শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৫১তম পর্ব: সতেরো নম্বর লকারের শেষ চাবি
রাত তখন প্রায় দশটা।
আরিয়ানের পাঠানো ছবিটি নীরা বারবার দেখছিল। ট্রাস্টের রেজিস্টারে তিনটি দায়িত্বের উল্লেখ থাকলেও তৃতীয় ব্যক্তির নামের জায়গাটি ফাঁকা।
আর নিচে সেই পরিচিত চিহ্ন—
১৭।
নীরা ফোন করে আরিয়ানকে বলল,
—আমার মনে হচ্ছে, ১৭ নম্বর লকারের সঙ্গে তৃতীয় ব্যক্তির পরিচয়ও লুকানো আছে।
আরিয়ান বলল,
—আমারও তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু একটা বিষয় বুঝতে পারছি না। লকারটি তো আজিজুর রহমানের নামে ছিল। তাহলে তৃতীয় ব্যক্তির নাম সেখানে কীভাবে পাওয়া যাবে?
—হয়তো লকারের ভেতরে এমন কোনো নথি আছে, যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিচয় লেখা।
—কাল সকালে ব্যাংকে যাব। এবার লকারের পুরো ইতিহাস জানতে হবে।
১. পুরোনো লকারের নতুন তথ্য
পরদিন সকালে আরিয়ান, নীরা, মাহমুদ ও রাশেদ ব্যাংকে পৌঁছালেন।
আগেই প্রয়োজনীয় কাগজ জমা দেওয়ায় কর্মকর্তা তাঁদের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করেছিলেন।
তিনি পুরোনো রেকর্ড পরীক্ষা করে বললেন,
—১৭ নম্বর লকারটি আজিজুর রহমানের নামে ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর লকারের দায়িত্ব হস্তান্তরের আবেদন করা হয়েছিল।
মাহমুদ প্রশ্ন করলেন,
—কার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল?
কর্মকর্তা কাগজ দেখে বললেন,
—রেকর্ডে সালেহ রহমানের নাম রয়েছে।
রাশেদ বললেন,
—কিন্তু সালেহ তো বলেছিলেন, সব নথি তাঁর কাছে ছিল না।
কর্মকর্তা উত্তর দিলেন,
—হস্তান্তরের কাগজে তাঁর স্বাক্ষর আছে। তবে লকারের ভেতরে কী ছিল, তার পূর্ণ তালিকা আমাদের কাছে নেই।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—লকারটি কি পরে আবার খোলা হয়েছিল?
কর্মকর্তা কিছুক্ষণ রেকর্ড পরীক্ষা করে বললেন,
—হ্যাঁ। প্রায় এক বছর পর। তবে সেদিন সালেহ রহমান উপস্থিত ছিলেন না।
আরিয়ান জানতে চাইল,
—তাহলে কে খুলেছিলেন?
কর্মকর্তা একটি পুরোনো আবেদন সামনে রাখলেন।
সেখানে লেখা—
“বিশেষ অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিনিধি।”
কিন্তু প্রতিনিধির নামের জায়গায় শুধু একটি কোড লেখা ছিল।
T-03।
২. সালেহ রহমানের ব্যাখ্যা
ব্যাংক থেকে বেরিয়েই মাহমুদ সালেহকে ফোন করলেন।
—চাচা, ১৭ নম্বর লকার এক বছর পর আবার খোলা হয়েছিল। আপনি জানতেন?
সালেহ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—হ্যাঁ। আমি জানতাম।
—তাহলে আমাদের বলেননি কেন?
—কারণ আমি নিজে লকারটি খুলিনি। আজিজুর ভাইয়ের নির্দেশে একজন প্রতিনিধিকে অনুমতি দিয়েছিলাম।
নীরা ফোনের কাছে এসে বলল,
—সেই প্রতিনিধি কে ছিলেন?
সালেহ উত্তর দিলেন,
—আমি তাঁর পরিচয় জানতাম না। আমাকে শুধু একটি সিল করা অনুমতিপত্র দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে নিরাপদ জায়গায় রাখতে হবে।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—আপনার কাছে সেই অনুমতিপত্রের কপি আছে?
—হ্যাঁ। আমার পুরোনো ফাইলে থাকার কথা।
নীরা বলল,
—দয়া করে সেটি খুঁজে রাখুন। আমরা আজই আপনার কাছে আসছি।
৩. T-03-এর পরিচয়
সালেহের বাড়িতে পৌঁছানোর পর তিনি একটি পুরোনো ফাইল তাঁদের সামনে রাখলেন।
ফাইলের ভেতরে অনেক কাগজের সঙ্গে একটি অনুমতিপত্র পাওয়া গেল।
নীরা কাগজটি হাতে নিল।
সেখানে লেখা—
“১৭ নম্বর লকার থেকে নির্ধারিত নথি সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের জন্য T-03 কোডধারী প্রতিনিধিকে অনুমতি প্রদান করা হলো।”
নিচে সালেহ রহমানের স্বাক্ষর।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কাগজটির পেছনের অংশ।
সেখানে একটি নামের অর্ধেক লেখা—
“রও...”
মাহমুদ বললেন,
—রওশন আরা?
রাশেদ মাথা নাড়লেন।
—হতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যাবে না।
নীরা কাগজটি উল্টেপাল্টে দেখল।
—এখানে কালি মুছে যাওয়ার চিহ্ন আছে। হয়তো পুরো নাম লেখা ছিল।
সালেহ বললেন,
—আমি যখন কাগজটি পেয়েছিলাম, তখনও নামটি এমনই ছিল।
৪. রওশন আরার অজানা কথা
সেদিন বিকেলে নীরা রওশন আরাকে ফোন করল।
—খালা, T-03 নামে একজন প্রতিনিধি ১৭ নম্বর লকার খুলেছিলেন। আপনার কি এ বিষয়ে কিছু জানা আছে?
রওশন আরা কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন।
তারপর বললেন,
—নীরা, তোমাদের একটা কথা আগে বলা উচিত ছিল।
—কী কথা?
—আজিজুর রহমান আমাকে একবার একটি দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি লকার খোলার দায়িত্ব ছিল না। আমাকে বলা হয়েছিল, লকার থেকে যে কাগজগুলো বের হবে, সেগুলোর একটি তালিকা তৈরি করতে।
নীরা অবাক হলো।
—তাহলে আপনি কি সেদিন ব্যাংকে গিয়েছিলেন?
—না। আমি ব্যাংকে যাইনি। তালিকাটি পরে আমার কাছে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু সেটি কখনো আসেনি।
আরিয়ান পাশে বসে সব শুনছিল।
সে বলল,
—আপনি কি জানতেন, সেই প্রতিনিধি কে ছিলেন?
রওশন উত্তর দিলেন,
—না। তবে আজিজুর রহমান বলেছিলেন, ওই ব্যক্তি পরিবারের কেউ নন। তিনি শুধু সত্য সংরক্ষণের দায়িত্ব পেয়েছেন।
৫. হারিয়ে যাওয়া তালিকা
রওশন আরা তাঁদের একটি পুরোনো খামের কথা বললেন।
—আমার কাছে আজিজুর রহমানের আরেকটি চিঠি আছে। সেখানে লকার থেকে বের করা নথির তালিকার উল্লেখ রয়েছে।
নীরা বলল,
—আমরা কি সেটি দেখতে পারি?
—অবশ্যই। তোমরা আগামীকাল এসো।
পরদিন সকালে তাঁরা আবার রওশন আরার বাড়িতে গেলেন।
তিনি একটি খাম খুলে চিঠিটি বের করলেন।
চিঠিতে লেখা—
“রওশন,
লকার থেকে যে নথিগুলো সংগ্রহ করা হবে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অসম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিবৃতির দ্বিতীয় অংশ।
ওই অংশে এমন একটি তথ্য আছে, যা আর্থিক অনিয়ম এবং হাসপাতালের সংযুক্ত কপির ঘটনাকে আলাদা করে বুঝতে সাহায্য করবে।
দয়া করে মনে রেখো, দুটি ঘটনা একই সময়ে ঘটেছে বলেই তাদের উদ্দেশ্য এক ছিল—এমন সিদ্ধান্ত নিও না।
সত্য যাচাই করেই সামনে এগোবে।
—আজিজুর রহমান”
নীরা চিঠিটি পড়ে বলল,
—দাদু স্পষ্ট করে লিখেছেন, দুটি ঘটনার উদ্দেশ্য এক নাও হতে পারে।
মাহমুদ বললেন,
—তাহলে এত দিন আমরা যে বিষয়গুলো একসঙ্গে মিলিয়ে দেখছিলাম, সেগুলো আরও সতর্কভাবে পরীক্ষা করতে হবে।
৬. তৃতীয় ব্যক্তির সূত্র
চিঠির সঙ্গে একটি ছোট তালিকাও ছিল।
তালিকায় লকার থেকে সংগ্রহ করা চারটি নথির উল্লেখ রয়েছে।
১. ট্রাস্টের মূল দায়িত্ব বণ্টনপত্র। ২. আর্থিক অনিয়মের প্রাথমিক প্রতিবেদন। ৩. হাসপাতালের সংযুক্ত কপির গ্রহণসংক্রান্ত রসিদ। ৪. তৃতীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিচয়পত্রের অনুলিপি।
কিন্তু চতুর্থ নথিটির পাশে লেখা—
“মূল পরিচয়পত্র ফেরত দেওয়া হয়নি।”
ইমরান কাগজটি দেখে বলল,
—এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিচয়পত্রের অনুলিপি পাওয়া গেলে T-03-এর পরিচয় জানা যেতে পারে।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে ব্যাংকের কাছে আবার আবেদন করতে হবে। প্রতিনিধির পরিচয় যাচাইয়ের কোনো রেকর্ড আছে কি না দেখতে হবে।
রাশেদ বললেন,
—আর যদি সেই রেকর্ড না থাকে?
নীরা উত্তর দিল,
—তাহলে যিনি লকার খুলেছিলেন, তাঁকে খুঁজে বের করব।
৭. অপ্রত্যাশিত ফোন
সেদিন রাতে নীরা নিজের ঘরে বসে পুরোনো কাগজগুলো গুছাচ্ছিল।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
নীরা ফোন ধরল।
—হ্যালো?
ওপাশ থেকে একজন বয়স্ক পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।
—আমি কি নীরা রহমানের সঙ্গে কথা বলছি?
—জি। আপনি কে বলছেন?
—আমার নাম আবদুল মান্নান। একসময় ব্যাংকের পুরোনো লকার বিভাগে কাজ করতাম।
নীরা সোজা হয়ে বসল।
—জি, বলুন।
—তোমরা কি ১৭ নম্বর লকারের খোঁজ করছ?
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—হ্যাঁ। আপনি কীভাবে জানলেন?
লোকটি ধীরে বললেন,
—কারণ সেই লকার খোলার দিন আমিই দায়িত্বে ছিলাম।
নীরার বুকের ভেতর কৌতূহল বেড়ে গেল।
—আপনি কি T-03 প্রতিনিধিকে দেখেছিলেন?
—দেখেছিলাম। তবে তাঁর নাম জানতাম না। একটা কথা মনে আছে, তিনি লকার থেকে সব কাগজ নেননি। শুধু একটি নীল খাম নিয়েছিলেন।
—নীল খাম?
—হ্যাঁ। আর খামটি নেওয়ার আগে তিনি একটি কথা বলেছিলেন।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—কী কথা?
লোকটি উত্তর দিলেন,
—“এই কাগজ যার হাতে পৌঁছানোর কথা, সে এখনো নিজের পরিচয় জানে না।”
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—আপনি কি সেই ব্যক্তিকে আবার দেখেছিলেন?
—না। তবে আমার কাছে সেদিনের একটি পুরোনো দর্শনার্থী রেজিস্টার আছে। সেখানে তাঁর স্বাক্ষর থাকতে পারে।
নীরা দ্রুত বলল,
—আমরা কি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি?
—পারবে। তবে একটা বিষয় মনে রেখো, নীরা। ওই স্বাক্ষর দেখলে তুমি হয়তো এমন একজনের নাম পাবে, যাঁকে তোমরা এত দিন খুঁজছিলে না।
ফোন কেটে গেল।
নীরা সঙ্গে সঙ্গে আরিয়ানকে ফোন করল।
সব শুনে আরিয়ান বলল,
—কাল আমরা আবদুল মান্নানের সঙ্গে দেখা করব।
নীরা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
১৭ নম্বর লকারের নীল খামটি কার হাতে গিয়েছিল?
আর সেই খামের জন্যই কি এত বছর ধরে কেউ অপেক্ষা করছিল?
চলবে…