শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৬৬তম পর্ব: সালেহর স্বীকারোক্তি
সকালের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। নীরা টেবিলের ওপর রাখা ফারহান কবিরের ফোন নম্বর আর PR-08/17-এর কাগজটির দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—সালেহ রহমান কেন প্যাকেট পাঠানোর অনুমতি দিয়েছিলেন, অথচ এত দিন বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন?
আরিয়ান ঘরে ঢুকে বলল,
—সালেহ চাচা আজ বিকেলে দেখা করতে রাজি হয়েছেন।
নীরা কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই বলল,
—তিনি কি জানেন আমরা ফারহান কবিরের সঙ্গে কথা বলেছি?
—জানেন। আমি তাঁকে কিছুই লুকাইনি।
নীরা এবার তাকাল।
—তাহলে দেখা যাক, এবার তিনি কী বলেন।
১. পুরোনো হিসাব
বিকেলে তাঁরা সালেহ রহমানের কাছে পৌঁছালেন। তাঁদের দেখে সালেহ বুঝতে পারলেন, নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেছে।
আরিয়ান কাগজটি তাঁর সামনে রাখল।
—চাচা, এই স্বাক্ষরটা কি আপনার?
সালেহ কাগজটি হাতে নিয়ে ভালো করে দেখলেন।
কিছুক্ষণ পর বললেন,
—হ্যাঁ। এটা আমার স্বাক্ষর।
নীরা সরাসরি প্রশ্ন করল,
—আপনি ফারহান কবিরকে C-14-এর প্যাকেট পাঠানোর অনুমতি দিয়েছিলেন?
—হ্যাঁ, দিয়েছিলাম।
—কেন?
সালেহ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—কারণ তখন ট্রাস্টের কিছু পুরোনো নথি নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে রাখার প্রয়োজন হয়েছিল। জহিরের কাছে একটি কপি ছিল। আর মূল কাগজের সঙ্গে সেটি মিলিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
আরিয়ান বলল,
—কিন্তু মিজানুর সাহেবের অনুমোদন তখনো স্থগিত ছিল।
সালেহ মাথা নিচু করলেন।
—আমি বিষয়টি জানতাম না।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—আপনি জানতেন না, নাকি জানার চেষ্টা করেননি?
প্রশ্নটি শুনে সালেহ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—সত্যি বলতে, আমি শুধু প্যাকেট পাঠানোর অনুমতি দিয়েছিলাম। পরিচয় যাচাইয়ের দায়িত্ব আমার ছিল না। তবে এখন বুঝতে পারছি, আমার আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।
২. অনুমতির সীমা
আরিয়ান কাগজের আরেকটি অংশ দেখাল।
—এখানে লেখা আছে, ফারহান কবির শুধু প্যাকেট গ্রহণ ও পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন। তাহলে তাঁকে প্যাকেটের ভেতরের বিষয় জানানো হয়নি কেন?
সালেহ বললেন,
—কারণ তাঁকে কেবল বাহক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। নথির বিষয়বস্তু জানার অনুমতি তাঁর ছিল না।
নীরা প্রশ্ন করল,
—তাহলে আপনি জানতেন প্যাকেটের ভেতরে কী ছিল?
সালেহ একটু থেমে বললেন,
—আমাকে বলা হয়েছিল, সেখানে C-14-এর দ্বিতীয় কপি এবং যাচাইসংক্রান্ত একটি নির্দেশনা আছে। কিন্তু হাসপাতালের সংযুক্ত কাগজের কথা আমাকে বলা হয়নি।
ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল।
নীরা ধীরে বলল,
—অর্থাৎ আপনি জানতেন না, একই প্যাকেটে হাসপাতালের কাগজও ছিল?
—না। আমি জানতাম না।
৩. নাসিমার নাম
নীরা এবার নাসিমা বেগমের কথা তুলল।
—ফারহান কবির বলেছেন, প্যাকেটটি তাঁর হাতে দিয়েছিলেন নাসিমা বেগম।
সালেহ মাথা নাড়লেন।
—নাসিমার কাছে তখন কিছু পুরোনো নথি সংরক্ষণের দায়িত্ব ছিল। সম্ভবত সেই কারণেই তিনি প্যাকেটটি দিয়েছিলেন।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি তাঁকে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন?
—না। আমি শুধু ফারহানকে অনুমতি দিয়েছিলাম। প্যাকেট তাঁর হাতে কীভাবে পৌঁছেছে, সেটা আমার জানা ছিল না।
নীরা বলল,
—তাহলে আমাদের নাসিমার কাছ থেকেও পুরো বিষয়টি জানতে হবে।
সালেহ সম্মতি জানালেন।
—অবশ্যই। তবে একটা কথা মনে রেখো, নীরা। কাগজ পৌঁছে দেওয়া আর কাগজের ভেতরের বিষয় পরিবর্তন করা এক কথা নয়। কাউকে সন্দেহ করার আগে প্রমাণ খুঁজে বের করো।
নীরা শান্ত গলায় বলল,
—আমি কাউকে দোষী করতে চাই না। শুধু সত্যটা জানতে চাই।
৪. ফারহানের রসিদ
সেদিন সন্ধ্যায় ফারহান কবির তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন।
তিনি একটি পুরোনো ফাইল থেকে রসিদটি বের করলেন।
—এটাই সেই কাগজ।
রসিদে তারিখ লেখা—১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮।
নিচে ফারহানের স্বাক্ষর। পাশে সালেহ রহমানের অনুমোদনের চিহ্ন।
কিন্তু নীরার চোখ আটকে গেল রসিদের একেবারে নিচের ছোট্ট লেখাটিতে।
“প্যাকেট গ্রহণের পর দ্বিতীয় কপি আলাদাভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।”
নীরা বলল,
—এই নির্দেশ কে লিখেছিল?
ফারহান উত্তর দিলেন,
—আমি জানি না। আমাকে যখন রসিদ দেওয়া হয়েছিল, তখন লেখাটি আগে থেকেই ছিল।
আরিয়ান কাগজটি ভালো করে দেখল।
—এখানে আরও একটি চিহ্ন আছে। R-21।
নীরা অবাক হলো।
—R-21! এই কোডটা তো আমরা আগেও পেয়েছি।
ফারহান বললেন,
—আমি কোডটির অর্থ জানি না। তবে জহির সাহেব প্যাকেট নেওয়ার সময় একটি নীল রঙের খাতায় কিছু লিখেছিলেন। খাতার মলাটে সম্ভবত R-21 লেখা ছিল।
নীরা আরিয়ানের দিকে তাকাল।
তাহলে R-21 শুধু কাগজের হিসাব নয়, প্যাকেট গ্রহণের হিসাবও হতে পারে।
৫. জহিরের কাছে নতুন প্রশ্ন
পরদিন তাঁরা জহির উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করলেন।
আরিয়ান রসিদটি তাঁর সামনে রাখল।
—আপনি কি R-21 খাতায় এই প্যাকেটের তথ্য লিখেছিলেন?
জহির কাগজটি দেখে বললেন,
—হ্যাঁ। প্যাকেটটি পাওয়ার পর আমি গ্রহণের তথ্য লিখেছিলাম।
নীরা প্রশ্ন করল,
—প্যাকেটটি কি আপনি খুলেছিলেন?
—হ্যাঁ। কিন্তু শুধু নথির সংখ্যা মিলিয়ে দেখেছিলাম। কোনো কাগজের বিষয়বস্তু পরিবর্তন করিনি।
—তাহলে দ্বিতীয় কপি আলাদা করে রাখার নির্দেশ কে দিয়েছিল?
জহির এবার থমকে গেলেন।
তিনি ধীরে বললেন,
—নির্দেশটি প্যাকেটের সঙ্গে ছিল। কিন্তু সেটা কে লিখেছিল, আমি জানি না।
আরিয়ান বলল,
—আপনি কি নির্দেশটির মূল কপি রেখেছেন?
জহির কিছুক্ষণ চিন্তা করে উত্তর দিলেন,
—R-21 খাতার সঙ্গে একটি ছোট কাগজ আটকানো ছিল। অনেক বছর আগে আমি সেটি আলাদা করে রেখেছিলাম।
নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
—সেটা কি এখনো আপনার কাছে আছে?
জহির মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। তবে সেখানে এমন একটি নাম লেখা আছে, যেটা দেখে আমিও অবাক হয়েছিলাম।
৬. অচেনা স্বাক্ষর
জহির একটি পুরোনো খাম বের করলেন।
খামের ভেতরে ছোট্ট কাগজ।
সেখানে লেখা—
“C-14-এর দ্বিতীয় কপি যাচাই না হওয়া পর্যন্ত আলাদা সংরক্ষণে থাকবে। পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যাবে না।”
নিচে একটি স্বাক্ষর।
নীরা স্বাক্ষরটির দিকে তাকিয়ে রইল।
এটা সালেহর নয়।
মাহমুদেরও নয়।
আরিয়ান কাগজটি হাতে নিয়ে বলল,
—এই স্বাক্ষরটা পরিচিত লাগছে।
নীরা তার দিকে তাকাল।
—কাকে মনে হচ্ছে?
আরিয়ান ধীরে উত্তর দিল,
—আমার মনে হচ্ছে, এটা আমাদের পরিবারের পুরোনো ট্রাস্টের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বাক্ষর। কিন্তু নিশ্চিত হতে মূল রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
জহির বললেন,
—আর একটা কথা আছে। এই নির্দেশের নিচে যে তারিখ লেখা, সেটা প্যাকেট পাঠানোর তারিখের আগের দিন।
নীরা কাগজের তারিখটি পড়ল।
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৮।
তার বুকের ভেতর অজানা এক আশঙ্কা তৈরি হলো।
কারণ এই তারিখে যে ব্যক্তি নির্দেশটি লিখেছিলেন, তাঁর নাম এখনো কেউ উচ্চারণ করেনি।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
সেই ব্যক্তি কি জানতেন, C-14-এর দ্বিতীয় সাক্ষীর পরিচয় তখনো যাচাই হয়নি?
নীরা কাগজটি শক্ত করে ধরে বলল,
—আমাদের এবার স্বাক্ষরটা মিলিয়ে দেখতে হবে।
আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
—হ্যাঁ। কারণ এই স্বাক্ষরই হয়তো আমাদের পরের দরজাটা খুলে দেবে।
কিন্তু তারা তখনো জানত না, সেই স্বাক্ষরের সঙ্গে এমন একজনের নাম জড়িয়ে আছে, যাঁকে এত দিন তারা এই ঘটনার বাইরে ভেবেছিল।
চলবে…