পর্ব ৮৩: জহিরের গোপন দায়িত্ব
শাহেদের মুখে জহির উদ্দিনের নাম শোনার পর ঘরের পরিবেশ বদলে গেল।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—জহির চাচা তো আগেও আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেছিলেন, C-14-এর দ্বিতীয় কপিটি তাঁর কাছে ছিল, কিন্তু মূল কপি তাঁর কাছে ছিল না।
শাহেদ মাথা নাড়লেন।
—হতে পারে তিনি পুরোপুরি মিথ্যা বলেননি। কিন্তু আমি যা দেখেছি, সেটা হলো—একসময় মূল C-14 তাঁর হাতে ছিল।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি নিজের চোখে মূল কপিটি দেখেছিলেন?
—হ্যাঁ। কাগজের ওপর C-14 লেখা ছিল। নিচে আজহার রহমানের ব্যক্তিগত সিলের ছাপও দেখেছিলাম।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—তাহলে সেটি কি সেই একই সিল, যেটা আমরা পেয়েছি?
—সম্ভবত। তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না।
রাফি নোটবুক খুলে লিখল—
মূল C-14 — শেষবার জহির উদ্দিনের কাছে দেখা গিয়েছিল।
আরিয়ান বলল,
—আমাদের জহিরের সঙ্গে আবার কথা বলতে হবে।
জহিরের সামনে নতুন প্রশ্ন
পরদিন সকালে জহির উদ্দিনকে ফোন করা হলো।
আরিয়ান সরাসরি বলল,
—জহির সাহেব, C-14-এর মূল কপি নিয়ে আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর জহির বললেন,
—আপনারা আবার সেই কাগজের কাছে ফিরে গেছেন?
—হ্যাঁ। আমাদের কাছে নতুন তথ্য এসেছে।
—কী তথ্য?
—শাহেদ রহমান বলেছেন, তিনি মূল C-14 আপনার হাতে দেখেছিলেন।
জহির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—শাহেদ আপনাদের সঙ্গে দেখা করেছে?
—হ্যাঁ।
—তাহলে এবার আমাকে সবকিছু খুলে বলতে হবে।
আরিয়ান বলল,
—আমরা আজই আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
জহির কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—বিকেল চারটায় পুরোনো অফিসে আসুন। এবার আমি কিছু নথি দেখাব।
বিকেল চারটা।
পুরোনো অফিসের একটি ছোট কক্ষে জহির বসে ছিলেন। সামনে একটি বাদামি ফাইল।
নীরা, আরিয়ান ও রাফি ঢুকতেই তিনি ফাইলটি সামনে এগিয়ে দিলেন।
—এখানে ২০০৮ সালের কয়েকটি নথির কপি আছে। আমি এতদিন এগুলো কাউকে দেখাইনি।
নীরা ফাইল খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা—
C-14 — Temporary Custody Record
তারিখ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০০৮।
দায়িত্বপ্রাপ্ত: জহির উদ্দিন।
পরের পাতায় একটি মন্তব্য—
“Original document received for verification only. No transfer of ownership or final responsibility.”
আরিয়ান বলল,
—আপনি তাহলে মূল কপি পেয়েছিলেন?
জহির মাথা নাড়লেন।
—একদিনের জন্য। আমাকে বলা হয়েছিল, কাগজের তারিখ, স্বাক্ষর এবং সিল যাচাই করতে।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—কে দিয়েছিল?
—আজহার রহমানের নির্দেশে কাগজটি আমার কাছে আসে। তবে যিনি হাতে দিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি পরিবারের সদস্য ছিলেন না।
—নাম?
জহির একটু থেমে বললেন,
—সেটা এই নথিতে নেই।
আরিয়ান বলল,
—কিন্তু শাহেদ বলেছেন, মূল কপিটি আপনার কাছে ছিল।
—ছিল। কিন্তু আমি সেটি নিজের কাছে রাখিনি।
নীরা দ্রুত বলল,
—তাহলে কোথায় দিয়েছিলেন?
জহির ফাইলের শেষ পৃষ্ঠাটি বের করলেন।
সেখানে একটি রসিদ ছিল।
তারিখ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৮।
গ্রহণকারী: Jahidul Islam
বিবরণ: C-14 — Temporary Preservation.
নীরা বলল,
—জাহিদুল ইসলাম তো বলেছিলেন, তিনি একটি বন্ধ ফাইল পেয়েছিলেন। তিনি জানতেন না ভেতরে কী ছিল।
জহির মাথা নাড়লেন।
—সেটাই সত্যি। আমি তাকে ফাইলটি দিয়েছিলাম সংরক্ষণের জন্য। কিন্তু তার আগে মূল কপিটি আলাদা করে ফেলেছিলাম।
আরিয়ান বিস্মিত হলো।
—কেন?
জহির উত্তর দিলেন,
—কারণ নির্দেশ ছিল, মূল কপি এবং অনুলিপি একসঙ্গে রাখা যাবে না।
নীরা বলল,
—তাহলে মূল কপিটি কোথায় রেখেছিলেন?
জহির চুপ করে গেলেন।
যে নামটি রেজিস্টারে নেই
কিছুক্ষণ পর জহির একটি ছোট নোট বের করলেন।
—মূল কপিটি আমি একজনের কাছে দিয়েছিলাম। কিন্তু তার নাম কোনো অফিস রেজিস্টারে লিখিনি।
আরিয়ান বলল,
—কেন লিখেননি?
—কারণ আমাকে বলা হয়েছিল, ওই ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। তবে আমি নিজের জন্য একটি সংকেত লিখে রেখেছিলাম।
নীরা নোটটি হাতে নিল।
সেখানে লেখা—
Holder: P-07
আর নিচে—
Personal verification required.
রাফি বলল,
—P-07! এই কোড তো ১৭ অক্টোবরের মিটিংয়ের তালিকাতেও ছিল।
জহির মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। একই ব্যক্তি।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি জানতেন P-07 কে?
—জানতাম। কিন্তু এত বছর ধরে নামটি গোপন রেখেছি।
নীরা শান্ত গলায় বলল,
—এখন তো আর গোপন রাখার কারণ নেই। একজন নির্দোষ মানুষের নাম এত বছর ধরে ভুলভাবে জড়িয়ে আছে।
জহির নীরার দিকে তাকালেন।
—আমি জানি। কিন্তু আমি ভয় পেয়েছিলাম, সত্য প্রকাশ করলে পুরোনো পরিবারের আরও কিছু গোপন বিষয় সামনে চলে আসবে।
আরিয়ান বলল,
—সত্য লুকিয়ে রাখলে সেই ভয় কখনো শেষ হবে না।
জহির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—P-07-এর আসল নাম হলো—
তিনি থেমে গেলেন।
ঠিক তখনই তাঁর ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে অচেনা নম্বর।
জহির ফোনটি কেটে দিলেন।
নীরা বলল,
—কে ফোন করেছিল?
—জানি না।
আরিয়ান বলল,
—আপনি আপনার কথা শেষ করুন।
জহির আবার মুখ খুললেন।
—P-07 হলো…
তিনি নামটি বলার আগেই কক্ষের দরজায় টোকা পড়ল।
একজন অফিস সহকারী ভেতরে এসে জানাল,
—স্যার, আপনার জন্য একটি খাম এসেছে।
জহির খামটি হাতে নিলেন।
প্রেরকের নাম নেই।
খামের ওপর শুধু লেখা—
P-07 — Final Record
জহিরের মুখের রং বদলে গেল।
পুরোনো নির্দেশের শেষ কপি
খামটি খুলে একটি পাতলা কাগজ বের করা হলো।
কাগজে লেখা—
“C-14-এর মূল কপি যাঁর কাছে রাখা হয়েছে, তাঁর পরিচয় প্রকাশের আগে ১৭ সেপ্টেম্বরের মূল নির্দেশ যাচাই করতে হবে। কারণ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কেবল সংরক্ষক, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগ্রহণকারী নন।”
নিচে একটি স্বাক্ষর।
A.R.
আরিয়ান বলল,
—এটা আজহার রহমানের স্বাক্ষর?
জহির মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। তাঁর স্বাক্ষর আমি চিনি।
নীরা কাগজটি উল্টে দেখল।
পেছনে ছোট করে লেখা—
“P-07 shall not be treated as final custodian.”
নীরা বলল,
—তার মানে P-07 মূল কপির মালিক বা চূড়ান্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ ছিলেন না। তিনি শুধু সাময়িকভাবে রেখেছিলেন।
জহির বললেন,
—ঠিক তাই। আর এ কারণেই আমি তাঁর নাম রেজিস্টারে লিখিনি।
আরিয়ান প্রশ্ন করল,
—কিন্তু এই খাম এখন আপনাকে কে পাঠাল?
জহির মাথা নাড়লেন।
—জানি না।
রাফি খামের ভেতর ও বাইরে পরীক্ষা করে বলল,
—এখানে ডাক বিভাগের কোনো সিল নেই। সম্ভবত কেউ সরাসরি অফিসে দিয়ে গেছে।
নীরা বলল,
—কেউ আমাদের তদন্তের প্রতিটি ধাপ জানে।
আরিয়ান উত্তর দিল,
—হতে পারে। কিন্তু এবার আমরা শুধু অনুমান করব না। খামের উৎস বের করার চেষ্টা করব।
বাবার কাছে ফিরে আসা
সন্ধ্যায় নীরা বাড়ি ফিরে বাবাকে সব জানাল।
রাশেদ রহমান মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি কথা শুনলেন।
—P-07-এর নাম এখনো বলেনি জহির?
—না বাবা। তার আগেই ওই খাম এসে গেল।
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—আমি একটা কথা তোমাকে আগে বলিনি।
নীরা বাবার দিকে তাকাল।
—কী কথা?
—২০০৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আজহার রহমান আমাকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, C-14-এর মূল কপি পরিবারের কারও কাছে থাকবে না। একজন বিশ্বস্ত বাইরের মানুষের কাছে থাকবে।
—তুমি কি জানো সেই মানুষটি কে ছিল?
—না। তবে আজহার সাহেব বলেছিলেন, তিনি মানুষটিকে অনেক দিন ধরে চেনেন।
নীরা বলল,
—তাহলে P-07 সম্ভবত সেই বাইরের মানুষ।
রাশেদ মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। আর একটা কথা মনে পড়ছে। আজহার সাহেব বলেছিলেন, সেই মানুষটি কখনো নিজের নামে কোনো নথি গ্রহণ করবেন না।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—কেন?
—তিনি বলেছিলেন, ‘কাগজের পরিচয় বদলাতে পারে, কিন্তু সত্যের দায়িত্ব বদলায় না।’
নতুন সূত্র
রাত দশটার দিকে আরিয়ান নীরাকে ফোন করল।
—নীরা, একটা নতুন খবর আছে।
—কী খবর?
—রাফি ১৭ সেপ্টেম্বরের মূল নির্দেশের আরেকটি রেফারেন্স খুঁজে পেয়েছে। সেখানে P-07-এর সঙ্গে একটি পুরোনো কর্মী কোড যুক্ত আছে।
—কী কোড?
—A-09।
নীরা বলল,
—এটা কার কোড?
—এখনো নিশ্চিত নই। তবে A-09 কোডটি ২০০৮ সালের ট্রাস্ট কর্মী তালিকায় নেই। এটি বাইরের একজন অনুমোদিত পরামর্শকের কোড।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—তাহলে আমাদের আবার পুরোনো পরামর্শকদের তালিকা দেখতে হবে।
—হ্যাঁ। আর কাল জহিরকে আবার জিজ্ঞেস করব, সে P-07-এর পরিচয় কেন গোপন রেখেছিল।
ফোন রাখার আগে আরিয়ান বলল,
—একটা কথা মনে রেখো। আমরা এখন অনেক কাছাকাছি। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে কাউকে অভিযুক্ত করব না।
নীরা মৃদু স্বরে বলল,
—আমি শুধু চাই, সত্যিটা সামনে আসুক।
রাত গভীর।
আরিয়ান নিজের কেবিনে বসে পুরোনো কর্মী তালিকা দেখছিল।
হঠাৎ একটি নামের ওপর তার চোখ আটকে গেল।
A-09 — External Records Consultant.
নামের জায়গায় লেখা—
আব্দুস সালাম।
আরিয়ানের চোখ বড় হয়ে গেল।
আব্দুস সালাম!
যিনি আগে বলেছিলেন, ১৭ সেপ্টেম্বরের মিটিংয়ে তিনি উপস্থিত ছিলেন। যিনি C-14-এর মূল কপি একজনকে হাতে নিতে দেখেছিলেন। যিনি বলেছিলেন, সেই ব্যক্তি রহমান পরিবারের একজন সদস্য।
কিন্তু এখন রেকর্ড বলছে, A-09 কোডটি তাঁর নামে ছিল।
আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে নীরাকে ফোন করল।
—নীরা, আমাদের আব্দুস সালামের সঙ্গে আবার কথা বলতে হবে।
—কেন?
আরিয়ান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—কারণ P-07-এর সঙ্গে যুক্ত A-09 কোডটি তাঁর নামেই পাওয়া গেছে।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তাহলে কি আব্দুস সালামই P-07?
আরিয়ান উত্তর দিল,
—এখনো জানি না। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—তিনি আমাদের যতটুকু বলেছেন, তার চেয়েও বেশি কিছু জানেন।
ফোনের ওপাশে নীরা ধীরে বলল,
—তাহলে এবার তাঁকে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
চলবে…