ফন্ট সাইজ:
থিম:
চিঠি থেকে ভালোবাসা

পর্ব 3

লেখক: মারজান আক্তার মির্হা

চিঠি থেকে ভালোবাসা

লেখিকা: মারজান আক্তার মির্হা

তৃতীয় পর্ব:

নতুন মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর দিনগুলো মোটামুটি ভালোই কাটছিল। প্রথমদিকে মনে হয়েছিল, নতুন জায়গায় হয়তো মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই হয়নি। কারণ, আমার আগের স্কুলের বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রীও একই মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিল। তাই জায়গাটা একেবারে অপরিচিত মনে হয়নি।

পরিচিত কয়েকজনকে পাশে পেয়ে প্রথম থেকেই ভালো লাগছিল। নতুন করে যাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, তাদের সঙ্গেও ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব তৈরি হতে থাকে। আমি সবার সঙ্গে মিশতাম, কথা বলতাম। খুব বেশি বাছবিচার করতাম না। এভাবেই অল্প দিনের মধ্যে অনেকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক হয়ে যায়।

সহপাঠীদের মধ্যে বেশিরভাগই আমাকে পছন্দ করত। তবে একজনের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা একটু অন্যরকম ছিল। তার নাম খাদিজা।

খাদিজা আমাকে খুব একটা পছন্দ করত না। বিশেষ করে পড়াশোনার বিষয়টি নিয়ে তার মধ্যে একধরনের হিংসা কাজ করত। আমি আগে স্কুলে পড়াশোনা করেও তার চেয়ে ভালো করতাম। বিষয়টি সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারত না। হয়তো তার মনে হতো, স্কুল থেকে আসা একটা মেয়ে কীভাবে তার চেয়ে পড়াশোনায় ভালো হয়!

এ কারণেই সে আমাকে হিংসা করত বলে আমার মনে হতো।

তবে আমি এসব নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতাম না। কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নিজেকে প্রমাণ করার ইচ্ছা আমার ছিল না। আমি নিজের মতো পড়াশোনা করতাম। ক্লাসের কাজ শেষ করতাম, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতাম। কে কী ভাবছে, কে আমাকে পছন্দ করছে না, এসব নিয়ে তখন আমার খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না।

আমার কাছে তখন মাদ্রাসার জীবনটাই ছিল নতুন এক অভিজ্ঞতা। প্রতিদিনের ক্লাস, শিক্ষকদের পড়ানো, সহপাঠীদের সঙ্গে গল্প করা—সব মিলিয়ে দিনগুলো ভালোই যাচ্ছিল।

এদিকে আমাদের দুই পরিবারের যোগাযোগও ধীরে ধীরে বাড়ছিল। কাকার পরিবারের সঙ্গে আমাদের আগে থেকেই সম্পর্ক ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। পরিবারের মানুষদের দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা বাড়তে থাকে। আর সেই সূত্রেই নাবিলের সঙ্গে আমার মাঝেমধ্যে দেখা হতো।

নাবিল তখন মাদ্রাসায় পড়ত। সে মাদ্রাসা থেকে বাসায় ফিরলে কখনো কখনো দেখা হয়ে যেত। দেখা হলে একটু কথা হতো, কখনো দুষ্টুমি, আবার কখনো সবাই মিলে একসঙ্গে সময় কাটানো হতো।

আমাদের মধ্যে তখন খুব সাধারণ একটা সম্পর্ক ছিল। একে অপরকে নিয়ে মজা করা কিংবা ছোটখাটো দুষ্টুমি করা—এগুলোই ছিল মূলত আমাদের যোগাযোগের অংশ।

একবার আমি দুষ্টুমি করতে গিয়ে তার রুবিকস কিউব ভেঙে দিয়েছিলাম। ঘটনাটা মনে পড়লে এখনো হাসি পায়। তখন হয়তো বিষয়টা নিয়ে একটু মজা হয়েছিল। নাবিল কীভাবে নিয়েছিল, সেটা এখন ঠিক মনে নেই। তবে আমার কাছে সেটা ছিল নিছক একটা দুষ্টুমি।

মাঝেমধ্যে আমরা সবাই মিলে ঝালমুড়ি পার্টি করতাম। এই ছোট্ট আয়োজনগুলো আমাদের সময় কাটানোর অন্যতম আনন্দের বিষয় ছিল। সবাই মিলে বসে ঝালমুড়ি খাওয়া, গল্প করা আর হাসাহাসি—এসবের মধ্যে অন্যরকম একটা আনন্দ ছিল।

বিশেষ করে নাবিল যখন আসত, তখন ঝালমুড়ি পার্টিটা আরও জমে উঠত। সবাই একসঙ্গে থাকতাম। কেউ মজা করত, কেউ গল্প করত, আবার কেউ হয়তো অন্যদের কথা শুনে হাসত।

সেই সময়গুলোতে আমি কখনো ভাবিনি যে একদিন এই সাধারণ মুহূর্তগুলোই আমার কাছে এত স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আমাদের বয়স তখন কম ছিল। তাই এসব ছোটখাটো আনন্দই অনেক বড় মনে হতো। কখনো কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই সবাই একসঙ্গে বসে যেতাম, আবার কখনো সামান্য একটা বিষয় নিয়েই অনেক হাসাহাসি হতো।

নাবিলের সঙ্গে আমার পরিচয়ও তখন এমনই ছিল। সে আসত, দেখা হতো, কথা হতো, তারপর আবার যার যার মতো সময় কেটে যেত।

তবে একটা ঘটনা আছে, যেটা আজও আমার বেশ ভালোভাবে মনে আছে।

সেদিন রাত প্রায় নয়টা হবে। আমি আর আমার এক চাচাতো বোন নাবিলদের বাসায় বসে ছিলাম। আমার দাদু আমাকে নিতে আসবেন, তাই আমরা অপেক্ষা করছিলাম। অপেক্ষা করতে করতে আমি আর আমার চাচাতো বোন নিজেদের মধ্যে দুষ্টুমি করছিলাম।

রাতের পরিবেশটা বেশ স্বাভাবিক ছিল। আমরা নিজেদের মতো সময় কাটাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই নাবিল সেখানে এলো।

এসে সে আমাকে বলল,

— তোমার একটা ছবি তুলেছি।

কথাটা শুনেই আমার মাথা গরম হয়ে গেল। আমি একদমই বুঝতে পারছিলাম না, সে কেন আমার ছবি তুলবে! তাই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে প্রায় জোর করেই তার কাছ থেকে মোবাইলটা নিয়ে নিলাম।

আমার উদ্দেশ্য ছিল গ্যালারিতে গিয়ে দেখা, সত্যিই সে আমার কোনো ছবি তুলেছে কি না।

মোবাইলের গ্যালারি খুলে ভালোভাবে খুঁজলাম। কিন্তু সেখানে আমার কোনো ছবিই পেলাম না।

ছবি না পেয়ে অন্যদিকে চোখ যেতেই একটা লেখা দেখতে পেলাম।

সেখানে লেখা ছিল—

I LOVE YOU

লেখাটা দেখে আমি একটু অবাক হয়েছিলাম কি না, এখন ঠিক মনে নেই। তবে এটুকু মনে আছে, বিষয়টাকে আমি তেমন গুরুত্ব দিইনি। তখন আমার মাথায় অনেক প্রশ্ন আসেনি, কিংবা লেখাটার পেছনে কোনো বিশেষ অর্থ খোঁজার চেষ্টাও করিনি।

আমি নাবিলকে নিয়ে তখন আলাদা করে কিছু ভাবতাম না। তার প্রতি আমার কোনো বিশেষ অনুভূতিও তৈরি হয়নি। এমনকি ভালোবাসা বলতে আসলে কী বোঝায়, সেটাও তখন ঠিকভাবে বুঝতাম না।

তাই মোবাইলে ওই কথাগুলো দেখার পরও আমার কাছে সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক ছিল।

আমি হয়তো লেখাটাকে সামান্য দুষ্টুমি হিসেবেই নিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর বিষয়টা ভুলেও গিয়েছিলাম। আমার কাছে তখন পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো আর পরিবারের মানুষের সঙ্গে আনন্দ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সেদিনের পর আর বিষয়টি নিয়ে বিশেষ কিছু ঘটেছিল কি না, তা আমার মনে নেই। তবে পরদিন যথারীতি খাওয়া-দাওয়া করে আবার মাদ্রাসায় চলে যাই।

নতুন দিনের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। ক্লাস, পড়াশোনা আর সহপাঠীদের সঙ্গে সময় কাটানো—সবকিছু আগের মতো চলতে থাকে।

নাবিলের মোবাইলে দেখা সেই লেখাটাও আমার মনে আর তেমন জায়গা করে নেয়নি।

কিন্তু এখন যখন পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে করি, তখন ঘটনাটা বারবার মনে পড়ে। ভাবি, সেদিন যদি একটু অন্যভাবে বিষয়টা বুঝতাম, তাহলে হয়তো নাবিলকে কিছু প্রশ্ন করতাম। কিন্তু তখন তো এসব বোঝার মতো বয়স বা অভিজ্ঞতা কোনোটাই ছিল না।

আমার কাছে নাবিল ছিল পরিচিত একজন মানুষ। পরিবারের সূত্রে দেখা হতো, মাঝেমধ্যে দুষ্টুমি হতো, সবাই মিলে ঝালমুড়ি খাওয়া হতো। এর বাইরে তাকে নিয়ে আমার আলাদা কোনো ভাবনা ছিল না।

আমি জানতাম না, তার মনে কী চলছিল। জানার প্রয়োজনও অনুভব করিনি।

এভাবেই দিনগুলো পার হতে লাগল। ২০২১ সালও ধীরে ধীরে শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলাচ্ছিল। আমিও বড় হচ্ছিলাম, পড়াশোনার নতুন ধাপে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।

তবে তখনো আমার জীবনে ভালোবাসা নিয়ে কোনো গল্প শুরু হয়নি।

সেই সময়ের ছোট ছোট ঘটনাগুলোকে আমি কখনো গল্পের অংশ হিসেবে দেখিনি। মনে করিনি, একদিন এগুলো নিয়ে এত কিছু লিখতে হবে। অথচ আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, মানুষের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতির শুরু হয় একেবারে সাধারণ কিছু ঘটনা দিয়ে।

সেদিনের সেই রাত, নাবিলের বলা কথাটা, মোবাইলের গ্যালারিতে দেখা ছোট্ট লেখাটি—সবকিছুই এখন অতীতের স্মৃতি।

আমি তখনো জানতাম না, সামনে ২০২২ সাল আসছে। জানতাম না, সেই বছরে এমন একটি ঘটনা ঘটবে, যা আমার জীবনের গল্পকে অন্যদিকে নিয়ে যাবে।

একটা চিঠি আসবে।

সেই চিঠির সঙ্গে জড়িয়ে যাবে কিছু নতুন অনুভূতি, কিছু প্রশ্ন আর এমন কিছু স্মৃতি, যা আজও ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।

কিন্তু সেসব তখনো অনেক দূরের কথা।

তখন আমি শুধু নিজের মতো করে দিন কাটাচ্ছিলাম। আর নাবিল? সে তখন আমার জীবনের পরিচিত মানুষগুলোর একজন হয়েই ছিল।

কিছু গল্প শুরু হওয়ার আগে কেউ বুঝতেই পারে না, সে আসলে একটি গল্পের মধ্যেই বেঁচে আছে।

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন