শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৫৫তম পর্ব: পুরোনো রসিদের পেছনের সত্য
রাশেদের পুরোনো ডায়েরির পাতায় লেখা ছোট্ট সংখ্যা—০৯।
নীরা বারবার সংখ্যাটির দিকে তাকাচ্ছিল।
নাসিমা বেগমের নামে থাকা ০৯ নম্বর লকার, আর বাবার ডায়েরিতে লেখা ০৯ নম্বর রসিদ—দুটির মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আরিয়ান বলল,
—কাল সকালে পুরোনো পারিবারিক দপ্তরে যাব। জহির সাহেবও সেখানে আসবেন।
নীরা বলল,
—রসিদটা পাওয়া গেলে হয়তো দ্বিতীয় সাক্ষীর পরিচয় জানা যাবে।
—হ্যাঁ। তবে মনে রেখো, কোনো নাম পেলেই তাকে দায়ী করা যাবে না।
নীরা মাথা নাড়ল।
১. পুরোনো সংরক্ষণাগার
পরদিন সকাল।
রহমান পরিবারের পুরোনো দপ্তরটি বহু বছর ধরে প্রায় বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। কয়েকটি ঘরে পুরোনো ফাইল, হিসাবের খাতা আর চুক্তিপত্র সাজানো।
জহির উদ্দিন তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
নীরাকে দেখে তিনি বললেন,
—তোমরা ঠিক সময়েই এসেছ। আমি গতকাল রাতেই পুরোনো তালিকাটা আবার পরীক্ষা করেছি।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—রসিদটির কোনো সন্ধান পেয়েছেন?
জহির একটি ফাইল বের করলেন।
—এখানে ০৯ নম্বর রসিদের উল্লেখ আছে। কিন্তু মূল রসিদটি এই ফাইলে নেই।
নীরা বলল,
—তাহলে কোথায়?
জহির উত্তর দিলেন,
—সম্ভবত পুরোনো নথি হস্তান্তরের বাক্সে।
মাহমুদ বললেন,
—বাক্সটি কোথায় রাখা হয়েছিল?
জহির একটি ঘরের দিকে ইশারা করলেন।
—ওই ঘরে। তবে বাক্সটি শেষবার কে খুলেছিল, তা আমার জানা নেই।
২. ধুলোমাখা বাক্স
ঘরটির দরজা খুলতেই পুরোনো কাগজের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
এক পাশে কয়েকটি কাঠের বাক্স রাখা।
জহির একটি বাক্সের গায়ে লেখা নম্বর দেখালেন।
TR-09
নীরা বলল,
—এটাই কি সেই বাক্স?
—হ্যাঁ। তবে ভেতরে কী আছে, খুলে না দেখলে বলা যাবে না।
আরিয়ান সাবধানে বাক্সটি খুলল।
ভেতরে কয়েকটি পুরোনো রসিদ, দায়িত্ব হস্তান্তরের কাগজ এবং একটি ছোট খাম পাওয়া গেল।
নীরা একে একে কাগজগুলো পরীক্ষা করতে লাগল।
হঠাৎ একটি রসিদ হাতে নিয়ে সে থেমে গেল।
রসিদের ওপর লেখা—
“নথি সংরক্ষণ ফি — ০৯”
নিচে তারিখ এবং দুটি স্বাক্ষর।
প্রথম স্বাক্ষরটি পরিচিত।
নাসিমা বেগম।
দ্বিতীয় স্বাক্ষরটি অস্পষ্ট।
নীরা বলল,
—এই স্বাক্ষরটা কার?
জহির কাগজটি হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখলেন।
—এটা আমার স্বাক্ষর নয়।
মাহমুদ বললেন,
—তাহলে দ্বিতীয় সাক্ষী?
জহির মাথা নাড়লেন।
—সম্ভবত।
৩. রসিদের পেছনের লেখা
নীরা রসিদটি উল্টে দেখল।
পেছনে পেন্সিল দিয়ে কয়েকটি লাইন লেখা।
লেখাগুলো পুরোনো হলেও পড়া যাচ্ছিল।
“মূল নথি গ্রহণ করা হয়নি।
পরবর্তী যাচাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
সাক্ষী উপস্থিত না থাকলে কোনো কাগজ চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে না।”
নিচে একটি নামের প্রথম অংশ লেখা—
“মোঃ আ...”
ইমরান বলল,
—নামটি অসম্পূর্ণ। কিন্তু এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। রসিদে স্পষ্ট লেখা, মূল নথি গ্রহণ করা হয়নি।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে নাসিমা বেগমের লকার থেকে কাগজ সরানো হয়েছিল—এমন ধারণাও আবার যাচাই করতে হবে।
নীরা বলল,
—আর দ্বিতীয় সাক্ষী উপস্থিত না থাকায় নথিটি অসম্পূর্ণ ছিল।
জহির ধীরে বললেন,
—এ কারণেই আজিজুর সাহেব বারবার বলতেন, কোনো কাগজকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরার আগে তার সঙ্গে থাকা সব নথি দেখতে হবে।
৪. নাসিমা বেগমের স্মৃতি
নীরা সঙ্গে সঙ্গে নাসিমা বেগমকে ফোন করল।
—খালা, ০৯ নম্বর রসিদের কথা মনে আছে?
নাসিমা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—হ্যাঁ, একটা রসিদ ছিল। কিন্তু আমি শুধু কাগজ সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছিলাম।
—সেদিন কি আপনার সঙ্গে আর কেউ ছিলেন?
—একজন লোক এসেছিলেন। তাঁর নামের শুরুতে সম্ভবত ‘আ’ ছিল। তবে পুরো নাম মনে নেই।
—তিনি কি কোনো কাগজে স্বাক্ষর করেছিলেন?
—হ্যাঁ। আমার মনে আছে, তিনি রসিদের পেছনে কিছু লিখেছিলেন। বলেছিলেন, মূল কাগজ যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কিছুই চূড়ান্ত নয়।
নীরা বলল,
—আপনি কি তাঁর চেহারা মনে করতে পারেন?
নাসিমা উত্তর দিলেন,
—চেহারা খুব স্পষ্ট মনে নেই। তবে তাঁর হাতে একটা পুরোনো পরিচয়পত্র ছিল। তিনি বলেছিলেন, তিনি ট্রাস্টের বাইরের নিরীক্ষক।
আরিয়ান পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
সে বলল,
—তাহলে লোকটি সম্ভবত মতিউর রহমানের মতোই কোনো নিরীক্ষক ছিলেন।
নাসিমা বললেন,
—হতে পারে। কিন্তু মতিউর সাহেব ছিলেন কি না, আমি নিশ্চিত নই।
৫. অসম্পূর্ণ পরিচয়
জহির রসিদটি আবার পরীক্ষা করলেন।
—এখানে একটা বিষয় খেয়াল করেছ?
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—কী?
জহির রসিদের নিচের দিকে দেখালেন।
সেখানে একটি ছোট সিল ছিল।
“বহিরাগত নিরীক্ষা বিভাগ।”
আর পাশে একটি নম্বর—
A-17/09
ইমরান বলল,
—A-17/09। এটা কি কোনো ফাইল নম্বর?
মাহমুদ বললেন,
—হতে পারে। আবার কোনো ব্যক্তির দায়িত্বের কোডও হতে পারে।
আরিয়ান বলল,
—জয়নাল আবেদিনের কাছে পুরোনো নিরীক্ষা বিভাগের তালিকা থাকতে পারে। তাঁকে দেখাতে হবে।
নীরা রসিদটির ছবি তুলে রাখল।
তারপর বলল,
—আমরা এত দিন T-03 কোডের পেছনে ছুটেছি। কিন্তু এই A-17/09 হয়তো আমাদের দ্বিতীয় সাক্ষীর পরিচয় দেবে।
৬. মতিউর রহমানের চিঠি
দুপুরে মতিউর রহমানের কাছ থেকে আরিয়ানের ফোনে একটি বার্তা এল।
তিনি তাঁদের জানালেন, পুরোনো কাগজপত্রের মধ্যে আরেকটি চিঠি পাওয়া গেছে।
চিঠিটি আজিজুর রহমানের লেখা।
আরিয়ান তাঁকে ফোন করল।
—চিঠিতে কী আছে?
মতিউর বললেন,
—এখানে ০৯ নম্বর রসিদের কথা উল্লেখ আছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো—
তিনি চিঠিটি পড়ে শোনালেন।
“নথি গ্রহণের সময় যে দ্বিতীয় সাক্ষী উপস্থিত থাকার কথা, তিনি কোনো পক্ষের প্রতিনিধি নন। তাঁর দায়িত্ব শুধু নিশ্চিত করা যে মূল কাগজের সঙ্গে সংযুক্ত অনুলিপির কোনো অমিল নেই।
যদি অনুলিপিতে অমিল পাওয়া যায়, তবে সেটি আলাদা করে সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই মূল রেজিস্টার পরিবর্তন করা যাবে না।”
নীরা বলল,
—এটা তো ডা. নাসরিনের কথার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। হাসপাতালের মূল রেজিস্টার পরিবর্তন হয়নি, শুধু সংযুক্ত কপিতে সমস্যা ছিল।
মতিউর উত্তর দিলেন,
—ঠিক। তবে এই চিঠি থেকে বোঝা যায় না, দ্বিতীয় সাক্ষী জানতেন কি না যে সংযুক্ত কপিতে সমস্যা ছিল।
৭. নতুন নাম
সন্ধ্যার দিকে জয়নাল আবেদিন তাঁদের কাছে এলেন।
রসিদটি দেখে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—এই সিল আমি চিনি।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—কার?
জয়নাল বললেন,
—এটা বহিরাগত নিরীক্ষা বিভাগের সিল। ওই সময় সেখানে তিনজন কাজ করতেন। তাঁদের একজন ছিলেন মতিউর রহমান। আরেকজন ছিলেন আবদুস সালাম। তৃতীয়জনের নাম আমার মনে নেই।
নীরা দ্রুত বলল,
—তাহলে ‘মোঃ আ...’ দিয়ে শুরু হওয়া নামটি কি আবদুস সালাম হতে পারে?
জয়নাল মাথা নাড়লেন।
—হতে পারে। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার জন্য কর্মচারী তালিকা লাগবে।
তিনি নিজের ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো কাগজ বের করলেন।
—এটা আমি বহু বছর আগে সংরক্ষণ করেছিলাম। নিরীক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকা।
নীরা কাগজটি হাতে নিল।
প্রথম নাম মতিউর রহমান।
দ্বিতীয় নাম আবদুস সালাম।
তৃতীয় নামের জায়গায় লেখা—
“আতিকুর রহমান — বিশেষ নথি যাচাইকারী।”
নীরা নামটি পড়তেই থেমে গেল।
কারণ এই নামটি সে আগে শুনেছে।
তার বাবা রাশেদ রহমান একবার পুরোনো অফিসের একটি ঘটনার কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, আতিকুর রহমান নামের একজন ব্যক্তি নথি যাচাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
কিন্তু তিনি কোথায় গিয়েছিলেন, কেউ জানত না।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে আমাদের পরবর্তী খোঁজ আতিকুর রহমান।
জয়নাল ধীরে বললেন,
—হ্যাঁ। তবে একটা কথা মনে রেখো। তিনি শুধু সাক্ষী ছিলেন না। আজিজুর রহমান তাঁকে একটি বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—কী দায়িত্ব?
জয়নাল উত্তর দিলেন,
—নীল খামের মূল কাগজটি কার হাতে যাবে, সেই সিদ্ধান্ত যাচাই করার দায়িত্ব।
নীরা রসিদটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তাহলে আতিকুর রহমান শুধু দ্বিতীয় সাক্ষী নন—তিনি জানতেন নীল খামের আসল কাগজ কোথায় যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু তিনি কি এখনো বেঁচে আছেন?
আর যদি বেঁচে থাকেন, এত বছর পর সত্য প্রকাশ করতে রাজি হবেন?
চলবে…