পর্ব ৮২: পরিচিত সেই স্বাক্ষর
পাঠাগারের ছোট সভাকক্ষটিতে কেউ কোনো কথা বলছে না।
টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো নোটটির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন রাশেদ রহমান।
স্বাক্ষরটি তাঁর অচেনা নয়।
বরং এতটাই পরিচিত যে, সেটি দেখে তাঁর বুকের ভেতর জমে থাকা বহু বছরের স্মৃতি একসঙ্গে ফিরে এসেছে।
নীরা বাবার হাত স্পর্শ করল।
—বাবা, তুমি কাকে চিনেছ?
রাশেদ কিছুক্ষণ পর ধীরে বললেন,
—এই স্বাক্ষর কামাল আহমেদের।
আরিয়ান অবাক হয়ে শাহেদের দিকে তাকাল।
—কামাল আহমেদ? কিন্তু কামাল তো আর্থিক অনিয়মের কথা স্বীকার করেছিল। সে কি C-14-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিল?
শাহেদ মাথা নাড়লেন।
—আমি এত দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই না। শুধু বলছি, খামটি আমার হাতে দেওয়ার সময় এই স্বাক্ষর ছিল।
নীরা কাগজটি হাতে নিয়ে দেখল।
—কিন্তু কামাল তো আগে থেকেই আমাদের কাছে স্বীকার করেছে যে সে হিসাবের কাগজ পরিবর্তন করেছিল। তাহলে এই নথি সম্পর্কে সে কিছু জানে না কেন?
শাহেদ উত্তর দিলেন,
—সেটা আপনাদের কামালের কাছ থেকেই জানতে হবে।
পুরোনো খামের ভেতরের নির্দেশ
আরিয়ান খাম থেকে বের করা দ্বিতীয় কাগজটি খুলল।
সেখানে লেখা—
Private Delivery Instruction
তারিখ: ১৮ অক্টোবর ২০০৮।
নির্দেশে বলা হয়েছিল, C-14 সম্পর্কিত একটি নথির অনুলিপি নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তবে মূল কপি আলাদা জায়গায় থাকবে।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—এখানে তো স্পষ্ট লেখা, মূল কপি আলাদা রাখা হয়েছে।
শাহেদ বললেন,
—হ্যাঁ। আমাকে বলা হয়েছিল, খামের ভেতরের কাগজ কাউকে দেখানো যাবে না। আমি শুধু নির্দেশ অনুযায়ী সেটি পৌঁছে দেব।
আরিয়ান প্রশ্ন করল,
—আপনাকে কে নির্দেশ দিয়েছিল?
—কামাল আহমেদ।
রাশেদ চোখ বন্ধ করলেন।
—কামাল কেন এমন করল?
শাহেদ বললেন,
—সেটা আমি জানি না। তবে সে আমাকে বলেছিল, এটি ব্যবসার হিসাবসংক্রান্ত কোনো বিষয় নয়। বরং পুরোনো ট্রাস্টের একটি দায়িত্বের ব্যাপার।
নীরা বলল,
—তাহলে সে আপনাকে পুরো সত্য বলেনি।
—সম্ভবত।
আরিয়ান কাগজের নিচের অংশ দেখল।
সেখানে একটি নাম লেখা ছিল, কিন্তু কালি ছড়িয়ে যাওয়ায় পুরোটা পড়া যাচ্ছে না।
শুধু শেষের অংশ বোঝা যায়—
“…নামা বেগম”
নীরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—নাসিমা বেগম?
শাহেদ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—হ্যাঁ। নামটি নাসিমা হতে পারে।
আরিয়ান বলল,
—নাসিমা বেগমের কাছে কি সেই সময় কোনো নথি পৌঁছেছিল?
শাহেদ উত্তর দিলেন,
—আমি নিজে পৌঁছে দিইনি। তবে আমাকে বলা হয়েছিল, নথির পরবর্তী দায়িত্ব একজন নারী কর্মকর্তার হাতে যাবে।
নাসিমা বেগমের পুরোনো স্মৃতি
সেদিন বিকেলেই আরিয়ান নাসিমা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করল।
নীরা, আরিয়ান ও রাফি তাঁর বাসায় পৌঁছালে নাসিমা তাঁদের বসতে বললেন।
নীরা পুরোনো নির্দেশপত্রটি সামনে রাখল।
—খালাম্মা, ১৮ অক্টোবর ২০০৮ সালের এই নথিটি কি আপনার পরিচিত?
নাসিমা চশমা ঠিক করে কাগজটি পড়লেন।
কিছুক্ষণ পর তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
—এই কাগজটা কোথায় পেলে?
আরিয়ান বলল,
—শাহেদ রহমানের কাছে ছিল।
নাসিমা কাগজটি টেবিলে রেখে বললেন,
—আমি সেদিন একটি খাম পেয়েছিলাম। কিন্তু সেটি C-14-এর মূল কপি ছিল না।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—খামের ভেতরে কী ছিল?
—একটি নির্দেশপত্র এবং পুরোনো রেজিস্টারের একটি অনুলিপি। আমাকে বলা হয়েছিল, মূল কপি না পাওয়া পর্যন্ত অনুলিপিটি আলাদা রাখতে।
আরিয়ান প্রশ্ন করল,
—কে আপনাকে দিয়েছিল?
নাসিমা একটু ভেবে বললেন,
—একজন লোক এসেছিল। তার হাতে অফিসের অনুমতিপত্র ছিল। তবে আমি তার পরিচয় পুরোপুরি যাচাই করতে পারিনি।
রাফি বলল,
—আপনার কাছে কি সেই অনুমতিপত্রের কোনো কপি আছে?
নাসিমা মাথা নাড়লেন।
—আমি তখন সব কাগজের কপি রাখতাম না। তবে একটা ব্যক্তিগত নোট লিখেছিলাম।
তিনি ঘরের ভেতরে গিয়ে একটি পুরোনো ডায়েরি নিয়ে এলেন।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে একটি তারিখে থামলেন।
১৮ অক্টোবর ২০০৮।
সেখানে লেখা—
“C-14-এর অনুলিপি গ্রহণ করা হলো। মূল কপি অনুপস্থিত। প্রেরকের নির্দেশ অনুযায়ী নথি আলাদা রাখা হলো। দায়িত্ব গ্রহণের অনুমোদন দেওয়া হয়নি।”
নীরা বলল,
—তাহলে আপনি শুধু অনুলিপি রেখেছিলেন?
—হ্যাঁ। আমি কখনো মূল কপি পাইনি। আর কাউকে দায়িত্বও বুঝিয়ে দিইনি।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—আপনার কাছে কি এখনো সেই অনুলিপি আছে?
নাসিমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—আছে। তবে সেটি আমি অন্য একটি ফাইলে রেখেছিলাম।
যে অনুলিপিতে ছিল না স্বাক্ষর
নাসিমা একটি পুরোনো ফাইল নিয়ে এলেন।
ফাইলের ওপর লেখা—
C-14 — Unverified Copy
নীরা সাবধানে ফাইলটি খুলল।
ভেতরে কয়েকটি পৃষ্ঠা।
প্রথম পৃষ্ঠায় C-14-এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় কিছু হিসাবের তথ্য। তৃতীয় পৃষ্ঠায় দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রস্তাব।
কিন্তু শেষ পৃষ্ঠায় গিয়ে নীরা থেমে গেল।
সেখানে লেখা—
“প্রস্তাবিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সম্মতি পাওয়া যায়নি।”
আর নিচে একটি মন্তব্য—
“R.R. has not accepted responsibility.”
নীরা বলল,
—এটা তো বাবার কথার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে!
আরিয়ান পৃষ্ঠাটি ভালো করে দেখল।
—হ্যাঁ। অন্তত এই অনুলিপি বলছে, তোমার বাবা দায়িত্ব গ্রহণ করেননি।
রাশেদ রহমানের চোখে অদ্ভুত এক স্বস্তি দেখা গেল।
—এত বছর পর অন্তত একটা কাগজ পাওয়া গেল, যেখানে সত্যিটা লেখা আছে।
কিন্তু নীরা শেষ পৃষ্ঠার নিচে আরেকটি বিষয় দেখতে পেল।
একটি ছোট সিলের ছাপ।
A.R. — 03
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—এই সিল তো আমাদের পাওয়া সিলের মতো!
আরিয়ান ধাতব সিলটি বের করে কাগজের ছাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখল।
ছাপের আকৃতি প্রায় একই।
শাহেদ বললেন,
—এই সিলটি আমি আগে দেখেছি। তবে আমি জানতাম না এটি আজহার রহমানের ব্যক্তিগত সিল।
নাসিমা ধীরে বললেন,
—সিলটি একসময় আমার কাছে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমি কখনো এটি হাতে পাইনি।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—আপনাকে কে বলেছিল সিলটি আপনার কাছে থাকবে?
নাসিমা উত্তর দিলেন,
—সালেহ রহমান।
সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
সালেহর বক্তব্য
সন্ধ্যায় আরিয়ান সালেহ রহমানকে ফোন করল।
—চাচা, A.R.-03 সিলটি সম্পর্কে আপনার কিছু মনে আছে?
সালেহ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
—মনে আছে। আজহার সাহেবের তিনটি বিশেষ সিল ছিল। এর মধ্যে ০৩ নম্বরটি ব্যবহার করা হতো ব্যক্তিগত ট্রাস্ট নথির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—সিলটি কি কখনো নাসিমা বেগমের কাছে দেওয়া হয়েছিল?
—না। অন্তত আমার জানা মতে নয়।
নীরা পাশে বসে সব শুনছিল।
আরিয়ান বলল,
—কিন্তু নাসিমা বেগমের কাছে থাকা C-14 অনুলিপিতে ওই সিলের ছাপ আছে।
সালেহ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তাহলে বিষয়টি আরও জটিল।
—কেন?
—কারণ আজহার সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর ব্যক্তিগত সিলগুলো একটি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। সেখানে ০১ এবং ০২ নম্বর সিলের অবস্থান লেখা আছে। কিন্তু ০৩ নম্বরটির পাশে শুধু একটি মন্তব্য ছিল।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—কী মন্তব্য?
সালেহ ধীরে বললেন,
—“Temporarily entrusted to a trusted person.”
নীরা বিস্মিত হয়ে বলল,
—কোন বিশ্বস্ত ব্যক্তি?
সালেহ উত্তর দিলেন,
—সেই নামটি তালিকায় লেখা ছিল না।
শেষ পৃষ্ঠার পেছনে
রাত সাড়ে নয়টা।
সবাই যখন নথিগুলো গুছিয়ে রাখছিল, তখন রাফি হঠাৎ বলল,
—একটু দাঁড়ান। এই পৃষ্ঠাটার পেছনে কিছু আছে।
নীরা কাগজটি উল্টে দেখল।
পাতার পেছনে খুব হালকা পেন্সিলে লেখা কয়েকটি শব্দ।
রাফি আলো একটু বাড়িয়ে দিল।
লেখাটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো—
“C-14 original — not with R.R.
Temporary holder — known to A.R.
Final confirmation pending.”
আর নিচে একটি তারিখ—
১৭ অক্টোবর ২০০৮।
আরিয়ান বলল,
—এটা প্রমাণ করে, ১৭ অক্টোবরেই কেউ জানত মূল কপি রাশেদ রহমানের কাছে নেই।
রাশেদ মাথা নাড়লেন।
—আমি কখনো C-14-এর মূল কপি হাতে পাইনি।
নীরা বলল,
—তাহলে মূল কপিটি কার কাছে ছিল?
শাহেদ এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। এবার তিনি বললেন,
—আমি একটা কথা এতদিন কাউকে বলিনি।
সবাই তাঁর দিকে তাকাল।
—১৮ অক্টোবর কামাল আমাকে খাম দেওয়ার সময় বলেছিল, মূল কপি এমন একজনের কাছে আছে, যিনি কখনো নিজের নাম প্রকাশ করবেন না।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি সেই ব্যক্তিকে দেখেছিলেন?
শাহেদ ধীরে মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। তবে শুধু একবার।
নীরা দ্রুত বলল,
—কে ছিলেন তিনি?
শাহেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিলেন,
—আমি তাঁর মুখ মনে করতে পারি। নামটাও মনে আছে।
আরিয়ান সামনে ঝুঁকে বসল।
—বলুন।
শাহেদ নীরার দিকে তাকালেন।
—কিন্তু নামটি শুনলে আপনারা অবাক হবেন।
নীরা বলল,
—আমরা সত্য জানতে চাই।
শাহেদ গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন,
—মূল C-14-এর অস্থায়ী রক্ষক ছিলেন এমন একজন, যাঁর নাম তোমাদের তদন্তে আগেও এসেছে।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—কে?
শাহেদ উত্তর দিলেন,
—জহির উদ্দিন।
ঘরের ভেতর সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
রাফি অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
আরিয়ান ধীরে বলল,
—কিন্তু জহির তো বলেছিল, পুরো C-14 ফাইল তার কাছে ছিল না।
শাহেদ মাথা নাড়লেন।
—সে পুরো ফাইলের কথা বলেনি। আমি বলছি, মূল কপিটি একসময় তার কাছে ছিল। কতদিন ছিল, কেন ছিল, আর পরে কোথায় গেছে—সেটা আমি জানি না।
নীরা টেবিলের ওপর রাখা কাগজগুলোর দিকে তাকাল।
এতদিন ধরে যে মানুষটিকে তারা শুধু নথির অস্থায়ী রক্ষক হিসেবে চিনেছে, সেই জহির উদ্দিনের কাছেই হয়তো লুকিয়ে আছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর।
কিন্তু জহির কি সত্যিই মূল C-14 নিজের কাছে রেখেছিল, নাকি অন্য কারও নির্দেশে শুধু সংরক্ষণ করেছিল?
এই প্রশ্নের উত্তরই এবার বদলে দিতে পারে পুরো তদন্তের গতিপথ।
চলবে…