শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
পর্ব ৮৪: জহিরের গোপন দায়িত্ব
লেখক: Mafiya Queen 👑
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা।
রয়্যাল হোল্ডিংসের বিশাল অফিস ভবনটি ধীরে ধীরে নীরব হয়ে এসেছে। দিনের ব্যস্ততা শেষ। করিডোরের বেশিরভাগ আলো নিভে গেছে। শুধু চেয়ারম্যানের কেবিনের পাশের ছোট কনফারেন্স রুমটিতে আলো জ্বলছে।
ঘরের মাঝখানে বড় টেবিল।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে পুরোনো কিছু দলিল, কয়েকটি রেজিস্টারের ফটোকপি, সি-১৪ ফাইলের নোট এবং একটি ছোট বাদামি খাম।
নীরা চুপচাপ বসে আছে।
তার চোখ আটকে আছে একটি কাগজের ওপর।
কাগজটিতে লেখা—
P-07 — Temporary Holder.
Final Custodian — Pending.
Reference Code — A-09.
নীরা কয়েকবার লেখাগুলো পড়ল।
তারপর ধীরে বলল,
—আরিয়ান, একটা বিষয় আমার মাথায় ঢুকছে না।
আরিয়ান ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে তার দিকে তাকাল।
—কী বিষয়?
—জহির সাহেব বলেছিলেন, সি-১৪-এর মূল কপিটি তিনি একজন গোপন ব্যক্তির কাছে দিয়েছিলেন। সেই ব্যক্তির পরিচয় ছিল পি-০৭। কিন্তু এখন আমরা দেখছি, পি-০৭-এর সঙ্গে এ-০৯ কোডের সম্পর্ক রয়েছে। তাহলে এ-০৯ কে?
আরিয়ান চেয়ারে হেলান দিল।
—আমাদের কাছে থাকা পুরোনো কর্মচারী তালিকা অনুযায়ী, এ-০৯ হলো আবদুস সালাম।
নীরা বলল,
—কিন্তু আবদুস সালাম তো আগে বলেছিলেন, তিনি শুধু হিসাব বিভাগের একজন কর্মচারী ছিলেন। তিনি সি-১৪-এর মূল কপি নিজের কাছে রাখেননি।
—ঠিক। আর সেই কারণেই বিষয়টা আরও ভালোভাবে যাচাই করতে হবে।
নীরা কাগজটি হাতে তুলে নিল।
—একটা কথা ভাবো। যদি আবদুস সালাম সত্যিই পি-০৭ হন, তাহলে তিনি এতদিন সেটা গোপন রাখলেন কেন?
আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
—আর যদি তিনি পি-০৭ না হন, তাহলে তাঁর নাম এই রেজিস্টারে এল কীভাবে?
নীরা কোনো উত্তর দিল না।
তার মনে হচ্ছিল, তারা যেন একটি বিশাল গোলকধাঁধার মধ্যে আটকে গেছে। প্রতিটি রহস্যের পেছনে নতুন একটি রহস্য অপেক্ষা করছে।
একজনের নাম খুঁজতে গিয়ে আরেকজনের পরিচয় সামনে আসছে।
কিন্তু কেউই পুরো সত্য বলছে না।
হঠাৎ আরিয়ান টেবিলের ওপর রাখা আরেকটি কাগজ তুলে নিল।
—এটা দেখো।
নীরা এগিয়ে এল।
কাগজটি ছিল ২০০৮ সালের একটি পুরোনো কর্মচারী তালিকার অংশ।
সেখানে লেখা—
A-09 — Abdus Salam
Designation — External Records Consultant
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—এক্সটার্নাল রেকর্ডস কনসালট্যান্ট!
—হ্যাঁ।
—কিন্তু আমরা তো জানতাম, তিনি অ্যাকাউন্টস অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন।
আরিয়ান বলল,
—একই ব্যক্তি একাধিক দায়িত্বে থাকতে পারেন। কিন্তু এখানে দুটি আলাদা রেজিস্টারে দুটি আলাদা পরিচয় রয়েছে। আমাদের জানতে হবে, কোনটি কখনকার।
নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—তাহলে কাল আবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হবে।
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
—কাল সকালেই।
পরদিন সকাল
সকাল দশটা।
নীরা বাসা থেকে বের হওয়ার আগে মায়ের কাছে এসে দাঁড়াল।
মা রান্নাঘরে নাশতা তৈরি করছিলেন।
—মা, আমি বের হচ্ছি।
মা ফিরে তাকালেন।
—এত সকালে আবার কোথায়?
—অফিসের একটা কাজে যেতে হবে।
মা কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—নীরা, একটা কথা বলব?
—বলো মা।
—তুই অনেক দিন ধরে এই পুরোনো ঘটনাগুলো নিয়ে ছুটাছুটি করছিস। তোর কাজেরও তো চাপ আছে। নিজের শরীরের দিকেও একটু খেয়াল রাখিস।
নীরা মায়ের কাছে এসে দাঁড়াল।
—চিন্তা কোরো না। আমি ঠিক আছি।
মা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
—আমি জানি, তুই সত্য জানতে চাস। কিন্তু সব সত্য জানার জন্য নিজের শান্তিটুকু হারিয়ে ফেলিস না।
নীরা মায়ের হাত ধরে বলল,
—যে সত্যের কারণে এতগুলো মানুষের জীবন বদলে গেছে, সেই সত্যটা না জেনে আমি কীভাবে শান্তিতে থাকব?
মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর মৃদু গলায় বললেন,
—আল্লাহ যেন তোকে সঠিক পথ দেখান।
নীরা মায়ের হাত ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল।
আবদুস সালামের সঙ্গে দ্বিতীয় সাক্ষাৎ
সকাল ১১টা।
পুরোনো শহরের একটি ছোট অফিস।
দরজার পাশে একটি সাধারণ নামফলক।
আবদুস সালাম — হিসাব ও নথি পরামর্শক।
নীরা ও আরিয়ান ভেতরে প্রবেশ করতেই আবদুস সালাম উঠে দাঁড়ালেন।
—আসুন। আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
আরিয়ান বলল,
—আশা করি বিরক্ত করছি না।
—না। তবে বুঝতে পারছি, আপনারা সহজে থামবেন না।
নীরা মৃদু হাসল।
—কারণ আমরা এখনো পুরো উত্তর পাইনি।
আবদুস সালাম তাদের বসতে দিলেন।
কিছুক্ষণ সাধারণ কথাবার্তার পর আরিয়ান সরাসরি মূল প্রসঙ্গে এল।
—আমরা আপনার নাম একটি পুরোনো কর্মচারী তালিকায় পেয়েছি।
আবদুস সালাম বললেন,
—কোন তালিকায়?
আরিয়ান কাগজটি তাঁর সামনে রাখল।
তিনি কাগজটি হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখলেন।
তারপর বললেন,
—হ্যাঁ, নামটি আমার।
নীরা প্রশ্ন করল,
—আপনি কি ২০০৮ সালে ট্রাস্ট অফিসের সঙ্গে কাজ করতেন?
—কিছুদিন করেছিলাম।
—কোন পদে?
আবদুস সালাম একটু ভেবে বললেন,
—আমি মূলত অ্যাকাউন্টস বিভাগে কাজ করতাম। তবে একটা সময় আমাকে পুরোনো রেকর্ড যাচাই করার জন্য আলাদা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—সেই দায়িত্বের জন্যই কি আপনাকে এক্সটার্নাল রেকর্ডস কনসালট্যান্ট বলা হয়েছিল?
—সম্ভবত। তবে আমি স্থায়ীভাবে ওই পদে ছিলাম না।
নীরা এবার বলল,
—আমরা পি-০৭ কোডটি সম্পর্কে জানতে চাই।
আবদুস সালামের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
তিনি কাগজটি টেবিলে রেখে বললেন,
—আপনারা এই কোড কোথায় পেয়েছেন?
আরিয়ান বলল,
—জহির উদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে।
—জহির সাহেব!
আবদুস সালাম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—তিনি কি আপনাদের পি-০৭ সম্পর্কে কিছু বলেছেন?
নীরা উত্তর দিল,
—তিনি বলেছেন, পি-০৭ একজন অস্থায়ী নথি সংরক্ষণকারী ছিলেন। কিন্তু তাঁর পরিচয় কোনো সাধারণ রেজিস্টারে লেখা ছিল না।
আবদুস সালাম ধীরে মাথা নাড়লেন।
—তাহলে জহির সাহেব অবশেষে কিছু বলেছেন।
আরিয়ান প্রশ্ন করল,
—আপনি কি পি-০৭-কে চিনতেন?
আবদুস সালাম কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—ব্যক্তিগতভাবে খুব ভালোভাবে চিনতাম না। তবে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই কোডটি নিয়ে একটি আলোচনা হয়েছিল।
নীরা দ্রুত বলল,
—কোথায়?
—পুরোনো ট্রাস্ট অফিসে। সেদিন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি যাচাই করা হচ্ছিল।
—সেখানে কারা ছিলেন?
—মাহমুদ সাহেব, জহির সাহেব, রাশেদ সাহেব এবং আরও কয়েকজন।
আরিয়ান বলল,
—আপনিও ছিলেন?
—আমি কিছু সময়ের জন্য সেখানে ছিলাম। তবে পুরো বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম না।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি সেদিন সি-১৪-এর মূল কপি দেখেছিলেন?
আবদুস সালাম এবার কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
তিনি টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাস তুলে এক চুমুক খেলেন।
তারপর বললেন,
—হ্যাঁ। আমি মূল কপিটি দেখেছিলাম।
নীরা ও আরিয়ান দুজনেই তাঁর দিকে তাকাল।
—আপনি দেখেছিলেন?
—হ্যাঁ। কিন্তু সেটা আমার কাছে ছিল না। জহির সাহেবের সামনে রাখা ছিল।
আরিয়ান বলল,
—কাগজটিতে কী সমস্যা ছিল?
আবদুস সালাম উত্তর দিলেন,
—মূল কপি এবং দ্বিতীয় কপির মধ্যে কিছু তথ্যের অমিল ছিল। তারিখ, স্বাক্ষর এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের কয়েকটি অংশে পার্থক্য ছিল।
নীরা বলল,
—তাহলে আপনি কি সেই অমিলগুলো লিখে রেখেছিলেন?
—হ্যাঁ। আমার কাজই ছিল সেগুলো চিহ্নিত করা।
পুরোনো ডায়েরির পাতা
আবদুস সালাম কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি ঘরের এক পাশে রাখা আলমারি খুললেন।
ভেতর থেকে একটি পুরোনো বাদামি ডায়েরি বের করলেন।
ডায়েরিটির মলাট কিছুটা ছেঁড়া।
তিনি সেটি টেবিলের ওপর রাখলেন।
—এটা আমার ব্যক্তিগত ডায়েরি। অফিসের কোনো আনুষ্ঠানিক নথি নয়। তবে ২০০৮ সালের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তারিখ এখানে লিখে রেখেছিলাম।
নীরা ডায়েরির দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমরা কি দেখতে পারি?
—অবশ্যই।
তিনি সেপ্টেম্বর মাসের অংশ খুলে দিলেন।
একটি পাতায় বড় করে লেখা—
১৭ সেপ্টেম্বর ২০০৮।
তার নিচে কয়েকটি লাইন।
“C-14 original inspected. Second copy not verified. R.R. objected to signing. J.U. requested temporary separation of records.”
নীরা ধীরে ধীরে লেখাটি পড়ল।
—এখানে আর.আর. মানে রাশেদ রহমান?
আবদুস সালাম মাথা নাড়লেন।
—আমার ধারণা তাই।
আরিয়ান বলল,
—আর জে.ইউ. মানে জহির উদ্দিন?
—হ্যাঁ, সম্ভবত।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—তাহলে বাবা সত্যিই দ্বিতীয় কপিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেছিলেন!
আবদুস সালাম বললেন,
—আমি নিজে তাঁকে আপত্তি জানাতে দেখেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, মূল নথি যাচাই না করে কোনো দ্বিতীয় কপিতে স্বাক্ষর করবেন না।
নীরার চোখে এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তি ফুটে উঠল।
সে এতদিন বাবার কাছ থেকে যা শুনেছে, এই নথির কথাগুলো তার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—এরপর কী হয়েছিল?
আবদুস সালাম পরের পৃষ্ঠা উল্টালেন।
সেখানে লেখা—
“Original separated from attached copy. Temporary preservation arranged. Final holder not recorded in accounts register.”
নীরা বলল,
—এখানে তো বলা হচ্ছে মূল কপিটি দ্বিতীয় কপি থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল।
—ঠিক।
—কিন্তু কোথায় রাখা হয়েছিল?
আবদুস সালাম মাথা নাড়লেন।
—সেটা আমি জানি না।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে পি-০৭-এর দায়িত্ব কী ছিল?
—আমার জানা অনুযায়ী, মূল কপিটি সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সেটি কারও কাছে হস্তান্তর করা যাবে না।
নীরা বলল,
—কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তো এখনো আমাদের কাছে নেই।
আবদুস সালাম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—কারণ সেই সিদ্ধান্তের কাগজটি আমি কখনো দেখিনি।
এ-০৯ আসলে কে?
আরিয়ান এবার আগের কাগজটি সামনে রাখল।
—আপনার নামের পাশে এ-০৯ লেখা আছে। এই কোডটি কী বোঝায়?
আবদুস সালাম কাগজটি হাতে নিলেন।
—এটা সম্ভবত আমার যাচাই-সংক্রান্ত দায়িত্বের কোড।
নীরা বলল,
—তাহলে পি-০৭ আর এ-০৯ একই ব্যক্তি নন?
আবদুস সালাম স্পষ্টভাবে বললেন,
—না। অন্তত আমার জানা অনুযায়ী, তারা আলাদা দায়িত্বের কোড।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি নিশ্চিত?
—আমি নিশ্চিত যে আমার কাজ ছিল রেকর্ড যাচাই করা। আমি মূল কপির অস্থায়ী হেফাজত গ্রহণ করিনি। কোনো রসিদে আমার নাম নেই। কোনো হস্তান্তরপত্রেও আমার স্বাক্ষর নেই।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তাহলে আপনার নাম কেন পি-০৭-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে?
আবদুস সালাম উত্তর দিলেন,
—হয়তো কারণ আমার কাজ ছিল সেই নথির তথ্য যাচাই করা। কিন্তু যাচাই করা আর নিজের কাছে নথি রাখা এক বিষয় নয়।
আরিয়ান বলল,
—আপনার কাছে কি এমন কোনো কাগজ আছে, যেটা দিয়ে আপনার দায়িত্বের সীমা প্রমাণ করা যাবে?
আবদুস সালাম ডায়েরির আরেকটি অংশ খুললেন।
সেখানে একটি ছোট নোট ছিল।
“A-09 — Verification Contact Only. No custody authority.”
নীরা লেখাটি পড়ে বলল,
—এখানে তো পরিষ্কার লেখা আছে, এ-০৯-এর কোনো নথি সংরক্ষণের ক্ষমতা ছিল না।
আবদুস সালাম বললেন,
—ঠিক। এই নির্দেশনা পাওয়ার পর আমি আর সি-১৪-এর মূল কপি নিয়ে কোনো কাজ করিনি।
অচেনা সেই মানুষটি
কিছুক্ষণ নীরবতার পর আবদুস সালাম নিজেই কথা শুরু করলেন।
—তবে একটা ঘটনা আপনাদের বলা দরকার।
নীরা মনোযোগ দিয়ে তাঁর দিকে তাকাল।
—কী ঘটনা?
—২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে একজন লোক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—কে তিনি?
—নাম বলেননি।
—আপনি তাঁকে চিনতেন?
—আগে এক-দুবার দেখেছি বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু নিশ্চিত ছিলাম না।
নীরা বলল,
—তিনি কী জানতে চেয়েছিলেন?
আবদুস সালাম বললেন,
—তিনি জানতে চেয়েছিলেন, সি-১৪-এর মূল কপি সম্পর্কে আমি কতটুকু জানি।
আরিয়ান দ্রুত প্রশ্ন করল,
—আপনি কী বলেছিলেন?
—আমি বলেছিলাম, আমি শুধু যাচাইয়ের কাজে যুক্ত ছিলাম। মূল কপি কোথায় আছে, সেটা জানি না।
—তারপর?
—তিনি বলেছিলেন, “যদি কখনো এই কাগজের খোঁজ কেউ করে, তাহলে তাকে বলবেন—মূল কপিটি হারিয়ে যায়নি।”
নীরা বিস্মিত হলো।
—তাহলে তিনি জানতেন মূল কপিটি কোথায় আছে!
আবদুস সালাম মাথা নাড়লেন।
—হয়তো জানতেন। কিন্তু আমি আর কোনো প্রশ্ন করিনি।
আরিয়ান বলল,
—আপনি তাঁর চেহারা মনে করতে পারবেন?
—কিছুটা। তবে এত বছর পর নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
নীরা বলল,
—তিনি কি কোনো চিহ্ন রেখে গিয়েছিলেন?
আবদুস সালাম কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন।
তারপর বললেন,
—হ্যাঁ। একটা ছোট কাগজ দিয়েছিলেন।
তিনি ডায়েরির ভেতর থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন।
কাগজটি খুলতেই দেখা গেল, সেখানে লেখা—
“A.R.-03 seal must remain with the original record.”
নীরা লেখাটি পড়ে থমকে গেল।
—এটা তো আজহার রহমানের ব্যক্তিগত সিল!
আবদুস সালাম বললেন,
—হ্যাঁ। পরে যখন আপনারা এ-আর-০৩ সিলের কথা বললেন, তখন আমার সেই কাগজটির কথা মনে পড়ে।
আরিয়ান কাগজটি হাতে নিয়ে বলল,
—এই সিলটি মূল কপির সঙ্গে থাকার কথা ছিল?
—নোটে সেটাই লেখা।
নীরা বলল,
—কিন্তু নাসিমা বেগমের কাছে যে সি-১৪-এর কপিটি পাওয়া গেছে, সেটিতেও তো এ-আর-০৩ সিল রয়েছে।
আবদুস সালাম বললেন,
—তাহলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল। কারণ আমি যতটুকু বুঝি, সিলটি মূল নথির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করা হতো।
আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
—কিন্তু সিল থাকলেই কাগজটি মূল কপি প্রমাণ হয় না।
—ঠিক বলেছেন।
একটি অসম্পূর্ণ নির্দেশনা
আবদুস সালাম এবার ডায়েরির শেষের দিকে একটি পৃষ্ঠা খুললেন।
সেখানে কয়েকটি তারিখ লেখা।
১৭ সেপ্টেম্বর ২০০৮।
১৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮।
১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৮।
তার নিচে আরও একটি তারিখ—
১৭ অক্টোবর ২০০৮।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—আপনি ১৭ অক্টোবরের কথাও লিখেছেন?
—হ্যাঁ। সেদিন একটি নতুন নির্দেশনা এসেছিল।
আরিয়ান বলল,
—কী নির্দেশনা?
আবদুস সালাম কাগজটি পড়লেন।
“Previous verification remains incomplete. P-07 temporary status continues. Final custodian confirmation required.”
নীরা বলল,
—অর্থাৎ ১৭ অক্টোবরেও পি-০৭-এর দায়িত্ব অস্থায়ী ছিল?
—হ্যাঁ। চূড়ান্ত দায়িত্ব তখনো নিশ্চিত হয়নি।
আরিয়ান কিছুক্ষণ কাগজটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—তাহলে ১৮ অক্টোবরের রসিদে যে এস. রহমানের নাম পাওয়া গেছে, সেটা হয়তো চূড়ান্ত হস্তান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আবদুস সালাম বললেন,
—হতে পারে। কিন্তু রসিদ না দেখে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।
নীরা বলল,
—আমাদের কাছে সেই রসিদ আছে। শাহেদ রহমান সেটি দিয়েছেন।
আবদুস সালাম কাগজটি দেখতে চাইলেন।
নীরা ব্যাগ থেকে ফটোকপিটি বের করে তাঁর সামনে রাখল।
তিনি ধীরে ধীরে পড়লেন।
তারপর বললেন,
—এখানে একটা বিষয় খেয়াল করেছেন?
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—কোনটি?
—এখানে গ্রহণকারীর নামের জায়গায় এস. রহমান লেখা হয়েছে। কিন্তু মূল নথির দায়িত্ব চূড়ান্তভাবে হস্তান্তরের কোনো উল্লেখ নেই।
নীরা বলল,
—তাহলে এই রসিদ শুধু কোনো কাগজ গ্রহণের প্রমাণ?
—ঠিক তাই। এটা দিয়ে প্রমাণ হয় না যে সি-১৪-এর মূল কপিও হস্তান্তর করা হয়েছিল।
আরিয়ান ধীরে মাথা নাড়ল।
—এতদিন আমরা যেটাকে চূড়ান্ত হস্তান্তরের প্রমাণ ভাবছিলাম, সেটি আসলে শুধু একটি খামের গ্রহণের রসিদও হতে পারে।
আবদুস সালাম বললেন,
—কাগজের ভাষা ভালোভাবে পড়তে হয়। অনেক সময় একটি শব্দের পার্থক্য পুরো ঘটনার অর্থ বদলে দেয়।
শেষ সূত্র
নীরা উঠে দাঁড়ানোর আগে আরেকটি প্রশ্ন করল।
—আবদুস সালাম সাহেব, আপনি কি জানেন, ২০০৮ সালের সেই বৈঠকে আর কে উপস্থিত ছিলেন?
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—একজন সিনিয়র ব্যক্তির কথা মনে আছে। তিনি বৈঠকে খুব বেশি কথা বলেননি। কিন্তু মাহমুদ সাহেব যখন একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, “এখন সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতে অনেক সমস্যা হবে।”
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—তিনি কি পরিবারের কেউ ছিলেন?
—আমি নিশ্চিত নই।
নীরা বলল,
—তাঁর নাম মনে আছে?
আবদুস সালাম মাথা নাড়লেন।
—না। তবে তাঁর হাতে একটি আংটি ছিল। নীল পাথর বসানো।
নীরা ও আরিয়ান একে অপরের দিকে তাকাল।
নীল পাথরের আংটি!
এই আংটির কথা তারা আগেও শুনেছে।
সালেহ রহমানের কাছে থাকা আংটিটি।
যেটিকে আজহার রহমানের ট্রাস্ট কিপারের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।
কিন্তু নীরা সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলল না।
কারণ শুধু আংটির বর্ণনা দিয়ে কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
আরিয়ান বলল,
—আপনি কি নিশ্চিত, আংটিটি নীল পাথরের ছিল?
—হ্যাঁ। বেশ বড় একটি পাথর ছিল।
নীরা ধীরে বলল,
—তাহলে আমাদের সালেহ সাহেবের সঙ্গে আবার কথা বলতে হবে।
আবদুস সালাম মাথা নাড়লেন।
—আপনারা তাঁর সঙ্গে কথা বলুন। হয়তো তিনি জানেন, সেই সময় আংটিটি কার হাতে ছিল।
অফিসে ফেরার পথে
গাড়ির জানালার বাইরে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে।
নীরা চুপচাপ বসে আছে।
আরিয়ান গাড়ি চালাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর নীরা বলল,
—আজ অনেক কিছু পরিষ্কার হলো।
আরিয়ান বলল,
—কী কী?
—প্রথমত, আবদুস সালাম পি-০৭ নন। তিনি ছিলেন শুধু যাচাইয়ের কাজে যুক্ত এ-০৯।
—ঠিক।
—দ্বিতীয়ত, সি-১৪-এর মূল কপি ১৭ সেপ্টেম্বর জহির সাহেবের কাছে ছিল। পরে সেটি আলাদা করে রাখা হয়েছিল।
—হ্যাঁ।
—তৃতীয়ত, ১৭ অক্টোবরেও পি-০৭-এর দায়িত্ব চূড়ান্ত হয়নি।
আরিয়ান বলল,
—আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা এখনো জানি না মূল কপিটি শেষ পর্যন্ত কার কাছে ছিল।
নীরা জানালার বাইরে তাকাল।
—কখনো কখনো মনে হয়, সবাই সত্যের একটা অংশ জানে। কিন্তু কেউ পুরোটা জানে না।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—হয়তো সবাই পুরোটা জানে না। আবার কেউ কেউ জানলেও এতদিন বলতে চায়নি।
নীরা তার দিকে তাকাল।
—তুমি কি মনে করো, কেউ ইচ্ছা করে আমাদের কাছ থেকে সত্য লুকাচ্ছে?
আরিয়ান উত্তর দিল,
—আমি এখন কাউকে সন্দেহ করতে চাই না। আগে প্রমাণগুলো একসঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চাই।
নীরা মৃদু স্বরে বলল,
—তোমার এই একটা ব্যাপার আমার ভালো লাগে।
আরিয়ান চোখ না সরিয়েই বলল,
—কোন ব্যাপার?
—তুমি রাগের মাথায় কাউকে অপরাধী বানিয়ে ফেলো না।
আরিয়ান হালকা হাসল।
—কারণ একটা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ইতিমধ্যে অনেক মানুষের জীবন নষ্ট হয়েছে। আমি আরেকটা ভুল করতে চাই না।
নীরা আর কিছু বলল না।
তার মনে পড়ে গেল বাবার দীর্ঘদিনের অপমান, মায়ের নীরব কষ্ট, আর সেই পুরোনো ঘটনার কারণে ভেঙে যাওয়া সম্পর্কগুলো।
সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এবার সত্যের শেষ পর্যন্ত পৌঁছাবে।
রাতের অপ্রত্যাশিত ফোন
রাত ১০টা ৪০ মিনিট।
নীরা নিজের ঘরে বসে ডায়েরিতে দিনের ঘটনাগুলো লিখছিল।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠল—
সালেহ রহমান।
নীরা দ্রুত কল রিসিভ করল।
—হ্যালো, সালেহ চাচা?
ওপাশ থেকে সালেহ রহমানের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল।
—নীরা, তুমি কি আজ আবদুস সালামের সঙ্গে দেখা করেছ?
নীরা অবাক হলো।
—হ্যাঁ। কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে?
—আরিয়ান আমাকে ফোন করেছিল।
—ওহ, বুঝেছি।
সালেহ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—আবদুস সালাম কি নীল পাথরের আংটির কথা বলেছে?
নীরা বিস্মিত হয়ে উঠে বসল।
—হ্যাঁ! আপনি কীভাবে জানলেন?
সালেহ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—কারণ সেই আংটিটি শুধু আমার কাছে ছিল না।
নীরার বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।
—মানে?
—আজহার রহমানের মৃত্যুর পর আংটিটি কিছুদিনের জন্য অন্য একজনের কাছে রাখা হয়েছিল।
—কার কাছে?
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর সালেহ বললেন,
—আমি তখন ভেবেছিলাম, সে শুধু আংটিটি সংরক্ষণ করবে। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম, আংটির সঙ্গে থাকা একটি ছোট নথিও তার কাছে ছিল।
নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
—কোন নথি?
সালেহ ধীরে বললেন,
—পি-০৭-এর পরিচয় সংক্রান্ত নথি।
নীরা আর অপেক্ষা করতে পারল না।
—চাচা, সেই মানুষটির নাম কী?
সালেহের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল।
—নামটা বলার আগে তোমাকে একটা বিষয় বুঝতে হবে। সে কখনো নিজের নামে কোনো নথি গ্রহণ করেনি। সবকিছু করা হয়েছিল অন্য একটি পরিচয়ের মাধ্যমে।
নীরা বলল,
—তাহলে তার আসল পরিচয় কীভাবে জানব?
সালেহ উত্তর দিলেন,
—পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের ০৩ নম্বর আর্কাইভ রুমে একটি রেজিস্টার আছে। সেখানে শুধু তার নাম নয়, তার স্বাক্ষরও রয়েছে।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—কিন্তু ০৩ নম্বর রুমের চাবি তো আপনার কাছে ছিল!
—হ্যাঁ। আর সেই চাবি আমি তোমাদের দিয়েছি।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তাহলে আমরা এতদিন যে রুমে খুঁজেছি, সেই রুমেই উত্তরটা লুকিয়ে আছে?
সালেহ ধীরে বললেন,
—হয়তো। কিন্তু একটা সতর্কতা আছে।
—কী সতর্কতা?
—রেজিস্টারের শেষ পাতাটি অন্য পাতাগুলোর মতো নয়। সেখানে এমন একটি স্বাক্ষর রয়েছে, যেটি দেখলে তোমরা হয়তো নিজেদের পরিচিত একজন মানুষকেই নতুন করে চিনতে বাধ্য হবে।
নীরার হাতের কলমটি থেমে গেল।
—পরিচিত একজন মানুষ?
—হ্যাঁ।
—কে তিনি?
সালেহ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
—সেটা রেজিস্টার দেখলেই বুঝবে।
কল কেটে গেল।
নীরা কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর দ্রুত আরিয়ানকে ফোন করল।
দ্বিতীয়বার রিং হতেই আরিয়ান ফোন ধরল।
—হ্যালো, নীরা?
নীরা উত্তেজিত গলায় বলল,
—আরিয়ান, আমাদের আবার পুরোনো ট্রাস্ট অফিসে যেতে হবে।
—কেন? নতুন কিছু পেয়েছ?
—সালেহ চাচা ফোন করেছিলেন। তিনি বলেছেন, ০৩ নম্বর আর্কাইভ রুমে পি-০৭-এর পরিচয় সংক্রান্ত রেজিস্টার রয়েছে।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আর কী বলেছেন?
নীরা ধীরে উত্তর দিল,
—রেজিস্টারের শেষ পাতায় এমন একজনের স্বাক্ষর আছে, যাকে আমরা সবাই চিনি।
আরিয়ান এবার গম্ভীর হয়ে গেল।
—কাল সকালেই যাব।
নীরা ফোন রেখে জানালার বাইরে তাকাল।
রাতের আকাশে মেঘ জমেছে।
তার মনে হলো, দীর্ঘ আঠারো বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি দরজা হয়তো এবার সত্যিই খুলতে চলেছে।
কিন্তু সেই দরজার ওপারে কী অপেক্ষা করছে?
একজন পুরোনো বিশ্বস্ত মানুষ?
নাকি এমন এক সত্য, যা এতদিন সবাইকে অন্ধকারে রেখেছিল?
নীরা জানত না।
তবে এবার সে আর পিছিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিল না।
কারণ এই রহস্যের সঙ্গে শুধু একটি নথির সম্পর্ক নেই।
জড়িয়ে আছে তার বাবার হারিয়ে যাওয়া সম্মান, আজহার রহমানের শেষ ইচ্ছা এবং এমন কিছু মানুষের নীরবতা, যাদের ওপর একসময় সবাই বিশ্বাস করেছিল।
চলবে...
পর্ব ৮৪ সমাপ্ত।