শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
পর্ব ৮৫: শেষ পাতার স্বাক্ষর
লেখক: Mafiya Queen 👑
সকাল ৮টা ১৫ মিনিট।
নীরা আজ অন্য দিনের তুলনায় একটু আগেই ঘুম থেকে উঠেছে।
রাতের সালেহ রহমানের ফোনকলটি তার মাথা থেকে কিছুতেই সরছে না।
পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের ০৩ নম্বর আর্কাইভ রুম।
সেই রুমের শেষ পাতায় এমন একজনের স্বাক্ষর রয়েছে, যাকে তারা সবাই চেনে।
কিন্তু কে সেই মানুষ?
রাশেদ রহমান?
মাহমুদ রহমান?
নাকি এমন কেউ, যার নাম এখনো তাদের অনুসন্ধানে আসেনি?
নীরা বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে দাঁড়াল।
আজ তাকে উত্তর খুঁজতেই হবে।
সকাল ৯টা — আরিয়ানের ফোন
নীরা নাশতা শেষ করে ব্যাগ গোছাচ্ছিল। ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
—হ্যালো?
—তুমি তৈরি?
আরিয়ানের কণ্ঠ।
—হ্যাঁ। বের হওয়ার জন্যই প্রস্তুত হচ্ছি।
—আমি নিচে অপেক্ষা করছি।
—এত তাড়াতাড়ি?
—আজকের কাজটা গুরুত্বপূর্ণ।
নীরা হালকা হাসল।
—বুঝেছি। আসছি।
ফোন রেখে নীরা মায়ের কাছে গেল।
—মা, আমি বের হচ্ছি।
মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আজও সেই পুরোনো কাগজপত্রের খোঁজে?
—হ্যাঁ মা। হয়তো আজ গুরুত্বপূর্ণ কিছু পাওয়া যাবে।
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—তোর বাবা সকালে বেরিয়েছে। বলেছে, প্রয়োজনে যেন তাকে ফোন করিস।
নীরা মাথা নাড়ল।
—ঠিক আছে।
বের হওয়ার আগে মা আবার বললেন,
—সাবধানে থাকিস।
নীরা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
—চিন্তা কোরো না।
পুরোনো ট্রাস্ট অফিস
সকাল ১০টা ১০ মিনিট।
পুরোনো ভবনটির সামনে গাড়ি থামল।
বহু বছর ধরে অবহেলায় পড়ে থাকা ভবনটি এখনো যেন অতীতের কোনো গল্প বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নীরা গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে তাকাল।
—জায়গাটা দেখলেই কেমন অদ্ভুত লাগে।
আরিয়ান বলল,
—কারণ এই জায়গার প্রতিটি ঘরের সঙ্গে আমাদের পরিবারের পুরোনো ইতিহাস জড়িয়ে আছে।
—কিন্তু এত বছরেও কেউ কেন সবকিছু পরিষ্কার করেনি?
—সম্ভবত সবাই ভেবেছে, সময়ের সঙ্গে পুরোনো ঘটনা হারিয়ে যাবে।
নীরা বলল,
—কিন্তু কিছু ঘটনা সময়ের সঙ্গে হারায় না। বরং আরও বেশি প্রশ্ন রেখে যায়।
আরিয়ান তার কথার উত্তর দিল না।
দুজন ভেতরে প্রবেশ করল।
সেখানে রাফি আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল।
তার হাতে কয়েকটি পুরোনো কাগজ এবং একটি ছোট টর্চ।
—স্যার, সালেহ সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, ০৩ নম্বর রুমের চাবিটি আগের জায়গাতেই থাকার কথা।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে চলো।
০৩ নম্বর আর্কাইভ রুম
পুরোনো করিডোরের একেবারে শেষ প্রান্তে রুমটি।
দরজার ওপর ছোট একটি ধাতব প্লেটে লেখা—
ARCHIVE ROOM — 03
রাফি দরজার তালা পরীক্ষা করল।
—স্যার, তালাটা এখনো ঠিক আছে।
আরিয়ান পকেট থেকে চাবি বের করল।
কয়েক সেকেন্ডের চেষ্টায় তালাটি খুলে গেল।
দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে পুরোনো কাগজের গন্ধ বেরিয়ে এল।
ঘরের মধ্যে কয়েকটি কাঠের আলমারি, লোহার তাক এবং একটি বড় টেবিল।
দেয়ালের পাশে একটি পুরোনো ঘড়ি।
নীরা ধীরে ঘরে প্রবেশ করল।
—এখানে তো অনেক ফাইল!
রাফি বলল,
—সব ফাইলের তারিখ অনুযায়ী তালিকা করা আছে। আমাদের ২০০৮ সালের রেকর্ডগুলো খুঁজতে হবে।
আরিয়ান ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলল,
—প্রথমে ট্রাস্ট রেজিস্টার খুঁজে বের করো।
তিনজন আলাদা আলাদা তাক পরীক্ষা করতে শুরু করল।
প্রায় বিশ মিনিট পর নীরা একটি পুরোনো কাঠের ড্রয়ারের সামনে থামল।
ড্রয়ারের গায়ে লেখা—
PRIVATE TRUST RECORDS — 2008
নীরা ডাকল,
—আরিয়ান!
আরিয়ান এগিয়ে এল।
—কী পেয়েছ?
—এই ড্রয়ারটা দেখো।
রাফি ড্রয়ারটি খুলল।
ভেতরে কয়েকটি মোটা রেজিস্টার।
প্রথম রেজিস্টারের মলাটে লেখা—
SPECIAL DOCUMENT REGISTER
আরিয়ান সেটি হাতে নিল।
—সম্ভবত এটাই।
নীরা বলল,
—খুলে দেখো।
পি-০৭-এর নাম
রেজিস্টারের প্রথম কয়েকটি পাতা ছিল সাধারণ হিসাবের।
কোন নথি কখন এসেছে, কে গ্রহণ করেছে, কোথায় রাখা হয়েছে—এসব তথ্য লেখা।
তারপর একটি পাতায় সি-১৪-এর উল্লেখ পাওয়া গেল।
নীরা দ্রুত পড়তে শুরু করল।
Document Code: C-14
Original Received: 17 September 2008
Temporary Holder: P-07
Verification Contact: A-09
Final Custodian: Pending
আরিয়ান বলল,
—এটা আবদুস সালামের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
নীরা মাথা নাড়ল।
—অর্থাৎ তিনি সত্যিই শুধু যাচাইয়ের কাজে যুক্ত ছিলেন।
রাফি বলল,
—স্যার, এর পরের পাতাটাও দেখুন।
পরের পাতায় লেখা—
18 September 2008
“Temporary preservation continued. Original document not transferred to general archive.”
নীরা বলল,
—এখানেও মূল কপি সাধারণ আর্কাইভে জমা দেওয়া হয়নি।
আরিয়ান বলল,
—কারণ সেটি পি-০৭-এর কাছে থাকার কথা ছিল।
নীরা পরের পাতা উল্টাল।
কিন্তু সেখানে কিছু লেখা নেই।
শুধু নিচে একটি ছোট সিল।
A.R.-03
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—আবার সেই সিল!
আরিয়ান কাগজটি পরীক্ষা করল।
—এই সিলটি সম্ভবত নথিটির ব্যক্তিগত ট্রাস্ট অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
রাফি বলল,
—স্যার, রেজিস্টারের শেষ পাতায় কিছু লেখা আছে।
তিনজন একসঙ্গে শেষ পাতার দিকে তাকাল।
শেষ পাতার স্বাক্ষর
শেষ পাতাটি অন্য পাতার তুলনায় একটু আলাদা।
কাগজটি সাদা নয়, হালকা হলদে।
তার ওপর একটি ছোট শিরোনাম—
CONFIDENTIAL CUSTODY RECORD
নীরা ধীরে ধীরে পড়তে লাগল।
“The person holding P-07 shall remain unnamed in the general register until the final confirmation is completed.”
তার নিচে লেখা—
“The temporary holder was personally trusted by A.R. and was instructed to preserve the original document without altering or replacing any page.”
আরও নিচে একটি স্বাক্ষর।
নীরা প্রথমে স্বাক্ষরটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ তার মুখের ভাব বদলে গেল।
—এটা...
আরিয়ান তার দিকে তাকাল।
—কী হয়েছে?
নীরা কাঁপা গলায় বলল,
—এই স্বাক্ষরটা আমি চিনি।
আরিয়ান কাগজটি নিজের হাতে নিল।
স্বাক্ষরটি ভালো করে দেখল।
কয়েক সেকেন্ড পর তার চোখও বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
স্বাক্ষরটি ছিল—
রাশেদ রহমান।
নীরা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।
—বাবার স্বাক্ষর!
রাফি অবাক হয়ে বলল,
—কিন্তু রাশেদ সাহেব তো আগেই বলেছিলেন, তিনি সি-১৪-এর দ্বিতীয় কপিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেছিলেন।
আরিয়ান বলল,
—এখানে বিষয়টি একটু আলাদা। এটা সি-১৪-এর অনুমোদনপত্র নয়। এটা একটি গোপন রেজিস্টারের স্বাক্ষর।
নীরা দ্রুত বলল,
—তাহলে বাবা কি পি-০৭-এর পরিচয় জানতেন?
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—সম্ভবত জানতেন। কিন্তু এই স্বাক্ষরটি কখন করা হয়েছে, সেটি আগে যাচাই করতে হবে।
নীরা বলল,
—বাবা আমাদের কাছে এতদিন এটা বলেননি কেন?
আরিয়ান উত্তর দিল না।
সে কাগজটির নিচে লেখা তারিখ পরীক্ষা করল।
19 September 2008.
নীরা ফিসফিস করে বলল,
—এটা তো সেই দিন, যেদিন জহির সাহেব মূল কপিটি আলাদা করেছিলেন।
আরিয়ান বলল,
—হ্যাঁ। একই দিনে জাহিদুল ইসলামের কাছে একটি সিল করা ফাইলও দেওয়া হয়েছিল।
রাফি বলল,
—তাহলে কি রাশেদ সাহেবই পি-০৭?
আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—এখনই এমন সিদ্ধান্তে আসবে না। এই স্বাক্ষর প্রমাণ করে তিনি এই নথি সম্পর্কে কিছু জানতেন। কিন্তু তিনি নিজেই অস্থায়ী ধারক ছিলেন, সেটা প্রমাণ করে না।
নীরা ধীরে মাথা নাড়ল।
কিন্তু তার ভেতরে প্রশ্নের ঝড় থামছিল না।
বাবার সঙ্গে মুখোমুখি
দুপুর ১২টা ৪০ মিনিট।
রাশেদ রহমান বাড়িতে ছিলেন।
নীরা ফোন করে জানিয়েছিল, তার জরুরি কথা আছে।
আরিয়ানও সঙ্গে এসেছে।
রাশেদ তাদের বসতে বললেন।
—কী হয়েছে? তোমাদের দুজনকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?
নীরা ব্যাগ থেকে কাগজটি বের করল।
—বাবা, এটা দেখো।
রাশেদ কাগজটি হাতে নিলেন।
স্বাক্ষরটি দেখেই তাঁর মুখের ভাব পাল্টে গেল।
কিছুক্ষণ তিনি কোনো কথা বললেন না।
তারপর ধীরে বললেন,
—তোমরা এটা কোথায় পেয়েছ?
আরিয়ান উত্তর দিল,
—পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের ০৩ নম্বর আর্কাইভ রুমে।
রাশেদ আবার কাগজটির দিকে তাকালেন।
নীরা বলল,
—বাবা, তুমি কি পি-০৭ সম্পর্কে জানতে?
রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—হ্যাঁ। জানতাম।
নীরা অবাক হয়ে গেল।
—তাহলে এতদিন আমাদের বলোনি কেন?
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—কারণ আমি জানতাম না, সেই মানুষটি শেষ পর্যন্ত কী করেছিলেন। আর শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে কারও নাম বলা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—এই স্বাক্ষরটি কি আপনার?
—হ্যাঁ।
—আপনি কেন স্বাক্ষর করেছিলেন?
রাশেদ ধীরে বললেন,
—১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৮-এ আজহার রহমানের একটি নির্দেশনা আমাকে দেখানো হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, সি-১৪-এর মূল কপি এমন একজনের কাছে থাকবে, যিনি পরিবারের সদস্য নন, কিন্তু পরিবারের পুরোনো নথি সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন।
নীরা বলল,
—তাহলে আপনি সেই মানুষটিকে চিনতেন?
রাশেদ মাথা নাড়লেন।
—চিনতাম।
ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল।
নীরা বাবার কাছে এগিয়ে এল।
—কে ছিলেন তিনি?
রাশেদ চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবলেন।
তারপর বললেন,
—তোমরা যে মানুষটিকে খুঁজছ, সে একসময় আমাদের পরিবারের খুব কাছের ছিল। কিন্তু তার কাজের পরিচয় ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
আরিয়ান বলল,
—আপনি কি তার নাম বলতে পারবেন?
রাশেদ উত্তর দিলেন,
—পারব। তবে তার আগে তোমাদের আরেকটি বিষয় জানতে হবে।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—কী বিষয়?
রাশেদ বললেন,
—আমি যখন এই কাগজে স্বাক্ষর করি, তখন আমাকে বলা হয়েছিল, পি-০৭-এর কাছে শুধু সি-১৪-এর মূল কপি থাকবে না। তার কাছে আরও একটি নথি থাকবে।
আরিয়ান বলল,
—কোন নথি?
রাশেদ ধীরে উত্তর দিলেন,
—আজহার রহমানের ব্যক্তিগত নির্দেশনা। যে নির্দেশনায় লেখা ছিল, সি-১৪-এর সত্যতা যাচাইয়ের আগে কোনো অবস্থাতেই দ্বিতীয় কপিকে চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করা যাবে না।
নীরা বলল,
—সেই নির্দেশনাটি এখন কোথায়?
রাশেদ মাথা নাড়লেন।
—আমি জানি না।
আরেকটি অপ্রত্যাশিত নাম
রাশেদ কিছুক্ষণ পর নিজের ঘরে গেলেন।
ফিরে এসে একটি পুরোনো খাম টেবিলের ওপর রাখলেন।
—এটা এতদিন আমার কাছে ছিল।
নীরা খামটি হাতে নিল।
খামের ওপর লেখা—
For P-07 — Not to be opened by any other person.
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—এটা কি আজহার রহমানের লেখা?
রাশেদ বললেন,
—হ্যাঁ। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে আমাকে এটি দেওয়া হয়েছিল।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—আপনি খুলে দেখেননি?
—না। আমাকে বলা হয়েছিল, এটা যার জন্য লেখা, কেবল তাকেই দিতে হবে।
নীরা খামের দিকে তাকিয়ে বলল,
—কিন্তু এখন তো আমরা জানি না, পি-০৭ কে।
রাশেদ ধীরে বললেন,
—সেই কারণেই এতদিন খামটি নিজের কাছে রেখেছি।
আরিয়ান বলল,
—খামটি কি আমাদের কাছে রাখা যাবে? আমরা এটি নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চাই।
রাশেদ কিছুক্ষণ ভেবে খামটি তার হাতে দিলেন।
—নাও। তবে মনে রেখো, এটা শুধু একটা পুরোনো চিঠি নয়। এর সঙ্গে আজহারের শেষ ইচ্ছা জড়িয়ে আছে।
নীরা খামটি ব্যাগে রাখল।
তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
—বাবা, তুমি বলেছিলে তুমি পি-০৭-কে চিনতে। এবার অন্তত তার নামটা বলো।
রাশেদ কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
—তোমরা হয়তো নামটি শুনে অবাক হবে।
নীরা অপেক্ষা করল।
রাশেদ বললেন,
—পি-০৭-এর সঙ্গে যিনি যুক্ত ছিলেন, তিনি আমাদের পুরোনো পরিবারের বাইরের কেউ ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন একজন, যিনি বহু বছর ধরে আমাদের পরিবারের বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন।
আরিয়ান বলল,
—আপনি কি তাঁর নাম বলতে চাইছেন না?
রাশেদ উত্তর দিলেন,
—না। আমি শুধু নিশ্চিত হতে চাই, তোমরা যে রেজিস্টার পেয়েছ, সেটার শেষ পাতাটি আসল কি না।
নীরা বলল,
—কিন্তু বাবার স্বাক্ষর তো আসল!
রাশেদ মাথা নাড়লেন।
—আমার স্বাক্ষর আসল। কিন্তু রেজিস্টারের বাকি অংশ পরে সংযোজন করা হয়েছে কি না, সেটা আমি জানি না।
আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আপনি বলতে চাইছেন, কেউ হয়তো আপনার স্বাক্ষর থাকা পুরোনো পাতার সঙ্গে নতুন তথ্য যুক্ত করেছে?
—ঠিক তাই।
নীরা স্তব্ধ হয়ে গেল।
অর্থাৎ তাদের হাতে থাকা রেজিস্টারটিও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।
রাতের নতুন রহস্য
সেদিন রাতে নীরা ও আরিয়ান আবার রয়্যাল হোল্ডিংসের কেবিনে বসেছিল।
রাশেদের দেওয়া খামটি টেবিলের ওপর রাখা।
আরিয়ান বলল,
—খামটি খোলার আগে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে, এটা আসলেই আজহার রহমানের লেখা কি না।
নীরা বলল,
—সালেহ চাচার কাছে তাঁর পুরোনো হাতের লেখার নমুনা আছে। মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।
—ঠিক বলেছ।
রাফি ঘরে প্রবেশ করল।
তার হাতে একটি নতুন ফাইল।
—স্যার, আপনার নির্দেশ অনুযায়ী পুরোনো রেজিস্টারের কপিগুলো মিলিয়ে দেখেছি।
আরিয়ান বলল,
—কী পেয়েছ?
রাফি ফাইলটি টেবিলে রাখল।
—একটা সমস্যা আছে।
নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
—কী সমস্যা?
—০৩ নম্বর আর্কাইভ রুমের রেজিস্টারের শেষ পাতাটি যে তারিখে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, সেই তারিখের মূল ইনডেক্সে পাতাটির কোনো উল্লেখ নেই।
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
—মানে?
—মূল ইনডেক্সে রেজিস্টারটির মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪৭ লেখা। কিন্তু বর্তমানে যে রেজিস্টারটি আমরা পেয়েছি, তাতে ৪৮টি পৃষ্ঠা রয়েছে।
নীরা ধীরে বলল,
—অর্থাৎ শেষ পাতাটি পরে যুক্ত করা হয়েছে?
রাফি বলল,
—সম্ভাবনা আছে। তবে পাতাটি কখন যুক্ত করা হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি।
আরিয়ান কাগজগুলো পরীক্ষা করল।
তারপর বলল,
—তাহলে আমাদের পরের কাজ হবে শেষ পাতার কাগজ, কালি এবং সংরক্ষণের তারিখ যাচাই করা।
নীরা বলল,
—আর বাবার স্বাক্ষরটি যে পাতায় আছে, সেটি আসল কি না সেটাও।
রাফি মাথা নাড়ল।
হঠাৎ নীরার ফোনে একটি মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
মেসেজে লেখা—
“আপনারা ভুল পাতায় পি-০৭-কে খুঁজছেন। শেষ পাতার স্বাক্ষরটি আসল, কিন্তু সেখানে লেখা পরিচয়টি সম্পূর্ণ নয়। আসল রেকর্ডটি এখনো ০৩ নম্বর আর্কাইভের ভেতরেই আছে।”
নীরা মেসেজটি আরিয়ানকে দেখাল।
আরিয়ান কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে পড়ল।
তারপর বলল,
—এই নম্বরটি কার?
নীরা উত্তর দিল,
—জানি না।
রাফি নম্বরটি পরীক্ষা করার জন্য ফোন বের করল।
কিন্তু তার আগেই আরেকটি মেসেজ এল।
“এবার রেজিস্টারের ১৭ নম্বর পাতাটি দেখুন। সেখানে এমন একটি নাম আছে, যা আপনারা এখনো খুঁজে পাননি।”
নীরা স্থির হয়ে গেল।
আরিয়ান ধীরে বলল,
—১৭ নম্বর পাতা!
রাফি সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো রেজিস্টারটি বের করল।
তিনজন মিলে ১৭ নম্বর পাতাটি খুলল।
সেখানে লেখা ছিল—
“Special Custody Reference — 2008.”
তার নিচে একটি নামের প্রথম অংশ স্পষ্ট।
কিন্তু শেষ অংশটি কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
নীরা কাগজটি আলোতে ধরল।
ঢেকে দেওয়া নামটির নিচে খুব ক্ষীণভাবে আরও একটি লেখা দেখা গেল।
“N. Begum.”
নীরা বিস্ময়ে আরিয়ানের দিকে তাকাল।
—নাসিমা বেগম!
আরিয়ান ধীরে বলল,
—তাহলে নাসিমা বেগমের সঙ্গে পি-০৭-এর কোনো সম্পর্ক ছিল?
রাফি বলল,
—কিন্তু তিনি তো আগেই বলেছেন, তিনি শুধু সি-১৪-এর দ্বিতীয় কপি পেয়েছিলেন।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—আমাদের আবার নাসিমা বেগমের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ। তবে এবার শুধু সি-১৪ নিয়ে নয়। ১৭ নম্বর পাতার এই নাম নিয়েও।
নীরা জানালার বাইরে তাকাল।
একটি বিষয় এখন স্পষ্ট—
তাদের হাতে থাকা কোনো তথ্যই পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক নয়।
কিন্তু প্রতিটি তথ্যের সঙ্গে এমন কিছু অস্পষ্ট অংশ জড়িয়ে আছে, যা সত্যকে আরও জটিল করে তুলছে।
পি-০৭ কে?
নাসিমা বেগম কি শুধু একটি কপি পেয়েছিলেন, নাকি তাঁর কাছে আরও কোনো দায়িত্ব ছিল?
রাশেদ রহমান কেন নিজের স্বাক্ষর থাকা সত্ত্বেও শেষ পাতাটির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ করছেন?
আর অচেনা নম্বর থেকে বারবার কে তাদের সঠিক পাতার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে?
নীরা বুঝতে পারল, রহস্যের পরবর্তী দরজাটি এবার নাসিমা বেগমের কাছেই খুলতে হবে।
চলবে...
পর্ব ৮৫ সমাপ্ত।