ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 76

লেখক: Mafiya Queen

রাত প্রায় এগারোটা।

আরিয়ানের হাতে তখনো সালেহ রহমানের পাঠানো মেসেজটি খোলা।

“C-14 নিয়ে আর খোঁজাখুঁজি কোরো না। পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের নিচতলার ঘরটি বহু বছর ধরে বন্ধ। সেখানে যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে দেখা করো। কারণ ওই ঘরের চাবি এখন আর আমার কাছে নেই।”

নীরা মেসেজটি আবার পড়ল।

— আরিয়ান, সালেহ সাহেব যদি চাবি না রাখেন, তাহলে সেটা কার কাছে?

আরিয়ান বলল,

— সেটা জানতেই তো কাল তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হবে।

নীরা টেবিলে রাখা পুরোনো কাগজটির দিকে তাকাল।

শেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত: R.R.

— আমার মনে হচ্ছে, এই R.R. নামটার মধ্যেই সব উত্তর লুকিয়ে আছে।

আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,

— হতে পারে। কিন্তু R.R. মানেই রাশেদ রহমান, এটা এখনই ধরে নেওয়া যাবে না।

নীরা কিছু বলল না।

তার মনে হচ্ছিল, বাবার অতীতের এমন একটি অধ্যায় ধীরে ধীরে সামনে আসছে, যেটা সম্পর্কে সে কখনো কিছুই জানত না।

পরদিন সকাল।

সালেহ রহমানের বাড়িতে পৌঁছাল নীরা ও আরিয়ান।

সালেহ তাদের বসার ঘরে নিয়ে গেলেন।

— তোমরা আবার C-14 নিয়ে এসেছ?

আরিয়ান বলল,

— এবার আমরা শুধু তথ্য জানতে চাই না। পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের নিচতলার ঘরটি দেখতে চাই।

সালেহ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— জানতাম, একদিন তোমরা সেখানে যাওয়ার কথা বলবে।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

— ওই ঘরে কী আছে?

— কিছু পুরোনো রেজিস্টার, দায়িত্ব হস্তান্তরের কাগজ এবং ট্রাস্টের ব্যক্তিগত নথি।

— তাহলে চাবি আপনার কাছে নেই কেন?

সালেহ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

— কারণ আমি চাবিটি অন্য একজনের কাছে জমা দিয়েছিলাম।

আরিয়ান দ্রুত প্রশ্ন করল,

— কার কাছে?

সালেহ উত্তর দিলেন,

— নাসিমা বেগমের কাছে।

নীরা অবাক হলো।

— নাসিমা বেগম?

— হ্যাঁ। তিনি আজিজুর রহমান সাহেবের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। পুরোনো নথি সংরক্ষণের ব্যাপারে তাঁর ওপর অনেক আস্থা ছিল।

আরিয়ান বলল,

— কিন্তু নাসিমা বেগম তো আগেই আমাদের কিছু নথি দিয়েছেন। তিনি কখনো এই ঘরের কথা বলেননি।

সালেহ মাথা নাড়লেন।

— হয়তো তিনি জানতেন না, চাবিটি এখনো তাঁর কাছে আছে। অথবা অন্য কোথাও সরিয়ে রেখেছেন।

নীরা বলল,

— আমরা কি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারি?

— অবশ্যই। তবে একটা কথা মনে রেখো।

— কী কথা?

সালেহ ধীরে বললেন,

— ওই ঘরে যে কাগজগুলো আছে, সেগুলোর কিছু অসম্পূর্ণ। কোনো একটি পৃষ্ঠা দেখে পুরো ঘটনা বিচার কোরো না।

দুপুর।

নাসিমা বেগমের বাড়িতে পৌঁছাল তারা।

নীরা তাঁকে সালেহর কথাগুলো জানাল।

নাসিমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

— আমি ভেবেছিলাম, চাবিটা হারিয়ে গেছে।

আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,

— আপনার কাছে ছিল?

— অনেক বছর আগে সালেহ আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, প্রয়োজন না হলে যেন ঘরটি না খুলি।

নীরা প্রশ্ন করল,

— আপনি কি জানেন, সেখানে কী রাখা আছে?

— পুরোটা জানি না। তবে আজিজুর সাহেবের মৃত্যুর আগে কিছু কাগজ সেখানে রাখা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, একদিন পরিবারের কারও প্রয়োজন হলে সেগুলো কাজে লাগবে।

নাসিমা উঠে ভেতরের ঘরে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর একটি ছোট কাপড়ের থলি নিয়ে ফিরে এলেন।

থলির ভেতর থেকে বের করলেন পুরোনো একটি চাবি।

চাবির সঙ্গে বাঁধা ছোট্ট কাগজে লেখা—

“Lower Archive — Room 03.”

নীরা চাবিটির দিকে তাকিয়ে বলল,

— এটাই কি সেই ঘরের চাবি?

নাসিমা মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ।

তারপর তিনি নীরার হাতের ওপর হাত রাখলেন।

— তবে একটা কথা বলি, মা। তোমার বাবা সম্পর্কে যা কিছু জানবে, সবকিছু যাচাই করে বিশ্বাস করবে। মানুষের নাম কাগজে লেখা থাকতে পারে, কিন্তু সেই নামের অর্থ সবসময় এক হয় না।

নীরা মাথা নাড়ল।

— আমি বুঝেছি।

বিকেল পাঁচটা।

পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের নিচতলা।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা করিডোরে ধুলো জমে আছে। দেয়ালের পুরোনো রং উঠে গেছে।

নাসিমা বেগমও তাদের সঙ্গে এসেছেন।

তিনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চাবিটি আরিয়ানের হাতে দিলেন।

আরিয়ান তালায় চাবি ঢোকাল।

কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর তালাটি খুলে গেল।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই পুরোনো কাগজের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।

ঘরের এক পাশে লোহার আলমারি।

অন্য পাশে কাঠের তাক।

তাকের ওপর কয়েকটি বাক্সে নম্বর লেখা।

R-17.

C-14.

T-03.

নীরা বাক্সগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,

— এতগুলো নথি এখানে রাখা ছিল!

আরিয়ান বলল,

— আগে রেজিস্টারটা খুঁজে বের করি।

রাফি আলমারির নিচের তাকে একটি মোটা খাতা পেল।

খাতার মলাটে লেখা—

Trust Responsibility Register — 2008.

আরিয়ান খাতাটি খুলল।

প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা সাধারণ দায়িত্ব হস্তান্তরের তথ্য।

তারপর পাওয়া গেল ১৭ সেপ্টেম্বরের একটি এন্ট্রি।

C-14 — Temporary Review.

Responsible Person: R.R.

নীরা দ্রুত বলল,

— আবার R.R.!

আরিয়ান পরের লাইন পড়ল।

“Final responsibility will remain suspended until original document verification.”

নীরা বলল,

— তাহলে মূল কপি যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কারও দায়িত্ব চূড়ান্ত ছিল না!

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

— ঠিক। কিন্তু শেষ দায়িত্বপ্রাপ্তের নাম কেন R.R. লেখা হলো, সেটা জানতে হবে।

রাফি রেজিস্টারের পরের পৃষ্ঠা উল্টে দিল।

সেখানে একটি ছোট্ট নোট।

“R.R. accepted the sealed register, not the C-14 original.”

নীরা থমকে গেল।

— তার মানে R.R. আসল C-14 নেয়নি। শুধু সিল করা রেজিস্টার গ্রহণ করেছিল!

আরিয়ান বলল,

— তাহলে এই ব্যক্তি নথির দায়িত্বে ছিলেন, কিন্তু মূল কপির দায়িত্বে ছিলেন কি না, সেটা আলাদা প্রশ্ন।

হঠাৎ নাসিমা বেগম একটি পুরোনো খাম হাতে নিয়ে বললেন,

— এটা আগে দেখিনি।

খামের ওপর লেখা—

“For R.R. — To be opened after verification.”

নীরা খামটি হাতে নিল।

ভেতরে একটি চিঠি।

চিঠিতে লেখা—

“আপনাকে যে রেজিস্টার দেওয়া হয়েছে, সেটি সংরক্ষণ করবেন। কিন্তু C-14-এর মূল কপি আপনার কাছে নেই। কেউ যদি আপনাকে মূল কপি গ্রহণের কথা বলে, তাহলে আগে তারিখ ও স্বাক্ষর মিলিয়ে নেবেন।”

চিঠির নিচে স্বাক্ষর ছিল—

A.R.

আরিয়ান ধীরে বলল,

— আজহার রহমান।

নীরা চিঠিটি আবার পড়ল।

— তাহলে আজহার সাহেব আগেই জানতেন, C-14-এর মূল কপি আর রেজিস্টার আলাদা থাকবে।

রাফি বলল,

— স্যার, খামের পেছনে আরেকটা লেখা আছে।

সবাই তাকাল।

খামের পেছনে লেখা—

“R.R. — Rashed Rahman.”

নীরার চোখ স্থির হয়ে গেল।

— বাবা!

আরিয়ান চুপ করে রইল।

নীরা ধীরে বলল,

— তাহলে বাবা-ই ছিলেন শেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত?

নাসিমা বেগম কাগজটি হাতে নিয়ে বললেন,

— নামটা রাশেদ সাহেবের হতে পারে। কিন্তু এই চিঠি তাঁর হাতে পৌঁছেছিল কি না, সেটা প্রমাণ করতে হবে।

আরিয়ান বলল,

— আরেকটা জিনিস খেয়াল করো। চিঠিতে বলা হয়েছে, তাঁকে রেজিস্টার দেওয়া হয়েছিল। C-14-এর মূল কপি নয়।

নীরা বলল,

— তাহলে বাবা হয়তো মূল কপিটা কখনো দেখেননি।

আরিয়ান উত্তর দিল,

— অথবা দেখেছিলেন, কিন্তু তাঁর কাছে জমা দেওয়া হয়নি। আমাদের আরও প্রমাণ দরকার।

ঠিক তখনই রাফি আলমারির পেছনে একটি ছোট ফাইল দেখতে পেল।

ফাইলটির ওপর ধুলো জমে ছিল।

সে সেটি বের করে টেবিলে রাখল।

ভেতরে একটি পুরোনো গ্রহণপত্র।

তারিখ: ১৮ অক্টোবর ২০০৮।

প্রাপক: রাশেদ রহমান।

বিষয়: Trust Register Handover.

কিন্তু গ্রহণকারীর স্বাক্ষরের জায়গাটি ফাঁকা।

নীরা অবাক হয়ে বলল,

— বাবার নামে কাগজ তৈরি হয়েছে, কিন্তু স্বাক্ষর নেই কেন?

আরিয়ান কাগজটি ভালো করে দেখল।

— সম্ভবত দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি।

নাসিমা বেগম ধীরে বললেন,

— রাশেদ সাহেব যদি সত্যিই দায়িত্ব গ্রহণ না করে থাকেন, তাহলে তাঁর নাম পরে এই রেজিস্টারে কীভাবে যুক্ত হলো?

কেউ উত্তর দিতে পারল না।

রাফি ফাইলের শেষ পাতাটি উল্টাতেই একটি ছোট্ট কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল।

নীরা সেটি তুলে নিল।

সেখানে মাত্র একটি বাক্য লেখা—

“R.R. refused to accept the register without the original C-14.”

নীরার চোখ ভিজে উঠল।

তার বাবা হয়তো সত্যিই সেই নথি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন।

কিন্তু তাহলে পরবর্তী রেকর্ডে তাঁকে শেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে দেখানো হলো কেন?

আরিয়ান কাগজটি হাতে নিয়ে বলল,

— এখন আমাদের বুঝতে হবে, কে তাঁর অস্বীকৃতির পরেও তাঁর নামে দায়িত্ব লিখেছিল।

নীরা ধীরে মাথা তুলল।

— আর সেটা জানতে হলে ১৮ অক্টোবরের মূল হস্তান্তর রেজিস্টার খুঁজতে হবে।

ঠিক তখনই নাসিমা বেগমের ফোন বেজে উঠল।

তিনি কল রিসিভ করলেন।

ওপাশ থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।

— নাসিমা আপা, পুরোনো ট্রাস্ট অফিসে কি আপনারা গিয়েছেন?

নাসিমা অবাক হয়ে বললেন,

— কে বলছেন?

— আমি মতিউর রহমান। একটা জরুরি কথা জানানোর ছিল।

নাসিমা বললেন,

— কী কথা?

মতিউর রহমানের কণ্ঠ এবার আরও গম্ভীর হলো।

— ১৮ অক্টোবরের মূল হস্তান্তর রেজিস্টার আমার কাছে নেই। কিন্তু তার একটি কার্বন কপি আমি বহু বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছি। সেখানে রাশেদ সাহেবের নামের পাশে এমন একজনের স্বাক্ষর আছে, যিনি সেদিন অফিসেই উপস্থিত ছিলেন না।

নীরা ও আরিয়ান একে অপরের দিকে তাকাল।

মতিউর আবার বললেন,

— আর সেই স্বাক্ষরটি দেখলে আপনারা বুঝতে পারবেন, এত বছর ধরে কার নামে দায়িত্ব চাপানো হয়েছিল।

কলটি শেষ হওয়ার আগে তিনি শুধু একটি কথা বললেন—

— কাল সকালেই আমার সঙ্গে দেখা করুন। এবার সত্যটা আর আটকে রাখা যাবে না।

নীরা ধীরে চোখ বন্ধ করল।

এতদিন ধরে যে মানুষটিকে তারা খুঁজছিল, সে হয়তো এবার সত্যিই সামনে আসতে চলেছে।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 76 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন