শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
পর্ব ৮৭: শেষ অনুমতিপত্র
লেখক: Mafiya Queen 👑
পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের ঘরটায় তখনও অদ্ভুত নীরবতা।
টেবিলের ওপর খোলা অবস্থায় পড়ে আছে কালো মলাটের রেজিস্টার—Private Custody Register — 17।
নীরা বারবার সেই ছেঁড়া অংশটার দিকে তাকাচ্ছিল।
১৮ অক্টোবর ২০০৮।
চূড়ান্ত দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়েছে।
গ্রহণকারীর নামের বেশিরভাগ অংশ ছেঁড়া। শুধু একটি অক্ষর স্পষ্ট—
M...
নীরা ধীরে বলল,
—একটা অক্ষর দিয়ে মানুষকে খুঁজে বের করা সম্ভব?
আরিয়ান রেজিস্টারটা বন্ধ না করেই বলল,
—সম্ভব, যদি অক্ষরটার সঙ্গে অন্য কোনো তথ্য মিলে যায়।
—কিন্তু আমাদের কাছে তো শুধু M আছে।
—না। আমাদের কাছে তারিখ আছে, অনুমতিপত্রের নম্বর আছে, আর আছে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
—কী?
আরিয়ান রেজিস্টারের শেষ লাইনটা দেখাল।
—এখানে লেখা, চূড়ান্ত দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়েছে আলাদা অনুমতিপত্রের মাধ্যমে। অর্থাৎ শুধু এই রেজিস্টার দেখে নাম জানা যাবে না। আসল অনুমতিপত্রটা খুঁজতে হবে।
রাফি পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—স্যার, A-17/18-10 নম্বরের কোনো ফাইল কি সাধারণ আর্কাইভে থাকার কথা?
আরিয়ান মাথা নাড়ল।
—থাকার কথা। কিন্তু সেটা সাধারণ নথি হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছিল কি না, সেটাই প্রশ্ন।
নীরা বলল,
—আমরা কি আবার জিহির সাহেবের কাছে যাব?
—যাব। তবে তার আগে অন্য একটা কাজ করতে হবে।
—কী কাজ?
আরিয়ান নিজের ফোন বের করল।
—পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের নথি সংরক্ষণের তালিকা সংগ্রহ করতে হবে। ২০০৮ সালে কোন নথি কোথায় রাখা হয়েছিল, সেটা জানা দরকার।
১. পুরোনো তালিকার নতুন পৃষ্ঠা
পরদিন সকাল।
রয়্যাল হোল্ডিংসের কনফারেন্স রুমে নীরা, আরিয়ান ও রাফি বসে আছে।
টেবিলের ওপর কয়েকটি পুরোনো নথির ফটোকপি।
রাফি বলল,
—আমি গত রাতেই আর্কাইভের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, ২০০৮ সালের কিছু সংরক্ষণ তালিকা এখনো আছে। তবে সেগুলো আলাদা আলাদা খাতায় রাখা।
আরিয়ান বলল,
—A-17 নম্বরের নথি কোন খাতায় থাকতে পারে?
—দুটি সম্ভাবনা আছে। Special Authorization Register অথবা Private Document Dispatch Register।
নীরা বলল,
—তাহলে দুটোই দেখতে হবে।
আরিয়ান তার দিকে তাকাল।
—তোমার মনে হচ্ছে অনুমতিপত্রটা সেখানে আছে?
—নিশ্চিত নই। কিন্তু যদি ১৮ অক্টোবর সত্যিই চূড়ান্ত দায়িত্ব হস্তান্তর হয়ে থাকে, তাহলে তার একটা প্রেরণ বা গ্রহণের রেকর্ড থাকার কথা।
রাফি সম্মতি জানাল।
—ঠিক বলেছেন। অনুমতিপত্র তৈরি হলে অন্তত একটা রেফারেন্স থাকার কথা।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে আজই আর্কাইভে যাব।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আরিয়ান, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—করো।
—তোমার কি কখনো মনে হয়, আমরা যতই সামনে এগোচ্ছি, ততই নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে?
আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
—হয়।
—তাহলে এতদিনের তদন্তের শেষ কোথায়?
—যেদিন আমরা অনুমান নয়, প্রমাণ নিয়ে বসতে পারব।
নীরা আর কিছু বলল না।
তার কাছে এখন এই একটি কথাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো।
২. স্পেশাল অথরাইজেশন রেজিস্টার
পুরোনো আর্কাইভের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাদের একটি ছোট ঘরে নিয়ে গেলেন।
ঘরের এক পাশে পুরোনো ফাইলের তাক। অন্য পাশে কয়েকটি কাঠের আলমারি।
তিনি বললেন,
—২০০৮ সালের রেজিস্টারগুলো খুব একটা ব্যবহার করা হয়নি। তবে কিছু খাতা এখনো সংরক্ষিত আছে।
আরিয়ান বলল,
—আমরা A-17/18-10 নম্বরের একটি অনুমতিপত্র খুঁজছি।
কর্মকর্তা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—A-17 নম্বরটা পরিচিত মনে হচ্ছে। তবে নিশ্চিত হতে হবে।
তিনি একটি মোটা খাতা বের করে টেবিলে রাখলেন।
খাতার মলাটে লেখা—
Special Authorization Register — 2008
নীরা দ্রুত পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগল।
সেপ্টেম্বরের কয়েকটি এন্ট্রি পেরিয়ে অক্টোবরের পাতায় পৌঁছাল তারা।
১৭ অক্টোবর।
১৮ অক্টোবর।
১৯ অক্টোবর।
১৮ অক্টোবরের এন্ট্রিতে একটি রেফারেন্স নম্বর পাওয়া গেল।
A-17/18-10
নীরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
—এটাই!
আরিয়ান খাতাটা নিজের দিকে টেনে নিল।
এন্ট্রিতে লেখা—
Authorization prepared for final custody transfer of document C-14. Approval subject to verification of original identity and signature.
নীরা পড়ে বলল,
—মানে অনুমতিপত্র তৈরি হয়েছিল, কিন্তু পরিচয় এবং স্বাক্ষর যাচাইয়ের শর্ত ছিল?
কর্মকর্তা বললেন,
—হ্যাঁ। তবে এখানে অনুমতিপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত ব্যক্তির নাম লেখা নেই।
আরিয়ান পরের লাইনটা পড়ল।
সেখানে লেখা—
Supporting document attached separately. Dispatch record to be checked.
রাফি বলল,
—তাহলে আমাদের পরের গন্তব্য Dispatch Register।
কর্মকর্তা মাথা নাড়লেন।
—সেটা পাশের আলমারিতে থাকার কথা।
৩. যে নামটি মুছে ফেলা হয়েছিল
কিছুক্ষণ পর আরেকটি রেজিস্টার টেবিলে রাখা হলো।
Private Document Dispatch Register — 2008
রাফি পৃষ্ঠা খুঁজতে শুরু করল।
নীরা তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ রাফি থেমে গেল।
—স্যার, এখানে কিছু আছে।
আরিয়ান কাছে এগিয়ে এল।
১৮ অক্টোবরের একটি এন্ট্রি।
রেফারেন্স নম্বর—A-17/18-10।
প্রেরণের ধরন—সিল করা খাম।
প্রাপক—নাম আংশিক অস্পষ্ট।
নীরা নিচু হয়ে লেখাটা দেখল।
প্রাপকের নামের প্রথম অক্ষর M।
কিন্তু এবার নামের পাশে আরেকটি তথ্য ছিল।
Designation: Special Trustee Representative
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—স্পেশাল ট্রাস্টি রিপ্রেজেন্টেটিভ! এই পদবিটা কি আগে কোথাও দেখেছি?
আরিয়ান রেজিস্টারের আগের পৃষ্ঠাগুলো দেখতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর সে বলল,
—হ্যাঁ। আজহার রহমানের পুরোনো নির্দেশনায় এই পদবির উল্লেখ ছিল।
নীরা বলল,
—তাহলে ওই ব্যক্তি পরিবারের কেউ ছিলেন না?
—সেটা এখনো বলা যাচ্ছে না। পদবিটা থেকে শুধু বোঝা যাচ্ছে, তিনি বিশেষ অনুমোদনের ভিত্তিতে দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
রাফি বলল,
—স্যার, এখানে আরেকটা বিষয় আছে।
সে নিচের ছোট নোটটি দেখাল।
Recipient identity verified through original authorization letter. Copy not to be retained in ordinary register.
নীরা ধীরে বলল,
—তাহলে আসল অনুমতিপত্রটা কোথাও আলাদা করে রাখা হয়েছিল।
আরিয়ান বলল,
—ঠিক তাই। আর সাধারণ রেজিস্টারে তার কপি রাখার অনুমতিও ছিল না।
কর্মকর্তা এবার বললেন,
—একটা কথা মনে পড়ছে। পুরোনো নথির সঙ্গে একটি আলাদা তালিকা ছিল। সেটাকে বলা হতো Restricted Authorization Index।
আরিয়ান দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
—সেটা কোথায়?
—নিশ্চিত বলতে পারছি না। তবে সম্ভবত পুরোনো ট্রাস্ট বোর্ডের ফাইলের সঙ্গে আছে।
৪. রাশেদের অজানা স্বাক্ষর
আর্কাইভ থেকে বেরিয়ে আরিয়ান রাশেদ রহমানকে ফোন করল।
—আঙ্কেল, ১৮ অক্টোবর ২০০৮-এর একটা নথি পেয়েছি।
ওপাশ থেকে রাশেদ বললেন,
—কী নথি?
—C-14-এর চূড়ান্ত দায়িত্ব হস্তান্তরের অনুমতিপত্র। সেখানে Special Trustee Representative নামে একজনের উল্লেখ আছে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর রাশেদ বললেন,
—এই পদবিটা আমি আগে শুনেছি।
নীরা দ্রুত আরিয়ানের দিকে তাকাল।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—কার কাছ থেকে?
—আজহার সাহেবের কাছ থেকে। তিনি বলেছিলেন, কিছু গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক নথি পরিবারের বাইরের একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে রাখা হবে। তবে তার পরিচয় তখন প্রকাশ করা হয়নি।
নীরা বলল,
—আপনি কি জানতেন, সেই ব্যক্তির নাম M দিয়ে শুরু?
—না। আমি শুধু জানতাম, একজন বিশেষ প্রতিনিধি দায়িত্ব নেবে।
আরিয়ান প্রশ্ন করল,
—আপনি কি ১৮ অক্টোবর কোনো অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন?
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
—আমি সেদিন একটি কাগজে স্বাক্ষর করেছিলাম। কিন্তু সেটি ছিল আমার কাছে একটি নথির তথ্য পৌঁছেছে—এমন স্বীকারোক্তি। আমি কাউকে চূড়ান্ত দায়িত্ব দিইনি।
নীরা বলল,
—আপনি কি কাগজটার কপি রেখেছিলেন?
—না। তবে আমার পুরোনো ব্যক্তিগত ফাইলে সেই দিনের একটি নোট থাকতে পারে।
আরিয়ান বলল,
—আমরা কি সেটা দেখতে পারি?
—অবশ্যই। তোমরা বিকেলে বাসায় এসো।
৫. পুরোনো চিঠির ভেতরে নতুন সূত্র
বিকেলে রাশেদের বাড়িতে পৌঁছাল নীরা ও আরিয়ান।
রাশেদ নিজের ঘরের আলমারি থেকে একটি পুরোনো ফাইল বের করলেন।
ফাইলের ভেতরে বিভিন্ন চিঠি, রসিদ ও ব্যক্তিগত নোট।
তিনি একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করে বললেন,
—এটা ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসের। আমি তখন বুঝতে পারিনি, ভবিষ্যতে এটা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নীরা কাগজটা হাতে নিল।
তারিখ লেখা—
১৮ অক্টোবর ২০০৮
রাশেদের হাতের লেখায় ছোট একটি নোট।
আজহার রহমানের নির্দেশ অনুযায়ী C-14-এর মূল নথির চূড়ান্ত দায়িত্ব একজন বিশেষ প্রতিনিধির হাতে দেওয়ার কথা শুনলাম। আমি শুধু প্রক্রিয়ার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত হয়েছি। প্রাপকের পরিচয় এবং অনুমতিপত্রের সত্যতা নিজে যাচাই করিনি।
নীরা ধীরে পড়ল।
তারপর নিচের লাইনটা দেখল।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তির নাম অনুমান করা উচিত নয়।
আরিয়ান বলল,
—আঙ্কেল, এই নোটটা কি আপনি নিজে লিখেছিলেন?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আপনি জানতেন, চূড়ান্ত দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেই ব্যক্তিকে চিনতেন না?
—ঠিক তাই।
নীরা কাগজটা আবার পড়ল।
—তাহলে আপনার স্বাক্ষর ব্যবহার করে কেউ যদি দাবি করে যে আপনি ওই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করেছিলেন, সেটা ভুল হবে।
রাশেদ মাথা নাড়লেন।
—আমি কখনো তার পরিচয় নিশ্চিত করিনি।
আরিয়ান নোটটা সাবধানে ফাইলে রাখল।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি মেসেজ এল।
অপরিচিত নম্বর।
“A-17-এর অনুমতিপত্র খুঁজে লাভ হবে না, যদি না আপনারা Restricted Authorization Index দেখেন। সেখানে নাম নয়, পরিচয়ের কোড রাখা হয়েছিল।”
আরেকটি মেসেজ এল কয়েক সেকেন্ড পর।
“M শুধু নামের প্রথম অক্ষর নয়। সেটি একটি অনুমোদিত পরিচয়-শ্রেণির সংকেতও হতে পারে।”
নীরা মেসেজ দুটো পড়ে বলল,
—আবার সেই অচেনা নম্বর!
আরিয়ান ফোনটা নামিয়ে রাখল।
—এবার অন্তত একটা নতুন সূত্র দিয়েছে।
—কিন্তু আমরা কীভাবে জানব, কথাগুলো সত্যি?
—যাচাই না করে বিশ্বাস করব না।
নীরা মাথা নাড়ল।
তারপর বলল,
—Restricted Authorization Index কোথায় পাওয়া যাবে?
আরিয়ান রাশেদের দিকে তাকাল।
রাশেদ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—আজহার সাহেবের ব্যক্তিগত নথির তালিকায় একবার এই নামটা দেখেছিলাম। আমার মনে হয়, সেই তালিকার আরেকটি কপি নিহারিকার কাছে থাকতে পারে।
নীরা অবাক হলো।
—নিহারিকা খালার কাছে?
—হ্যাঁ। আজহার সাহেবের মৃত্যুর পর কিছু ব্যক্তিগত নথি তার কাছে রাখা হয়েছিল।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ পরিষ্কার।
৬. নামের বদলে কোড
রাত হয়ে গেছে।
নীরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
আরিয়ান টেবিলের ওপর A-17-এর নোটগুলো সাজাচ্ছিল।
নীরা বলল,
—একটা বিষয় বুঝতে পারছি না।
—কী?
—যদি আজহার রহমান নিজেই কাউকে দায়িত্ব দিয়ে থাকেন, তাহলে তার পরিচয় গোপন রাখার প্রয়োজন কেন ছিল?
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—হয়তো নথিগুলোকে পারিবারিক বিরোধের বাইরে রাখতে চেয়েছিলেন।
—অথবা কাউকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।
—সেটাও সম্ভব। কিন্তু কারণ জানার আগে কাউকে সন্দেহ করা ঠিক হবে না।
নীরা টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল।
—আমরা এতদিন P-07 খুঁজেছি। এখন বুঝলাম, P-07 শুধু অস্থায়ী দায়িত্বে ছিল। আসল ব্যক্তি ছিল অন্য কেউ।
আরিয়ান বলল,
—হ্যাঁ। আর সেই ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করার জন্যই Restricted Authorization Index তৈরি করা হয়েছিল।
নীরা নিচু গলায় বলল,
—তাহলে এতদিন আমরা ভুল জায়গায় নাম খুঁজছিলাম।
আরিয়ান তার দিকে তাকাল।
—ভুল জায়গায় নয়, নীরা। আমরা ধাপে ধাপে এগিয়েছি। P-07 না জানলে Final Custodian-এর অস্তিত্বই বুঝতে পারতাম না।
নীরা মৃদু মাথা নাড়ল।
তারপর টেবিলের ওপর রাখা রাশেদের নোটের দিকে তাকাল।
একটা অদ্ভুত ব্যাপার।
২০০৮ সালের সেই নোটে রাশেদ লিখেছিলেন—
“পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তির নাম অনুমান করা উচিত নয়।”
কিন্তু কেউ একজন সেই পরিচয় জানত।
কেউ একজন জানত, M কেবল একটি অক্ষর নয়।
আর সেই কেউ হয়তো আজও তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের খবর রাখছে।
আরিয়ানের ফোন আবার বেজে উঠল।
এবার কল।
অপরিচিত নম্বর।
আরিয়ান কল রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল।
—আপনারা Restricted Authorization Index খুঁজছেন?
আরিয়ান বলল,
—হ্যাঁ। আপনি কে?
লোকটি উত্তর দিল,
—আমার নাম এখন জানার দরকার নেই। শুধু একটা কথা মনে রাখবেন।
—কী কথা?
—আজহার রহমান যে ব্যক্তিকে চূড়ান্ত দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তিনি কখনো নিজেকে পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেননি।
আরিয়ান চুপ করে রইল।
লোকটি আবার বলল,
—আরেকটা বিষয় আছে। ১৮ অক্টোবরের অনুমতিপত্রে যে স্বাক্ষর আছে, সেটি প্রাপকের স্বাক্ষর নয়।
নীরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
আরিয়ান দ্রুত প্রশ্ন করল,
—তাহলে কার স্বাক্ষর?
ওপাশের লোকটি কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বলল,
—যে ব্যক্তি অনুমতিপত্র তৈরি করেছিল, তার।
কল কেটে গেল।
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।
নীরা ধীরে বলল,
—তাহলে প্রাপকের নিজের কোনো স্বাক্ষর নেই?
আরিয়ান ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
—সম্ভবত পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য অন্য কোনো নথি ব্যবহার করা হয়েছিল।
নীরা বলল,
—সেই নথিটাই Restricted Authorization Index?
আরিয়ান উত্তর দিল না।
সে শুধু রেজিস্টারের একটি ফটোকপি তুলে নিল।
সেখানে M অক্ষরের পাশে লেখা ছিল—
Special Trustee Representative.
আর তার নিচে ছোট করে একটি কোড—
M-04
নীরা কোডটা দেখে স্থির হয়ে গেল।
—M-04!
আরিয়ান এবার তার দিকে তাকাল।
—কী হয়েছে?
নীরা ধীরে বলল,
—এই কোডটা আমি আগে দেখেছি।
—কোথায়?
নীরা কিছুক্ষণ মনে করার চেষ্টা করল।
তারপর হঠাৎ বলল,
—আজহার রহমানের সেই পুরোনো চিঠিতে। যে চিঠিটা আমরা প্রথমবার পুরোনো বাড়িতে পেয়েছিলাম।
আরিয়ান দ্রুত ফাইল খুলল।
চিঠির শেষ অংশে ছোট করে লেখা ছিল—
“M-04-এর পরিচয় প্রকাশ করা হবে কেবল মূল অনুমতিপত্রের মাধ্যমে।”
দুজনেই একে অপরের দিকে তাকাল।
এতদিন ধরে যে নামটা তারা খুঁজছিল, সেই নামের বদলে এবার হাতে এসেছে একটি কোড।
আর সেই কোডের পরিচয় লুকিয়ে আছে এমন এক নথিতে, যেটি আজও তাদের নাগালের বাইরে।
চলবে...