শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৬৯তম পর্ব: পরিচিত স্বাক্ষরের অচেনা সত্য
রাফির ফোন কেটে যাওয়ার পর নীরা আরিয়ানকে বলল,
—তুমি কি মনে করো, স্বাক্ষরটা সত্যিই সালেহ চাচার?
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—সম্ভব। কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে কাউকে সন্দেহ করতে চাই না।
নীরা বলল,
—তাহলে রাফির সঙ্গে আবার যোগাযোগ করো।
আরিয়ান কয়েকবার ফোন করল। কিন্তু রাফি ফোন ধরল না।
প্রায় দশ মিনিট পর রাফির ফোন এল।
—স্যার, দুঃখিত। আর্কাইভের ভেতরে নেটওয়ার্ক ছিল না।
—স্বাক্ষরটা কার?
রাফি উত্তর দিল,
—স্বাক্ষরটি সালেহ রহমানের নয়। এটি মাহমুদ রহমানের পুরোনো স্বাক্ষরের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
নীরা বিস্ময়ে তাকাল।
—মাহমুদ আঙ্কেল?
আরিয়ানও অবাক হলো।
—তুমি নিশ্চিত?
—পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য মূল কপি পরীক্ষা করতে হবে। তবে মিল অনেক বেশি।
১. মাহমুদের সামনে প্রশ্ন
সেদিন বিকেলেই তাঁরা মাহমুদের কাছে গেলেন।
আরিয়ান রেজিস্টারের কপিটি তাঁর সামনে রাখল।
—বাবা, এই স্বাক্ষরটা কি আপনার?
মাহমুদ কাগজটি হাতে নিলেন। কিছুক্ষণ দেখার পর তাঁর মুখের ভাব বদলে গেল।
—স্বাক্ষরটা আমার মতোই দেখাচ্ছে।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ তারিখে T-03-এর দায়িত্ব নিয়েছিলেন?
মাহমুদ মাথা নাড়লেন।
—না। ওই সময় আমি ট্রাস্টের নিয়মিত দায়িত্বে ছিলাম না। বিশেষ করে নথি পরিবহনের কোনো দায়িত্ব আমার ছিল না।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে আপনার স্বাক্ষর এখানে এল কীভাবে?
মাহমুদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আমার পুরোনো অনেক কাগজ ট্রাস্ট অফিসে ছিল। কেউ সেগুলো থেকে স্বাক্ষর নকল করে থাকতে পারে। তবে প্রমাণ ছাড়া কিছু বলতে পারব না।
নীরা ধীরে বলল,
—আপনি কি ওই দিন কোনো নথিতে স্বাক্ষর করেছিলেন?
মাহমুদ একটু ভেবে উত্তর দিলেন,
—সেদিন আমি একটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু T-03 রেজিস্টারে কোনো স্বাক্ষর করেছিলাম বলে মনে পড়ছে না।
২. বৈঠকের পুরোনো নথি
আরিয়ান রাফিকে নির্দেশ দিল, ১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের উপস্থিতি তালিকা সংগ্রহ করতে।
পরদিন রাফি একটি কপি নিয়ে এল।
তালিকায় মাহমুদ রহমানের নাম ছিল। তাঁর পাশে উপস্থিতির স্বাক্ষরও রয়েছে।
নীরা বলল,
—তাহলে তিনি সেদিন অফিসে ছিলেন।
আরিয়ান উত্তর দিল,
—হ্যাঁ। কিন্তু উপস্থিত থাকা আর T-03-এর দায়িত্ব নেওয়া এক বিষয় নয়।
রাফি বলল,
—আরেকটি বিষয় আছে। বৈঠকের উপস্থিতি তালিকার স্বাক্ষর আর T-03 রেজিস্টারের স্বাক্ষরের মধ্যে সামান্য পার্থক্য আছে।
মাহমুদ কাগজ দুটি পাশাপাশি রেখে দেখলেন।
—দুটো স্বাক্ষর আমার মতো দেখালেও আমি দ্বিতীয়টিতে স্বাক্ষর করিনি।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি নিশ্চিত?
—আমি আমার নিজের স্বাক্ষর চিনি, নীরা।
৩. রেজিস্টারের মূল কপি
আরিয়ান সিদ্ধান্ত নিল, স্ক্যান কপি দিয়ে আর এগোনো যাবে না। মূল রেজিস্টার দেখতে হবে।
ট্রাস্ট অফিসের অনুমতি নিয়ে তাঁরা আর্কাইভে গেলেন।
সেখানে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা রেজিস্টারটি বের করে দিলেন।
নীরা পাতাটি খুলতেই একটি বিষয় চোখে পড়ল।
T-03-এর পাশে মাহমুদের স্বাক্ষরের নিচে ছোট করে লেখা—
“প্রতিনিধির পরিচয় যাচাই সাপেক্ষে।”
আরিয়ান বলল,
—এই কথাটার মানে কী?
আর্কাইভ কর্মকর্তা জানালেন,
—সম্ভবত স্বাক্ষরটি যাচাইয়ের অপেক্ষায় ছিল। তবে এই মন্তব্যের পাশে কোনো কর্মকর্তার নাম নেই।
নীরা বলল,
—তাহলে এটিকে অনুমোদিত দায়িত্ব হিসেবে দেখানো যাবে না।
কর্মকর্তা সম্মতি জানালেন।
—ঠিক তাই। এখানে চূড়ান্ত অনুমোদনের ঘরও ফাঁকা।
৪. মাহমুদের স্মৃতির দরজা
ফিরে আসার সময় মাহমুদ নিজেই তাঁদের থামালেন।
—একটা কথা মনে পড়েছে।
নীরা বলল,
—কী কথা?
—সেদিন বৈঠকের পর একজন আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কিছু পুরোনো কাগজের জন্য আমার স্বাক্ষর প্রয়োজন হতে পারে।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—কে এসেছিলেন?
মাহমুদ চোখ বন্ধ করে স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করলেন।
—তাঁর মুখটা মনে আছে, কিন্তু নামটা ঠিক মনে পড়ছে না। তিনি ট্রাস্টের স্থায়ী কর্মী ছিলেন না।
নীরা বলল,
—তাঁকে কি আবার দেখলে চিনতে পারবেন?
—সম্ভবত পারব।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে আমরা পুরোনো কর্মীদের তালিকা নিয়ে আপনার সঙ্গে বসব।
৫. রাফির নতুন আবিষ্কার
সন্ধ্যায় রাফি আরিয়ানকে একটি ইমেইল পাঠাল।
সেখানে T-03 রেজিস্টারের একটি পুরোনো সংশোধনী কপি ছিল।
কপিতে লেখা—
“১৮ সেপ্টেম্বরের দায়িত্ব হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি। পরিচয় যাচাই না হওয়ায় পূর্ববর্তী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম বহাল থাকবে।”
নীরা কাগজটি পড়ে বলল,
—অর্থাৎ মাহমুদের নাম যোগ করা হয়েছিল, কিন্তু যাচাই না হওয়ায় সেটি কার্যকর হয়নি।
আরিয়ান বলল,
—হ্যাঁ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে তাঁর নাম যোগ করেছিল?
রাফি জানাল,
—সংশোধনী কপিটি ২২ সেপ্টেম্বর তৈরি হয়েছিল। তবে প্রস্তুতকারীর স্বাক্ষর নেই।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—চার দিন পরে সংশোধন করা হলো, অথচ কে করেছে তার কোনো পরিচয় নেই?
আরিয়ান গম্ভীরভাবে বলল,
—এটা সাধারণ ভুলও হতে পারে, আবার ইচ্ছাকৃতভাবে পরিচয় গোপন রাখার চেষ্টাও হতে পারে। আমাদের প্রমাণ দরকার।
৬. অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ
পরদিন অফিস থেকে বের হওয়ার সময় নীরার সঙ্গে একজন বয়স্ক লোকের দেখা হলো।
লোকটি নীরাকে দেখে থেমে গেলেন।
—তুমি কি রাশেদ সাহেবের মেয়ে?
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—জি। আপনি আমাকে চেনেন?
লোকটি নিজের পরিচয় দিলেন।
—আমি হারুন মিয়া। অনেক বছর আগে ট্রাস্ট অফিসে নথি সংরক্ষণের কাজ করতাম।
নীরা দ্রুত বলল,
—আপনি কি ২০০৮ সালে সেখানে কাজ করতেন?
—হ্যাঁ। কেন?
নীরা তাঁকে T-03 রেজিস্টারের কথা বলল।
হারুন মিয়ার মুখের ভাব বদলে গেল।
—ওই রেজিস্টারের কথা এখনো খুঁজছ?
—আপনি কি কিছু জানেন?
তিনি চারপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন,
—আমি সেদিন অফিসে ছিলাম। মাহমুদ সাহেবের স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য একজন এসেছিলেন। কিন্তু মাহমুদ সাহেব তাঁকে কোনো অনুমতি দেননি।
নীরা বিস্ময়ে বলল,
—আপনি কি লোকটিকে চিনতেন?
হারুন মিয়া মাথা নাড়লেন।
—চিনতাম। তাঁর নাম আমার মনে আছে।
নীরা অধীর হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কে তিনি?
হারুন মিয়া উত্তর দেওয়ার আগে একটু থামলেন।
—তবে একটা কথা। তাঁর নাম শুনে তোমরা অবাক হবে। কারণ তিনি বহু বছর ধরে এই পরিবারের কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত।
নীরা আরিয়ানকে ফোন করতে গেল।
কিন্তু হারুন মিয়ার পরের কথাটি শুনে তার হাত থেমে গেল।
—লোকটির নাম ছিল জয়ন্ত সেন।
নীরা নামটি আগে শুনেছে।
পুরোনো ট্রাস্টের কয়েকটি কাগজে এই নাম ছিল। কিন্তু কেউ কখনো তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেনি।
তাহলে জয়ন্ত সেন কেন মাহমুদের স্বাক্ষরের বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন?
আর তিনি কি শুধু একটি কাগজের জন্য এসেছিলেন, নাকি C-14-এর পুরো ঘটনার সঙ্গে তাঁর অন্য কোনো সম্পর্ক ছিল?
চলবে…