শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৫৪তম পর্ব: খালার লুকানো চিঠি
মতিউর রহমানের দেওয়া ছোট কাগজটিতে লেখা নামটির দিকে নীরা বারবার তাকাচ্ছিল।
সামিরা বেগম।
তার নিজের খালা!
যে মানুষটি ছোটবেলা থেকে তাকে স্নেহ করেছেন, বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন, সেই মানুষটির কাছে কি সত্যিই ১৭ নম্বর লকারের নীল খামের আসল কাগজটি ছিল?
নীরা ধীরে বলল,
—খালা যদি কাগজটি পেয়ে থাকেন, তাহলে এত দিন আমাদের বলেননি কেন?
আরিয়ান বলল,
—আগে তাঁর সঙ্গে কথা বলি। শুধু একটা নাম দেখে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
মতিউর রহমানও মাথা নাড়লেন।
—আজিজুর সাহেবের নির্দেশে আমি শুধু নামটি লিখেছিলাম। কাগজটি তাঁর হাতে পৌঁছেছিল কি না, তা আমার জানা নেই।
নীরা কাগজটি ভাঁজ করে ব্যাগে রাখল।
তার মনে এখন একটাই প্রশ্ন—সামিরা খালা কী জানেন?
১. খালার মুখোমুখি
সেদিন সন্ধ্যায় নীরা সরাসরি সামিরার বাড়িতে গেল।
সামিরা তাকে দেখে অবাক হলেন।
—কী ব্যাপার নীরা? কিছু হয়েছে?
নীরা বসে ব্যাগ থেকে কাগজটি বের করল।
—খালা, এই নামটা কি আপনার?
সামিরা কাগজটির দিকে তাকালেন।
এক মুহূর্তের জন্য তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—এটা তুমি কোথায় পেলে?
নীরা শান্ত গলায় বলল,
—মতিউর রহমানের কাছে দ্বিতীয় ট্রাস্ট রেজিস্টার পেয়েছি। সেখানে আপনার নাম লেখা আছে।
সামিরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—আমি জানতাম, একদিন এই প্রশ্নটা আসবে।
নীরার বুক ধক করে উঠল।
—তার মানে আপনি কিছু জানেন?
সামিরা ধীরে মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। তবে পুরো ঘটনা নয়।
২. নীল খামের গল্প
সামিরা আলমারির ভেতর থেকে একটি পুরোনো ফাইল বের করলেন।
ফাইলটি টেবিলের ওপর রেখে বললেন,
—অনেক বছর আগে আজিজুর রহমান আমাকে একটি খাম দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এটা এমন একটি কাগজ, যা ভুল মানুষের হাতে গেলে অনেক নির্দোষ মানুষ সমস্যায় পড়বে।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—সেই খামটাই কি ১৭ নম্বর লকারের নীল খাম?
—আমি নিশ্চিত নই। আমার কাছে যে খামটি এসেছিল, সেটি নীল রঙের ছিল। কিন্তু সেটি লকার থেকে সরাসরি এসেছিল কি না, তা আমি বলতে পারব না।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—খামটি কে আপনার কাছে পৌঁছে দিয়েছিল?
সামিরা উত্তর দিলেন,
—জহির উদ্দিন।
নীরা বলল,
—জহির চাচা?
—হ্যাঁ। তিনি বলেছিলেন, আজিজুর রহমানের নির্দেশে কাগজটি আমার কাছে রাখতে হবে। আমি তখন খুব বেশি প্রশ্ন করিনি।
ইমরান, যে নীরার সঙ্গে এসেছিল, বলল,
—খামটি এখন কোথায়?
সামিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—খামটি আমার কাছে নেই।
নীরা বিস্মিত হলো।
—নেই মানে?
—অনেক বছর আগে আমি সেটি একজনের কাছে ফেরত দিয়েছিলাম।
৩. কাগজটি কার কাছে গেল?
আরিয়ান এবার একটু সামনে ঝুঁকে বসল।
—কাকে দিয়েছিলেন?
সামিরা বললেন,
—রাশেদ ভাইকে।
নীরা অবাক হয়ে গেল।
—বাবাকে?
—হ্যাঁ। তবে পুরো খাম নয়। ভেতরের একটি কাগজ তাঁকে দেখিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, কাগজটি তাঁর কাছে থাকা উচিত নয়। পরে সেটি জহিরের কাছে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।
নীরা বলল,
—তাহলে বাবা কি জানতেন, খামের ভেতরে কী ছিল?
সামিরা মাথা নাড়লেন।
—তিনি কাগজটি পড়েছিলেন। কিন্তু সেটির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ করেছিলেন। কারণ সেখানে কিছু হিসাবের তথ্য ছিল, আর একটি হাসপাতালের নথির উল্লেখও ছিল। তিনি বলেছিলেন, দুটি বিষয় আলাদা করে যাচাই না করে কাউকে কিছু বলা যাবে না।
ইমরান বলল,
—তাহলে নীল খামের কাগজটি এখন জহিরের কাছে থাকার কথা?
সামিরা উত্তর দিলেন,
—হতে পারে। কিন্তু শেষবার যখন তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন কাগজটি আর তাঁর কাছে নেই।
৪. রাশেদের স্বীকারোক্তি
নীরা সেদিনই বাবাকে ফোন করল।
—বাবা, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
রাশেদ কিছুক্ষণ পর তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন।
সামিরা সব ঘটনা খুলে বললেন।
রাশেদ চুপচাপ শুনলেন।
তারপর বললেন,
—হ্যাঁ, আমি ওই কাগজটি দেখেছিলাম। কিন্তু তোমাদের কাছ থেকে কিছু লুকানোর জন্য চুপ থাকিনি।
নীরা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তাহলে আগে বলোনি কেন?
রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—কারণ কাগজটিতে কয়েকজনের নাম ছিল। কিন্তু নামের পাশে কী দায়িত্ব ছিল, তা পরিষ্কার ছিল না। আমি ভয় পেয়েছিলাম, ভুল ব্যাখ্যা করলে আবার নির্দোষ কারও ওপর দোষ চাপবে।
মাহমুদ বললেন,
—কাগজে কি আমার বাবার নাম ছিল?
রাশেদ উত্তর দিলেন,
—তোমার বাবার নাম ছিল না। সেখানে একটি দায়িত্বের উল্লেখ ছিল, আর পাশে একটি সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষর।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—স্বাক্ষরটি কি A. Rahman?
রাশেদ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—না। আমার যতদূর মনে আছে, সেখানে লেখা ছিল “A.R. — Witness Copy”।
ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল।
৫. সাক্ষীর কপি
ইমরান বলল,
—Witness Copy মানে সাক্ষীর জন্য রাখা অনুলিপি। তাহলে মূল কাগজ আরেক জায়গায় ছিল।
আরিয়ান বলল,
—আর সেই মূল কাগজ খুঁজতেই আমাদের এত দিন সময় লাগছে।
নীরা বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
—তুমি কি কাগজটির কোনো ছবি তুলেছিলে?
রাশেদ মাথা নাড়লেন।
—না। তবে কাগজটি ফেরত দেওয়ার আগে আমি একটা তারিখ লিখে রেখেছিলাম। সেটা আমার পুরোনো ডায়েরিতে থাকতে পারে।
তিনি নিজের ব্যাগ থেকে একটি ছোট ডায়েরি বের করলেন।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে একটি তারিখের পাশে লেখা পাওয়া গেল—
“নীল খাম — জহিরের কাছে ফেরত। মূল নথি যাচাই বাকি।”
তারিখটি ছিল প্রায় আঠারো বছর আগের।
আরেকটি লাইনে লেখা—
“দ্বিতীয় সাক্ষীর স্বাক্ষর না পাওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নয়।”
আরিয়ান বলল,
—তাহলে দ্বিতীয় সাক্ষীই আমাদের পরবর্তী সূত্র।
মাহমুদ প্রশ্ন করলেন,
—সেই সাক্ষী কে?
রাশেদ মাথা নাড়লেন।
—আমি জানি না। কাগজটি ফেরত দেওয়ার সময় জহির শুধু বলেছিল, সে ব্যক্তির পরিচয় পরে জানানো হবে।
৬. জহিরের ফোন
রাত প্রায় সাড়ে আটটা।
নীরা যখন বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন আরিয়ানের ফোন বেজে উঠল।
ফোনের ওপাশে জহির উদ্দিন।
—আরিয়ান, তোমাদের সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
আরিয়ান বলল,
—জী, বলুন।
—সামিরা বেগমের কাছে যে নীল খামটি ছিল, সে বিষয়ে আমি জানি।
নীরা দ্রুত আরিয়ানের দিকে তাকাল।
আরিয়ান স্পিকারে দিল।
জহির বললেন,
—তবে তোমরা একটা ভুল ধারণা করছ। নীল খামের কাগজটি আমি ফেরত পাইনি।
নীরা বলল,
—তাহলে কাগজটি কোথায়?
জহির কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
—কাগজটি যার কাছে থাকার কথা ছিল, তিনি সেটি গ্রহণ করেননি।
—কেন?
—কারণ তিনি বলেছিলেন, কাগজটি অসম্পূর্ণ। দ্বিতীয় সাক্ষীর স্বাক্ষর ছাড়া সেটি কোনো কাজে আসবে না।
আরিয়ান প্রশ্ন করল,
—সেই দ্বিতীয় সাক্ষী কে?
জহির ধীরে উত্তর দিলেন,
—তাঁর নাম আমি জানি। কিন্তু নাম বলার আগে তোমাদের একটি পুরোনো রসিদ দেখাতে হবে।
নীরা বলল,
—কোথায় পাব সেই রসিদ?
জহির জানালেন,
—আমার কাছে নেই। রসিদটি রাখা হয়েছিল পুরোনো পারিবারিক দপ্তরের নথি সংরক্ষণাগারে।
৭. রসিদের পেছনের লেখা
ফোন রাখার আগে জহির আরও একটি কথা বললেন।
—নীরা, একটা বিষয় মনে রেখো। তোমার বাবা ওই কাগজের কারণে কোনো অপরাধ করেননি। তিনি শুধু সত্যতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে চাননি।
নীরা বলল,
—আমি বাবাকে বিশ্বাস করি। কিন্তু এবার সবকিছু পরিষ্কারভাবে জানতে চাই।
জহির উত্তর দিলেন,
—সেটাই হওয়া উচিত।
ফোন কেটে যাওয়ার পর আরিয়ান বলল,
—কাল পুরোনো সংরক্ষণাগারে যেতে হবে।
নীরা মাথা নাড়ল।
তারপর বাবার ডায়েরির পাতাটি আবার দেখল।
রসিদের কথা সেখানে লেখা ছিল না। কিন্তু তারিখের পাশে ছোট করে একটি সংখ্যা লেখা—
০৯।
নীরা হঠাৎ বলল,
—এক মিনিট! ১৭ নম্বর লকারের পর এবার ০৯ নম্বর রসিদ। এটা কি নাসিমা বেগমের ০৯ নম্বর লকারের সঙ্গে সম্পর্কিত?
মাহমুদ বললেন,
—সম্ভব। তবে আগে রসিদটি খুঁজে বের করতে হবে।
আরিয়ান নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এবার আমরা শুধু নাম খুঁজব না। প্রতিটি কাগজের উৎসও যাচাই করব।
নীরা ডায়েরিটি বন্ধ করল।
তার মনে হলো, এত দিনের রহস্যের প্রতিটি দরজা খুলছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি দরজার পেছনে অপেক্ষা করছে আরও একটি প্রশ্ন।
আর এবার সেই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে একটি পুরোনো রসিদের পেছনে।
চলবে…