পর্ব ৮১: শাহেদ রহমানের ফিরে আসা
ছবিটা নীরার হাতেই রয়ে গেল।
ছবির পেছনে লেখা নামটি বারবার পড়ছে সে—
শাহেদ রহমান।
আরিয়ান ফোনে ছবিটি পাওয়ার পর কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দেয়নি। তারপর শুধু একটি মেসেজ পাঠিয়েছে—
“এই নামটি আমার বাবার কাছেও পরিচিত হতে পারে।”
নীরা সঙ্গে সঙ্গে আরিয়ানকে ফোন করল।
—তুমি কি শাহেদ রহমানকে চেনো?
—আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তবে বাবার পুরোনো কাগজে নামটি দেখেছি।
—কোন কাগজে?
—একটা পুরোনো ট্রাস্ট মেমোতে। সেখানে শাহেদ রহমানকে ‘Special Receiver’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। আমি তখন বিষয়টাকে গুরুত্ব দিইনি।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—তাহলে নামটা তোমাদের কাছেও ছিল!
—হ্যাঁ। কাল বাবার সঙ্গে কথা বলব।
পরদিন সকাল।
আরিয়ান নীরাকে নিয়ে মাহমুদ রহমানের কাছে গেল।
মাহমুদ ছবিটি হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
—এই ছবিটা কোথায় পেলে?
নীরা বলল,
—বাবার পুরোনো অ্যালবামে। ছবির পেছনে ১৭ অক্টোবর ২০০৮ লেখা আছে।
মাহমুদ ছবির মানুষটির দিকে আঙুল রাখলেন।
—শাহেদ রহমান।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—আপনি তাঁকে চিনতেন?
—চিনতাম। সে একসময় আমাদের পুরোনো প্রতিষ্ঠানের নথি সংরক্ষণের কাজে যুক্ত ছিল। তবে সে স্থায়ী কর্মচারী ছিল না।
নীরা বলল,
—তাহলে S. Rahman নামে যে রসিদে স্বাক্ষর আছে, সেটা কি তার?
মাহমুদ ছবিটি টেবিলে রাখলেন।
—সম্ভব। কিন্তু একটা বিষয় মনে রাখতে হবে—শাহেদ শুধু নথি গ্রহণ করত না। কখনো কখনো অন্যের পক্ষেও নথি গ্রহণ করত।
আরিয়ান প্রশ্ন করল,
—কাদের পক্ষ থেকে?
—সেটা নির্ভর করত লিখিত অনুমতির ওপর। কোনো অনুমতি ছাড়া সে কারও ব্যক্তিগত দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারত না।
নীরা বলল,
—তাহলে ১৮ অক্টোবরের রসিদে তার নাম থাকলে অনুমতিপত্রও থাকার কথা।
মাহমুদ মাথা নাড়লেন।
—ঠিক তাই। কিন্তু আমি কখনো তাকে C-14-এর মূল কপি গ্রহণের অনুমতি দিইনি।
আরিয়ান এবার সামনে ঝুঁকে বসল।
—আপনি কি নিশ্চিত?
—সম্পূর্ণ নিশ্চিত। আমি বরং সেদিন একটি লিখিত আপত্তি দিয়েছিলাম। সেখানে বলা ছিল, মূল কপি যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কেউ দায়িত্ব নিতে পারবে না।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—আপনার কাছে সেই আপত্তির কপি আছে?
মাহমুদ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—আমার ব্যক্তিগত ফাইলে থাকার কথা।
এক ঘণ্টা পর মাহমুদ তাঁর পুরোনো ফাইল নিয়ে ফিরে এলেন।
ফাইলের ভেতর থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন।
শিরোনাম—
C-14 — Objection to Unauthorized Receipt
তারিখ: ১৮ অক্টোবর ২০০৮।
নথিতে স্পষ্ট লেখা ছিল—
“কোনো প্রতিনিধি লিখিত অনুমতি ছাড়া C-14-এর মূল কপি গ্রহণ বা স্থানান্তর করতে পারবেন না। প্রাপক হিসেবে কোনো সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহার করা হলে তার পূর্ণ পরিচয় ও স্বাক্ষর যাচাই বাধ্যতামূলক।”
নিচে মাহমুদের স্বাক্ষর।
আরেকটি অংশে লেখা—
“শাহেদ রহমানের নামে কোনো অনুমোদনপত্র ইস্যু করা হয়নি।”
নীরা বিস্মিত হয়ে বলল,
—তাহলে শাহেদ যদি কাগজ গ্রহণ করে থাকে, সেটা অনুমতি ছাড়া হয়েছে?
আরিয়ান বলল,
—প্রাথমিকভাবে তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু রসিদটি আসল কি না এবং সে সত্যিই গ্রহণ করেছিল কি না, সেটাও যাচাই করতে হবে।
মাহমুদ এবার আরেকটি কাগজ বের করলেন।
—এটা দেখো। এই কাগজটি আমার কাছে পরে এসেছিল।
কাগজটির ওপর লেখা—
Delivery Confirmation — R-18/04
প্রাপক: S. Rahman
বিষয়: C-14 সম্পর্কিত নথি
মূল কপি: সংযুক্ত নয়।
নিচে একটি স্বাক্ষর।
কিন্তু এবার স্বাক্ষরের পাশে লেখা ছিল—
On behalf of S. Rahman.
নীরা বলল,
—তার মানে শাহেদ নিজে কাগজটি গ্রহণ করেনি?
মাহমুদ উত্তর দিলেন,
—এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
দুপুরে রাফি একটি খবর নিয়ে এল।
—স্যার, শাহেদ রহমানের পুরোনো ঠিকানায় যোগাযোগ করা গেছে।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—তিনি কোথায় আছেন?
—ঠিকানায় তিনি থাকেন না। তবে তাঁর এক আত্মীয় জানিয়েছেন, তিনি এখনো জীবিত। ঢাকার বাইরে থাকেন।
নীরা দ্রুত বলল,
—আমরা কি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারব?
রাফি বলল,
—তাঁর আত্মীয় একটি নম্বর দিয়েছেন। তবে দেখা করার আগে তিনি শাহেদের সঙ্গে কথা বলে জানাবেন।
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
—ঠিক আছে। কোনো চাপ দেওয়া যাবে না। আমরা শুধু পুরোনো নথি সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য জানতে চাই।
বিকেল পাঁচটা।
নীরার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
—হ্যালো?
ওপাশ থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল।
—আপনি কি নীরা রহমান?
—জি। কে বলছেন?
—আমি শাহেদ রহমান।
নীরা এক মুহূর্তের জন্য কথা বলতে পারল না।
তারপর নিজেকে সামলে বলল,
—আপনার সঙ্গে ২০০৮ সালের C-14 নথি নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।
শাহেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আমি জানতাম, একদিন কেউ না কেউ এই কাগজ নিয়ে খোঁজ করবে।
নীরা বলল,
—আপনি কি ১৮ অক্টোবর ২০০৮ সালে C-14 সম্পর্কিত কোনো কাগজ গ্রহণ করেছিলেন?
—আমি একটি খাম পেয়েছিলাম। কিন্তু সেটি মূল C-14 ছিল না।
—তাহলে খামের ভেতরে কী ছিল?
—একটি রসিদ, একটি নির্দেশপত্র এবং একটি পুরোনো নথির অনুলিপি।
—প্রেরক কে ছিলেন?
শাহেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—প্রেরকের নাম মনে আছে। কিন্তু আমি ফোনে বলতে চাই না।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি আমাদের সঙ্গে দেখা করবেন?
—করব। তবে একটা শর্ত আছে।
—কী শর্ত?
—আপনার বাবাকে সঙ্গে আনবেন।
নীরা অবাক হলো।
—আমার বাবাকে কেন?
শাহেদ ধীরে বললেন,
—কারণ ২০০৮ সালের ১৭ অক্টোবর আপনার বাবা যে মিটিং থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, তার পরের ঘটনাগুলো আমি নিজের চোখে দেখেছি।
কল শেষ হওয়ার আগে তিনি আরও বললেন,
—আর একটা কথা, নীরা রহমান। আপনার বাবা সেদিন ভুল করেননি। তিনি যে কাগজে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেছিলেন, সেটি সত্যিই অসম্পূর্ণ ছিল।
রাত আটটা।
নীরা, আরিয়ান ও রাশেদ রহমান বসার ঘরে বসে আছেন।
নীরা বাবাকে সব জানাল।
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—শাহেদ আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়?
—হ্যাঁ বাবা। সে বলেছে, তুমি সেদিন ভুল করোনি।
রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আমি কখনো চাইনি আমার কারণে এত মানুষকে এত বছর ধরে প্রশ্নের মুখে পড়তে হোক।
আরিয়ান বলল,
—আপনার কোনো দোষ ছিল না। আপনি মূল কপি ছাড়া স্বাক্ষর করতে চাননি।
রাশেদ মাথা নাড়লেন।
—কিন্তু আমি একটা বিষয় লুকিয়ে রেখেছিলাম।
নীরা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
—কী বিষয়?
রাশেদ ধীরে বললেন,
—১৭ অক্টোবরের মিটিং শেষ হওয়ার পর শাহেদ আমার কাছে এসেছিল। সে বলেছিল, C-14-এর মূল কপি তার কাছে নেই, কিন্তু সে জানে কপিটি কোথায় রাখা হয়েছে।
আরিয়ান দ্রুত প্রশ্ন করল,
—তাহলে আপনি তাকে জিজ্ঞেস করেননি?
—করেছিলাম। কিন্তু সে বলেছিল, জায়গাটা জানালে একজন নির্দোষ মানুষ বিপদে পড়বে।
নীরা বলল,
—কোন মানুষ?
রাশেদ মাথা নিচু করলেন।
—সে নাম বলেনি। শুধু বলেছিল, ‘যিনি কাগজটি রেখেছেন, তিনি পরিবারের কেউ নন। কিন্তু পরিবারের সবাই তাঁকে বিশ্বাস করে।’
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
আরিয়ান ধীরে বলল,
—আজহার রহমানের চিঠিতেও প্রায় একই কথা লেখা ছিল।
নীরা বাবার দিকে তাকাল।
—তুমি কি মনে করো, শাহেদ সেই মানুষটির পরিচয় জানত?
রাশেদ বললেন,
—হ্যাঁ। কিন্তু সে আমাকে কখনো বলেনি।
পরদিন দেখা করার সময় নির্ধারিত হলো।
শাহেদ রহমান নিজেই জায়গা জানিয়ে দিলেন—একটি পুরোনো পাঠাগারের ছোট সভাকক্ষ।
সকাল দশটায় নীরা, আরিয়ান ও রাশেদ সেখানে পৌঁছালেন।
কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর দরজা খুলে একজন মধ্যবয়সী মানুষ ভেতরে ঢুকলেন।
তিনি ধীরে ধীরে রাশেদের দিকে তাকালেন।
—অনেক বছর পর, রাশেদ সাহেব।
রাশেদ উঠে দাঁড়ালেন।
—শাহেদ, তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?
শাহেদ চেয়ার টেনে বসলেন।
—আমি কোথাও হারিয়ে যাইনি। শুধু পুরোনো বিষয়গুলো থেকে দূরে ছিলাম।
আরিয়ান বলল,
—আমরা জানতে চাই, ১৮ অক্টোবর ২০০৮ সালে আপনি কী গ্রহণ করেছিলেন।
শাহেদ ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো খাম বের করলেন।
খামের ওপর লেখা—
R-18/04 — Personal Delivery
নীরা অবাক হয়ে তাকাল।
—এটা কি সেই খাম?
শাহেদ মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। আমি এত বছর ধরে এটি সংরক্ষণ করেছি।
তিনি খাম থেকে তিনটি কাগজ বের করলেন।
প্রথমটি ছিল ডেলিভারি রসিদ।
দ্বিতীয়টি ছিল একটি নির্দেশপত্র।
তৃতীয়টি ছিল একটি ছোট হাতে লেখা নোট।
শাহেদ বললেন,
—আমি আপনাদের একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমি কখনো C-14-এর মূল কপি গ্রহণ করিনি। আমাকে শুধু একটি সিল করা খাম দেওয়া হয়েছিল।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—কে দিয়েছিল?
শাহেদ উত্তর দেওয়ার আগে রাশেদের দিকে তাকালেন।
—যে মানুষটি খামটি দিয়েছিল, তাকে আপনি খুব ভালোভাবে চিনতেন।
রাশেদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—কে?
শাহেদ নোটটি সামনে রাখলেন।
নোটের নিচে একটি স্বাক্ষর।
M. Rahman.
নীরা বলল,
—মাহমুদ রহমান?
শাহেদ মাথা নাড়লেন।
—না। এই স্বাক্ষর মাহমুদ রহমানের নয়।
আরিয়ান কাগজটি হাতে নিল।
—তাহলে কে?
শাহেদ ধীরে বললেন,
—এটি এমন একজনের স্বাক্ষর, যিনি রাশেদ রহমানের সঙ্গে বহু বছর কাজ করেছেন। আর যিনি ১৭ অক্টোবরের মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন।
রাশেদ এবার কাগজটির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
—না… এটা হতে পারে না।
নীরা বাবার হাত ধরে বলল,
—কী হয়েছে বাবা?
রাশেদ কাঁপা গলায় বললেন,
—এই স্বাক্ষর আমি চিনি।
শাহেদ তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তাহলে আপনি জানেন, এতদিন আমরা কাকে খুঁজছিলাম।
রাশেদ ধীরে মাথা তুললেন।
—হ্যাঁ। কিন্তু আমি কখনো ভাবিনি, সে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
চলবে…