আবদুস সালামের ফোন কেটে যাওয়ার পর নীরা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তার মাথায় একটাই কথা ঘুরছিল—
C-14-এর মূল কপি দেখেছিল রহমান পরিবারেরই কেউ!
আরিয়ান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
নীরা বলল,
— আরিয়ান, রহমান পরিবারের মধ্যে এমন কে আছেন, যিনি ২০০৮ সালে ওই নথি দেখেছিলেন?
আরিয়ান ধীরে ফিরে তাকাল।
— অনেকেই তখন পরিবারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সবাইকে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই।
— আমি কাউকে সন্দেহ করছি না। শুধু জানতে চাই, আবদুস সালাম কেন বলল মানুষটি এখনো আমাদের পরিবারের মধ্যে আছেন?
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আমাদের পরিবারের পুরোনো কাগজপত্র আবার পরীক্ষা করতে হবে।
ঠিক তখনই রাফি কক্ষে প্রবেশ করল।
— স্যার, আবদুস সালামের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করেছি। তিনি আগামীকাল দেখা করতে রাজি হয়েছেন।
নীরা দ্রুত বলল,
— কোথায়?
— পুরোনো রহমান পরিবারের অফিসে।
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
— ঠিক আছে। আমরা সেখানে যাব।
পরদিন সকাল।
পুরোনো রহমান পরিবারের অফিস।
একসময় এই ভবনেই মাহমুদ রহমান, রাশেদ রহমান এবং তাঁদের ব্যবসায়িক অংশীদাররা নিয়মিত বৈঠক করতেন।
এখন ভবনটি প্রায় পরিত্যক্ত।
নীরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখছিল।
আরিয়ান বলল,
— জায়গাটা তোমার পরিচিত মনে হচ্ছে?
— বাবা একবার আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। তখন আমি অনেক ছোট। খুব বেশি কিছু মনে নেই।
দুজন ভেতরে প্রবেশ করল।
একটি পুরোনো টেবিলের পাশে বসে ছিলেন আবদুস সালাম।
বয়সের ভারে তাঁর শরীর কিছুটা নুয়ে পড়েছে। কিন্তু চোখে এখনো সতর্কতা।
তিনি নীরাকে দেখে বললেন,
— তোমার বাবা রাশেদ সাহেবকে আমি চিনতাম।
নীরা এগিয়ে গিয়ে বসল।
— আপনি তাঁকে কেমন মানুষ হিসেবে চিনতেন?
— সৎ মানুষ। কিন্তু তাঁর সঙ্গে অন্যায় হয়েছিল।
নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— সেই অন্যায়ের কারণেই তো আমরা এত বছর ধরে সত্য খুঁজছি।
আবদুস সালাম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— তোমরা C-14 নিয়ে জানতে চাও, তাই তো?
আরিয়ান বলল,
— হ্যাঁ। আপনি আমাদের বলেছিলেন, মূল কপিটি রহমান পরিবারের একজন দেখেছিলেন।
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
— ঠিক বলেছি। তবে আমি যা জানি, তার সবটুকু প্রমাণ করতে পারব না।
নীরা বলল,
— আপনি যা জানেন, সেটাই বলুন। আমরা প্রমাণ খুঁজে নেব।
আবদুস সালাম ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
— ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অফিসে একটা বিশেষ নথি এসেছিল। সেটার সঙ্গে আর্থিক হিসাবের কোনো সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। নথিটি ছিল পুরোনো ট্রাস্টের একটি নির্দেশনা।
আরিয়ান প্রশ্ন করল,
— সেটাই কি C-14?
— হ্যাঁ। আমি নথিটি নিজে দেখিনি। তবে নথি নিয়ে একটি বৈঠকের সময় উপস্থিত ছিলাম।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
— বৈঠকে কারা ছিলেন?
— মাহমুদ সাহেব, জহির সাহেব এবং রহমান পরিবারের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য।
আরিয়ান দ্রুত বলল,
— নাম?
আবদুস সালাম তাঁর দিকে তাকালেন।
— নাম বলার আগে একটা কথা জানতে চাই। তোমরা কি আজহার রহমান সাহেবের পুরোনো ব্যক্তিগত নথিগুলো দেখেছ?
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
— কিছু দেখেছি।
— তাহলে নিশ্চয়ই তাঁর একটি ব্যক্তিগত সিলের কথা জানো?
নীরা বলল,
— নীল রঙের সিল?
বৃদ্ধ অবাক হয়ে তাকালেন।
— তুমি জানো?
— কিছুদিন আগে আমরা একটি পুরোনো নথিতে সেটা পেয়েছি।
আবদুস সালাম ধীরে বললেন,
— C-14-এর প্রথম নির্দেশনাতেও সেই সিল ছিল।
নীরা আরিয়ানকে একবার দেখল।
আরিয়ান বলল,
— কিন্তু আজহার রহমান তো তখন জীবিত ছিলেন না।
— আমি জানি। সিলটি তাঁর মৃত্যুর পরও ট্রাস্টের নথিতে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত ছিল। তবে সেটি ব্যবহার করার অধিকার সবার ছিল না।
নীরা প্রশ্ন করল,
— তাহলে কার ছিল?
আবদুস সালাম উত্তর দিলেন না।
বরং নিজের ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো কাগজ বের করলেন।
— এটা আমার কাছে এত বছর ধরে আছে।
আরিয়ান কাগজটি হাতে নিল।
এটি ছিল ২০০৮ সালের একটি বৈঠকের উপস্থিতি তালিকা।
তারিখ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০০৮।
তালিকায় কয়েকটি পরিচিত নাম।
মাহমুদ রহমান।
জহির উদ্দিন।
মোস্তাফিজুর রহমান।
শওকত আলী।
আর তালিকার একেবারে নিচে একটি নাম দেখে নীরা থমকে গেল।
রাশেদ রহমান।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
— বাবা ওই বৈঠকে ছিলেন?
আবদুস সালাম বললেন,
— হ্যাঁ। কিন্তু বৈঠকের শেষ হওয়ার আগেই তিনি বেরিয়ে গিয়েছিলেন।
আরিয়ান প্রশ্ন করল,
— কেন?
— কারণ তিনি একটি কাগজে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর কথা ছিল, মূল নথি না দেখে কোনো দ্বিতীয় কপিতে স্বাক্ষর করা যাবে না।
নীরা বাবার নামের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে এক ধরনের আবেগ জমে উঠল।
— বাবা কি জানতেন, নথিটা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে?
— আমার ধারণা, তিনি সন্দেহ করেছিলেন।
কিছুক্ষণ পর আবদুস সালাম আবার বললেন,
— কিন্তু তোমাদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় আছে।
আরিয়ান তাঁর দিকে তাকাল।
— কী?
— বৈঠকের পরদিন আমি একটি কক্ষে C-14-এর কপি দেখেছিলাম। সেখানে একটি নাম লেখা ছিল, যিনি নথিটি পরীক্ষা করেছিলেন।
নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
— কে ছিলেন তিনি?
বৃদ্ধ কাগজের অন্য একটি অংশ বের করলেন।
সেখানে লেখা ছিল—
“Reviewed by: R.R.”
নীরা বিস্ময়ে বলল,
— R.R. মানে রাশেদ রহমান?
আবদুস সালাম মাথা নাড়লেন।
— আমি নিশ্চিত নই। তবে ওই সময় রহমান পরিবারের মধ্যে এই আদ্যক্ষরের আরেকজনের নামও নথিতে ছিল।
আরিয়ান বলল,
— রওশন আরা রহমান?
— হতে পারে। তাই শুধু আদ্যক্ষর দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— আপনি কি আমার বাবাকে ওই কপি দেখতে দেখেছিলেন?
আবদুস সালাম মাথা নাড়লেন।
— না। আমি শুধু নথির তালিকায় তাঁর নাম দেখেছিলাম। তবে আমি একজনকে নিজের চোখে C-14-এর কাগজ হাতে নিতে দেখেছি।
আরিয়ান এবার একটু সামনে ঝুঁকল।
— কে?
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন,
— তিনি ছিলেন মাহমুদ রহমানের পরিবারের একজন সদস্য।
নীরা প্রশ্ন করল,
— তাঁর নাম বলুন।
আবদুস সালাম কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।
তারপর বললেন,
— নামটা বলার আগে তোমাদের একটা জায়গায় যেতে হবে। পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের নিচতলায় একটি ছোট ঘর ছিল। সেখানে কিছু নথি রাখা হতো।
আরিয়ান বলল,
— সেই ঘর এখনো আছে?
— আছে। কিন্তু সেখানে প্রবেশের চাবি আমার কাছে নেই।
নীরা বলল,
— চাবি কার কাছে?
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন,
— শেষবার আমি চাবিটি দেখেছিলাম সালেহ রহমানের হাতে।
সন্ধ্যা।
নীরা ও আরিয়ান গাড়িতে বসে ছিল।
নীরা বলল,
— সালেহ রহমানের কাছে আবার যেতে হবে।
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ। তবে এবার শুধু চাবি চাইব না। ওই ঘরের সংরক্ষণ রেজিস্টারও দেখতে হবে।
নীরা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— আমার বাবা এত বছর ধরে কত কিছু একা সহ্য করেছেন, ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে।
আরিয়ান শান্ত স্বরে বলল,
— সত্য জানতে গিয়ে তোমার বাবার প্রতি অন্যায় যেন না করি। কোনো প্রমাণ ছাড়া তাঁকে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলব না।
নীরা তার দিকে তাকাল।
— আমি জানি।
ঠিক তখনই আরিয়ানের ফোনে একটি মেসেজ এল।
প্রেরক: সালেহ রহমান।
মেসেজে লেখা—
“C-14 নিয়ে আর খোঁজাখুঁজি কোরো না। পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের নিচতলার ঘরটি বহু বছর ধরে বন্ধ। সেখানে যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে দেখা করো। কারণ ওই ঘরের চাবি এখন আর আমার কাছে নেই।”
আরিয়ানের চোখ স্থির হয়ে গেল।
নীরা মেসেজটি পড়ে বলল,
— চাবি তাহলে কার কাছে?
আরিয়ান ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করল।
— সেটাই এখন আমাদের জানতে হবে।
কিন্তু তারা কেউ জানত না, পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের সেই বন্ধ ঘরে শুধু C-14-এর নথিই নয়, এমন একটি রেজিস্টারও রাখা ছিল, যা ২০০৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের আসল সিদ্ধান্ত প্রকাশ করতে পারত।
আর সেই রেজিস্টারের শেষ পাতায় লেখা ছিল মাত্র একটি নাম—
“শেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত: R.R.”
চলবে...