ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 80

লেখক: Mafiya Queen

পর্ব ৮০: ১৭ অক্টোবরের স্বাক্ষর

পুরোনো বাড়ির ওপরের ঘরটিতে তখন অদ্ভুত নীরবতা।

টেবিলের ওপর রাখা ধাতব সিলটির দিকে তাকিয়ে আছে নীরা। পাশে আজহার রহমানের পুরোনো চিঠি। চিঠির শেষ লাইনটি যেন বারবার তার মাথার ভেতর ঘুরছে—

“সেই স্বাক্ষরটি যে হাতে করা, সেই হাত একসময় রাশেদ রহমানের পাশে বসে কাজ করত।”

নীরা বাবার দিকে তাকাল।

—বাবা, তোমার সঙ্গে তখন কারা কাজ করত?

রাশেদ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

—অনেকেই। মাহমুদ, কামাল, ইমরান তো ছিলই। এছাড়াও হিসাব বিভাগে কয়েকজন ছিল। কেউ স্থায়ী, কেউ অস্থায়ী।

আরিয়ান প্রশ্ন করল,

—তাদের মধ্যে কারও সঙ্গে কি আপনার ব্যক্তিগত বিরোধ হয়েছিল?

—বিরোধ নয়। তবে ২০০৮ সালের দিকে অফিসের কিছু কাগজ নিয়ে মতবিরোধ হয়েছিল। আমি কয়েকটি নথিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হইনি।

নীরা চিঠিটি বাবার সামনে রাখল।

—এই স্বাক্ষরটা কি তোমার পরিচিত কারও হতে পারে?

রাশেদ কাগজটি মনোযোগ দিয়ে দেখলেন।

—হতে পারে। কিন্তু শুধু হাতের লেখা দেখে এত বছর পর নিশ্চিত হওয়া কঠিন।

রাফি ধাতব সিলটি একটি ছোট বাক্সে রাখল।

—স্যার, এই সিলের নম্বরটা দেখুন।

সিলের এক পাশে খুব ছোট করে খোদাই করা—

A.R. — 03

আরিয়ানের চোখ সরু হয়ে এল।

—তিন নম্বর?

রাফি বলল,

—হ্যাঁ। হয়তো আজহার রহমানের একাধিক ব্যক্তিগত সিল ছিল।

নীরা বলল,

—অথবা তিন নম্বর সিলটি বিশেষ কোনো কাজের জন্য ব্যবহার করা হতো।

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

—এটা যাচাই করতে হবে।

দুপুরে তারা পুরোনো ট্রাস্ট অফিসে ফিরে এল।

রাফি আগে থেকেই ১৭ অক্টোবর ২০০৮ সালের নথির তালিকা সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু মূল রেজিস্টারটি পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে একটি কার্বন কপি।

কাগজের ওপর লেখা—

17 October 2008 — Special Document Review

উপস্থিত ব্যক্তিদের তালিকায় ছিল:

১. মাহমুদ রহমান
২. জহির উদ্দিন
৩. রাশেদ রহমান
৪. কামাল আহমেদ
৫. একজন বিশেষ পর্যবেক্ষক

পঞ্চম ব্যক্তির নামের জায়গাটি কেটে দেওয়া।

নীরা কাগজের দিকে তাকিয়ে বলল,

—এই বিশেষ পর্যবেক্ষক কে ছিলেন?

রাফি উত্তর দিল,

—নাম মুছে ফেলা হয়েছে। তবে নিচে একটি স্বাক্ষর আছে।

আরিয়ান কাগজটি কাছে টেনে নিল।

স্বাক্ষরের পাশে লেখা—

Received by: S. Rahman

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—আবার সেই S. Rahman!

আরিয়ান বলল,

—এবার অন্তত আমরা জানি, ১৭ অক্টোবরেও এই নামটি ব্যবহৃত হয়েছিল।

রাশেদ কাগজটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বললেন,

—এক মিনিট!

সবাই তাঁর দিকে তাকাল।

—এই স্বাক্ষরের নিচে যে ছোট দাগটা আছে, এটা আমি চিনি।

নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,

—কাকে চেনো বাবা?

রাশেদ ধীরে বললেন,

—আমাদের অফিসে একজন ছিলেন, যিনি সবসময় নিজের স্বাক্ষরের নিচে এমন একটা দাগ দিতেন। তাঁর নাম ছিল সাইফুল রহমান।

ঘরের ভেতর সবাই থমকে গেল।

সাইফুল রহমান।

নামটি রাফি সঙ্গে সঙ্গে নোট করে নিল।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

—তিনি কী কাজ করতেন?

রাশেদ বললেন,

—তিনি সরাসরি আমাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ছিলেন না। বাইরের একজন হিসাব পরামর্শক ছিলেন। তবে বেশ কিছুদিন আমাদের অফিসে নিয়মিত আসতেন। পুরোনো হিসাব, ট্রাস্টের কাগজপত্র—এসব দেখতেন।

নীরা বলল,

—তাহলে তিনি কি S. Rahman হতে পারেন?

—হতে পারেন। কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না।

আরিয়ান রাফিকে বলল,

—সাইফুল রহমানের পুরোনো কর্মসংক্রান্ত রেকর্ড, ঠিকানা এবং অফিসে আসা-যাওয়ার তথ্য খুঁজে বের করো। বৈধ নথি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করবে না।

রাফি মাথা নাড়ল।

—ঠিক আছে, স্যার।

বিকেল পাঁচটা।

রাফি একটি পুরোনো ফাইল নিয়ে ফিরে এল।

—স্যার, একটা তথ্য পেয়েছি।

আরিয়ান ফাইলটি খুলল।

সেখানে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কয়েকজন বাইরের পরামর্শকের তালিকা ছিল।

সাইফুল রহমানের নামের পাশে লেখা—

External Accounts Consultant
Assignment: Trust Records Review
Last Active: 18 October 2008

নীরা বিস্মিত হয়ে বলল,

—১৮ অক্টোবরই তাঁর শেষ কর্মদিবস?

রাফি বলল,

—হ্যাঁ। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, তাঁর কাজ শেষ হওয়ার কারণ হিসেবে লেখা আছে—‘Assignment completed by special instruction.’

আরিয়ান বলল,

—কার নির্দেশে?

—সেই জায়গাটি ফাঁকা।

নীরা ফাইলের পাতা উল্টাতে লাগল। হঠাৎ একটি ছোট কাগজ বেরিয়ে এল।

কাগজটিতে হাতে লেখা—

“১৭ অক্টোবরের পর কোনো নথি সরাসরি ট্রাস্ট রেজিস্টারে জমা দেওয়া যাবে না। সব কাগজ প্রথমে S.R.-এর মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।”

নীরা বলল,

—এখানে S.R. লেখা আছে।

আরিয়ান কাগজটি পরীক্ষা করল।

—কিন্তু এটা কার নির্দেশ, তা বোঝা যাচ্ছে না। স্বাক্ষর নেই।

রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—সেদিন অফিসে অনেক কিছুই স্বাভাবিক ছিল না। আমি বুঝতে পারছিলাম, কেউ কাগজপত্রের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে চাইছে।

নীরা বাবার দিকে তাকাল।

—তুমি তখন কাউকে সন্দেহ করেছিলে?

রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—আমি সাইফুলকে সন্দেহ করিনি। কারণ সে সবসময় কাগজপত্র যাচাই করেই কাজ করত। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সে হয়তো এমন কিছু জানত যা আমাদের কাউকে বলেনি।

সন্ধ্যা সাতটা।

আরিয়ান সাইফুল রহমানের পুরোনো যোগাযোগের সূত্র ধরে একটি নম্বর পেল। নম্বরটি এখন আর চালু নেই। তবে ফাইলে একটি পুরোনো অফিসের ঠিকানা ছিল।

রাফি বলল,

—ঠিকানাটা ঢাকার বাইরে। জায়গাটা এখন হয়তো বদলে গেছে।

নীরা বলল,

—তাহলে সেখানে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে।

আরিয়ান তার দিকে তাকাল।

—যাব। তবে আগে একটা কাজ বাকি।

—কী?

আরিয়ান ১৭ অক্টোবরের কার্বন কপিটি সামনে রাখল।

—এই স্বাক্ষরটি সাইফুল রহমানের কি না, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

রাফি বলল,

—আমাদের কাছে তাঁর পুরোনো কয়েকটি স্বাক্ষর আছে। সেগুলো তুলনা করার জন্য একজন যোগ্য নথি বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

নীরা সম্মতি জানাল।

—আমরা অনুমানের ওপর কাউকে দোষী করব না।

আরিয়ান মৃদু স্বরে বলল,

—এই কথাটাই আমাদের এতদিনের তদন্তকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

রাতের দিকে নীরা বাড়ি ফিরল।

মা খাবার টেবিলে বসে অপেক্ষা করছিলেন।

—সারাদিন কোথায় ছিলি?

—পুরোনো কিছু কাগজ খুঁজছিলাম, মা।

মা কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

—তোর বাবা কি আবার পুরোনো দিনের কথা বলেছে?

নীরা মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ। মা, ২০০৮ সালের ১৭ অক্টোবরের কথা তোমার কিছু মনে আছে?

মায়ের মুখের ভাব বদলে গেল।

—কেন?

—সেদিন কি বাবা বাড়িতে ফিরতে দেরি করেছিল?

মা একটু ভেবে বললেন,

—হ্যাঁ। সেদিন অনেক রাত করে ফিরেছিল। খুব চিন্তিত ছিল। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কী হয়েছে। সে শুধু বলেছিল, ‘কিছু কাগজ ঠিক জায়গায় নেই।’

নীরা চুপ করে শুনল।

মা আবার বললেন,

—আর একটা কথা মনে পড়ছে। পরদিন সকালে একজন লোক আমাদের বাড়িতে এসেছিল।

—কে?

—নাম জানি না। তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল। কিন্তু তোমার বাবা তার সঙ্গে দেখা করেনি।

নীরা অবাক হলো।

—কেন?

—তোমার বাবা বলেছিল, লোকটি নাকি এমন একটি কাগজ নিয়ে এসেছে, যেটাতে তাঁর নাম লেখা আছে। কিন্তু তিনি সেই কাগজ গ্রহণ করবেন না।

নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,

—লোকটা দেখতে কেমন ছিল?

মা চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করলেন।

—মাঝারি গড়ন। হাতে বাদামি রঙের ফাইল ছিল। আর যাওয়ার আগে সে একটা কথা বলেছিল।

—কী কথা?

মা ধীরে বললেন,

—‘যে কাগজ আজ গ্রহণ করা হলো না, একদিন সেটাই সবাইকে উত্তর দেবে।’

নীরার বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।

এটা কি সেই একই কাগজ, যার খোঁজ তারা এতদিন ধরে করছে?

পরদিন সকাল।

নীরা আরিয়ানকে মায়ের বলা কথাগুলো জানাল।

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তাহলে ১৮ অক্টোবরের রসিদটি হয়তো সেই লোকটির সঙ্গে সম্পর্কিত।

—কিন্তু লোকটি সাইফুল রহমান ছিল কি না, আমরা জানি না।

—সেটাই খুঁজে বের করব।

ঠিক তখন রাফি এসে একটি নতুন কাগজ টেবিলে রাখল।

—স্যার, সাইফুল রহমানের পুরোনো ফাইল থেকে আরেকটি তথ্য পেয়েছি।

আরিয়ান কাগজটি হাতে নিল।

এটি ছিল ১৮ অক্টোবরের একটি অফিস ছাড়পত্র।

সেখানে লেখা—

Name: Saiful Rahman
Last Assignment: Trust Records Review
Final Note: All pending documents transferred to authorized receiver.

কিন্তু নিচের স্বাক্ষরটি ছিল অন্য কারও।

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে সাইফুল নিজের হাতে কিছু জমা দেননি?

রাফি বলল,

—সেটাই বোঝা যাচ্ছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রহণকারীর নামের জায়গায় লেখা আছে—

S. Rahman.

আরিয়ান কাগজটি নামিয়ে রাখল।

—একজন মানুষ একই সময়ে নিজের কাছেই কাগজ গ্রহণ করেছে—এটা অসম্ভব নয়, কিন্তু এখানে বিষয়টি অস্বাভাবিক।

নীরা বলল,

—তাহলে কি S. Rahman আর সাইফুল রহমান একই ব্যক্তি নন?

আরিয়ান উত্তর দিল,

—এখনো জানি না। তবে আমাদের হাতে দুটি সম্ভাবনা আছে। সাইফুল নিজের নামের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করেছেন, অথবা অন্য কেউ তাঁর পরিচয় ব্যবহার করেছে।

রাফি বলল,

—আরেকটা বিষয় আছে, স্যার।

—কী?

—ছাড়পত্রের সঙ্গে একটি ছোট নোট ছিল। সেটি সম্ভবত পরে যুক্ত করা হয়েছে।

নোটটি খুলতেই দেখা গেল—

“প্রকৃত গ্রহণকারীকে চিহ্নিত করার আগে এই ছাড়পত্র কার্যকর বলে গণ্য করা যাবে না।”

নীরা ধীরে বলল,

—তাহলে কেউ নিজেই জানত, কাগজে লেখা গ্রহণকারীর পরিচয় নিয়ে সন্দেহ আছে।

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

—আর সেই সন্দেহের উত্তর লুকিয়ে আছে ১৭ অক্টোবরের মূল রেজিস্টারে।

সেদিন রাতেই নীরা বাবার ঘরে গেল।

রাশেদ একটি পুরোনো ছবির অ্যালবাম দেখছিলেন।

নীরা পাশে বসে বলল,

—বাবা, সাইফুল রহমানের কোনো ছবি তোমার কাছে আছে?

রাশেদ অ্যালবামের কয়েকটি পাতা উল্টালেন।

একটি পুরোনো অফিস অনুষ্ঠানের ছবির সামনে এসে থামলেন।

ছবিতে কয়েকজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

রাশেদ একজনের দিকে আঙুল দেখালেন।

—এই হলো সাইফুল রহমান।

নীরা ছবিটি হাতে নিল।

ছবির পেছনে তারিখ লেখা—

17 October 2008

কিন্তু ছবির একেবারে ডান পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ আংশিক ঢাকা।

তার বুকের পকেটে একটি পরিচয়পত্র ঝুলছে।

নীরা ছবিটি কাছে টেনে নিল।

পরিচয়পত্রে লেখা নামটি পড়তেই তার চোখ বড় হয়ে গেল।

S. Rahman.

আরিয়ানের ফোনে সঙ্গে সঙ্গে ছবিটি পাঠানো হলো।

কয়েক মিনিট পর আরিয়ানের উত্তর এল—

“নীরার বাবা, ছবির লোকটিকে কি আপনি চেনেন?”

রাশেদ ছবিটির দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন,

—চিনি। কিন্তু সে সাইফুল রহমান নয়।

নীরা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,

—তাহলে কে?

রাশেদ ছবির মানুষটির দিকে আঙুল রাখলেন।

—সে ছিল আমাদের পুরোনো অফিসের আরেকজন কর্মী। যার নাম আমি বহু বছর ধরে শুনিনি।

নীরা বলল,

—নামটা বলো বাবা।

রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—শাহেদ রহমান।

নীরার হাতে থাকা ছবিটি কেঁপে উঠল।

কারণ ছবির পেছনে আরও একটি ছোট লেখা ছিল—

“S. Rahman — Special Receiver.”

এতদিন তারা যে পরিচয়কে সাইফুল রহমান ভেবেছিল, সেটি আসলে অন্য একজনের।

আর সেই মানুষটির নাম—

শাহেদ রহমান।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 80 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন