শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৬৮তম পর্ব: যে নিয়োগ কখনো কার্যকর হয়নি
নীরার ফোনে আসা বার্তাটি বারবার পড়ছিল আরিয়ান।
“SA-17/09-এর পুরো কপি খুঁজবেন না। ওই নিয়োগ কখনো কার্যকর হয়নি।”
আরিয়ান ফোনটি টেবিলে রেখে বলল,
—যে ব্যক্তি বার্তাটি পাঠিয়েছে, সে আমাদের তদন্তের খবর রাখছে।
নীরা বলল,
—কিন্তু সে কেন চাইছে আমরা এই নিয়োগের কাগজ না খুঁজি?
—হয়তো সে জানে, ওই কাগজে এমন কিছু আছে যা সামনে এলে অনেক পুরোনো ঘটনা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—তাহলে আমাদের প্রথম কাজ হবে নম্বরটির অর্থ বের করা।
১. SA-17/09-এর রহস্য
পরদিন সকালে রাফি পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের রেজিস্টার নিয়ে হাজির হলো।
—স্যার, SA কোডের একটি ব্যাখ্যা পেয়েছি।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—কী?
—Special Appointment। অর্থাৎ বিশেষ নিয়োগ।
নীরা বলল,
—তাহলে ১৭/০৯ কি তারিখ?
রাফি মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ। ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৮।
আরিয়ান রেজিস্টারটি খুলে বলল,
—এখানে নিয়োগের প্রস্তাব আছে, কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদনের জায়গা ফাঁকা।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—তাহলে কেউ নিয়োগের প্রস্তাব তৈরি করেছিল, কিন্তু বোর্ড অনুমোদন দেয়নি?
—ঠিক তাই।
রাফি আরেকটি কাগজ বের করল।
—আরেকটি বিষয় আছে। ১৮ সেপ্টেম্বরের C-14 প্যাকেট পাঠানোর রসিদে SA-17/09-এর উল্লেখ পাওয়া গেছে।
নীরা বলল,
—অর্থাৎ নিয়োগ কার্যকর না হলেও সেই রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছিল!
২. পুরোনো বোর্ড মিটিং
আরিয়ান পুরোনো বোর্ড মিটিংয়ের কার্যবিবরণী খুঁজতে বলল।
কিছু সময় পর একটি নথি পাওয়া গেল।
সেখানে ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের সিদ্ধান্ত লেখা ছিল—
“বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব পরবর্তী বৈঠকে পর্যালোচনা করা হবে। ততদিন কোনো ব্যক্তি এই পদ ব্যবহার করে নথি গ্রহণ বা অনুমোদনের ক্ষমতা পাবেন না।”
নীরা কাগজটি পড়ে বলল,
—তাহলে ফারহান কবিরকে কীভাবে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল?
আরিয়ান উত্তর দিল,
—তাঁকে হয়তো আলাদা অস্থায়ী বাহক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসেবে নয়।
রাফি বলল,
—আরেকটি সমস্যা আছে, স্যার। C-14-এর ডেলিভারি রসিদে তাঁকে “Family Authorized Representative” বলা হয়েছে।
নীরা ধীরে বলল,
—যে পরিচয় তাঁর ছিল না, সেটাই তাঁকে দেওয়া হয়েছিল?
আরিয়ান বলল,
—এখনো নিশ্চিত নই। তবে কাগজে পরিচয়ের অসামঞ্জস্য রয়েছে।
৩. ফারহানের দ্বিতীয় বক্তব্য
তাঁরা আবার ফারহান কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।
আরিয়ান তাঁকে জিজ্ঞেস করল,
—আপনাকে কি কখনো বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল?
ফারহান অবাক হয়ে বললেন,
—না। আমাকে বলা হয়েছিল, আমি শুধু একটি প্যাকেট পৌঁছে দেব।
নীরা প্রশ্ন করল,
—আপনার কাছে কি কোনো নিয়োগপত্র ছিল?
—একটি অস্থায়ী দায়িত্বপত্র ছিল। সেখানে আমার দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট লেখা ছিল।
—সেটি কি এখনো আছে?
—আছে। আমি আপনাদের কপি দিতে পারব।
ফারহান কাগজটি পাঠিয়ে দিলেন।
নীরা কাগজটি পড়তে শুরু করল।
সেখানে লেখা—
“প্রতিনিধি কেবল নির্দিষ্ট প্যাকেট গ্রহণ ও নির্ধারিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেবেন। এই দায়িত্ব কোনো প্রশাসনিক অনুমোদন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করে না।”
আরিয়ান বলল,
—এখন পরিষ্কার, ফারহানকে সীমিত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
নীরা বলল,
—কিন্তু তাঁর নামের পাশে Family Authorized Representative লেখা হলো কেন?
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
৪. নাসিমার ব্যাখ্যা
নাসিমা বেগমকে কাগজটি দেখানো হলে তিনি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—ফারহানকে আমি প্যাকেটটি দিয়েছিলাম। কিন্তু তাঁকে কখনো পরিবারের প্রতিনিধি বলিনি।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—তাহলে এই পরিচয় কোথা থেকে এলো?
—আমি জানি না। আমার কাছে যে দায়িত্বপত্র ছিল, সেখানে শুধু নথি পৌঁছে দেওয়ার কথা লেখা ছিল।
আরিয়ান বলল,
—আপনি কি প্যাকেটটি কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন?
নাসিমা এবার একটু ভেবে বললেন,
—একজন কর্মচারী আমার কাছে প্যাকেটটি রেখে গিয়েছিল। বলেছিল, সালেহ সাহেবের নির্দেশ আছে।
—কর্মচারীর নাম মনে আছে?
নাসিমা চোখ বন্ধ করে স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করলেন।
—নামটা পুরোপুরি মনে নেই। তবে তাঁর পরিচয়পত্রে একটি কোড দেখেছিলাম। সম্ভবত T-03।
নীরা আরিয়ানের দিকে তাকাল।
T-03!
এই কোডটি তারা আগেও পেয়েছিল।
৫. T-03-এর নতুন সূত্র
আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে রাফিকে ফোন করল।
—T-03 কোডের পুরোনো কর্মী তালিকা বের করো।
রাফি কিছুক্ষণ পর জানাল,
—স্যার, T-03 ছিল অস্থায়ী নথি পরিবহন ও সংরক্ষণ দায়িত্বের কোড। এই কোডে একাধিক ব্যক্তি কাজ করেছেন।
নীরা বলল,
—তাহলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কীভাবে চেনা যাবে?
রাফি উত্তর দিল,
—একটি দায়িত্ব হস্তান্তর রেজিস্টার আছে। সেখানে T-03 কোডের পাশে কর্মীর স্বাক্ষর থাকার কথা।
আরিয়ান বলল,
—সেটি সংগ্রহ করো।
রাফি জানাল, রেজিস্টারটি পুরোনো আর্কাইভে পাঠানো হয়েছে। সেখানে খোঁজ নিতে হবে।
৬. নীরার অস্বস্তি
সেদিন রাতে নীরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
আরিয়ান এসে পাশে দাঁড়াল।
—এত চুপচাপ কেন?
নীরা বলল,
—আমার মনে হচ্ছে, আমরা সত্যের খুব কাছে এসেও বারবার থেমে যাচ্ছি।
আরিয়ান শান্তভাবে বলল,
—কারণ আমরা শুধু একটি ঘটনার তদন্ত করছি না। অনেকগুলো মানুষের দায়িত্ব, ভুল আর গোপন সিদ্ধান্তের হিসাব মিলাচ্ছি।
নীরা বলল,
—আমি শুধু চাই, আমার বাবার নামের ওপর যে অন্যায় হয়েছিল, তার পুরো সত্যটা সামনে আসুক।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—সত্য সামনে আসবে। তবে এবার আমরা কোনো অনুমানের ওপর নির্ভর করব না।
নীরা তার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
—তোমার এই কথাটা শুনলে কেন যেন সাহস পাই।
আরিয়ান মৃদু স্বরে বলল,
—তাহলে সাহসটা ধরে রেখো।
৭. রেজিস্টারের শেষ পাতা
পরদিন সকালে রাফি আর্কাইভ থেকে একটি স্ক্যান কপি পাঠাল।
নীরা ও আরিয়ান একসঙ্গে সেটি খুলল।
T-03 দায়িত্ব হস্তান্তর রেজিস্টারের পাতায় কয়েকটি নাম ছিল।
প্রথম নামটি পরিচিত—মাসুদুল হক।
দ্বিতীয় নামটি অন্য একজনের।
কিন্তু শেষ পাতায় একটি আলাদা নোট লেখা ছিল—
“১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ — T-03 দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি পরিবর্তিত। পূর্ববর্তী কর্মীর পরিবর্তে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্যাকেট গ্রহণ করেছেন।”
নিচে নতুন ব্যক্তির নামের জায়গায় শুধু একটি আদ্যক্ষর—
“S.R.”
নীরা ধীরে বলল,
—S.R. মানে কি সালেহ রহমান?
আরিয়ান কাগজটি বড় করে দেখল।
—হতে পারে। আবার অন্য কারও নামও হতে পারে।
ঠিক তখনই রাফির আরেকটি ফোন এল।
—স্যার, একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। রেজিস্টারের মূল কপিতে S.R.-এর পাশে একটি স্বাক্ষর আছে। কিন্তু স্ক্যান কপিতে সেটা দেখা যাচ্ছে না।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—স্বাক্ষরটি কার?
রাফি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
—স্যার, স্বাক্ষরটি দেখে মনে হচ্ছে, এটা আমাদের পরিচিত একজনের।
নীরা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
—কার?
রাফির উত্তর আসার আগেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
আরিয়ান আবার ফোন করল।
কিন্তু এবার কেউ ধরল না।
নীরা বুঝতে পারল, পরের রহস্যের দরজা খুলতে আর বেশি দেরি নেই।
চলবে…