ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 74

লেখক: Mafiya Queen

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল।

রয়্যাল হোল্ডিংসের কনফারেন্স রুমে বসে আছে নীরা, আরিয়ান, রাফি ও নওরীন।

টেবিলের মাঝখানে রাখা পুরোনো খামটি সবার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে।

খামের ওপর লেখা—

“C-14 — Keep the Copies Separate.”

নীরা খামটির দিকে তাকিয়ে বলল,

— আপনার বাবা কেন দুটি কপি আলাদা রাখতে বলেছিলেন?

নওরীন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

— বাবা কখনো আমাকে এসব বিষয়ে কিছু বলেননি। তবে মৃত্যুর আগে একটা কথা বলেছিলেন।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

— কী কথা?

নওরীন ধীরে বললেন,

— তিনি বলেছিলেন, কোনোদিন যদি রহমান পরিবারের কেউ সত্য জানতে আসে, তাহলে যেন আমি তার হাতে এই খামটি তুলে দিই।

নীরা অবাক হয়ে তাকাল।

— তিনি কি আমার কথা জানতেন?

— তোমার নাম বলেননি। শুধু বলেছিলেন, একদিন এমন একজন আসবে, যার জন্মের রাতের সঙ্গে এই নথিগুলোর সম্পর্ক আছে।

নীরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— আপনি কি নিশ্চিত, তিনি নীরার কথাই বলেছিলেন?

— পুরোপুরি নিশ্চিত নই। তবে তাঁর ডায়েরিতে তোমার জন্মের রাতের কথা লেখা আছে।

নীরা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

— খামটা খুলতে পারি?

নওরীন মাথা নাড়লেন।

খামের ভেতরে ছিল তিনটি কাগজ।

প্রথমটি একটি ডাক রসিদ।

দ্বিতীয়টি ছোট্ট একটি নির্দেশপত্র।

তৃতীয়টি ছিল হাতে লেখা একটি চিঠি।

আরিয়ান নির্দেশপত্রটি হাতে নিল।

সেখানে লেখা—

“C-14-এর দ্বিতীয় কপি সংরক্ষণ করা হবে। মূল কপি পাওয়া না যাওয়া পর্যন্ত কোনো কপিকেই চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।”

নীরা বলল,

— তাহলে মাহবুব সাহেব জানতেন, মূল কপি পাওয়া যায়নি!

নওরীন মাথা নাড়লেন।

— মনে হচ্ছে, হ্যাঁ।

আরিয়ান চিঠিটি খুলল।

চিঠির শুরুতে লেখা—

“যে সত্য আজ কাগজের ভাঁজে আটকে আছে, তা একদিন মানুষের সামনে আসবেই। কিন্তু ভুল কাগজকে সত্য বলে মেনে নিলে নির্দোষ মানুষ আবারও অপরাধী হয়ে যাবে।”

নীরা ধীরে ধীরে চিঠিটি পড়তে লাগল।

শেষের দিকে একটি বাক্য দেখে সে থেমে গেল।

“C-14-এর মূল কপি আমার কাছে নেই। তবে যে ব্যক্তি মূল কপিটি শেষবার দেখেছিল, সে এখনো জীবিত।”

ঘরের সবাই চুপ।

রাফি বলল,

— তাহলে ওই ব্যক্তি কে?

নওরীন চিঠির শেষ অংশ দেখালেন।

সেখানে একটি নাম লেখার জায়গা ছিল।

কিন্তু নামটি কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।

শুধু একটি শব্দ বোঝা যাচ্ছে—

“Witness.”

আরিয়ান বলল,

— কেউ ইচ্ছা করেই নামটি ঢেকে দিয়েছে।

নীরা কাগজটি ভালো করে দেখল।

— এটা কি আপনার বাবার হাতের লেখা?

নওরীন উত্তর দিলেন,

— চিঠির বাকিগুলো বাবার হাতের লেখা। কিন্তু নামের ওপর যে কালি দেওয়া হয়েছে, সেটা অন্য কারও হতে পারে।

কিছুক্ষণ পর রাফি একটি নতুন তথ্য দিল।

— স্যার, ২০০৮ সালের পুরোনো কর্মচারীদের তালিকা আবার পরীক্ষা করেছি। সেই সময় C-14 ফাইলের মূল কপি দেখার অনুমতি ছিল মাত্র তিনজনের।

আরিয়ান বলল,

— নামগুলো বলো।

রাফি কাগজ দেখে পড়ল।

— জহির উদ্দিন, মতিউর রহমান এবং আবদুস সালাম।

নীরা অবাক হলো।

— আবদুস সালাম! তাঁর নাম তো আগে থেকেই আমাদের কাছে ছিল।

আরিয়ান বলল,

— কিন্তু তিনি দ্বিতীয় সাক্ষী ছিলেন কি না, সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। আর মূল কপি দেখার অনুমতি থাকা মানেই তিনি কপিটি সরিয়েছেন, এমন নয়।

নীরা মাথা নাড়ল।

— ঠিক। আমাদের তাঁর বক্তব্য শুনতে হবে।

রাফি বলল,

— তাঁর পুরোনো ঠিকানা পেয়েছি। তবে তিনি এখন সেখানে থাকেন না।

— নতুন ঠিকানা?

— খুঁজছি।

পরদিন সকাল।

নীরা অফিসে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরেই আরিয়ানের কক্ষে গেল।

তার হাতে একটি ছোট্ট ডায়েরি।

— এটা কোথায় পেয়েছ? আরিয়ান জিজ্ঞেস করল।

— বাবার পুরোনো কাগজের মধ্যে। গতকাল রাতে মা ডায়েরিটা দিয়েছেন।

আরিয়ান ডায়েরিটি খুলল।

ভেতরে নীরার বাবা রাশেদ রহমানের হাতের লেখা।

একটি পাতায় লেখা—

“২০০৮ সালের সেই ঘটনার পর মাহবুব আমাকে বলেছিল, সব কাগজের উত্তর কাগজে পাওয়া যাবে না। কিছু সত্য মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। কিন্তু মানুষ যখন ভয় পায়, তখন সেই স্মৃতিও হারিয়ে যায়।”

নীরা ধীরে বলল,

— বাবা এত কিছু জানতেন, অথচ আমাকে কখনো বলেননি।

আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,

— হয়তো তোমাকে এসব ঝামেলা থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন।

নীরা ডায়েরির পরের পাতাটি উল্টাল।

সেখানে একটি তারিখ লেখা—

১৮ অক্টোবর ২০০৮।

তার নিচে মাত্র একটি লাইন—

“আবদুস সালামকে খুঁজে বের করতে হবে। সে যা দেখেছে, তা অন্য কেউ দেখেনি।”

নীরা আরিয়ানের দিকে তাকাল।

— তাহলে আবদুস সালামই হয়তো আমাদের পরবর্তী সূত্র।

আরিয়ান বলল,

— হতে পারে। কিন্তু আগে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হবে।

দুপুর ১২টা।

রাফির ফোনে একটি কল এল।

সে কথা বলে দ্রুত আরিয়ানের কাছে ফিরে এল।

— স্যার, আবদুস সালামের সন্ধান পাওয়া গেছে।

— কোথায়?

— তিনি এখন ঢাকার বাইরে থাকেন। তবে একটা অদ্ভুত তথ্য আছে।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

— কী তথ্য?

রাফি বলল,

— তিনি কয়েক মাস আগে পুরোনো অফিসের আর্কাইভে এসে C-14 ফাইল সম্পর্কে খোঁজ করেছিলেন।

আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,

— এতদিন পর হঠাৎ কেন?

— সেটা জানা যায়নি। তবে তিনি রেজিস্টারে নিজের নাম লিখে গিয়েছিলেন।

নীরা বলল,

— সেই রেজিস্টারটা দেখতে চাই।

রাফি কাগজটি বের করল।

আবদুস সালামের নামের পাশে লেখা—

“C-14 — Original Copy Inquiry.”

তারিখ: ১৪ আগস্ট ২০২৬।

নীরা বিস্মিত হয়ে বলল,

— তিনি তো আমাদের আগেই মূল কপির খোঁজ শুরু করেছিলেন!

আরিয়ান ধীরে বলল,

— তার মানে তিনি হয়তো এমন কিছু জানেন, যা আমরা এখনো জানি না।

ঠিক তখনই নীরার ফোন বেজে উঠল।

অপরিচিত নম্বর।

নীরা কলটি রিসিভ করল।

— হ্যালো?

ওপাশ থেকে একজন বৃদ্ধ পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল।

— আপনি কি নীরা রহমান বলছেন?

— জি। আপনি কে?

— আমার নাম আবদুস সালাম।

নীরা এক মুহূর্তের জন্য কথা বলতে ভুলে গেল।

— আপনি... আমাদের সঙ্গে দেখা করতে চান?

বৃদ্ধ বললেন,

— হ্যাঁ। তবে একটা শর্ত আছে।

— কী শর্ত?

কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি বললেন,

— মাহবুব আলমের নাম নিয়ে আমার সামনে আসবেন না। কারণ ২০০৮ সালে যে মানুষটি C-14-এর মূল কপি দেখেছিল, সে মাহবুব আলম ছিল না।

নীরার হাত থেকে ডায়েরিটি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

আরিয়ান তার দিকে তাকাল।

ফোনের ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠ এল—

— আর সেই মানুষটি এখনো রহমান পরিবারের কাছেই আছে।

কলটি কেটে গেল।

নীরা স্থির হয়ে বসে রইল।

আরিয়ান ধীরে জিজ্ঞেস করল,

— কী বলল লোকটা?

নীরা তার দিকে তাকাল।

— সে বলেছে, C-14-এর মূল কপি মাহবুব সাহেব দেখেননি।

— তাহলে কে দেখেছিল?

নীরা ফিসফিস করে বলল,

— সে বলেছে, মানুষটা এখনো রহমান পরিবারের মধ্যেই আছে।

আরিয়ানের মুখের ভাব বদলে গেল।

কারণ রহমান পরিবারের মধ্যে এমন কয়েকজন মানুষ আছেন, যাঁদের অতীত সম্পর্কে এখনো অনেক কিছু অজানা।

কিন্তু তাঁদের মধ্যে কে ২০০৮ সালের সেই গোপন নথি দেখেছিলেন?

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 74 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন