ব্যাখ্যা করলেন,
—আজিজুর রহমান জহিরকে বিশ্বাস করতেন। তাঁকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে জানতে পারেন, জহির কয়েকটি কাগজের উৎস যাচাই না করেই গ্রহণ করেছে।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে জহির সরাসরি নথি পরিবর্তন করেছিল, এমন প্রমাণ নেই?
—না। এই কাগজে সেটাও লেখা নেই। শুধু বলা হয়েছে, সে বিষয়টি বুঝতে পেরেও সময়মতো সবাইকে জানায়নি।
নীরা বলল,
—জহির নিজেও তো আমাদের কাছে কিছু কথা স্বীকার করেছে।
রওশন মাথা নাড়লেন।
—তাহলে সে অন্তত নিজের ভুলের একটি অংশ মেনে নিয়েছে।
রাশেদ বললেন,
—কিন্তু আজিজুর ভাই কেন পুরো ঘটনাটি প্রকাশ করেননি?
রওশন উত্তর দিলেন,
—তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। ভেবেছিলেন, সব প্রমাণ একত্র করে তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু তার আগেই তিনি মারা যান।
৪. আরেকটি অপ্রত্যাশিত তথ্য
নীরা কাগজটি আবার দেখতে লাগল।
হঠাৎ তার চোখে একটি বাক্য পড়ল।
“এই বিবৃতির সঙ্গে সংযুক্ত দ্বিতীয় তালিকাটি নাসিমার কাছে পাঠানো হয়নি। সেটি রাখা হয়েছে পারিবারিক ট্রাস্টের পুরোনো রেজিস্টারে।”
নীরা বলল,
—দ্বিতীয় তালিকা!
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—এটা কোথায় পাওয়া যাবে?
রওশন বললেন,
—ট্রাস্টের পুরোনো রেজিস্টার এখন আমার কাছে নেই। আজিজুর সাহেবের মৃত্যুর পর সেটি জহিরের কাছে যাওয়ার কথা ছিল।
মাহমুদ বললেন,
—তাহলে আবার জহিরের কাছে যেতে হবে।
রওশন ধীরে বললেন,
—হ্যাঁ। তবে এবার তাকে শুধু প্রশ্ন করলে হবে না। এই বিবৃতির কপিটাও দেখাতে হবে।
৫. নীরার সিদ্ধান্ত
বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে রওশন নীরাকে আলাদা করে ডাকলেন।
—একটা কথা বলব, মা?
—জি, বলুন।
—তোমার জন্মের রাতের বিষয়টি নিয়ে তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছ, বুঝতে পারছি। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, তোমার পরিচয় নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তোমার বাবা-মা তোমাকে ভালোবেসে বড় করেছেন। পুরোনো কিছু মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত তোমার পরিচয় বদলে দিতে পারে না।
নীরা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
—আমি জানি। এখন আর নিজের পরিচয় নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। আমি শুধু জানতে চাই, কেন আমার জন্মের রাতের কাগজটি অন্য নথির সঙ্গে জড়ানো হয়েছিল।
রওশন তার হাতের ওপর হাত রাখলেন।
—সেই উত্তরও একদিন পাবে।
নীরা মৃদু হাসল।
—আমি অপেক্ষা করব। তবে এবার আর অর্ধেক সত্যে থামব না।
৬. জহিরের সামনে শেষ বিবৃতি
সেদিন সন্ধ্যায় আরিয়ান জহিরকে ফোন করল।
—আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
জহির বললেন,
—কী বিষয়ে?
—আজিজুর রহমানের ব্যক্তিগত বিবৃতির শেষ পাতাটি আমরা পেয়েছি।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর জহিরের কণ্ঠ শোনা গেল,
—তাহলে রওশন অবশেষে কাগজটি দিয়েছে।
আরিয়ান অবাক হলো।
—আপনি জানতেন কাগজটি তাঁর কাছে আছে?
—জানতাম।
—তাহলে এত দিন বলেননি কেন?
জহির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—কারণ ওই বিবৃতির সঙ্গে আরেকটি তালিকা ছিল। আর সেই তালিকায় শুধু আমার নাম নয়, আরও কয়েকজনের দায়িত্বের বিবরণ আছে।
আরিয়ান বলল,
—আমরা কাল আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
জহির সম্মতি দিলেন।
—এসো। এবার পুরো রেজিস্টারটাও দেখাব।
৭. যে তালিকায় তিনটি নাম
ফোন রাখার পর আরিয়ান নীরাকে সব জানাল।
নীরা বলল,
—তাহলে কালই হয়তো আমরা অনেক কিছু জানতে পারব।
আরিয়ান বলল,
—হতে পারে। তবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রতিটি নথি যাচাই করব।
নীরা একটু হেসে বলল,
—তুমি সব সময় এত হিসাব করে কথা বলো কেন?
আরিয়ান মৃদু হেসে উত্তর দিল,
—কারণ এই গল্পে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফল আমরা অনেক দেখেছি।
নীরা আর কিছু বলল না।
পরদিন জহিরের কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে সে পুরোনো নথিগুলো গুছিয়ে রাখল।
কিন্তু রাতের দিকে জহির নিজেই আরিয়ানকে একটি ছবি পাঠাল।
ছবিটি ছিল ট্রাস্টের পুরোনো রেজিস্টারের একটি পাতা।
সেখানে তিনটি নাম লেখা—
১. জহির উদ্দিন — নথি সংরক্ষণ। ২. মিজানুর রহমান — চুক্তি যাচাই। ৩. তৃতীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত — নামের জায়গাটি ফাঁকা।
নিচে হাতে লেখা একটি বাক্য—
“তৃতীয় ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না, যত দিন না মূল হিসাব উদ্ধার হয়।”
নীরা ছবিটি দেখে বলল,
—তাহলে তৃতীয় ব্যক্তির নাম ইচ্ছা করেই বাদ রাখা হয়েছিল!
মাহমুদ ছবিটি হাতে নিয়ে বললেন,
—কিন্তু কেন?
আরিয়ান ছবির নিচের অংশে জুম করে দেখল।
সেখানে ছোট একটি চিহ্ন ছিল—একটি বৃত্তের ভেতরে ১৭।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—১৭ নম্বর লকার!
মাহমুদ ধীরে বললেন,
—তাহলে ১৭ নম্বর লকারের সঙ্গে এই তৃতীয় ব্যক্তির সম্পর্ক রয়েছে।
এত দিনের অনুসন্ধান আবার ফিরে এল সেই পুরোনো লকারের কাছে।
কিন্তু এবার তাদের হাতে শুধু একটি নম্বর নয়—একটি অজানা পরিচয়ের সূত্রও রয়েছে।
চলবে…